রাষ্ট্রপতির পদবির আগে ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পদবির আগে ‘মাননীয়’ বা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই দিন থেকেই সিদ্ধান্তটি কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় কাজ ও দাপ্তরিক নথিপত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ আর ব্যবহার করা যাবে না। সরকারের সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং এর অধীনস্থ দপ্তরগুলোকে অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে নতুন বার্তা
দাপ্তরিক নথিতে কোনো পদবির আগে সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহারের বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে ভাষাগত বা আনুষ্ঠানিকতার প্রশ্ন মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দেরই একটি সাংবিধানিক, প্রশাসনিক ও প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। সে বিবেচনায় ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্তকে কেবল একটি ভাষাগত পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী কিংবা মন্ত্রীদের মতো সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পদকে ব্যক্তির পরিবর্তে পদ হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্ত একটি নিরপেক্ষ প্রশাসনিক ভাষা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অর্থাৎ, ব্যক্তি নয়—পদই হবে রাষ্ট্রীয় নথিপত্রে মূল পরিচয়।
রাষ্ট্রীয় পদ ও ব্যক্তিগত মর্যাদার মধ্যে পার্থক্য
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তারা অবশ্যই মর্যাদার অধিকারী। তবে সেই মর্যাদা ব্যক্তিকে ঘিরে অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা তৈরির মাধ্যমে প্রকাশ করা জরুরি নয়। একজন রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী যে পদে অধিষ্ঠিত, তার সাংবিধানিক মর্যাদা পদটির মধ্যেই নিহিত।
ফলে পদবির সঙ্গে অতিরিক্ত সম্মানসূচক শব্দ যুক্ত না করেও একজন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রীর সাংবিধানিক মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব। বরং এ ধরনের ভাষাগত সরলীকরণ দাপ্তরিক যোগাযোগকে আরও নিরপেক্ষ, সংক্ষিপ্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক করে তুলতে পারে।
প্রশাসনিক ভাষায় সরলতা ও সমতা
সরকারি নথিপত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত নির্ভুলতা, সংক্ষিপ্ততা ও নিরপেক্ষতা। সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিশেষণ বা অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে দায়িত্ব ও পদকে গুরুত্ব দেওয়া হলে প্রশাসনিক ভাষা আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে ওঠে। ‘মহামান্য’ বা ‘মাননীয়’ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাই রাষ্ট্রীয় নথিতে একটি অভিন্ন ভাষাশৈলী প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এতে একই সঙ্গে প্রশাসনিক যোগাযোগে আনুষ্ঠানিকতার ভার কমবে এবং রাষ্ট্রীয় পদকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় হিসেবে তুলে ধরা সহজ হবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। শুধু পরিপত্র জারি করলেই রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আসে না; মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধীনস্থ দপ্তরগুলো নিয়মটি কতটা ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করছে, সেটিই হবে মূল বিষয়। সরকারি চিঠি, প্রজ্ঞাপন, স্মারক, প্রতিবেদন, আমন্ত্রণপত্রসহ সব ধরনের দাপ্তরিক নথিতে একই নীতি অনুসরণ করা গেলে এটি প্রশাসনিক ভাষায় একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন আনতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় পদগুলোর ক্ষেত্রে সম্মান প্রকাশের প্রচলিত রীতিগুলো কীভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটিও নজর দেওয়ার বিষয়। রাষ্ট্রপতির আগে ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের আগে ‘মাননীয়’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আপাতদৃষ্টিতে ছোট একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হলেও এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় ভাষা, প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতা এবং ব্যক্তি ও পদের পার্থক্যকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array