২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের টোপেকায় খুন হন কারেন হার্কনেস ও মাইক সিসকো। তদন্তের শুরু থেকেই সন্দেহের কেন্দ্রে ছিলেন সিসকোর সাবেক স্ত্রী ডানা চ্যান্ডলার। প্রায় এক দশক পর গ্রেপ্তার হন তিনি। এরপর হয়েছে তিন দফা বিচার, একবার সাজা বাতিল, একবার মিসট্রায়াল এবং সর্বশেষ আবারও দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা। কিন্তু এত কিছুর পরও মামলার সব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
এই দীর্ঘ ও বিতর্কিত হত্যাকাণ্ডের অনুসন্ধান নিয়েই তৈরি হয়েছে এইচবিওর তিন পর্বের তথ্যচিত্র ‘আ কিলার স্টোরি’। ম্যাথিউ গ্যালকিন পরিচালিত সিরিজটির প্রচার শুরু হয়েছে ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সিরিজটি অনুসন্ধানী সাংবাদিক জো সেক্সটন এবং কানসাসের দম্পতি ইলিন ও কিন উমবেরের দীর্ঘ অনুসন্ধানকে সামনে রেখে ডানা চ্যান্ডলারের মামলাটি পুনরায় খতিয়ে দেখে।
হাজার হাজার ই-মেইল থেকে শুরু
২০১৭ সালে সাংবাদিক জো সেক্সটনের কাছে ইলিন উমবেরের একটি ই-মেইল আসে। ২০০২ সালের জোড়া খুনের মামলাটি নিয়ে সেক্সন আগ্রহী কি না, জানতে চেয়েছিলেন তিনি। শুরুতে সেক্সটন আগ্রহ দেখাননি। তাঁর কাছে ঘটনাটি ছিল বহু আগেই প্রায় নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া একটি মামলা।
কিন্তু ইলিন থামেননি। কখনো সপ্তাহে একাধিক ই-মেইল, কখনো আবার এক দিনেই কয়েক ডজন বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি। আদালতের নথি, ব্যালিস্টিকস রিপোর্ট, সম্পত্তির কাগজপত্রসহ নানা তথ্য পাঠাতে থাকেন। একসময় সেই ই-মেইলের সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছায়।
ইলিনের স্বামী কিন উমবের একজন আইনজীবী। তাঁরা নিজেদের অর্থ খরচ করে দীর্ঘদিন ধরে চ্যান্ডলারের মামলাটি পর্যালোচনা করছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, চ্যান্ডলার ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
২ হাজার ৭১৪তম ই-মেইলে ইলিন জানান, কানসাস সুপ্রিম কোর্ট চ্যান্ডলারের সাজা বাতিল করেছে। এবার সেক্সটন মামলাটি নতুন করে দেখতে আগ্রহী হন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর গভীর অনুসন্ধান।
কী হয়েছিল ২০০২ সালে?
২০০২ সালের ৭ জুলাই গভীর রাতে কারেন হার্কনেস ও তাঁর প্রেমিক মাইক সিসকোকে টোপেকার একটি টাউনহাউসে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর আগে দুজনকে একটি ক্যাসিনোয় দেখা গিয়েছিল। পরে তাঁরা হার্কনেসের বাড়িতে ফিরে যান।
ঘটনাস্থলে ডাকাতির সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। টাকা ও গয়না অক্ষত ছিল। হত্যার অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি এবং গুলির খোসায় আঙুলের ছাপ পাওয়া যায়নি। ফলে শুরু থেকেই মামলাটি মূলত পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ব্যবহৃত গুলিগুলো ইসরায়েলি তৈরি সাবসনিক বুলেট, যা উজি ধরনের অস্ত্রে ব্যবহৃত হতে পারে। সিসকোর পরিবারের সদস্যদের সন্দেহও যায় তাঁর সাবেক স্ত্রী চ্যান্ডলারের দিকে।
চ্যান্ডলার তখন টোপেকা থেকে প্রায় ৫৪০ মাইল দূরে ডেনভারে থাকতেন। হত্যার কয়েক দিন পর তাঁর কেনা দুটি বড় গ্যাস ক্যানের রসিদ তদন্তকারীদের নজরে আসে। তাঁদের ধারণা ছিল, ওই জ্বালানি ব্যবহার করে ডেনভার থেকে টোপেকা যাওয়া ও ফিরে আসা সম্ভব ছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে হত্যার রাতে চ্যান্ডলার টোপেকায় ছিলেন—এমন প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
প্রথম বিচার ও সাজা বাতিল
২০১১ সালে চ্যান্ডলারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর প্রথম বিচারে জুরি মাত্র ৮৩ মিনিট আলোচনা করে তাঁকে দুটি প্রথম ডিগ্রির হত্যায় দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে পরপর দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং ১০০ বছর পর্যন্ত প্যারোলের সুযোগ ছিল না।
পরে মামলায় প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত কিছু তথ্য নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে মাইক সিসকো চ্যান্ডলারের বিরুদ্ধে ‘প্রটেকশন ফ্রম অ্যাবিউজ’ আদেশ নিয়েছিলেন—এমন দাবি করা হলেও আদালতের নথি ঘেঁটে কিন উমবের এমন কোনো আদেশের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি।
২০১৮ সালে কানসাস সুপ্রিম কোর্ট চ্যান্ডলারের সাজা বাতিল করে। আদালত নতুন বিচারের জন্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ যথেষ্ট বলে মনে করলেও আগের বিচারে প্রসিকিউশনের অসদাচরণকে গুরুতর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে। পরে সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর জ্যাকুই স্প্র্যাডলিংয়ের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
উমবের দম্পতির অন্য সন্দেহ
চ্যান্ডলারকে নির্দোষ মনে করা ইলিন ও কিন উমবের শুধু তাঁর মুক্তির চেষ্টা করেননি, সম্ভাব্য অন্য সন্দেহভাজনদের নিয়েও অনুসন্ধান চালান। তাঁদের সন্দেহের কেন্দ্রে ছিলেন কারেন হার্কনেসের জামাই জেফ সাটন।
তাঁরা সাটনের অতীত, ঘটনাস্থলে প্রবেশের সম্ভাবনা এবং অস্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য খতিয়ে দেখেন। এমনকি তাঁরা মনে করেছিলেন, ঘটনাস্থলে পাওয়া গুলির খোসায় থাকা একটি চুল হত্যাকারীর পরিচয় সম্পর্কে সূত্র দিতে পারে।
পরে ডিএনএ পরীক্ষায় দেখা যায়, চুলটি সাটনেরও নয়। ফলে উমবের দম্পতির ওই তত্ত্বের পক্ষে প্রমাণ মেলেনি। তবু মামলার সম্ভাব্য অন্য দিকগুলো নিয়ে তাঁদের অনুসন্ধান থামেনি।
দ্বিতীয় বিচারেও হয়নি নিষ্পত্তি
২০২২ সালে চ্যান্ডলারের দ্বিতীয় বিচার হয়। এ সময় প্রসিকিউশন স্বীকার করে যে মামলাটি মূলত ডিএনএ, আঙুলের ছাপ বা হত্যার অস্ত্রের মতো সরাসরি ফরেনসিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে নেই।
চ্যান্ডলারের আলিবি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তাঁর বক্তব্য বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছিল। দ্বিতীয় বিচারে একজন প্রতিবেশীও দাবি করেন, গুলির শব্দ শোনার পর তিনি চ্যান্ডলারের মতো দেখতে একজনকে দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর বর্ণিত সময়ের সঙ্গে ক্যাসিনোর ভিডিওসহ অন্যান্য তথ্যের অসঙ্গতি সামনে আসে।
ছয় দিন আলোচনার পর জুরি ৭-৫ ভাগ হয়ে যায়। ফলে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় দ্বিতীয় বিচারটি মিসট্রায়ালে শেষ হয়।
তৃতীয় বিচারে নিজেই নিজের আইনজীবী
২০২৫ সালে চ্যান্ডলারের তৃতীয় বিচার শুরু হয়। এবার বিচার শুরুর সময় তিনি নিজের আইনজীবীদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই নিজের পক্ষে সওয়াল করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি আদালতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন এবং এমনকি নিজের সন্তানদেরও জেরা করেন।
চ্যান্ডলার হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, হত্যার সময় তিনি কানসাসে ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণ নেই এবং তিনি কখনো ৯ মিলিমিটারের অস্ত্রের মালিক ছিলেন না।
কিন্তু তৃতীয় বিচারের জুরি তাঁকে আবারও দুই হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। তাঁকে পরপর দুটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, ৫০ বছর পর্যন্ত প্যারোলের সুযোগ ছাড়া। চ্যান্ডলার তাঁর নির্দোষিতা বজায় রেখেছেন এবং তাঁর ২০২৫ সালের সাজা নিয়ে আপিলও চলছে।
‘রায় আছে, নিশ্চিত উত্তর নেই’
‘আ কিলার স্টোরি’র সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই—আদালতের রায় হলেও ২০০২ সালের সেই হত্যাকাণ্ডের সব রহস্য কি সত্যিই মিটেছে?
সিরিজটি সরাসরি কোনো নতুন খুনিকে চিহ্নিত করার চেয়ে দেখেছে, কীভাবে দীর্ঘদিনের বিশ্বাস, গণমাধ্যমের বয়ান, তদন্তের সীমাবদ্ধতা এবং মানুষের নিজের ধারণাকে সত্য ধরে নেওয়ার প্রবণতা একটি মামলার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।
তথ্যচিত্রটির পরিচালক ম্যাথিউ গ্যালকিন সাত বছর ধরে মামলাটি অনুসরণ করেছেন। সিরিজটির বর্ণনাতেও মামলাটিকে এমন একটি ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে তিনটি বিচার হলেও ফরেনসিক প্রমাণের ঘাটতি এবং পরস্পরবিরোধী বয়ান প্রশ্নগুলোকে পুরোপুরি মুছে দেয়নি।
ফলে ‘আ কিলার স্টোরি’ কেবল একটি জোড়া খুনের তদন্ত নয়; এটি সত্য অনুসন্ধান, বিচারব্যবস্থা এবং মানুষ কীভাবে নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রমাণকে মিলিয়ে নিতে শুরু করে—সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
সূত্র:টাইম অবলম্বনে
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array