পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে শি পুতিনের সঙ্গে বসতে চান ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে যৌথ বৈঠকে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আগামী মাসে চীনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে তিন নেতার এই বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। বৈঠকে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, নিরস্ত্রীকরণ এবং বাণিজ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চান ট্রাম্প। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সোমবার (১৯ অক্টোবর) হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, শি জিনপিং রাজি থাকলে তিনি এ ধরনের বৈঠকে অংশ নিতে প্রস্তুত। তাঁর বক্তব্যে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। খবর রয়টার্সের।
এপেক সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকের সম্ভাবনা
আগামী ১৮ ও ১৯ নভেম্বর চীনে এপেক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই সম্মেলনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন বিশ্বনেতারা। সম্মেলনের ফাঁকে ট্রাম্প, শি জিনপিং ও পুতিনের বৈঠক হলে তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব পাবে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরেই তিন নেতার সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে আলোচনার অগ্রগতি কতদূর, বৈঠকের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে কি না কিংবা তিন নেতার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিং ও পুতিনের আলাদা বৈঠক হলেও তিন নেতার একসঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক আগে হয়নি। ফলে প্রস্তাবিত এই বৈঠক বাস্তবায়িত হলে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিন পরাশক্তির অবস্থান সরাসরি আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনায় পুতিনের আগ্রহ
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুতিন সম্ভাব্য এই বৈঠককে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় কাজে লাগাতে চান। তাঁর লক্ষ্য এমন একটি সমাধানের পথ তৈরি করা, যা রাশিয়ার স্বার্থের অনুকূলে থাকবে। গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে ফোনালাপে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। ট্রাম্প একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নতুন মাত্রা দিতে পারে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের বিষয়ে রাশিয়ার আচরণ আপাতত তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে ইউক্রেনের পক্ষে আলোচনার দায়িত্ব অন্য কাউকে দেওয়ার সময় এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে তাঁর এই বক্তব্যের পর ইউক্রেনের প্রতিনিধিত্ব এবং সম্ভাব্য শান্তি আলোচনায় দেশটির ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ট্রাম্পের পদক্ষেপ
সাম্প্রতিক সময়ে পুতিনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। রাশিয়ার ডিজেল জ্বালানি নিয়ে একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি মস্কোর ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে চীনের সঙ্গেও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, শুল্কনীতি, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে আলোচনা চালু রাখা দুই দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ট্রাম্পের রাশিয়াবিষয়ক নীতির সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর আশঙ্কা, মস্কোর ওপর চাপ কমিয়ে দেওয়া হলে পুতিন আরও উৎসাহিত হতে পারেন এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বৈঠক শুধু পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকটও আলোচনায় আসবে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে বৈঠকের আলোচ্যসূচি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর উদ্যোগে তিন পরাশক্তি
পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমানো এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে আলোচনা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেছিলেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর চুক্তি করা সম্ভব। তবে সেই চুক্তি এ বছরই সম্পন্ন করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সবচেয়ে বড় মজুত রয়েছে রাশিয়ার কাছে। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডারও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ফলে তিন দেশের মধ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা হলে তা বৈশ্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে পারমাণবিক অস্ত্র কমানোর বিষয়ে তিন দেশের অবস্থান এক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে আগে থেকেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের চুক্তি থাকলেও চীন মনে করে, তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সমপর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিন দেশকে একই কাঠামোর আওতায় এনে নিরস্ত্রীকরণ আলোচনার প্রস্তাবকে বেইজিং ন্যায্য বা বাস্তবসম্মত মনে করে না। এই মতপার্থক্য দূর করা সম্ভাব্য বৈঠকের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। কারণ, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে কোনো নতুন সমঝোতা করতে হলে অস্ত্রের সংখ্যা, ভবিষ্যৎ উৎপাদন, নজরদারি এবং চুক্তি বাস্তবায়নের মতো বিষয়েও ঐকমত্য প্রয়োজন।
নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বাড়ছে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র সীমিত করার গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি নিউ স্টার্টের মেয়াদ ২০২৬ সালের শুরুতে শেষ হয়েছে। এই চুক্তির মাধ্যমে দুই দেশ কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ওপর নির্দিষ্ট সীমা বজায় রাখতে সম্মত হয়েছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় দুই দেশের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নতুন কোনো চুক্তি বা সমঝোতা কার্যকর করতে হলে উভয় পক্ষের সম্মতি প্রয়োজন। পাশাপাশি চীনের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টিও ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে চীন এখনই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সমপর্যায়ের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে অংশ নিতে আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছে। ফলে ট্রাম্পের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলেও তিন দেশের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানো সহজ হবে না।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের আসন্ন সাক্ষাৎ
আগামী মাসে চীনের শেনঝেনে এপেক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। চলতি বছর এটি হবে তাঁর দ্বিতীয় চীন সফর। একই সময়ে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এটি হবে তাঁর তৃতীয় সাক্ষাৎ। দুই নেতার আলোচনায় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাণিজ্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ও গুরুত্ব পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা বিশ্ববাজার, প্রযুক্তি খাত এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলে। তাই দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। শি জিনপিংয়ের সম্মতি ছাড়া প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজন করা সম্ভব নয়। একইভাবে পুতিনের অংশগ্রহণ ও আলোচনার শর্তও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এপেক সম্মেলনের আগে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বৈঠকের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনাও খোলা রাখলেন ট্রাম্প
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আরেকটি বৈঠকের সম্ভাবনাও নাকচ করেননি ট্রাম্প। তবে এ ধরনের বৈঠকের জন্য কেউ অনুরোধ জানিয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন বলে জানিয়েছেন তিনি। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কারণ। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র উন্নয়ন বন্ধ এবং উপদ্বীপে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে অতীতে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ থেকে স্থায়ী সমাধান আসেনি। উত্তর কোরিয়া এর আগে জানিয়েছে, পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগে দেশটিকে রাজি করানোর উদ্দেশ্যে তারা আলোচনায় বসতে আগ্রহী নয়। ফলে ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে নতুন বৈঠক হলেও তা থেকে কী ধরনের অগ্রগতি আসবে, সেটি অনিশ্চিত।
সব মিলিয়ে শি জিনপিং ও পুতিনের সঙ্গে যৌথ বৈঠকের প্রস্তাবের মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে তিন নেতার সম্মতি, পারস্পরিক স্বার্থের সংঘাত এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে মতপার্থক্য কাটিয়ে বৈঠকটি বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। সূত্র: রয়টার্স, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা ইনস্টিটিউট
কালের আলো/এমএএইচ/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]