নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার রাইগাঁ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও রাইগাঁ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আরিফুর রহমান। পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও তিনি পরিচিত একজন বৃক্ষপ্রেমী মানুষ হিসেবে। পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে ছাত্রজীবনেই গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, তা এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। নিজের বেতনের একটি অংশ ব্যয় করে গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ করছেন তিনি। এ পর্যন্ত দেশের ৩০টি জেলায় প্রায় ৬৫ হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণ করেছেন বলে জানিয়েছেন এই অধ্যক্ষ।
গাছ লাগানোকে কেবল ব্যক্তিগত শখের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি আরিফুর রহমান। রাস্তার দুই পাশে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগিয়ে সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন তিনি। তাঁর উদ্যোগে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় তৈরি হয়েছে তালগাছের সারি, ফুলের বাগান ও সবুজে ঘেরা নানা স্থান। এসব উদ্যোগ স্থানীয় পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পথচারী, কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য ছায়া ও উপকার বয়ে আনছে। নওগাঁর বদলগাছী-পত্নীতলা আঞ্চলিক সড়কের সাতপ্রাম থেকে ডাবরকুড়ি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে সারি সারি তালগাছ চোখে পড়ে। প্রায় তিন দশক আগে রোপণ করা এসব গাছ এখন বেড়ে উঠে সড়কটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এলাকাটি ‘তালপার্ক’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে।
সড়কটির দুই পাশে তালগাছ লাগানোর পেছনে রয়েছে অধ্যক্ষ আরিফুর রহমানের উদ্যোগ। ছাত্রজীবনে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি তালবীজ রোপণ করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই বীজ থেকে জন্ম নেওয়া গাছগুলো বড় হয়েছে। এখন সড়কের পাশ দিয়ে চলাচলকারী মানুষ যেমন সবুজের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তেমনি মাঠে কাজ করা কৃষকেরাও গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে পারেন। ডাবরকুড়ি গ্রামের বাসিন্দা বয়োজ্যেষ্ঠ লুৎফর রহমান জানান, প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগে বদলগাছী-পত্নীতলা আঞ্চলিক সড়কটি প্রশস্ত করার সময় মাটি ফেলা হয়েছিল। সে সময় আরিফুর রহমান তাঁর কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে সড়কের দুই পাশে তালবীজ রোপণ করেন। সেই উদ্যোগের ফল এখন সড়কজুড়ে দৃশ্যমান। লুৎফর রহমানের ভাষ্য, তালগাছগুলো এলাকার সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের বিশ্রামের জায়গা হিসেবে কাজে আসছে। ঝড়-বৃষ্টির সময়ও মানুষ এসব গাছের নিচে আশ্রয় নেয়।
অধ্যক্ষ আরিফুর রহমানের বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের পেছনে রয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমানোর চিন্তা। বিশেষ করে বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে মানুষকে সুরক্ষার প্রত্যাশা নিয়ে তিনি তালগাছের চারা রোপণ শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে তাঁর এই উদ্যোগে যুক্ত হয় বিভিন্ন প্রজাতির ফুল, ফল ও বনজ গাছ। তবে তালগাছ রোপণের পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতনতা, নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ এবং আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কতা অনুসরণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানোর পাশাপাশি দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আরিফুর রহমান শুধু নিজের উদ্যোগে গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন না; শিক্ষার্থী ও ইউনিয়ন পরিষদে সেবা নিতে আসা মানুষের মধ্যেও গাছের চারা বিতরণ করেন। কোথাও ঘুরতে গেলেও সঙ্গে গাছের চারা রাখেন। তাঁর এই অভ্যাসের কারণে অনেকের কাছে তিনি ‘সবুজের ফেরিওয়ালা’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন।
তালগাছের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, পলাশ, শিমুলসহ নানা প্রজাতির ফুল ও ফলের গাছ রোপণ করেছেন আরিফুর রহমান। এসব গাছের সমারোহে গড়ে ওঠা একটি স্থান ‘কৃষ্ণচূড়া ভ্যালি’ নামে পরিচিত। এ ছাড়া সান্তাহার রেলস্টেশন, নওগাঁর হাঁসাইগাড়ি বিল, পত্নীতলা উপজেলার নদীর পশ্চিম পাশ এবং সিলিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃক্ষরোপণ ও বনায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন স্থানে কৃষ্ণচূড়া চত্বর গড়ে তোলার মাধ্যমেও সবুজ পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন।
ফুলের গাছের সৌন্দর্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পাশাপাশি ফলজ ও বনজ গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রাকৃতিক সম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব বিবেচনায় বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করছেন এই বৃক্ষপ্রেমী। মহাদেবপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিজ উদ্যোগে গাছের চারা বিতরণ ও রোপণ করে আসছেন আরিফুর রহমান। তাঁর লক্ষ্য, গাছ লাগানোর কাজকে একটি নির্দিষ্ট এলাকা বা ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া।
প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে রোপণ করা গাছের পরিচর্যাও করেন তিনি। কারণ, শুধু চারা লাগালেই বনায়নের কাজ শেষ হয় না; গাছের বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে নিয়মিত পরিচর্যা প্রয়োজন। এ কারণে চারা রোপণের পাশাপাশি গাছের যত্ন নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের হাতে গাছের চারা তুলে দেওয়ার মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বৃক্ষরোপণ স্থানীয় মানুষকে পরিবেশ সংরক্ষণে যুক্ত করতে পারে। আরিফুর রহমানের উদ্যোগে এসব কার্যক্রমের সমন্বয় ঘটেছে। মাতাজি হাটের বাসিন্দা খালিদ হাসান বাবু বলেন, সড়কের দুই পাশে থাকা তালগাছ শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায়নি; ফল ও ছায়া দিয়েও স্থানীয়দের উপকার করছে। তাল মৌসুমে এসব গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও তাল খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। গাছের বিভিন্ন অংশ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করেন স্থানীয়রা।
তাঁর মতে, তালগাছের পাশাপাশি অধ্যক্ষ আরিফুর রহমান বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছ রোপণ করেছেন। পরিবেশ রক্ষায় তাঁর এই উদ্যোগ মহাদেবপুর ছাড়িয়ে বিভিন্ন মানুষের প্রশংসা পাচ্ছে। গাছের ছায়া, ফল এবং অন্যান্য ব্যবহারিক সুবিধা স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। দীর্ঘদিন ধরে বেড়ে ওঠা গাছগুলো একদিকে যেমন প্রাকৃতিক পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কও দৃঢ় করে। নিজের উদ্যোগ সম্পর্কে অধ্যক্ষ আরিফুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য সবুজ পৃথিবী রেখে যাওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য। এ পর্যন্ত রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকাসহ দেশের ৩০টি জেলায় ৬৫ হাজার গাছের চারা রোপণ করেছেন বলে জানান তিনি।

আরিফুর রহমানের স্বপ্ন, দেশের প্রতিটি জেলায় বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে প্রকৃতিকে সবুজে ভরিয়ে তোলা। তাঁর প্রত্যাশা, মানুষ গাছ লাগানোর পাশাপাশি গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণেও এগিয়ে আসবে। কারণ, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়; এটি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিষয়। ছাত্রজীবনে বন্ধুদের নিয়ে শুরু করা বৃক্ষরোপণ আজ তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর পরিবেশ সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। নওগাঁর সড়কের পাশে তালগাছের সারি কিংবা বিভিন্ন স্থানে ফুলের গাছের সমারোহ—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে প্রকৃতিকে ভালোবাসার বার্তা। অধ্যক্ষ আরিফুর রহমানের এই উদ্যোগ অন্যদেরও গাছ লাগাতে এবং সবুজ পরিবেশ গড়ে তুলতে উৎসাহিত করতে পারে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]