বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রণীত ‘গবেষণা অর্থায়ন পরিচালনা নির্দেশনা-২০২৬’ প্রত্যাখ্যান ও পুনর্বিবেচনার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) সাধারণ শিক্ষকরা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো. শামীমের কাছে স্মারকলিপি দেন।
পদমর্যাদার বদলে গবেষণার সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি
মানববন্ধনে শিক্ষকরা বলেন, গবেষণা অনুদান বিতরণে স্বচ্ছতা, গবেষণার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ইউজিসির উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানান। তবে নতুন নির্দেশনায় গবেষণা প্রকল্পের প্রধান গবেষক (প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর-পিআই) হিসেবে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের আবেদনের সুযোগ না রাখা এবং পিএইচডিবিহীন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের সুযোগ সীমিত বা বাতিল করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পাবিপ্রবির ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক আশিকুর রহমান অভি বলেন, শুধু পদমর্যাদা কিংবা নির্দিষ্ট ডিগ্রির ভিত্তিতে গবেষকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি না করে গবেষণার সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা প্রস্তাবনার মানের ভিত্তিতে যোগ্যদের পিআই হিসেবে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, একজন শিক্ষকের পদমর্যাদা তাঁর একাডেমিক অবস্থান নির্দেশ করলেও গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার সামগ্রিক সক্ষমতা শুধু পদ দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। গবেষণায় প্রকাশনা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা, গবেষণাপদ্ধতির জ্ঞান, পূর্ববর্তী প্রকল্পে অংশগ্রহণ, দল পরিচালনা এবং বাজেট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
পিএইচডি বাধ্যতামূলক হলে বঞ্চিত হবেন অনেক শিক্ষক
শিক্ষকরা জানান, পাবিপ্রবির প্রায় ২১৩ জন শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশের পিএইচডি ডিগ্রি নেই। ফলে পিআই হিসেবে আবেদনের ক্ষেত্রে পিএইচডি বাধ্যতামূলক করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক যোগ্য শিক্ষক স্বাধীনভাবে গবেষণা প্রকল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
তাদের মতে, এর ফলে শুধু পাবিপ্রবি নয়, দেশের অন্যান্য বিকাশমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ গবেষণা নেতৃত্ব তৈরি করার প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
শিক্ষকদের প্রস্তাব, পিআই হিসেবে আবেদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষক হওয়া, প্রাসঙ্গিক একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণার অভিজ্ঞতা, মানসম্পন্ন প্রকাশনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাকে মূল মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে পিএইচডি ডিগ্রি, উচ্চমানের আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, সাইটেশন, পূর্ববর্তী গবেষণা অনুদান ও প্রকল্প পরিচালনার অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পেটেন্ট, উদ্ভাবন এবং গবেষণার সামাজিক বা নীতিগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
তরুণ গবেষকদের নেতৃত্বের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান
মানববন্ধনে শিক্ষকরা পিআই হিসেবে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকসহ সব পর্যায়ের শিক্ষকের জন্য সমানভাবে আবেদনের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে পিএইচডিবিহীন অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য না করে তাঁদের গবেষণা সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মূল্যায়নের আহ্বান জানানো হয়।
তারা বলেন, পদমর্যাদার পরিবর্তে গবেষকের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা প্রস্তাবনার মানকে গুরুত্ব দিয়ে একটি স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
বক্তারা আরও বলেন, প্রথমবার পিআই হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া যোগ্য তরুণ গবেষকের প্রকল্পে অভিজ্ঞ অধ্যাপক বা সহযোগী অধ্যাপককে কো-পিআই হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে একদিকে তরুণ গবেষকদের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ গবেষকদের সহযোগিতায় প্রকল্পের গবেষণার মান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শিক্ষক-গবেষকদের সঙ্গে আলোচনা করে নীতিমালা সংশোধনের দাবি
মানববন্ধন থেকে নবীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ‘গবেষণা অর্থায়ন পরিচালনা নির্দেশনা-২০২৬’ পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানানো হয়।
শিক্ষকদের আরও দাবি, ভবিষ্যতে এ ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন বা সংশোধনের আগে শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময় করা উচিত। একই সঙ্গে ইউজিসির সঙ্গে শিক্ষক-গবেষকদের সরাসরি মতবিনিময়সভার আয়োজনেরও দাবি জানান তারা।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আরিফুল ইসলাম, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান মো. আশিকুর রহমান অভি, একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এস. এম. শাহেদুল আলম, সমাজকর্ম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোছা. ফাতেমা বেগম এবং অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা ইয়াসমিন।
এ ছাড়া ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. কামরুজ্জামান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মো. খাইরুল ইসলাম, রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. হুমায়ুন কবিরসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকরা দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array