খুঁজুন
                               
, ,
           

গ্যাসের দাম বাড়ালে আমরা পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব: নাহিদ ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬, ২:৪১ পূর্বাহ্ণ
গ্যাসের দাম বাড়ালে আমরা পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব: নাহিদ ইসলাম

সরকারকে পাঁচ বছর অতিক্রম করার সুযোগ দেওয়া হবে না জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‌‌সরকার যদি মনে করে এভাবে পাঁচ বছর অতিক্রম করবে, এই সুযোগ দেওয়া হবে না। দেশের পরিস্থিতি খুবই খারাপ। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না।

টিকে থাকতে হলে দমন-পীড়ন, নির্যাতন করে টিকে থাকতে হয়, যেটা আমরা শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেখেছি।

এ সময় তিনি সরকারের জ্বালানিনীতিরও সমালোচনা করে বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে আমরা অবশ্যই পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব। ঢাকা শহরের মানুষও দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাতে আহত আলিফ চৌধুরীকে দেখতে রাজধানীর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গিয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, হবিগঞ্জে হামলার শিকার কিশোর আলিফের একটি চোখের দৃষ্টি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এবং অন্য চোখও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই চোখে দৃষ্টি ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। অন্য চোখও কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না চিকিৎসকরা। চিকিৎসকদের বোর্ড সভার পর আলিফের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।

তিনি বলেন, আমি সিলেট থেকে এসেছি। গত কয়েক দিনে সিলেটে কী ঘটেছে, তা সবাই জানেন। তিন দিন হয়ে গেল, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে আলিফের খোঁজ নেওয়া হয়নি। সরকারি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে, এটি ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট। হবিগঞ্জ সদর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব হামলায় জড়িত ছিল। আমরা অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, সরকার বার্তা দিচ্ছে যে তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ছাত্রদল-যুবদলের সন্ত্রাসীরা চাইলে দিনের আলোয় হামলা করতে পারে, মানুষকে হত্যা করতে পারে, চোখ উপড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু তার বিচার হবে না। আমরা যখন এই ঘটনার প্রতিবাদে কর্মসূচি দিচ্ছি, তখনও সরকারি দল বাধা দিচ্ছে। হবিগঞ্জে আমরা দেখেছি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রায় এক হাজার সন্ত্রাসী জড়ো হয়েছিল। পুলিশ কিছুই করেনি। একটি সভ্য সমাজে এটা কল্পনাও করা যায় না।

সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, জি কে গউসের অনুসারী যে ব্যক্তি আলিফের ওপর হামলা করেছে এবং সারজিস আলমের গাড়িতেও হামলা চালিয়েছে, অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে হলে তিনি এতক্ষণে ক্ষমা চাইতেন, পদত্যাগ করতেন অথবা দল থেকে বহিষ্কৃত হতেন।

প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো বক্তব্য নেই। প্রধানমন্ত্রী স্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না।

অভিভাবকদের উদ্দেশে নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে আলিফের চোখ গেছে, কালকে আপনার সন্তানেরও চোখ যেতে পারে। কারণ এই সন্ত্রাসী বাহিনীকে যদি প্রতিরোধ করা না যায়, তারা পুলিশ মানে না, বিচার মানে না। আপনার সন্তানও এই সরকারের কাছে নিরাপদ নয়।

তিনি আরও বলেন, শুধু সিলেট নয়, কুড়িগ্রাম, সাভার, কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এনসিপি, ছাত্রশক্তি ও যুবশক্তির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার বিরোধী মতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দমনের চেষ্টা করছে।

আলিফের উদ্ধৃতি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, আলিফ আমাকে বলেছে, কাঁটা গলায় বিঁধে যাওয়ার আগেই কাঁটা তুলে ফেলতে হয়। বিঁধে গেলে অনেক ক্ষতি হয়।

সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, যদি সরকার মনে করে এভাবে পাঁচ বছর পার করবে, সেই সুযোগ দেওয়া হবে না। দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের রায় অস্বীকার করে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। টিকে থাকতে হলে দমন-পীড়নের পথেই থাকতে হয়, যেমনটি শেখ হাসিনার সরকারের সময় দেখা গেছে।

এ সময় তিনি সরকারের জ্বালানিনীতিরও সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে ২৫ টাকা এবং সিএনজির গ্যাসের দাম ৪২ টাকা থেকে ৬৫ টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে, শিল্প-কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে।

সরকার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দফায় দফায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। আবাসিক গ্যাসের দামও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে। মানুষ গ্যাস না পেলেও নিয়মিত বিল দিচ্ছে।

নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, দেশে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, শিল্পকারখানা বিদ্যুৎ সংকটে রয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা প্রশাসনিক হয়রানি ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ দিয়ে সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পেট্রোবাংলা ঘেরাও কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে আমরা অবশ্যই পেট্রোবাংলা ঘেরাও করব। ঢাকা শহরের মানুষও দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে।

তিনি আরও বলেন, ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক বসানো হয়েছে। পদবঞ্চিত নেতাদের মূল্যায়ন করতে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পাঁচ মাসেই সরকারের অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী চরিত্র জনগণের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, তিনি দল পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন, তাই ১৮ কোটি মানুষের দেশ পরিচালনাও তার পক্ষে সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সরকার আলিফের পাশে নেই। আমরা সরকারের কাছে বিচার, ক্ষতিপূরণ বা সহানুভূতি প্রত্যাশা করি না। কিন্তু সারা বাংলাদেশের মানুষ, গণঅভ্যুত্থানের শক্তি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আলিফের পাশে আছে। আমরা জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানাই। সরকারের সন্ত্রাসী ও দমন-পীড়নের আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি 

প্রত্যাবাসনেই রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান দেখছেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৯ অপরাহ্ণ
প্রত্যাবাসনেই রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান দেখছেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা

রোহিঙ্গা সংকটকে দীর্ঘদিন ধরে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সময়ের সঙ্গে এর চরিত্র বদলে এখন তা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনৈতিক স্বার্থ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এমন বাস্তবতায় সংকট মোকাবিলায় মানবিক দায়িত্বের পাশাপাশি নিরাপত্তা, কূটনীতি ও সীমান্ত প্রতিরোধ সক্ষমতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ আয়োজিত সেমিনারে দেওয়া সমাপনী বক্তব্যে তিনি রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের সামনে তৈরি হওয়া বহুমাত্রিক ঝুঁকির একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরেন।

মানবিক সংকট থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রোহিঙ্গা সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন মানবিক ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দীর্ঘস্থায়ী শরণার্থী পরিস্থিতি, ক্যাম্পে অপরাধ ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, মাদক পাচার এবং সীমান্তের অস্থিতিশীলতা মিলিয়ে সংকটটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার অবস্থান এবং ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিকে তিনি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্যাম্পে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং মাদক পাচার অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের ঘিরে দুই হাজারের বেশি মামলা হওয়ার তথ্যও সংকটের সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাগত মাত্রাকে সামনে নিয়ে আসে। অর্থাৎ, শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা শুধু রোহিঙ্গাদের জীবনকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে না; স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।

রাখাইনে নতুন বাস্তবতা, বাড়ছে সীমান্তঝুঁকি
সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিবর্তিত সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, রাখাইনের বড় অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। ফলে বাংলাদেশকে শুধু মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের হিসাব করলেই হবে না; সীমান্তের ওপারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাকারী অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আরাকান আর্মির অবস্থান নিয়ে তাঁর উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর অর্থ হলো, প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হলেও নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, অধিকার এবং প্রত্যাবর্তন-পরবর্তী পরিস্থিতির নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।

অতীতের অভিজ্ঞতা, ভবিষ্যতের কূটনৈতিক পথ
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ১৯৭৮ এবং নব্বইয়ের দশকের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—ধৈর্য, ধারাবাহিকতা ও কৌশলগত দৃঢ়তার সঙ্গে পরিচালিত কূটনীতি দীর্ঘমেয়াদি ফল দিতে পারে। এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মানবিক আবেদনকে কার্যকর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত করা। জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, চীন ও ভারতসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনকে সম্পৃক্ত রাখার কৌশল সেই লক্ষ্যেই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে চীন ও ভারতের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টি বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান শুধু ঢাকা ও নেপিডোর দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং বড় শক্তিগুলোর স্বার্থও জড়িয়ে আছে।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিতে ছয় কৌশল
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় সরকারের ছয়টি কৌশলগত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। এগুলোর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে সম্পৃক্ত করা, চীন-ভারতের মধ্যে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা, মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে পৃথক যোগাযোগ, ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার, পূর্ব সীমান্তে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি এবং আসিয়ান ও ওআইসিকে সম্পৃক্ত করে আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলা। এই ছয়টি পদক্ষেপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এখন কেবল প্রত্যাবাসনকেন্দ্রিক নয়; বরং প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হওয়ার আগ পর্যন্ত নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্যাবাসনযোগ্য ৩ লাখ ৮ হাজার রোহিঙ্গা—কতটা বাস্তব অগ্রগতি?
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ১৫ আগস্টের ঘোষণায় ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনযোগ্য হিসেবে যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার মূল্যায়ন, এই উদ্যোগ প্রকৃত প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতির চেয়ে আন্তর্জাতিক চাপ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের অবস্থান শক্ত করার কৌশলও হতে পারে। এই সন্দেহের কারণও রয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, প্রত্যাবাসন নিয়ে ঘোষণা ও বাস্তব প্রত্যাবাসনের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ফলে এবার শুধু তালিকা যাচাই বা কূটনৈতিক ঘোষণা নয়, বাস্তবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে কি না—সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।

সামনে বাংলাদেশের জন্য কঠিন সমীকরণ
রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর সমাধান বাংলাদেশের একক সক্ষমতার মধ্যে নেই। বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে, মানবিক সহায়তা দিচ্ছে এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে; কিন্তু সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। তাই একদিকে ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে সীমান্তে বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধ সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের দরজা খোলা রেখে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপও অব্যাহত রাখতে হবে।

এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকেন্দ্রিক পদক্ষেপ যেন মানবিক দায়বদ্ধতাকে দুর্বল না করে এবং মানবিক কার্যক্রম যেন জাতীয় নিরাপত্তার বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করে—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই হবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

টেকসই সমাধানের কেন্দ্রে প্রত্যাবাসন
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার বক্তব্যের সারকথা হলো, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকাল শরণার্থী অবস্থান নয়; বরং নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন। তবে সেই প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিয়ে নিজেদের ভূমিতে ফিরতে পারেন।

এখন বাংলাদেশের সামনে তাই দ্বিমুখী দায়িত্ব—একদিকে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দেশের নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখা। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে এই দুই দায়িত্বকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে সমন্বয় করা যায় তার ওপর।

রোহিঙ্গা সংকট যত দীর্ঘ হবে, এর নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক মাত্রাও তত গভীর হবে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—আন্তর্জাতিক সমর্থনকে কার্যকর কূটনৈতিক চাপে রূপ দেওয়া, সীমান্ত ও ক্যাম্প নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং শেষ পর্যন্ত নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য বাস্তবসম্মত পথ তৈরি করা। এ পথ দীর্ঘ ও কঠিন হলেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে এর কোনো বিকল্প নেই।

কালের আলো/এমএএএমকে

মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ছেলেদের জন্যও উপবৃত্তির ভাবনা সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৬ অপরাহ্ণ
মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ছেলেদের জন্যও উপবৃত্তির ভাবনা সরকারের

নারীদের শিক্ষার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে উপবৃত্তি দেয় সরকার। এবার ছেলেদের শিক্ষায় উৎসাহিত করতে তাদেরকেও মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে উপবৃত্তি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হলো প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে একটি বৈঠকে।

ওই বৈঠকে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত ছাত্রীদের জন্য সর্বজনীন উপবৃত্তি পুনর্বহালের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের উদ্যোগে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, বৈঠকে মেয়েদের জন্য সর্বজনীন উপবৃত্তি পুনর্বহাল করা হলে সম্ভাব্য ব্যয়, উপকারভোগীর সংখ্যা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং এর প্রত্যাশিত সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রভাব বিশ্লেষণ করে একটি সুস্পষ্ট প্রস্তাব প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একইসঙ্গে ছেলেদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে উপবৃত্তি দেওয়ার বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে।

উপ-প্রেস সচিব জানান, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের চলমান কার্যক্রম, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে আর্থিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তাদের ঝরে পড়া রোধে ট্রাস্টের ভূমিকা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হয়।

বৈঠকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার আমলে মেয়েদের জন্য চালু হওয়া সর্বজনীন উপবৃত্তি কর্মসূচির প্রভাব ও অর্জন নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সময় মেয়েদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষাজীবন অব্যাহত রাখা এবং বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহিত করার ক্ষেত্রে সর্বজনীন উপবৃত্তির ইতিবাচক প্রভাবের বিষয়গুলো উঠে আসে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব।

বৈঠকে শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকেও শিক্ষার মানোন্নয়নের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ সময় বিদ্যালয় পর্যায়ে মিড-ডে মিল কার্যক্রমের ব্যবস্থাপনা, খাবারের পুষ্টিমান এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত ও সরবরাহ নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সরবরাহ করা খাবার যাতে পুষ্টিকর, নিরাপদ ও মানসম্মত হয় এবং কোনোভাবেই খাদ্যের মানের সঙ্গে আপস না করা হয়, সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।

শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, মিড-ডে মিল কার্যক্রম বাস্তবায়নে ব্যয়, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ এবং খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয় বিবেচনায় রেখে দুটি বিকল্প পদ্ধতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। উভয় পদ্ধতির কার্যকারিতা, বাস্তবায়নযোগ্যতা ও সম্ভাব্য ফলাফল যাচাই করতে পৃথক দু’টি জেলায় প্রতিটি পদ্ধতির পাইলট প্রকল্প চালুর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র মাহদী আমিন, শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

বাড়ছে নারী মাদকাসক্তি, ঝুঁকিতে পরিবার

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৪৪ অপরাহ্ণ
বাড়ছে নারী মাদকাসক্তি, ঝুঁকিতে পরিবার

নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তির প্রবণতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীতে ইয়াবা, গাঁজা ও অ্যালকোহলের পাশাপাশি ই-সিগারেট ব্যবহারের প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। মাদকাসক্ত নারীদের তালিকায় শিক্ষার্থী ও বেকারের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত চাকরিজীবী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও গৃহিণীরাও রয়েছেন।

নারীদের নিয়ে কাজ করা আহছানিয়া মিশনের তথ্য বলছে, তাদের মাত্র ৩টি বেডের বিপরীতে বর্তমানে ৩৩ নারী মাদকাসক্ত চিকিৎসাধীন। গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চিকিৎসাধীনদের ৭৩ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের প্রায় ৪৫ শতাংশ ইয়াবা এবং ৪৩ শতাংশ গাঁজায় আসক্ত। অ্যালকোহলে আসক্ত প্রায় ৭ শতাংশ। চিকিৎসাধীন নারীদের ৭৭ শতাংশই ঢাকার বাসিন্দা।

পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ—মাদকাসক্তি শুধু নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বেসরকারি চাকরিজীবী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী ও গৃহিণী—বিভিন্ন পেশা ও সামাজিক অবস্থানের নারীরাই এখন চিকিৎসার আওতায় আসছেন। অনেকের ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির সঙ্গে মানসিক সমস্যাও যুক্ত হচ্ছে।

অ্যালকোহল সেবনের প্রবণতার ক্ষেত্রেও রাজধানীতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মদ পানের পারমিটের জন্য চলতি বছর হাজারের বেশি তরুণী আবেদন করেছেন বলে জানিয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। জুন পর্যন্ত ৭ শতাধিক পারমিট ইস্যু হয়েছে। গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁও এলাকায় নারী পারমিটধারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

তবে পারমিটের সংখ্যা সরাসরি মাদকাসক্তির সংখ্যা নির্দেশ করে না। বৈধভাবে অ্যালকোহল সেবনের অনুমতি নেওয়া এবং আসক্ত হয়ে পড়া—দুটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু চিকিৎসাকেন্দ্রে নারী মাদকাসক্তদের উপস্থিতি এবং তরুণীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবহারের তথ্য সামাজিক বাস্তবতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারী মাদকাসক্তির বিষয়টি শুধু আইনশৃঙ্খলা বা চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার সমাধান হবে না। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, সামাজিক পরিবেশ ও সহজলভ্যতার মতো কারণগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি নারীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনসুবিধা বাড়ানো জরুরি।

কারণ একজন নারীর মাদকাসক্তির প্রভাব শুধু তার নিজের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবার, সন্তান ও সামাজিক সম্পর্ক। ফলে বাড়তে থাকা নারী মাদকাসক্তি এখন ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে পরিবার ও সমাজের জন্যও একটি বড় সামাজিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

কালের আলো/এম/এএইচ