উন্নয়ন প্রকল্পে লাগাম, গ্যাস-রেলে বড় পরিকল্পনা
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা ঠেকানো, ভবিষ্যৎ গ্যাস সংকট মোকাবিলা, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে একযোগে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের পৃথক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব পরিকল্পনা ও পদক্ষেপের কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উন্নয়ন প্রকল্পে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, দ্রুত রেল যোগাযোগ এবং চট্টগ্রামের নগর অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকার স্পষ্ট হয়েছে।
প্রকল্পে সময়-ব্যয় বৃদ্ধিতে কঠোর সরকার
কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণত একটি মাত্র কারণে হয় না। প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ সমস্যা তৈরি করে। তিনি বলেন, বিষয়গুলো সরকারের দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুর্বল ফিজিবিলিটি স্টাডি, ব্যয়ের সঠিক প্রাক্কলন না হওয়া, প্রকল্প এলাকা নির্বাচনে দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, যথাসময়ে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দেওয়া এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের অভাব।
- মেয়াদ-ব্যয় বৃদ্ধিতে কঠোর নজরদারি
- ১৫০ কূপ খনন
- ঢাকা-চট্টগ্রামে ইলেকট্রিক ট্রেন
- বর্ষার আগেই পরিষ্কার হবে ১,৬০০ কিমি ড্রেন
১৩ দফায় নজরদারি ও জবাবদিহিতা
প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতা ও অপচয় রোধে সরকার ১৩ দফা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা; অনুমোদনের পর বাস্তবায়ন প্রস্তুতি দ্রুত করা; প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের নির্দেশিকা সময়োপযোগী করা; বাস্তবায়ন অগ্রগতি মনিটরিংয়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন; নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে তদারকি বৃদ্ধি; ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় জোরদার; নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ না হলে বিলম্ব ও ব্যয়ের কারণ নিরূপণ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা; ৩০ শতাংশের কম অগ্রগতির প্রকল্প পুনর্বিন্যাস, স্কোপ পরিবর্তন বা চলমান রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত; বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত কর্মসূচির অধীনে গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ; সরকারি ক্রয়ে ই-জিপির ব্যবহার সম্প্রসারণ; প্রকল্প পরিচালক নিয়োগে পেশাগত যোগ্যতা, দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব; পিপিপি মডেলের প্রকল্প গ্রহণে গুরুত্ব ও সরকারি ক্রয়ে প্রতিযোগিতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুল ২০২৫’ হালনাগাদের উদ্যোগ।
১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা
শিল্পখাতে সাময়িক সংকটের সময় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদ সদস্য সুলতানা আহমেদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খনন, ২ডি ও ৩ডি সাইসমিক সার্ভে এবং সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থলভাগে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে Onshore Model PSC 2026 প্রণয়নের কার্যক্রমও চলছে। বর্তমানে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে গড়ে দৈনিক ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব। ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড-বেইজড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর টার্মিনাল থেকে ডিসেম্বর ২০৩০ নাগাদ গ্যাস সরবরাহের আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ভোলার গ্যাস এলএনজি আকারে এনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্যাস প্রাপ্তি সাপেক্ষে অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও বিসিকের মতো পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ইলেকট্রিক ট্রেন
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাতায়াতের সময় ও দূরত্ব কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এনামুল হকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, পুরো রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তর, ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন নির্মাণ এবং ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বিস্তারিতকর্মপরিকল্পনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেনের গড় গতি বাড়বে এবং যাতায়াতের সময় কমে আসবে।
তিন স্তরের রেল পরিকল্পনা
ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি কর্ডলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইনের কাজ চলছে। অন্যদিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পুরো রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে রূপান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।টঙ্গী-আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইনের কাজ শেষ হয়েছে। লাকসাম-চট্টগ্রাম ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন। টঙ্গী-আখাউড়া অংশের ডিপিপি প্রণয়নও শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
বর্ষার আগেই পরিষ্কার হবে ১,৬০০ কিমি ড্রেন
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া পদক্ষেপের কথা জানাতে গিয়ে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বারইপাড়া খাল খনন প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অধীনে নগরের ২৫টি খাল থেকে আবর্জনা ও মাটি উত্তোলনসহ ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার সার্ভিস ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই এ কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি নগরীর আরও ৩২টি খাল থেকে আবর্জনা ও মাটি অপসারণের কার্যক্রমও চলছে।
স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে বাস্তবায়নাধীন জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের ৩৬টি খাল রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ডিপিপি প্রণয়ন চলছে। এর বাইরে আরও ২১টি খাল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পৃথক ডিপিপি প্রণয়ন করা হচ্ছে। চট্টগ্রামের অবকাঠামোগত উন্নয়নেও চলছে একাধিক প্রকল্প। এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৪৮ কিলোমিটার সড়ক, দুটি কালভার্ট ও ছয়টি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। নাগরিকদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে দুটি খেলার মাঠের উন্নয়নকাজ শেষ হয়েছে এবং আরও ছয়টি মাঠ উন্নয়নের কাজ চলছে।
কালের আলো/এসআর/এএএন

আপনার মতামত লিখুন
Array