এআই বদলে দিচ্ছে মার্কেটিং, গুরুত্ব পাবে ব্যক্তি ও ব্র্যান্ড: ফিলিপ কটলার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্রুত বদলে দিচ্ছে প্রচলিত মার্কেটিংয়ের ধরন। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো এআই গ্রহণ করতে পারলে পরিবর্তিত বাজারে নিজেদের কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারবে বলে মনে করেন আধুনিক মার্কেটিংয়ের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ অধ্যাপক ফিলিপ কটলার।
১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের উদ্দেশে আয়োজিত এক ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠানে এআইনির্ভর মার্কেটিং নিয়ে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন তিনি। ‘এআই ফর মার্কেটার্স সামিট’ নামের এই অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন আইডিয়ান কনসাল্টিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক অনুপম মল্লিক।
৪ পি-এর সঙ্গে যুক্ত হবে নতুন উপাদান
দীর্ঘদিন ধরে মার্কেটিংয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত ছিল ৪ পি—প্রোডাক্ট, প্রাইস, প্লেস ও প্রমোশন। তবে কটলারের মতে, বর্তমান সময়ে এই চারটি উপাদান যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে সেবা, শক্তিশালী ব্র্যান্ড এবং কার্যকর ইনসেনটিভ যুক্ত করে বিপণনের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি করতে হবে।
বদলে যাচ্ছে ভোক্তার মানসিকতা
ডিজিটাল প্রযুক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআইয়ের প্রভাবে ভোক্তাদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। কটলারের আলোচনায় ভোক্তার মনোযোগ, সামাজিক সংযোগ ও পুরস্কারপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
তাঁর মতে, আধুনিক মার্কেটারদের শুধু প্রচলিত বিপণন কৌশল জানলেই হবে না; ভোক্তার মনস্তত্ত্ব এবং নিউরোসায়েন্স সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে।
শুধু তাৎক্ষণিক বিক্রি নয়, ব্র্যান্ডও জরুরি
স্বল্পমেয়াদি বিক্রি বাড়ানোর জন্য পারফরম্যান্স মার্কেটিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়েও সতর্ক করেছেন কটলার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক বিক্রির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ শুধু গ্রাহকের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কেনাকাটা করানোই শেষ কথা নয়। একটি ব্র্যান্ডের মূল্য ও পরিচয় ধরে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
ক্রয়ের পর গ্রাহকের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ
কটলারের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ‘ইউসেজ এক্সপেরিয়েন্স’ বা পণ্য ব্যবহারের অভিজ্ঞতা। সাধারণত একটি পণ্য কেনার আগ থেকে কেনাকাটা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়।
এআই ব্যবহার করে এর পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব। গ্রাহক পণ্যটি কেনার পর কীভাবে ব্যবহার করছেন, কোথায় সমস্যায় পড়ছেন এবং পরবর্তী সময়ে ব্র্যান্ডটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কেমন থাকছে—এসব তথ্যও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
সবার জন্য একই মার্কেটিং নয়
প্রচলিত মার্কেটিংয়ে গ্রাহকদের বয়স, পেশা বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন সেগমেন্টে ভাগ করা হয়। কিন্তু এআইয়ের মাধ্যমে একই সেগমেন্টের ভেতরেও ব্যক্তিভেদে পছন্দ ও আচরণের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা সম্ভব।
ফলে ভবিষ্যতের মার্কেটিং আরও বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা ‘ওয়ান-অন-ওয়ান মার্কেটিং’-এর দিকে যেতে পারে। এতে প্রত্যেক গ্রাহকের প্রয়োজন ও পছন্দ অনুযায়ী বিপণন বার্তা ও সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
চ্যাটবট থেকে এজেন্টিক এআই
চ্যাটবট, অ্যালগরিদম ও এজেন্টিক এআই এখন ব্যবসার নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে। পাশাপাশি ChatGPT, Gemini ও Claude-এর মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, তথ্য বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন কাজ স্বয়ংক্রিয় করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
বার্ষিক পরিকল্পনার বদলে রিয়েল-টাইম সিদ্ধান্ত
প্রথাগত মার্কেটিং পরিকল্পনা সাধারণত দীর্ঘ সময়ের জন্য নির্ধারিত করা হয়। কিন্তু এআইয়ের যুগে বাজারের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনাও নিয়মিত পরিবর্তিত হতে পারে।
রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের আচরণ ও বাজারের পরিবর্তন দ্রুত বুঝতে পারবে। ফলে মার্কেটিং পরিকল্পনা একটি স্থির বার্ষিক দলিলের পরিবর্তে নিয়মিত হালনাগাদ হওয়া একটি ‘জীবন্ত’ পরিকল্পনায় পরিণত হতে পারে।
এআইয়ের সঙ্গে ব্র্যান্ড ও উদ্ভাবন
কটলারের আলোচনার অন্যতম মূল বার্তা হলো—শুধু এআই ব্যবহার করলেই ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক সাফল্য নিশ্চিত হবে না। এর সঙ্গে শক্তিশালী ব্র্যান্ড এবং ধারাবাহিক উদ্ভাবনকে যুক্ত করতে হবে।
বাজার ও ভোক্তার চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তির পাশাপাশি পণ্য ও সেবাতেও নতুনত্ব আনতে হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের মার্কেটিংয়ে এআই, শক্তিশালী ব্র্যান্ড এবং উদ্ভাবন—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array