বাংলাদেশ একটি প্রগাঢ় ইতিহাস ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র। এই ভূখণ্ডের অগণিত ত্যাগ, রক্তের মহাকাব্য এবং মূল্যবোধের স্তম্ভগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় পরিচয়। এই জাতি গঠনে এবং তার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে যেসব শ্রেণি সর্বাগ্রে আলো ছড়িয়েছে, তাঁদের মধ্যে শিক্ষকসমাজ অন্যতম। শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মাঝে পাঠদানকারী কোনো সাধারণ চাকরিজীবী নন; তিনি জাতির বিবেক, মূল্যবোধের ধারক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধে দীক্ষিত করার দিশারী। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতা এবং ষড়যন্ত্রের গুরুতর অভিযোগ সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে—যা পুরো জাতিকে স্তব্ধ ও গভীরভাবে মর্মাহত করেছে।
যেখানে শিক্ষককে সামাজিক ও জাতীয় কাঠামোতে সবচেয়ে মর্যাদাবান ও শ্রদ্ধেয় শ্রেণি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেখানেই যখন কতিপয় শিক্ষক ব্যক্তিস্বার্থ, রাজনৈতিক তোষণ কিংবা দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন, তখন এর চেয়ে বেদনাদায়ক ও লজ্জাজনক বিষয় আর কিছু হতে পারে না।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ দেশের শিক্ষকমণ্ডলী ছিলেন মুক্তির আন্দোলনের অগ্রসেনানী। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা খুব ভালো করেই জানত—একটি জাতিকে পঙ্গু ও মেধাশূন্য করতে হলে আগে তার বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষকদের নিধন করতে হবে। সেই লক্ষ্যে ২৫ মার্চ কালরাতে এবং ১৪ ডিসেম্বরের নির্মম বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু প্রথিতযশা অধ্যাপক ও শিক্ষক প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন।
অধ্যাপক ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, ড. জি সি দেব, অধ্যাপক সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতো শিক্ষাগুরুরা রক্ত দিয়ে এই লাল-সবুজ পতাকাকে অর্থবহ করে গেছেন। তাঁরা জীবনের বিনিময়ে শিখিয়ে গেছেন—শিক্ষকের মূল পরিচয় তাঁর নীতি, সততা এবং অদম্য দেশপ্রেম।
কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে যখন আমরা দেখি—একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে কিছু শিক্ষক গোপনে জোট বাঁধছেন, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় মদদ দিচ্ছেন, তখন স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে—ঐতিহ্যের সেই মহান স্তম্ভগুলো আজ কোথায় এসে দাঁড়াল?
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষক একটি টেলিগ্রামভিত্তিক গোপন গ্রুপের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন। এই তথ্যের পরিপ্রক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২ জন শিক্ষকের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (শিক্ষা)-কে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
অভিযোগ উঠেছে, ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা গোপন টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে তারা এই কার্যক্রম সমন্বয় করছিলেন। শিক্ষা যদি হয় আলোর নাম, তবে তা কেন কোনো গোপন অন্ধকার চ্যাটগ্রুপের আড়ালে পরিচালিত হবে? শিক্ষকের চেতনা যদি হয় সততা ও উন্মুক্ততা, তবে কেন রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বিনষ্টের চক্রান্তে গোপন ছক কষা হবে?
শিক্ষার চত্বরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে এমন গোপন আঁতাত কোনোভাবেই একজন আদর্শ শিক্ষকের নৈতিকতার সঙ্গে মেলে না। যারা ক্ষমতার লোভ, দলীয় অন্ধ আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করতে চান, আমি মনে করি তারা আর যা-ই হোক—প্রকৃত শিক্ষক পদের যোগ্য নন। তারা শিক্ষক নামক পবিত্র পদের আড়ালে এই জাতির জন্য এক বড় কলঙ্ক।
সাধারণত পেশাগত শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে চাকরিচ্যুতি বা বরখাস্ত করার বিধান থাকে। কিন্তু ‘রাষ্ট্রবিরোধী গোপন তৎপরতা’ বা দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার ষড়যন্ত্র কোনো সাধারণ শৃঙ্খলাভঙ্গের অপরাধ নয়। এটি সরাসরি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, আইনি শৃঙ্খলা এবং কোটি মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
একজন সাধারণ নাগরিক অপরাধ করলে যে ক্ষতি হয়, একজন শিক্ষক যখন রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হন, তখন তার বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ওপর। শিক্ষকের ওপর সমাজ ও রাষ্ট্র যে বিপুল আস্থা রাখে, রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার মাধ্যমে সেই আস্থার চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়।
রাষ্ট্রদ্রোহ ও গোপন চক্রান্ত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি। তাই শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে চাকরিচ্যুত করে তাদের ছেড়ে দিলে তা অপরাধের ভয়াবহতাকে লঘুপাত করার সামিল হবে। আইনের সুনির্দিষ্ট ধারায় তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিদ্যাপীঠ রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তের উর্বর ভূমিতে পরিণত হতে না পারে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেধা ও দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষক নিয়োগের যে অপসংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, এটি তারই এক বিষময় ফল। যখন একজন শিক্ষক মেধার জোরে নয়, বরং রাজনৈতিক তোষামোদীর মাধ্যমে পদমর্যাদা পান, তখন তিনি শিক্ষাদানের চেয়ে রাজনৈতিক প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি ব্যস্ত থাকেন।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হলো মুক্তচিন্তা, গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চার কেন্দ্রস্থল। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গোপন গ্রুপ তৈরি করে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন, তখন শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ ধসে পড়ে।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার যে,শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের অনুসরণ করে। শিক্ষকরা যদি সততা ও জাতীয় স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেন, তবে তা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চরম হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয় তৈরি করে।
শিক্ষকতার মূল কাজ গবেষণা ও শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দেওয়া। কিন্তু রাজনীতিকীকরণের কারণে শিক্ষকরা যখন রাষ্ট্রবিরোধী বা দলীয় চক্রান্তে যুক্ত হন, তখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আন্তর্জাতিক সূচকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এখানে আমি এ কথাও বলব যে,তদন্ত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে—আইনের বিচার হতে হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, তাদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণমাধ্যমের সংবাদের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ও অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। যেন কোনো নিরপরাধ শিক্ষক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিভ্রান্তির শিকার না হন।
তবে যদি তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়—তবে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এই গ্লানিকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি:
দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ করে মেধা, গবেষণা ও নৈতিক চরিত্রকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রসংবিধানে রাষ্ট্রদ্রোহ ও জাতীয় নিরাপত্তাবিরোধী আচরণের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ও কঠোর শাস্তিমূলক ধারা যুক্ত করতে হবে।
গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ, উন্মুক্ত ও গঠনমূলক একাডেমিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও শিক্ষকের ঐতিহ্যগত সামাজিক দায়িত্ববোধের আলোকে শিক্ষকতার মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশের স্থপতি ও শহীদেরা যে স্বপ্নের বাংলাদেশ চেয়েছিলেন, সেখানে শিক্ষকসমাজ থাকবে জাতির পথপ্রদর্শক হয়ে। শিক্ষকের পোশাকে কোনো ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা কিংবা ষড়যন্ত্র এ দেশের সচেতন জনগণ বরদাশত করবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত শেষ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যারা তদন্তে অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হবেন, তাদেরকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়াই শেষ কথা নয়; দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল শাস্তির মধ্য দিয়েই নিশ্চিত করা সম্ভব যে-ভবিষ্যতে আর কেউ শিক্ষকের পবিত্র পোশাক ও মর্যাদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জাতির স্বার্থ ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দুঃসাহস দেখাবে না।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com
আপনার মতামত লিখুন
Array