বিদেশের মাটিতে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ও নতুন বাংলাদেশের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের ওপর মব করে হামলা ও নির্যাতন কোনোভাবেই সরকার বা বাংলাদেশের নাগরিকরা সমর্থন করে না বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাতে ইতালির ভেনিসে বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন আওয়ামী লীগ ও এর অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের প্রবাসী কর্মী-সমর্থকরা।
এ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, দেশে-বিদেশে মব রাজনীতি, মব কালচার ও অকারণে সন্ত্রাস সৃষ্টি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
নতুন বাংলাদেশে স্বচ্ছ, সুস্থ ও মানবিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বাংলা একাডেমি মেলা প্রাঙ্গণে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে জিয়া স্মৃতি পাঠাগার আয়োজিত জিয়া স্মৃতি বইমেলা ২০২৬ এর আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, গত ১৭ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন-নির্যাতন হয়েছে। ছাত্রদল, যুবদলসহ দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী গ্রাম পর্যন্ত ত্যাগ করেছেন।
অনেককে বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়নি, গাছের নিচে কিংবা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। পুলিশের নির্যাতনে জেলে থাকতে হয়েছে এবং হাজার হাজার মামলা নিয়ে তাদের ঘুরতে হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে গিয়ে অনেকে খুন ও গুম হয়েছেন। তাদের এবং তাদের পরিবারের কথা আমাদের স্মরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, যারা নির্যাতিত হয়েছেন, তাদের আজ দেশ গড়ার কাজে ও উন্নয়নের কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের আত্মত্যাগ ভুলে গেলে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমাদের বিবেকের কাছে দায়ী থাকতে হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শহীদ জিয়া আমাদের উৎপাদনের রাজনীতি, উন্নয়নের রাজনীতি, জনসেবা ও গণসেবার রাজনীতি এবং ধৈর্য ও সহনশীলতার রাজনীতি শিখিয়েছেন। এ আদর্শ প্রত্যেক নেতাকর্মীর মধ্যে নিহিত রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ও জিয়া পরিবারের ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন হয়েছে, সেটিও আমাদের স্মরণ করতে হবে। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। এ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যারা আত্মাহুতি দিয়েছেন, তাদের কথা ভুলে গেলে চলবে না।
তিনি বলেন, বর্তমানে সংসদ আবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় যেকোনো সিদ্ধান্ত ও সংকট নিয়ে সংসদে স্বচ্ছভাবে আলোচনা হচ্ছে এবং সারা দেশের মানুষ তা সরাসরি দেখছে। এ স্বচ্ছ সংসদ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের স্মরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, অসংখ্য নেতাকর্মী তৎকালীন পুলিশ ও র্যাবের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের নাম হয়তো আমরা সবাই বলতে পারব না, কিন্তু তাদের আত্মত্যাগ আমাদের মনে রাখতে হবে এবং দেশের উন্নয়নে তাদের কাজে লাগাতে হবে।
সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে শামা ওবায়েদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনসেবা, গণসেবা ও উন্নয়নের রাজনীতি করছেন। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যে প্রথম ক্যাবিনেট সভায় কৃষকদের কৃষিঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য ফার্মার্স কার্ড চালু করা হয়েছে। প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য শিগগিরই প্রবাসী কার্ড চালু করা হবে, যার মাধ্যমে তারা বিশেষ সুবিধা পাবেন।
গত ১৭ বছরে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাত এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেসব খাতকে শূন্য থেকে নতুন করে গড়ে তোলার কঠিন কাজ বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে শুরু করেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং গত সরকারের দুর্নীতি ও ভুল নীতির কারণে দেশে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, সরকার তা মোকাবিলা করছে। সংকটের কারণে জনগণের কষ্ট হচ্ছে-এ জন্য প্রধানমন্ত্রী জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। যদিও এ দায় বর্তমান সরকারের নয়, তারপরও জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, বিএনপি এমন সরকার নয় যে ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও কোনো সমস্যার জন্য ১৮ বছর আগে বিএনপি ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি সামনে এনে দায় এড়িয়ে যাবে। বর্তমান সরকার প্রত্যেকটি খাতে তৃণমূল থেকে সামাজিক ও মানব উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে কাজ করছে।
রাজনীতিতে অশ্লীলতার প্রসঙ্গ তুলে শামা ওবায়েদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সমাজ ও গণমাধ্যমে যেভাবে অশ্লীল কথাবার্তা ছড়ানো হচ্ছে, তা নিয়ে একজন অভিভাবক ও দেশের নাগরিক হিসেবে তিনি উদ্বিগ্ন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে এত মানুষ আহত-নিহত হওয়ার পর নতুন বাংলাদেশে আমরা এমন রাজনীতি দেখতে চাই না।
তিনি বলেন, সরকারের কোনো নীতি বা কার্যক্রমের সমালোচনা করতে হলে তা করা যাবে। বর্তমানে গণমাধ্যম অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি স্বাধীন। সরকারের সমালোচনা করা বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার। কিন্তু সমালোচনার নামে অশ্লীলতা, গালাগালি ও অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শামা ওবায়েদ বলেন, বিএনপি বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। শহীদ জিয়াউর রহমান দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা ফ্রিডম অব স্পিচে বিশ্বাস করি। তবে এ স্বাধীনতা চর্চার নামে অশ্লীলতা ছড়ানো উচিত নয়, যা ছোট শিশুদেরও মোবাইল ফোনে দেখতে হয়। ভদ্র ভাষায় ও গঠনমূলকভাবে সমালোচনা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসেন এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়তে চান, তাদের সবাইকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে। নতুন বাংলাদেশে স্বচ্ছ, সুস্থ ও মানবিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা একটি মানবিক বাংলাদেশ গঠনে সহযোগিতা করবে।
বিদেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তৎপরতার প্রসঙ্গে শামা ওবায়েদ বলেন, বিভিন্ন দেশে আওয়ামী লীগের যারা লুকিয়ে বা অবস্থান করছেন, তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী, বাংলাদেশে বিশ্বাসী এবং নতুন বাংলাদেশের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের ওপর মব করে হামলা ও নির্যাতন করছেন। বিদেশের মাটিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বাংলাদেশ সরকার বা বাংলাদেশের নাগরিকরা সমর্থন করে না।
তিনি বলেন, মব রাজনীতি, মব কালচার এবং অকারণে সন্ত্রাস সৃষ্টি-কোনোটিই আমরা সমর্থন করি না। দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশে কোনোভাবেই এমন সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।
আলোচনা সভায় জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের আহ্বায়ক সৈয়দা ফাতেমা সালামের সভাপতিত্বে এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনিসহ বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকমীরা।
সন্ধানী বার্তা/এএএন/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
Array