মাদক নির্মূলে কঠোর সরকার, রাজনৈতিক নেতৃত্বও মাঠে
মাদকের বিরুদ্ধে এবার শুধু অভিযান নয়, মাঠে নেমেছেন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বও। সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ এলাকায় মাদকবিরোধী কমিটি গঠন, জনসচেতনতা কর্মসূচি, প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় এবং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি আসছে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেই—মাদক ব্যবসা বা সেবনের সঙ্গে যুক্ত হলে দলীয় পরিচয় কোনোভাবেই সুরক্ষা দেবে না।
বছরের পর বছর মাদক পরিবার ও সমাজে যে ক্ষত তৈরি করেছে, তার বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থানকে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ মাদক নির্মূলের লড়াই শুধু পুলিশের হাতে থাকলে কারবারিদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ভাঙা কঠিন। জনপ্রতিনিধিরা সরাসরি মাঠে থাকলে প্রশাসনিক উদ্যোগের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততাও বাড়ে।
- রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ দেখেই ব্যবস্থা
- সীমান্ত থেকে অনলাইন, সরবরাহ বন্ধে বাড়ছে নজরদারি
- সরকারের কঠোর বার্তার সঙ্গে এমপিদের সরাসরি তৎপরতা
‘নিজ দলের হলেও আগে ব্যবস্থা’
সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ভিপি আইনুল হক তাঁর এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, শিক্ষক, ইমাম, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সমাজের সজ্জন ব্যক্তি এবং অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে মাদকবিরোধী কমিটি করা হচ্ছে। ইউনিয়নে ৫১ জন এবং ওয়ার্ডে ২১ সদস্যের কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কমিটির সদস্যদের সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে প্রতি মাসে দুটি সভা করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
আইনুল হকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা—নিজ দলের কেউ মাদক কারবার বা সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেই আগে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে বলা হয়েছে। মাদকবিরোধী লড়াইয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আইন প্রয়োগের এই অবস্থানই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ। কারণ কারবারিরা রাজনৈতিক আশ্রয় হারালে তাদের স্থানীয় প্রভাবও কমে আসবে।
ময়মনসিংহে প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি
গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের চরকালীবাড়ী যুব স্পোর্টিং ক্লাব আয়োজিত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদকবিরোধী সমাবেশে বক্তব্য দেন সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ।
তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘মাদকের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।’ দলীয় নেতাকর্মীদেরও সতর্ক করে ওয়াহাব আকন্দ আরও বলেন, আত্মীয়তা বা রাজনৈতিক পরিচয়ে কেউ মাদক কারবারির পক্ষে কথা বললেও তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। সাংগঠনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে ২১ জুন ময়মনসিংহে মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের মাদকবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। অর্থাৎ রাজনৈতিক বক্তব্য এখন শুধু মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই; স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি, সভা ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে সেটিকে কার্যকর করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
রামগঞ্জে সচেতনতা ও প্রশাসনিক কঠোরতার আহ্বান
গত ৩০ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার কচুয়া আহমদিয়া ফাজিল মাদরাসার অনুষ্ঠানে মাদকবিরোধী বক্তব্য দেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি বলেন, তাঁর এলাকায় মাদকের ভয়াবহতা রয়েছে। এ কারণে জনসচেতনতা তৈরি, মিছিল-শোভাযাত্রা এবং সামাজিক প্রতিরোধের পাশাপাশি প্রশাসনকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মাদক মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জামিনে বেরিয়ে আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী ওমর ফারুক তুষার লিগ্যাল নোটিশ পাঠালেও মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট।
পরিবারকেও প্রতিরোধের অংশ করছেন এমপিরা
সিরাজগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান আলিমের উদ্যোগে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পরিবারকে যুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। তিনি জানান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা, সমাজকর্মী, বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রশাসনের সদস্যদের নিয়ে থানাভিত্তিক ‘মাদক নিয়ন্ত্রক সমন্বয় কমিটি’ করা হয়েছে।
মাদক বিক্রেতা ও সেবনকারীদের শনাক্ত করার পর তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া হচ্ছে প্রশাসনের সহায়তা। এই উদ্যোগ মাদকবিরোধী লড়াইকে শুধু শাস্তিমূলক অবস্থান থেকে প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ একজন আসক্তকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনাও জরুরি।
৬২ হাজার কোটি টাকার বাজারে আঘাত
অপরাধ বিশ্লেষকদের ধারণা, দেশে বছরে ৬০ থেকে ৬২ হাজার কোটি টাকার মাদক বাণিজ্য হয়। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও আইসসহ বিভিন্ন মাদক সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও কক্সবাজারের সীমান্তকে গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, মাদক ব্যবসার সঙ্গে বড় অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। সীমান্ত থেকে রাজধানী পর্যন্ত মাদক পৌঁছাতে একাধিক চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হয়। তাই পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে নজরদারিতে আনতে হবে।
তাঁর মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যুক্ত হলে অভিযান আরও কার্যকর হবে।
অনলাইন কারবারেও বাড়ছে সক্ষমতা
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের লড়াই এখন ডিজিটাল পরিসরেও বিস্তৃত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচার প্রবণতা ঠেকাতে সাইবার নজরদারি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অনলাইনে অপরাধ হলেও প্রযুক্তির মাধ্যমেই অপরাধী শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে অনলাইনে মাদক বিক্রির মতো অপরাধ শনাক্ত ও তদন্তের সক্ষমতাও বাড়ছে।
কঠোরতার সঙ্গে মানবিক সমাধান
মাদক নির্মূলে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং এমপিদের মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তা ইতিবাচক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করছে। এখন এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে হবে তিনটি পথে—মাদকের সরবরাহ বন্ধ, কারবারিদের অর্থের উৎস শনাক্ত এবং আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে যুক্ত করতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে যে কমিটিগুলো গড়ে উঠছে, সেগুলো যদি নিয়মিতভাবে কাজ করে এবং প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় রাখে, তাহলে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরও স্থায়ী রূপ পেতে পারে।
সবচেয়ে বড় ইতিবাচক বার্তা হলো—মাদকের বিরুদ্ধে এখন কঠোরতার কথা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বলছে না; রাজনৈতিক নেতৃত্বও প্রকাশ্যে বলছে, ‘নিজ দলের হলেও ছাড় নয়।’ এই অবস্থান কার্যকর হলে মাদক কারবারিদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়ের জায়গা সংকুচিত হবে। আর সেই জায়গাটিই হতে পারে মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার লড়াইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
কালের আলো/জেএন/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array