বিয়ের অনুষ্ঠান ও রীতিপ্রথা নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা
ইসলামে বিয়ে শুধু সামাজিক বন্ধন নয়, বরং এটি একটি পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। তাই বিয়ের অনুষ্ঠান, এর প্রচার-প্রকাশ এবং আনন্দ আয়োজনের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু শরিয়াহসম্মত নির্দেশনা। ইসলামি আলেমদের মতে, বিয়ের আকদ মসজিদে সম্পন্ন করা মুস্তাহাব এবং বিয়ের বিষয়টি মানুষের মাঝে প্রকাশ্যে জানান দেওয়াও প্রশংসনীয়।
হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের ঘোষণা দেওয়ার প্রতি উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা এই বিবাহের ঘোষণা দাও। এটা মসজিদে সম্পন্ন করো এবং বিবাহ উপলক্ষে দফ বাজাও।’—তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ।
আরেক হাদিসে বিয়ের ঘোষণা ও দফ বাজানোর মাধ্যমে হালাল ও হারামের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করার কথা বলা হয়েছে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হালাল ও হারামের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়কারী হলো- বিয়ের সময় দফ বাজানো এবং তা জনসম্মুখে প্রচার করা।’—তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ।
আলেমদের ব্যাখ্যায়, বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে ঘোষণা করার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ককে অবৈধ সম্পর্ক থেকে আলাদা করে দেওয়া। এর ফলে স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সম্পর্ক নিয়ে মানুষের মধ্যে অযথা সন্দেহেরও অবকাশ থাকে না।
বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও ইসলামে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। একজন মুসলিমের বিয়ের দাওয়াতে অংশ নেওয়া শুধু সামাজিক দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়; বরং শরিয়াহসম্মত একটি আনন্দের আয়োজনে অংশ নেওয়ার সুযোগও হতে পারে। তাই এমন অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় ভালো নিয়ত রাখা এবং নবদম্পতির জন্য কল্যাণ ও বরকতের দোয়া করা উচিত।
নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানানোর ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের শিক্ষা। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) নবদম্পতির জন্য দোয়া করতেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য বরকত দান করুন, তোমাদের ওপর বরকত নাজিল করুন এবং তোমাদেরকে কল্যাণের মধ্যে একত্রিত করুন।’—তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ।
বিয়ের অনুষ্ঠানে পোশাক-পরিচ্ছদ ও সাজসজ্জার ক্ষেত্রেও শরিয়াহর সীমারেখা মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনুষ্ঠানের আনন্দ ও সৌহার্দ্য নষ্ট করে—এমন আচরণ থেকেও বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।
নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানানোর সময় অশালীন, কুরুচিপূর্ণ বা অভদ্র ভাষা ব্যবহার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.)-এর সঙ্গে তার বিবাহের সময় কয়েকজন আনসারি নারী তাকে মঙ্গল, বরকত ও সৌভাগ্যের জন্য দোয়া করেছিলেন।—সহিহ বোখারি।
ইসলামে বিয়ের অনুষ্ঠানে বৈধ আনন্দ-বিনোদনেরও সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে দফ বাজিয়ে কবিতা বা আনন্দের গান পরিবেশনের অনুমতির কথা হাদিসে পাওয়া যায়। তবে এসব আয়োজন অবশ্যই অশালীনতা, অনৈতিকতা ও পাপাচারমুক্ত হতে হবে।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক নববধূকে এক আনসারি বরের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বলেন, ‘হে আয়েশা! তোমাদের কাছে কি আনন্দ বিনোদনের কিছু নেই? মদিনার আনসারিরা বিনোদনে বিমুগ্ধ হয়।’—সহিহ বোখারি।
এ থেকে আলেমরা বলেন, বিয়ের মতো আনন্দঘন আয়োজনে শরিয়াহসম্মত বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। নারীরা দফ বাজিয়ে কবিতা বা সুন্দর কথা পরিবেশন করতে পারেন। তবে তাতে অবৈধ প্রেম, অশালীনতা কিংবা অনৈতিক বিষয় থাকা যাবে না। এ ধরনের গান ও বিনোদন পরিত্যাজ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।—তাবারানি।
অতএব, ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের অনুষ্ঠান আনন্দ, সৌহার্দ্য ও বরকতের উপলক্ষ হতে পারে। তবে সেই আনন্দ উদযাপন করতে হবে শরিয়াহর সীমারেখার মধ্যে থেকে। বিয়ের ঘোষণা, নবদম্পতির জন্য দোয়া, পারস্পরিক শুভেচ্ছা এবং বৈধ বিনোদনের মাধ্যমে একটি সুন্দর ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করাই হতে পারে ইসলামের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আয়োজন।
কালের আলো/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
Array