গ্যাসের দাম বাড়ালে আমরা পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব: নাহিদ ইসলাম
সরকারকে পাঁচ বছর অতিক্রম করার সুযোগ দেওয়া হবে না জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার যদি মনে করে এভাবে পাঁচ বছর অতিক্রম করবে, এই সুযোগ দেওয়া হবে না। দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না।
টিকে থাকতে হলে দমন-পীড়ন, নির্যাতন করে টিকে থাকতে হয়, যেটা আমরা শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেখেছি।
এ সময় তিনি সরকারের জ্বালানিনীতিরও সমালোচনা করে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে আমরা অবশ্যই পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব। ঢাকা শহরের মানুষও দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাতে আহত আলিফ চৌধুরীকে দেখতে রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, হবিগঞ্জে হামলার শিকার কিশোর আলিফের একটি চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং অন্য চোখও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই চোখে দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অন্য চোখও কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের বোর্ড সভার পর আলিফের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।
তিনি বলেন, আমি সিলেট থেকে এসেছি। গত কয়েক দিনে সিলেটে কী ঘটেছে, তা সবাই জানেন। তিন দিন হয়ে গেল, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আলিফের খোঁজ নেওয়া হয়নি। সরকারি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে, এটি ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট। হবিগঞ্জ সদর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব হামলায় জড়িত ছিল। আমরা অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, সরকার বার্তা দিচ্ছে যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ছাত্রদল-যুবদলের সন্ত্রাসীরা চাইলে দিনের আলোয় হামলা করতে পারে, মানুষকে হত্যা করতে পারে, চোখ উপড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তার বিচার হবে না। আমরা যখন এই ঘটনার প্রতিবাদে কর্মসূচি দিচ্ছি, তখনও সরকারি দল বাধা দিচ্ছে। হবিগঞ্জে আমরা দেখেছি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রায় এক হাজার সন্ত্রাসী জড়ো হয়েছিল। পুলিশ কিছুই করেনি। একটি সভ্য সমাজে এটা কল্পনাও করা যায় না।
সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জি কে গউসের অনুসারী যে ব্যক্তি আলিফের ওপর হামলা করেছে এবং সারজিস আলমের গাড়িতেও হামলা চালিয়েছে, অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে হলে তিনি এতক্ষণে ক্ষমা চাইতেন, পদত্যাগ করতেন অথবা দল থেকে বহিষ্কৃত হতেন।
প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। প্রধানমন্ত্রী স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না।
অভিভাবকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে আলিফের চোখ গেছে, কালকে আপনার সন্তানেরও চোখ যেতে পারে। কারণ এই সন্ত্রাসী বাহিনীকে যদি প্রতিরোধ করা না যায়, তারা পুলিশ মানে না, বিচার মানে না। আপনার সন্তানও এই সরকারের কাছে নিরাপদ নয়।
তিনি আরও বলেন, শুধু সিলেট নয়, কুড়িগ্রাম, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এনসিপি, ছাত্রশক্তি ও যুবশক্তির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমনের চেষ্টা করছে।
আলিফের উদ্ধৃতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আলিফ আমাকে বলেছে, কাঁটা গলায় বিঁধে যাওয়ার আগেই কাঁটা তুলে ফেলতে হয়। বিঁধে গেলে অনেক ক্ষতি হয়।
সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যদি সরকার মনে করে এভাবে পাঁচ বছর পার করবে, সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। টিকে থাকতে হলে দমন-পীড়নের পথেই থাকতে হয়, যেমনটি শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেখা গেছে।
এ সময় তিনি সরকারের জ্বালানিনীতিরও সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং সিএনজির গ্যাসের দাম ৪২ টাকা থেকে ৬৫ টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।
সরকার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দফায় দফায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। আবাসিক গ্যাসের দামও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। মানুষ গ্যাস না পেলেও নিয়মিত বিল দিচ্ছে।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, দেশে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, শিল্পকারখানা বিদ্যুৎ সংকটে রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক হয়রানি ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পেট্রোবাংলা ঘেরাও কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে আমরা অবশ্যই পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব। ঢাকা শহরের মানুষও দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে।
তিনি আরও বলেন, ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো হয়েছে। পদবঞ্চিত নেতাদের মূল্যায়ন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পাঁচ মাসেই সরকারের অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী চরিত্র জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি দল পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন, তাই ১৮ কোটি মানুষের দেশ পরিচালনাও তার পক্ষে সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, সরকার আলিফের পাশে নেই। আমরা সরকারের কাছে বিচার, ক্ষতিপূরণ বা সহানুভূতি প্রত্যাশা করি না। কিন্তু সারা বাংলাদেশের মানুষ, গণঅভ্যুত্থানের শক্তি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আলিফের পাশে আছে। আমরা জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাই। সরকারের সন্ত্রাসী ও দমন-পীড়নের আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি


আপনার মতামত লিখুন
Array