খুঁজুন
                               
, ,
           

সেনাপ্রধানের চীন সফর, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এবার সামরিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯, ৬:৪৭ পূর্বাহ্ণ
সেনাপ্রধানের চীন সফর, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এবার সামরিক কূটনীতিতে বাংলাদেশ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো :

দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট ‘দ্বিপক্ষীয় সমাধানে’ বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীনের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই গতিধারায় মায়ানমার থেকে জোরপূর্বক নির্বাসিত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে সেখানে ফিরিয়ে নিতে এবার সামরিক কূটনীতির পথে হেঁটেছে বাংলাদেশ সরকার।

আরও পড়ুনঃ সেনাপ্রধানের চীন সফর, বাংলাদেশ-চীন সেনাবাহিনীর সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়

ফলে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের চার মাসের মাথায় মায়ানমারের এ শক্তিধর মিত্র দেশের সামরিক নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটের আদ্যোপান্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন দেশটিতে সফরত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

কূটনৈতিক তৎপরতায় সাহসী ও অভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর গাইডলাইনে সেনাপ্রধান চীনের সামরিক শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছেন।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বেসামরিক কূটনীতির পাশাপাশি সফল সামরিক কূটনৈতিক তৎপরতায় বাংলাদেশ সরকার আরও একধাপ এগিয়ে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জেনারেল আজিজ-উয়েই ফেং’র বৈঠক, চীনের ‘গুড উইল’ কামনা

তাঁরা বলছেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে একমাত্র চীনই যে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারে এ বিষয়টি সামরিক নীতি নির্ধারকদের কাছে জোরালোভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন সেনাপ্রধান।

এসবের পাশাপাশি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, সেনাপ্রধানের এ সফর বন্ধুপ্রতীম বাংলাদেশ এবং চীনের মৈত্রী বন্ধন আরও সুদৃঢ় করবে। ঢাকা-বেইজিং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নেও যোগ হবে নতুন মাত্রা। নিবিড় হবে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও। ফলে তাঁরা সেনাপ্রধানের এ সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।

জানা যায়, দুই বছর আগে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের গণবাস্তুচ্যুতি ও মানবতার চরম বিপর্যয়ের পর চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম দিকে চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে শুরু করে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তিনি ফলপ্রসু আলোচনা করেন।

ওই  সময় মায়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশকে আলোচনার মাধ্যমেই এ সঙ্কট সমাধান করতে বলার পাশাপাশি প্রয়োজনে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস আদায় করে বড় রকমের কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন করেন প্রধানমন্ত্রী।

এরপর রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারের ওপর চীনের চাপ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ‘নীরব দূতিয়ালী’ বা সাইলেন্ট ডিপ্লোমেসির মোড়কে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ।

আরও জানা যায়, মায়ানমারে এনএলডির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও দেশটির সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করা ১১ সদস্যের জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা পরিষদে সেনাবাহিনীর আধিপত্য সুপ্রিতিষ্ঠিত।

সেনাবাহিনী ও তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মন্ত্রণালয়গুলো প্রত্যক্ষভাবে সেখানকার রোহিঙ্গা এলাকায় সহিংসতা মোকাবিলায় যুক্ত থাকায় সেখানে রাজনৈতিক সরকারের চেয়ে তাদের সেনাপ্রধানের মনোভাবই প্রাধান্য পায়। এমনকি রোহিঙ্গা সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানও তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপরই নির্ভর করে।

সূত্র মতে, চলমান এমন বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সমাধান সূত্রের আলোকে ষ্ট্রাটেজি ঠিক করে সামরিক কূটনীতির পথে হাঁটতে শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টিতে তাদের সম্মত করতে একমাত্র চীনই সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখার অধিকারী হওয়ায় মহাপরাক্রমশালী দেশটিতে সফরে গিয়ে তাদের সামরিক নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ।

গত সোমবার (০৪ নভেম্বর) থেকে বৃহস্পতিবার (০৭ নভেম্বর) পর্যন্ত চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী উয়েই ফেং, পিপলস্ লিবারেশন আর্মি গ্রাউন্ড ফোর্স এর কমান্ডার জেনারেল হান উয়েগো, চীন অলিম্পিক এসোসিয়েশনের কর্ণধার ও চীনের ডিফেন্স ইন্ডাষ্ট্রিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে জ্বলন্ত রোহিঙ্গা ইস্যুটিই সর্বোচ্চ প্রাধান্য পায়।

চীনের শীর্ষস্থানীয় সামরিক নেতৃত্বের কাছে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশের আশ্রয় প্রদানের পর সাম্প্রতিক সময়ে যে মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে এ বিষয়টিও তিনি জোরালোভাবে উপস্থাপন করেন।

‘বাংলাদেশ বর্তমানে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে, যা দেশের জন্য পরিবেশ ও নিরাপত্তার দিক থেকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ’ প্রায় চার মাস আগে চীনের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ বক্তব্যটিও তাদের সামনে তুলে ধরেন।

সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ চীনের সামরিক বাহিনীর নীতি নির্ধারকদের মাধ্যমে মায়ানমারের সেনা নায়কদের এ বিষয়টি বোঝানোর অনুরোধ করেন। দীর্ঘায়িত রোহিঙ্গা সমস্যা দ্রুত সমাধানের বিষয়ে তাঁরা সেনাপ্রধানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ-চীনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রাচীন। ইতিহাসের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল সেই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েও।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৃষি, বিনিয়োগ এবং শিল্প-বাণিজ্যে মহাচীনের সঙ্গে এ সম্পর্কের ক্রমশ বিস্তার ঘটছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বংলাদেশের ভূরাজনৈতিক, ভূকৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক অবস্থান আঞ্চলিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশে রূপ দিয়েছে। বৈশ্বিক কৌশলগত ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের স্থান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ-সেতু হিসেবে বিবেচিত।

কিন্তু রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে বাংলাদেশ ও মায়ানমারের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা এবং মায়ানমারের শেষ মুহুর্তে বেঁকে বসায় প্রত্যাবাসন ভেস্তে যাওয়ায় দু’দেশের সম্পর্ক এখন শীতল অবস্থায় রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সামরিক কূটনীতিতেও এ সংকটের সম্ভাব্য সমাধান খুঁজছে বাংলাদেশ।

ফলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সেনাপ্রধানের চীন সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অভিহিত করে বলছেন, বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি জেনারেল আজিজ আহমেদের প্রথম চীন সফর।

যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়া সফরের মতোই তাঁর এ চীন সফরে কাঙ্খিত প্রত্যাশার পাশাপাশি অর্জনও রয়েছে।

রাজনৈতিক কূটনীতির মতোই সামরিক কূটনীতিতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে চীনের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যেমন ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে তেমনি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বেগবান হওয়ার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ এ দেশটির সঙ্গে পারস্পরিক বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করবে।

দুই জাতির সাধারণ বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং প্রকৃত মৈত্রীর চেতনারও মূর্ত প্রকাশ ঘটবে।

জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুবিন এস খান কালের আলোকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরেই প্রতিবেশী দুই শক্তিশালী রাষ্ট্র ভারত ও চীনের সঙ্গে একই সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে চলেছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমশ জটিল আকার নিয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ চীনের জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরে তাকে এ বিষয়ে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরবে কীনা এটি নির্ধারণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে পারে।’  

তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ঐতিহ্যগতভাবেই চীনা সামরিক অস্ত্রের উপর অনেক নির্ভর করে। ফলে বৃহৎ দু’ দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ‘ভারসাম্য’ রক্ষায় সেনাপ্রধানের চীন সফর নতুন মাত্রা নেবে’, যোগ করেন এ নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

সূত্র মতে, সামরিক কূটনীতিতে ইতোপূর্বেও সফলতার মুখ দেখেছিলেন বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। ২০১৪ সালের মে মাসে মায়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) গুলিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্য নায়েক মিজানুর রহমান নিহত হওয়ার পর দুই দেশের সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়।

পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মায়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন ওই সময়কার বিজিবি মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি ওই বছরের জুন মাসে মায়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে বিজিবি ও মিয়ানমার পুলিশ ফোর্সের (এমপিএফ) প্রধানদের বৈঠকে বাংলাদেশের ৮ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন।

মিয়ানমার পুলিশ ফোর্সের (এমপিএফ) সঙ্গে বিজিবির এটি ছিল প্রথম বৈঠক। সেই বৈঠক দুই দেশের সীমান্ত বাহিনীর সম্পর্ক উন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। তৎকালীন বিজিবি মহাপরিচালকের ওই সফরের মধ্যে দিয়ে স্থল সীমান্ত চুক্তি মেনে নিয়ে দীর্ঘদিন একযোগে কাজ করে বিজিবি ও বিজিপি।

এতে করে স্বস্তি ফিরে আসে মায়ানমারের সাথে বাংলাদেশের ২৬১ কিলোমিটার সীমান্তভূমিতে। ওই বৈঠকের  সূত্র ধরেই এরপর বাংলাদেশের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের বহি:প্রকাশ ঘটায় মায়ানমার।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রোহিঙ্গা ইস্যুতে সামরিক শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে সেনাপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে চীনের জোর সমর্থনের পাশাপাশি কাউন্টার টেরোরিজম, সাইবার সিকিউরিটিসহ নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উন্নত প্রশিক্ষন সহায়তা, দুই দেশের বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের যৌথ অনুশীলন, চিকিৎসা ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর চিকিৎসকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ, সেনা সদস্যদের বিনা খরচে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদানের বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়।

কালের আলো/কেটিআইবি/এমএএএমকে

নিউইয়র্কে ববি হাজ্জাজকে ঘিরে প্রবাসীদের কটূক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:২৯ অপরাহ্ণ
নিউইয়র্কে ববি হাজ্জাজকে ঘিরে প্রবাসীদের কটূক্তি

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে নিউইয়র্কে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের একটি সড়কে চলাচলের সময় একদল প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁর দিকে এগিয়ে এসে বিভিন্ন আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে প্রতিমন্ত্রীকে ‘বাংলাদেশি সন্ত্রাসী’ ও ‘প্রতারক’ বলে কটূক্তি করতে দেখা যায়।

ভিডিওতে ববি হাজ্জাজকে শান্ত থাকতে দেখা যায়। তিনি ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো ধরনের বাদানুবাদে জড়াননি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে একটি উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা সম্মেলনে অংশ নিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন ববি হাজ্জাজ।

এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, চলতি মাসের ৭ সেপ্টেম্বর ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। পরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি এ বিষয়ে অভিযোগ করেন।

কালের আলো/এমএসআইপি 

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:১৮ অপরাহ্ণ
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ ভাষণ

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় ভাষণ দেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলায় ভাষণ দেন।

ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনকে একমাত্র টেকসই সমাধান হিসেবে উল্লেখ করে বিশ্বসম্প্রদায়ের কার্যকর ভূমিকা কামনা করেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণ করে দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন) কৌশলের রূপরেখা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কপ-৩১ সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থায়নের দাবি জানানোর পাশাপাশি দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের জাতীয় উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া ভাষণে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার অঙ্গীকার, ফিলিস্তিনের ন্যায্য অধিকারের প্রতি অবিচল সমর্থন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুফল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের বৈশ্বিক নীতিমালার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

ভাষণের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো–

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

মাননীয় সভাপতি,

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় আমরা আপনাকে পূর্ণ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। একই সঙ্গে আমি বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম আনালেনা বায়েরবককেও তার সুযোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

শুরুতেই আমি বাংলাদেশের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানকে বিনম্রচিত্তে স্মরণ করছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে সকল শহীদ এবং আহতদের প্রতিও আমি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জানাই।

ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে বাংলাদেশ বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত। এই বাংলাদেশে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। আমি দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।

মাননীয় সভাপতি,

জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।

বিশ্বায়নের এই সময়ে বিশ্বের যে প্রান্তেই যা কিছু ঘটুক, প্রতিটি রাষ্ট্রেই কমবেশি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানবসৃষ্ট বিরাজমান সংঘাতের ফলে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ছে। তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা-সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির ফলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই হওয়া উচিত দ্বিপক্ষীয় কিংবা বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি। আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় বিশ্ব, এমন একটি মানবিক বিশ্বসমাজ, যেখানে মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা। একে অপরের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির অন্তরায়। শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্বমানবতা এবং বিশ্বশান্তির প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন আমি আজ আবারও পুনর্ব্যক্ত করছি। স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মনে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ পুনরায় তার অবিচল সমর্থন জানাচ্ছে।

মাননীয় সভাপতি,

চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনর্গঠন ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ’ (রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: আ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভার্স ফর অল) অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল। শান্তিনির্মাণ কমিশনের (পিসবিল্ডিং কমিশন) ভাইস চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকারবিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে।

অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশেই অভিবাসীরা তাদের জন্মভূমি এবং অভিবাসিত দেশ উভয় প্রান্তের অর্থনীতিতেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ সরকার নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা আশা করে।

মাননীয় সভাপতি,

বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে আমাদের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান। এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে।

পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার আগপর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্যও আমি জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি আরও বড় মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

মাননীয় সভাপতি,

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও দেশকে জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায়, বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। সুতরাং, জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কপ-৩১ সম্মেলনে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ আশা করে।

বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার বহুমুখী কর্মসূচি জোরদার করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করেছে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। দেশকে বন্যা ও খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে।

বাংলাদেশে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি আন্তসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে।

মাননীয় সভাপতি,

দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে পুনরায় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ফ্যাসিবাদী শাসনে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন অর্থাৎ ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে এক অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। জনমিতিক লভ্যাংশের (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) সুযোগে বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে উৎপাদন কেন্দ্র (ম্যানুফ্যাকচারিং হাব) হিসেবে গড়ে তুলতে বিস্তারিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়। দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।

মাননীয় সভাপতি,

দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। ফলে দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারীশিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টির বিষয়টিকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে। নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারীদের জন্য সরকার নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ অবারিত করা হয়েছে।

শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়; যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছায়। সেই লক্ষ্য পূরণে ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবেই বিবেচনা করে। প্রতিটি খাতে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বয় করে একটি ‘সার্বজনীন কার্ড’ চালু করার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।

মাননীয় সভাপতি,

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’ (লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড) এই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষ মিল রয়েছে। সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর ও গ্রামের মধ্যকার উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে এবং একই সঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং খেলাধুলাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এবার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী ৫ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের হিস্যা বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি এবং ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলব্যাগ, পোশাক ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে। সরকার আশা করে, এর ফলে বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার এবং শিক্ষার মান বাড়বে।

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে প্রথমবারের মতো ক্রীড়াকে একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত জুন মাসে শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারা দেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

মাননীয় সভাপতি,

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই গড়ে তুলবে আগামীর বিশ্ব। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বায়োটেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, তবে এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।

আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। বিজ্ঞানের এই অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে, সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, সে ব্যাপারে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

মাননীয় সভাপতি,

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সকল দেশের ক্ষেত্রে এই উত্তরণ প্রক্রিয়াটিকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ অংশীদারত্বের মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারি। কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে এটি বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে—টিকে থাকতে হলে অবশ্যই একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা ও সংহতি অপরিহার্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসাসামগ্রী ও রোগনির্ণয়ের সরঞ্জামের সহজলভ্যতা এবং টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

মাননীয় সভাপতি,

রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমূলক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান এবং মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হবে।

মাননীয় সভাপতি,

গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অনুকূল পরিবেশ বজায় রেখে বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা এগিয়ে চলেছে। সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশবান্ধব একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারত্ব, উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং সর্বোপরি জনগণ পাবে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি—‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সকল নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি আবারও বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

মাননীয় সভাপতি, আপনাকে ধন্যবাদ।

আল্লাহ হাফেজ।

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

বিষয়: জাতিসংঘ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

কালের আলো/এমএসআইপি 

 

প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে প্রহসনের নজির স্থাপন করেছে সরকার: নাহিদ ইসলাম

কালের আলো ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:০৬ অপরাহ্ণ
প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে প্রহসনের নজির স্থাপন করেছে সরকার: নাহিদ ইসলাম

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে সরকার চূড়ান্ত প্রহসনের নজির স্থাপন করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

পোস্টে নাহিদ ইসলাম লেখেন, শিক্ষিত বেকারদের সবশেষ আশ্রয়স্থল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগেও চূড়ান্ত প্রহসনের নজির স্থাপন করেছে তারেক রহমানের সরকার। গোয়েন্দা সংস্থার ভেরিফিকেশনের নামে নিয়োগপ্রাপ্ত অন্তত এক হাজার মেধাবী তরুণের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে। লিখিত ও অন্যান্য ধাপের পরীক্ষায় মেধার প্রমাণ দেওয়ার পরও তাদের নিয়ে দীর্ঘ আট মাস ধরে চলেছে ভেরিফিকেশনের নামে এক অনিশ্চয়তা ও হয়রানির প্রক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত এসব তরুণদের নিয়োগপত্র না দিয়ে গভীর হতাশার মধ্যে ঠেলে দেয়া হয়েছে।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ লেখেন, আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বাদ পড়াদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে থানায় কোনো ফৌজদারি মামলা বা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তথ্য নেই। তাদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া যায়নি। এরপরও কোনো স্বচ্ছ, সুস্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে তাদের নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তিনি আরও লেখেন, মেধা, যোগ্যতা ও পরীক্ষার সব ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করার পরও যদি কোনো নাগরিককে অস্বচ্ছ ভেরিফিকেশনের ভিত্তিতে চাকরি থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট তরুণদের প্রতি অবিচার নয়, বরং রাষ্ট্রের নিয়োগব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

পোস্টের শেষে তিনি লেখেন, আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি জানাচ্ছি, যাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ও আইনসম্মত অভিযোগ নেই, এমন প্রত্যেক নিরপরাধ প্রার্থীর নিয়োগ অবিলম্বে নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া ও ভেরিফিকেশনের মানদণ্ড জনসমক্ষে স্পষ্ট করতে হবে।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ