জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের হামলার বর্ণনা দিয়েছেন ১১ নম্বর সাক্ষী মেসবাহ উদ্দীন আহমেদ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে তিনি বলেন, আন্দোলনকারীরা পুলিশের হামলা থেকে বাঁচতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকে ফটক বন্ধ করে দিলে পুলিশ গেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গুলি চালাতে থাকে। তাঁর দাবি, ওই দিনের হামলায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক আন্দোলনকারীও আহত হন। আন্দোলনের সময় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়ক ছিলেন মেসবাহ উদ্দীন। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার (১৯ অক্টোবর) তিনি সাক্ষ্য দেন।
মেসবাহর জবানবন্দিতে জুলাই আন্দোলনে পুলিশের হামলা, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনকারীদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং আহতদের চিকিৎসার বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় তৎকালীন সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানান।
১৮ জুলাই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে হামলার বর্ণনা
জবানবন্দিতে মেসবাহ উদ্দীন বলেন, ১৮ জুলাই ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে তাঁদের কর্মসূচি ছিল। সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই পুলিশ তাঁদের বাধা দিতে থাকে। আন্দোলনকারীরা পুলিশের কথায় কর্মসূচি প্রত্যাহার না করায় প্রথমে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়। এরপর পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। মেসবাহ বলেন, মেরুদণ্ডের সমস্যার কারণে তিনি তখন ক্রাচ ব্যবহার করছিলেন। তা সত্ত্বেও আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। পুলিশের লাঠিচার্জের সময় তিনি অবস্থান থেকে সরে যাননি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ তাঁর ওপরও লাঠিচার্জ করে এবং সেখান থেকেই আক্রমণ শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, লাঠিচার্জের পর পুলিশ রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি ছুড়তে থাকে। হামলার মুখে শিক্ষার্থীরা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে গেট বন্ধ করে দেন। তখন পুলিশ গেটের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে গুলি চালাতে থাকে এবং টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। সাক্ষীর দাবি, ওই দিন পুলিশের হামলায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ২০০ থেকে ২৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতাধিক আন্দোলনকারীও আহত হন।
পুলিশের গুলিতে জিল্লুর শেখ নিহত, বন্ধুর চোখ নষ্ট হওয়ার দাবি
মেসবাহ উদ্দীন জবানবন্দিতে বলেন, ওই দিন পুলিশের গুলিতে ইম্পেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থী জিল্লুর শেখ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিহত হন। আহতদের অনেকে পুলিশের লাঠিচার্জ, ছররা গুলি ও টিয়ারশেলের আঘাতে জখম হন।
নিজের বন্ধু জিসানের আহত হওয়ার ঘটনাও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জিসানের চোখে ছররা গুলি লাগে এবং এতে তাঁর চোখ নষ্ট হয়ে যায়। মেসবাহ বলেন, আহতদের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাকেন্দ্র এবং আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। হামলার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি উত্তর বাড্ডায় এক বন্ধুর মেসে চলে যান। তাঁর আশঙ্কা ছিল, বাড়িতে যুবলীগের লোকজন হামলা করতে পারে।
১৬ জুলাই কর্মসূচি, পুলিশের বাধার অভিযোগ
জবানবন্দিতে মেসবাহ উদ্দীন বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, জুনাইদ আহমেদ পলকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্ট, ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মসূচি দেন তাঁরা। সেদিন সকাল ১০টায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তাঁদের জমায়েত শুরু হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবিগুলো প্রতিষ্ঠা করা এবং আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করা। মেসবাহর দাবি, সেদিন বাড্ডা থানার পুলিশ তাঁদের বারবার বাধা দেয়। বিকেল আনুমানিক ৪টা পর্যন্ত কর্মসূচি চলার পর তিনি বাসায় ফিরে জানতে পারেন, সারা দেশে ছয়জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন।
ইন্টারনেট বন্ধে আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
জুলাই আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেন মেসবাহ উদ্দীন। তিনি বলেন, ১৮ জুলাই দিবাগত রাতে তাঁরা দেখতে পান, মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট কাজ করছে না। এর আগে কয়েকবার ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মেসবাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা তাঁদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের নিজেদের মধ্যেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগের আগ পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত ছিল। তাঁর দাবি, ওই আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি ও আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীদের হামলায় সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষ আহত হন।
ইন্টারনেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়ে জবানবন্দিতে যা বলেন
মেসবাহ উদ্দীন বলেন, ৫ আগস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে আরেক ব্যক্তির কথোপকথনের বিষয়ে জানতে পারেন। ওই ব্যক্তি সম্ভবত সালমান এফ রহমান ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, কথোপকথন থেকে তিনি জানতে পারেন, শেখ হাসিনার নির্দেশে এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের পরামর্শে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় হতাহত হওয়ার খবর দেশের ভেতরে ও বিদেশে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং আন্দোলনকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। মামলার অভিযোগপত্রেও ইন্টারনেট বন্ধের বিষয়ে জয় ও পলকের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ আনা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং হামলা ও প্রাণহানির তথ্য আড়াল করার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সেবা বন্ধের সিদ্ধান্ত ভূমিকা রেখেছিল। এসব অভিযোগের বিচার চলছে।
জয় ও পলকের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় সজীব ওয়াজেদ জয় ও জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে পলকের ফেসবুক পোস্ট এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্য আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে উসকানি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এর পর ১৪ ও ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা হয় এবং অনেকে আহত হন। দ্বিতীয় অভিযোগে আন্দোলন দমনে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি কমানো, পরে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপ বন্ধ করার বিষয় রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব পদক্ষেপ আন্দোলনকারীদের পারস্পরিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং তাঁদের শনাক্ত করে আটক ও দমন করার সুযোগ তৈরি করেছিল।
তৃতীয় অভিযোগে ইন্টারনেট সেবা বন্ধের মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হামলা ও প্রাণহানির তথ্য আড়াল করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ১৯ জুলাই এবং উত্তরায় ৫ আগস্ট আন্দোলনকারীদের গুলি করে হত্যার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।এসব অভিযোগের মধ্যে ইন্টারনেট বন্ধ, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা এবং অধীনস্থদের অপরাধ প্রতিরোধে ব্যর্থতার বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে অভিযোগগুলো আদালতে বিচারাধীন; সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।
জয় পলাতক, পলক কারাগারে
মামলায় সজীব ওয়াজেদ জয় পলাতক এবং জুনাইদ আহমেদ পলক গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। এ মামলায় চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করা হয়।জবানবন্দির শেষ দিকে মেসবাহ উদ্দীন জুলাই আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের ক্ষতির জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, জুনাইদ আহমেদ পলক, সালমান এফ রহমান, আরাফাতসহ শেখ হাসিনার অধীন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের দাবি জানান।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]