‘সরকারি কাজে কোনো ভুল হলে তা তুলে ধরুন, সরকার সংশোধনের উদ্যোগ নেবে’—জবাবদিহির এই বার্তার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান স্পষ্ট করলেন রাষ্ট্রের প্রতিটি পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর মূল পরিচয় জনগণের সেবক। একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উন্নয়নের প্রচলিত প্রকল্পকেন্দ্রিক ধারণা থেকে বেরিয়ে মাঠের মানুষের প্রয়োজনকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনার নির্দেশনা দিয়েছেন।
- ভুল হলে সংশোধন, গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ
- অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে পৃথক তহবিল
- বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও বিকল্প পানির উৎস তৈরিতে জোর
এই দুই বার্তায় শুধু সরকারি কাজের জবাবদিহি নয়, স্থানীয় সরকার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল খাতের উন্নয়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকারও পরিষ্কার হয়েছে। নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্যকে সম্পদে রূপ দেওয়া এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে বিকল্প পানির উৎস তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাজধানীর কাকরাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) অডিটোরিয়ামে অধিদপ্তরের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এসব নির্দেশনা দেন।
‘ভুল হলে সংশোধনের উদ্যোগ নেবে সরকার’
সরকারি কর্মকাণ্ডের সমালোচনার ক্ষেত্রে গঠনমূলক অবস্থানের কথা তুলে ধরে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘সরকার গঠনমূলক সমালোচনা শুনতে প্রস্তুত। সরকারি কাজে কোনো ভুল হলে তা তুলে ধরলে সরকার সংশোধনের উদ্যোগ নেবে।’ তবে মিথ্যা তথ্য বা প্রচারণার মাধ্যমে সমালোচনা না করার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্যে সরকারের কাছে জবাবদিহি এবং দায়িত্বশীল সমালোচনার—দুই দিকই গুরুত্ব পেয়েছে। গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বানও জানান তিনি।
‘জনগণের সেবক’ কর্মকর্তারা
মন্ত্রী বলেন, সরকারের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী জনগণের সেবক। সীমিত সম্পদের মধ্যেও নিষ্ঠার সঙ্গে মানুষের সেবা করাই তাদের দায়িত্ব। এই বক্তব্যের তাৎপর্য হলো—সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমকে শুধু বরাদ্দ ব্যয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের হিসাবের মধ্যে না রেখে নাগরিক সেবার ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করা। মানুষের কল্যাণ এবং দেশের উন্নয়নকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখার বার্তাই এতে উঠে এসেছে।
‘প্রকল্পনির্ভর’ উন্নয়ন থেকে বের হওয়ার নির্দেশ
সভায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যক্রম শুধু উন্নয়ন প্রকল্পনির্ভর হলে চলবে না; মাঠপর্যায়ের মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে তা পরিচালনা করতে হবে। এই অবস্থান উন্নয়ন পরিকল্পনায় একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। নতুন প্রকল্প নেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামো সচল রাখা, সেবার মান ধরে রাখা এবং কোন এলাকায় কী ধরনের প্রয়োজন—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণে পৃথক তহবিল
নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পর সেটির রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল হলে সরকারি বিনিয়োগের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিষয়টি বিবেচনায় মাঠপর্যায়ে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক তহবিল ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। অর্থাৎ উন্নয়ন ব্যয়ের পাশাপাশি অবকাঠামোর জীবনচক্র, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতাকেও পরিকল্পনার অংশ করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
বর্জ্য হবে সম্পদ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও প্রচলিত ধারণার বাইরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন মীর শাহে আলম। বড় শহরগুলোতে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। আর ছোট পৌরসভা ও উপজেলায় কম খরচে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়েছেন। এতে বর্জ্য অপসারণের চাপ কমানোর পাশাপাশি বর্জ্যকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে
নিরাপদ পানি সরবরাহে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর নির্দেশনাও এসেছে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে। নদী ও পুকুরের পানি পরিশোধন করে নিরাপদ পানি সরবরাহ বাড়ানোর কথা বলেন তিনি। এখানে লক্ষ্য শুধু বিকল্প পানির উৎস তৈরি নয়; দীর্ঘমেয়াদে পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তে থাকা চাপ কমানো। তাই পানি সরবরাহের বর্তমান চাহিদার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজনকেও পরিকল্পনায় যুক্ত করার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
উন্নয়নের নতুন হিসাব
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্য মিলিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা এসেছে তা হলো—উন্নয়নকে শুধু নতুন প্রকল্প, অবকাঠামো বা বরাদ্দের সংখ্যায় মাপলে হবে না। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে জবাবদিহি, রক্ষণাবেক্ষণ, নাগরিকের বাস্তব চাহিদা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উন্নয়ন কার্যক্রমে এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা তাই কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ নয়; বরং সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ জনসেবা নিশ্চিত করার একটি নীতিগত বার্তাও। সভায় স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. জামানুর রহমানসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array