যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির জবাবে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। দেশটির অন্টারিও প্রদেশের সরকারপ্রধান ডগ ফোর্ড বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের দাম বাড়ানো কিংবা সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।
ট্রাম্প আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কানাডায় তৈরি গাড়ি, ট্রাক, মোটর পার্টস ও ইস্পাতের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দেওয়ার পরই ফোর্ডের এই হুঁশিয়ারি আসে। এর আগে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপরও ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফোর্ড বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কানাডার উৎপাদনশিল্প ধ্বংসের চেষ্টা চালায়, তাহলে সব ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা বিবেচনায় রাখা হবে। তিনি বলেন, অন্টারিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫ লাখ বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। প্রয়োজনে এই সরবরাহের ওপরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
ফোর্ড আরও সতর্ক করে বলেন, ট্রাম্প যদি কানাডার শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে থাকেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিদ্যুৎ সংকট সামাল দিতে ‘একগাদা ব্যাটারি’ সঙ্গে রাখতে হবে।
ফোর্ডের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ফোর্ডের হুমকিকে ‘ফাঁকা বুলি’ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং কানাডার নেতাদের তাঁর ভাষায় ‘সোজা লাইনে’ আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে আবারও ‘গভর্নর কার্নি’ বলে সম্বোধন করেন তিনি।
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডার তুলনায় অনেক বড়, ধনী ও শক্তিশালী এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়া কানাডার টিকে থাকা কঠিন হবে। তাঁর হুমকির জবাবে ফোর্ডও জানান, তিনি ট্রাম্পের চাপের কাছে মাথা নত করবেন না।
ফোর্ডের পাশাপাশি কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের ওপরও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বাড়ছে। তাঁর মতে, প্রয়োজনে জ্বালানি তেল, পটাশ ও কৌশলগত খনিজ সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে কানাডার সব প্রদেশ একই মাত্রায় কঠোর অবস্থান নেয়নি। কুইবেকের সরকারপ্রধান ক্রিস্টিন ফ্রেচেট জানিয়েছেন, আপাতত তিনি ফোর্ডের মতো কঠোর পদক্ষেপে যাচ্ছেন না। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করায় ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদের সরবরাহ সীমিত করার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করছেন না তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কানাডার বিদ্যুৎ সরবরাহ জাতীয় পর্যায়ে তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও সীমান্তবর্তী কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। নিউইয়র্ক, মিশিগান ও মিনেসোটার মতো অঙ্গরাজ্যগুলো বিশেষ করে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে কানাডার বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে এসব অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপরও চাপ বাড়ছে।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে অন্টারিও নিউইয়র্ক, মিশিগান ও মিনেসোটায় রপ্তানি করা বিদ্যুতের ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করেছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিলে সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।
এদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতির সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ওয়াশিংটন কানাডার অটোমোবাইল শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু দাবি তুলেছিল, যা কানাডার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না।
কার্নির ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ‘চেয়েছে অনেক বেশি, কিন্তু দিতে চেয়েছে খুব কম’। ফলে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব এখন আরও বড় সংঘাতের দিকে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, বিদ্যুৎ ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদকে পাল্টা চাপ হিসেবে ব্যবহার করার হুমকি কানাডার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি কানাডার নিজস্ব শিল্প ও প্রাদেশিক অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ কতটা তীব্র হয়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array