শিরোনামটি পড়ে অদ্ভুত লাগতেই পারে—লিওনেল মেসির আবার মাথা খোলার কী আছে! আসলে মেসির মাথা বরাবরই ছিল, তবে গোল করার ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারের বড় একটা সময় সেটির ব্যবহার ছিল তুলনামূলক কম। কিন্তু ইন্টার মায়ামিতে এসে সেই চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
প্রায় দুই দশকের পেশাদার ক্যারিয়ারে বার্সেলোনার মূল দলে ১৭ বছর খেলেছেন মেসি। এরপর পিএসজিতে কাটিয়েছেন দুই মৌসুম। সর্বশেষ চার মৌসুম ধরে খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়েও দুই দশকের বেশি সময় ধরে খেলছেন তিনি।
দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান বলছে, মায়ামিতে এসেই হেডে গোল করার হার বেড়েছে মেসির।
বার্সায় ৬৭২ গোলে হেড মাত্র ২৪
বার্সেলোনার হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মেসি করেছেন ৬৭২ গোল। এর মধ্যে হেড থেকে এসেছে মাত্র ২৪টি। অর্থাৎ বার্সার হয়ে তাঁর প্রতি ১০০ গোলের মধ্যে হেডে ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৫৭টি।
বিপরীতে বাঁ পায়ের ব্যবহার ছিল তাঁর গোলের প্রধান অস্ত্র। বার্সেলোনার হয়ে করা ৬৭২ গোলের ৫৫৭টিই এসেছে বাঁ পায়ে, যা মোট গোলের প্রায় ৮২ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
পিএসজিতেও চিত্রটা খুব একটা বদলায়নি। প্যারিসের ক্লাবটির হয়ে দুই মৌসুমে ৩২ গোলের ২৮টিই করেছেন বাঁ পায়ে। হেডে গোল ছিল শূন্য।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়েও ১২৫ গোল করেছেন মেসি। এর মধ্যে ১১১টি বাঁ পায়ে, আর হেডে মাত্র দুটি।
মায়ামিতে বদলে গেল চিত্র
ইন্টার মায়ামির হয়ে বৃহস্পতিবার ক্রুজ আজুলের বিপক্ষে করা গোলটি ছিল মেসির শততম গোল। আর এই শতকের মধ্যে হেড থেকে এসেছে ছয়টি গোল। অর্থাৎ মায়ামির হয়ে মেসির মোট গোলের ৬ শতাংশ এসেছে মাথা দিয়ে।
বার্সেলোনা বা পিএসজির তুলনায় সংখ্যাটি খুব বড় না হলেও মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনটি চোখে পড়ার মতো।
বার্সেলোনায় হেডে গোল কম কেন?
মেসির হেডে গোলের সংখ্যা বুঝতে হলে তাঁর খেলার ধরনও বিবেচনায় নিতে হয়। বার্সেলোনার সোনালি সময়ে দলের আক্রমণ গড়ে উঠত ছোট পাস, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিক বিল্ডআপের ওপর।
জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও সার্জিও বুসকেতসদের সঙ্গে দ্রুত পাস আদান-প্রদানের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙাই ছিল বার্সার অন্যতম প্রধান অস্ত্র। সেই ব্যবস্থায় বল বেশির ভাগ সময় মাটিতেই থাকত।
মেসিও অনেক সময় নিচে নেমে বল নিতেন, ড্রিবল করে রক্ষণ ভাঙতেন কিংবা সতীর্থদের গোলের সুযোগ তৈরি করে দিতেন। ফলে ক্রস থেকে বক্সে উঠে মাথা দিয়ে গোল করার পরিস্থিতি তাঁর খেলায় তুলনামূলক কম তৈরি হতো।
মায়ামিতে ভূমিকা বদলেছে
ইন্টার মায়ামিতে এসে মেসির ভূমিকায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তিনি এখনো দলের প্রধান সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়, তবে আগের মতো প্রতিটি আক্রমণের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একইভাবে যুক্ত থাকেন না।
কখনো মাঝমাঠে নেমে আক্রমণ তৈরি করছেন, কখনো ডান দিকের হাফ স্পেসে অবস্থান নিচ্ছেন, আবার কখনো প্রতিপক্ষের বক্সের কাছাকাছি গিয়ে শেষ পাস কিংবা ফিনিশিংয়ের অপেক্ষায় থাকছেন।
এমএলএসের ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণেও মেসির এই স্বাধীন ভূমিকার বিষয়টি উঠে এসেছে। ডান দিকের হাফ স্পেসে তাঁকে তুলনামূলক স্বাধীনভাবে খেলানো হলে তিনি ভেতরে ঢুকতে কিংবা বাইরে গিয়ে জায়গা তৈরি করতে পারেন। এতে প্রতিপক্ষের বক্সে বিভিন্ন অবস্থান থেকে পৌঁছানোর সুযোগও বাড়ে।
বয়সের সঙ্গে বদলেছে মেসির খেলাও
বার্সেলোনার মেসি আর ইন্টার মায়ামির মেসি একই খেলোয়াড় হলেও তাঁদের বয়স ও শারীরিক চাহিদা এক নয়। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে আগের মতো প্রতিটি আক্রমণে দীর্ঘ সময় দৌড়ানো কিংবা বল পায়ে নিয়ে পুরো মাঠ পাড়ি দেওয়ার পরিবর্তে নিজের অবস্থান, সময়জ্ঞান ও শক্তির ব্যবহার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সতীর্থদের ধরনও এখানে ভূমিকা রাখে। বার্সেলোনায় মেসির সঙ্গে জাভি, ইনিয়েস্তা ও বুসকেতসের মতো খেলোয়াড়দের বোঝাপড়া ছিল। মায়ামিতে লুইস সুয়ারেজ, রদ্রিগো দি পল ও জর্দি আলবার মতো পরিচিত মুখ থাকলেও দলের খেলার কাঠামো বার্সেলোনার তিকিতাকা যুগের মতো নয়।
মায়ামির আক্রমণে দ্রুত বল এগিয়ে নেওয়া, উইং ব্যবহার কিংবা দূর থেকে শট নেওয়ার মতো বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে মেসির সামনে এখন শুধু বল পায়ে নিয়ে আক্রমণ তৈরির সুযোগই নয়, বক্সে গিয়ে শেষ মুহূর্তে আক্রমণ শেষ করার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
আর সেই পরিবর্তনেরই একটি মজার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তাঁর হেডে করা গোলের পরিসংখ্যানে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বাঁ পা ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অস্ত্র; মায়ামিতে এসে মাথাটাও যেন একটু বেশি কাজে লাগছে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array