আর্ন প্রকল্পের সার্ভিস প্রোভাইডার নিয়োগের ক্রয় প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ইকোনমিক অ্যাকসিলারেশন অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ফর নিট (EARN) প্রকল্পের ১০টি প্যাকেজের আওতায় আট বিভাগে সার্ভিস প্রোভাইডার নিয়োগের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
বুধবার (২৪ জুন) মন্ত্রিপরিষদের সভাকক্ষে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ১০ প্যাকেজের সবগুলোর ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সূত্র এ খবর নিশ্চিত করেছে।
এতে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে যুবক ও যুব নারীদের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণে নেই- ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী এমন নয় লাখ যুবকে (যাদের মধ্যে ৬০ শতাংশই যুব নারী) প্রশিক্ষিণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তোলার লক্ষ্যে গৃহীত আর্ন প্রকল্প সেই অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে একটি অন্যতম প্রধান উদ্যোগ। শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণে না থাকা এই জনগোষ্ঠীকে বলা হচ্ছে নিট (Not in Education, Employment or Training) । প্রকল্পটি বাংলাদেশের সৃজনশীল শিল্প ও ক্রীড়া শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়তা করবে, যা দেশের যুবসমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত।
প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, আর্ন প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ সহায়তায় পরিচালিত একটি উন্নয়ন প্রকল্প, যার লক্ষ্য বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলের যুবদের, অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে এই ধরণের নিষ্ক্রিয় যুব জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৈশ্বিক গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ এবং এই হার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এই নিষ্ক্রিয় যুব সমাজ একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত। ক্রমবর্ধমান নিষ্ক্রিয় যুব সমাজকে কর্মমুখী করা ও এদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত প্রথম ও একমাত্র প্রকল্প হলো আর্ন।
বিশ্বব্যাংকের ক্রয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮ বিভাগের প্রকল্প এলাকাকে ১০টি প্যাকেজে বিভক্ত করে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক (Quality and Cost Based Selection-QCBS) দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। মোট ৪০১টি প্রতিষ্ঠান (Single Entity and Joint Venture) Expression of Interest (EoI) দাখিল করেছিল। যার মধ্যে ৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়। সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্তদের মধ্যে ৬৯টি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব (RFP) দাখিল করে। দাখিলকৃত প্রস্তাবসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন গ্রহণ করে প্রতিটি প্যাকেজের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবের চুড়ান্ত মুল্যায়ন করা হয় এবং সর্বাধিক সমন্বিত নম্বরপ্রাপ্ত এনজিও’র সাথে সমঝোতাপূর্বক খসড়া চুক্তি করা হয়। ক্রয় প্রস্তাবগুলোর প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের অনাপত্তি গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশকৃত এবং বিশ্বব্যাংকের অনাপত্তিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো ব্র্যাক , সেভ দ্যি চিলড্রেন, কেয়ার বাংলাদেশ এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশন। ব্র্যাক কাজ করবে ঢাকা ও রংপুর বিভাগে। সেভ দ্য চিলড্রেন বরিশাল এবং কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলায়, কেয়ার বাংলাদেশ তিন পার্বত্য জেলা এবং খুলনা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে এবং ঢাকা আহছানিয়া মিশন কুমিল্লা, ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়া, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলা এবং সিলেট বিভাগে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চারদের নিয়ে ২০২৮ সালের মধ্যে ৬৪ জেলার ২৫০ উপজেলার গ্রাম পর্যায়ে পাঁচ হাজার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করবে। সেসব কেন্দ্রের মাধ্যমে আট লাখ যুবক ও যুব নারীকে বর্তমান সময়ের চাহিদাভিত্তিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথ দেখাবে, যা দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তোরণের প্রক্রিয়াকে কার্যকরভাবে সহায়তা করবে।
EARN প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী মোখলেছুর রহমান জানান, এই প্রকল্প কোনো সাধারণ ‘প্রশিক্ষণ/দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্প নয় বরং বিভিন্ন আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে যুবক ও যুব নারীদের কর্মসংস্থান সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই এই প্রকল্পের অন্যতম কার্যক্রম। এটি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্প, যার লক্ষ্য বাংলাদেশি যুবদের জন্য সমন্বিত (Holistic) সহায়তা নিশ্চিত করা। প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের যুব কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও ভবিষ্যতমুখী খাতসমূহ বিকাশের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
EARN প্রকল্পের মূল লক্ষ্য শুধু প্রশিক্ষণ নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সুনিশ্চিত করা। প্রকল্পটি সেইসব যুবক ও যুব নারীর জন্য কাজ করবে, যারা সাধারণত আনুষ্ঠানিক সহায়তা পায় না। কারণ অধিকাংশ সরকারি ও বেসরকারি দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ যুব সমাজ এই সকল প্রশিক্ষণের সুবিধা লাভে বঞ্চিত হয়। বাংলাদেশে এটি প্রথম পূর্ণাঙ্গ যুব সহায়তা প্রকল্প, যা যুবকদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার জন্য সমন্বিত সহায়তা প্রদান করবে। এ প্রকল্পটি শুধু প্রশিক্ষণ প্রদান নয় বরং যুবকদের প্রকৃত প্রয়োজন এবং আঞ্চলিক, জাতীয় ও বৈশ্বিক শ্রম বাজারের চাহিদা নিরূপণ করে সেই অনুযায়ী সহায়তা করবে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অনেক যুব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণের পরও অবস্থানগত সীমাবদ্ধতা, সিড ফান্ডের অভাব, ইন্টার্নশিপ ও অন্যান্য সহায়তার অভাবে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হতে পারে না। এই প্রকল্প সেই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে কাজ করবে।
চারটি কম্পোনেন্টে সম্পাদন হবে EARN প্রকল্পের কাজ। কম্পোনেন্ট ১: বিকল্প শিক্ষা ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা। কম্পোনেন্ট ২: স্ব-কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা প্রদান। কম্পোনেন্ট ৩: গ্রামীণ পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় যুবদের বিশেষ করে যুব নারীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং কম্পোনেন্ট ৪: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
এই প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের মান উপযোগী করা হবে, আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করা হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে যথাযথ সনদ প্রদান নিশ্চিত করা হবে।
কালের আলো/এসএকে


আপনার মতামত লিখুন
Array