জননিরাপত্তায় আগাম প্রস্তুতি পুলিশের, জোরদার নিরাপত্তা পরিকল্পনা
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং রাজধানীসহ সারা দেশে স্বাভাবিক জনজীবন বজায় রাখতে চলছে সমন্বিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি।
আত্মগোপনে থেকে দলীয় কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের শনাক্ত করতে তালিকা প্রস্তুতের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও উসকানিমূলক প্রচারণা ঠেকাতেও তৎপর রয়েছে সাইবার পুলিশ ইউনিট। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে সারা দেশে ৫৩ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। চলতি মাসের প্রথম ছয় দিনেই গ্রেফতার হয়েছেন প্রায় ১০ হাজার।
- দেশজুড়ে এক মাসে গ্রেফতার ৫৩ হাজার
- গুজব ও উসকানি প্রতিরোধে সাইবার নজরদারি
- আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের শনাক্তে উদ্যোগ
- শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা সামনে রেখে পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা
ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ। তিনি বলেছেন, ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজধানীতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা জনজীবন অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা বিন্দুমাত্র বরদাশত করা হবে না।
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কোনো কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ও ডিসেম্বরে যেকোনো অপতৎপরতা রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ রয়েছে।
পুলিশের এ অবস্থানের মধ্য দিয়ে সম্ভাব্য অস্থিরতা মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, নিয়মিত অভিযান এবং বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বিত তৎপরতার মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
এক মাসে সারা দেশ থেকে গ্রেফতার ৫৩ হাজার
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত এক মাসে সারা দেশ থেকে ৫৩ হাজার লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০০ জনকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। বুধবার ডিএমপি ৪৬৫ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানায়।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, রাজধানীতে ডিএমপির নিয়মিত অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় ৫৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গ্রেফতারের তালিকায় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা
সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন খান জ্যোতি, পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া মুক্তা, তজুমদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক ফরিদুল তালুকদার এবং সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের ধুবিল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম ভোলা।
এ ছাড়া সাটুরিয়ার বরাইদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মুহাম্মদ রুহুল আমিন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের রেনু মিয়া, রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক মাজেদুর রহমান, একই উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সদস্য অধ্যাপক আব্দুল বারিক এবং কেরানীগঞ্জ মডেল থানা তাঁতী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম সরকারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রেনু মিয়া হাতকড়া পরা অবস্থায় পালিয়ে যাওয়ার আট ঘণ্টা পর পুনরায় গ্রেফতার হন বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন অতিরিক্ত আইজিপি জানান, আত্মগোপনে থেকে গোপনে দলের কার্যক্রম পরিচালনাকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং ডিসেম্বরের আগেই তাদের গ্রেফতারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা উসকানিমূলক পোস্ট ঠেকাতে সাইবার পুলিশ ইউনিট নিবিড় নজরদারি চালাচ্ছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে বিশ্লেষকদের ভিন্নমত
আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দুই দফায় ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, দেশে ফিরলে গ্রেফতার ও মামলার ঝুঁকি থাকায় এ ঘোষণা কোণঠাসা হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা রাখার কৌশল হতে পারে। অন্য অংশের মতে, ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় নিরাপত্তা ও আইনি নিশ্চয়তার ভিত্তিতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার ঘোষণাকে স্রেফ মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ভাবার অবকাশ নেই। রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং দেশের মাটিতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগের তাগিদ এখানে বড় চালিকাশক্তি। তবে আত্মগোপনে থাকা নেতারা উপযুক্ত সময়ে মাঠে নেমে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
কারাগারের চাপও বড় চ্যালেঞ্জ
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার হলেও সেখানে গড়ে লাখের কাছাকাছি বন্দি রয়েছে। ব্যাপক গ্রেফতারের মধ্যে বন্দির সংখ্যা আরও বাড়লে কারা ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হতে পারে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমঝোতা ছাড়াই শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং তা প্রতিরোধের পরিস্থিতি তৈরি হলে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা দিতে পারে। কেবল পুলিশি শক্তি বা গণগ্রেফতারের মাধ্যমে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান উসকানিদাতাদের আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ডিসেম্বরের আগে প্রস্তুতিতে জোর
ডিসেম্বরকে সামনে রেখে পুলিশের প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং জনজীবনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা। নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও সাইবার তৎপরতার মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রয়েছে। সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আগাম প্রস্তুতি, দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং সমন্বিত পদক্ষেপ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array