ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার লড়াই
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যবাহী পেশা হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রযুক্তিনির্ভর ও প্লাস্টিকের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে না পেরে অনেকেই পেশা বদল করছেন। তবে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বংশপরম্পরায় বাঁশ-বেত শিল্প ধরে রেখেছেন মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখান উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের মধুপুর মনিপাড়ার প্রায় একশ পরিবার।
প্রতিদিন ভোর থেকেই শুরু হয় কারিগরদের কর্মব্যস্ততা। বাড়ির উঠান কিংবা ঘরের এক কোণে বসে বাঁশ ও বেত কেটে, চিরে এবং বুনে তৈরি করা হয় নানা ধরনের পণ্য। ঝুড়ি, ডালা, মোড়া, দোলনা, ফুলের টব, পাখা, ঝাড়সহ বিভিন্ন শৌখিন ও গৃহসজ্জার সামগ্রী তৈরি করছেন কারিগররা।
এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে একই পেশা। দাদা ছিলেন কারিগর, বাবা ছিলেন কারিগর—এখন সন্তানরাও সেই কাজ করছেন। আয় কম হলেও পূর্বপুরুষের পেশা, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের প্রতি টান থেকেই তারা এ শিল্প ধরে রেখেছেন।
কারিগর যতিন কুমার দাস বলেন, বাঁশ ও বেতের তৈরি পণ্যের দেশ-বিদেশে চাহিদা রয়েছে। সরকারি সহযোগিতা ও সহজ শর্তে পুঁজি পাওয়া গেলে কম খরচে এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এতে কারিগররা আরও লাভবান হতে পারবেন।
কারিগরদের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁচামালের সংকট। দূর-দূরান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাঁশ ও বেত সংগ্রহ করতে হয়। কুষ্টিয়া, সিলেট ও বরিশালসহ বিভিন্ন স্থান থেকে কাঁচামাল কিনে আনায় এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয়।
কাঁচামালের দাম ও উৎপাদন খরচ বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়ছে না পণ্যের দাম। পাশাপাশি প্লাস্টিক ও ধাতব পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রীর বাজারও আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। ফলে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলো অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়েছে।
কারিগর নিরঞ্জন দাস বলেন, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহযোগিতা, আধুনিক ডিজাইনের প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এসব সহায়তা পেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
কারিগরদের ভাষ্য, বাঁশ-বেত শিল্প তাদের কাছে শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি পূর্বপুরুষের স্মৃতি, পারিবারিক পরিচয় ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। তাই নানা সংকটের মধ্যেও তারা এ পেশা ছাড়তে চান না। তবে শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজাইনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদনের সুযোগ।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array