খুঁজুন
                               
, ,
           

‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ: জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ জ্বালানি খাতের বেসরকারিকরণ: জামায়াত

পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগকে ‘লুটপাটের নতুন লাইসেন্স’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে প্রতিযোগিতা তৈরির নামে শেষ পর্যন্ত কয়েকটি প্রভাবশালী বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে জ্বালানি তেলের বাজার তুলে দেওয়া হতে পারে। এতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শনিবার (৮ আগস্ট)  বিকেলে রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সরকারের নতুন জ্বালানি নীতিমালা প্রণয়নের পদক্ষেপ’ নিয়ে দলটির বক্তব্য ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

তিনি বলেন, জ্বালানি খাত সংস্কারের পরিবর্তে এর নিয়ন্ত্রণ বেসরকারি গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর খরচ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ খসড়া নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বিপিসি চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার চার দিনের মধ্যে এ খসড়া তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।’

বেসরকারি খাতকে জ্বালানি তেল আমদানির সুযোগ দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দাম কমবে—সরকারের এমন যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি তেলের ব্যবসায় গভীর সমুদ্রবন্দর, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং, বড় ট্যাংক টার্মিনাল, পাইপলাইন এবং বিপুল ব্যাংকিং সক্ষমতা প্রয়োজন। ফলে বাস্তবে হাতেগোনা কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষেই এ বাজারে প্রবেশ করা সম্ভব। এতে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ভেঙে বেসরকারি একচেটিয়া তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসিকে অদক্ষ ও লোকসানি দেখিয়ে বেসরকারিকরণের যুক্তিও প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। গোলাম পরওয়ারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিপিসি ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এর আগে ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি যথাক্রমে ১ হাজার ৯৮৩ কোটি ও ৭ হাজার ৮৭ কোটি টাকা লোকসান করেছিল।

জামায়াতের দাবি, বর্তমান জ্বালানি সংকট বিপিসির ব্যবস্থাপনাগত ব্যর্থতার কারণে নয়; বরং এটি বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক সংকটের ফল। গোলাম পরওয়ার বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও দেশের ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে দাম না বাড়ানোর কারণে বিপিসি প্রতিদিন প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সরকার তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণ কমে গিয়ে দরদাতা সংকট, বেশি দামে জ্বালানি তেল কেনা এবং সিন্ডিকেটের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দ্রুততা আর স্বচ্ছতা পরস্পরবিরোধী নয়। কিন্তু এখানে দ্রুততার নামে স্বচ্ছতাই বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি তেলের বাজার কয়েকটি গোষ্ঠীর হাতে চলে গেলে প্রতি লিটারে সামান্য বাড়তি মুনাফাও বছরে হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আয়ে পরিণত হতে পারে।

জ্বালানি তেলকে সাধারণ পণ্য নয়, বরং কৃষি, বিদ্যুৎ, পরিবহন, বিমান চলাচল ও জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। বাংলাদেশে একটি মাত্র শোধনাগার—ইস্টার্ন রিফাইনারি—এবং সীমিত মজুত সক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, যুদ্ধ বা দুর্যোগের সময় বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্র কীভাবে জ্বালানি সরবরাহের বিষয়ে নির্দেশ দেবে।

অলাভজনক ও দুর্গম এলাকায় জ্বালানি সরবরাহের দায়িত্ব বেসরকারি কোম্পানিগুলো নেবে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের আইনি সুরক্ষা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি দাবি করেন, শ্রম আইনের ১৮৭ ধারা জ্বালানি খাতের শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের ক্ষেত্রে রহিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

এটি শুধু বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্য নয় দাবি করে গোলাম পরওয়ার সংবাদ সম্মেলনে সিপিডি, ক্যাব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেন। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, জ্বালানি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হওয়ায় এটিকে মুনাফার খাত না করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে সীমিত মুনাফায় পরিচালনা করাই জনস্বার্থসম্মত।

ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম জ্বালানিকে মুনাফার পরিবর্তে সেবাখাত হিসেবে বিবেচনার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে গোলাম পরওয়ার বলেন, জ্বালানি খাত বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে এলপিজি খাতের মতো সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে।

জামায়াতের দাবি, গত ২ আগস্ট বাঙ্কারিং নীতিমালায় পরিবর্তন এনে মেরিন ফুয়েল আমদানিতে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিতের দাবি জানিয়েছে জামায়াত। একই সঙ্গে খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করে অন্তত ৬০ দিনের জনমত গ্রহণ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানির দাবি জানিয়েছে দলটি। বেসরকারিকরণের পরিবর্তে বিপিসির সংস্কারেরও দাবি করা হয়েছে।

দলটির দাবির মধ্যে আরও রয়েছে বিপিসির স্বাধীন নিরীক্ষা, পরিচালনা পর্ষদে পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ, জ্বালানি তেল ক্রয়ে ই-জিপি বাধ্যতামূলক করা এবং প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণ প্রকাশ করা। পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়েছে। জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা খর্বের সব সুপারিশ প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছে জামায়াত।

গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াত বাজার অর্থনীতি বা বেসরকারি বিনিয়োগের বিরোধী নয়। তাদের বিরোধিতা জবাবদিহিহীন হস্তান্তরের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘প্রতিযোগিতা মানে একচেটিয়া হাতবদল নয়। সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠান মেরামত, প্রতিষ্ঠান বিক্রি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়।’

সংবাদ সম্মেলনে পাবনা-১ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

আমি কিছুই জানি না, দল থেকেও বলা হয়নি: মির্জা ফখরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ অপরাহ্ণ
আমি কিছুই জানি না, দল থেকেও বলা হয়নি: মির্জা ফখরুল

বিএনপি নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বেছে নিচ্ছে- এমন খবর গণমাধ্যমে চাউর হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নিজে কিছু জানেন না বলে গণমাধ্যমকে বলেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

রোববার (৯ আগস্ট) রাতে গণমাধ্যমে তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়ে খবর প্রকাশের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মির্জা ফখরুল একথা বলেন।

বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মির্জা ফখরুল দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন বলে সন্ধ্যার দিকে খবর প্রকাশিত হয়। আগামী ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে দুপুরে বিএনপির পক্ষ থেকে দুটি মনোনয়ন সংগ্রহের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে।

খবরটি এমন সময় ছড়িয়েছে যখন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য চট্টগ্রাম সফরে।

এ বিষয়ে জানত চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এই বিষয়ে কিছু জানি না। দলের পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি।’

এর আগে রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে রাষ্ট্রপতি দুটি মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছে বিএনপি। নির্বাচন কমিশন থেকে একটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। আরেকটি সংগ্রহ করেছেন বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ও সরকার দলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।

এখন দলের পক্ষ থেকে যাকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করা হবে, তার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে। বিএনপি ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষমতা দলীয় প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দিয়েছে।

এদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যও কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীরবিক্রমকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছে। ফলে ১৯৯১ সালের পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদিও বিএনপির বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের মনোনীত রাষ্ট্রপতিই বঙ্গভবনে যাওয়ার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত।

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২০ আগস্ট। বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।

গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস

এ এইচ এম ফারুক:
প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৬ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস

প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালিত হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি বিশ্বের প্রান্তিক ও নিপীড়িত নৃগোষ্ঠীগুলোর অধিকার রক্ষার বার্তা নিয়ে এলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ বা Indigenous শব্দটির ব্যবহার কেবল একটি শব্দগত বা সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এক গভীর ঐতিহাসিক, নৃবিজ্ঞানিক এবং সার্বভৌম ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে তৎপরতা গত কয়েক দশকে দেখা যাচ্ছে, তা ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাঁচে দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডের জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার শামিল। ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও নৃবিজ্ঞানের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, বাংলাদেশের একমাত্র ভূমিপুত্র বা প্রাক-ঔপনিবেশিক আদি বাসিন্দা হলো মূল স্রোতধারা বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষ অনার্য প্রাকৃতজন।

এক. ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালির প্রাচীনত্ব ও ভূমিপুত্র পরিচয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমান্তে ‘ভূমিপুত্র’ বা ‘আদিবাসী’ কারা, তা নির্ধারণে প্রাচীন ইতিহাস ও নৃবিজ্ঞানের সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য। ঐতিহাসিক বিচারে এ ভূখণ্ডের অবিনশ্বর পলিমাটিতে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সভ্যতার কারিগর ছিল এ দেশের অনার্য প্রাকৃত জনগোষ্ঠী, যারা কালক্রমে বাঙালি জাতি হিসেবে রূপ লাভ করেছে।

পণ্ডিতজনদের বয়ান
মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রাসাদ শাস্ত্রী তাঁর অপ্রকাশিত নিবন্ধ ‘Bengal, Bengali’s, Their manners, customs and Literature’—এ প্রাচীন বাংলার সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, যখন আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে পাঞ্জাবে এসে পৌঁছায়, তখনও বাংলা এক উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতার অধিকারী ছিল। আর্যরা এলাহাবাদ পর্যন্ত বসতি বিস্তার করে বাংলার সমৃদ্ধি ও সভ্যতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বাঙালিদের ‘ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী’ বলে বর্ণনা করেছিল।

ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙালার ইতিহাস’ গ্রন্থে হরপ্রাসাদ শাস্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, বুদ্ধদেবের জন্মের বহু পূর্বেই বাঙালিরা জলে ও স্থলে এতটাই পরাক্রান্ত ছিল যে, বঙ্গরাজের ত্যাজ্যপুত্র বিজয় সিংহ সাত শত সঙ্গী নিয়ে নৌপথে লঙ্কাদ্বীপ জয় করেন এবং তাঁর নামানুসারেই সেই দ্বীপের নাম হয় ‘সিংহল’। প্রাচীনকালে লোহা ব্যবহারের পূর্বেও বাঙালিরা বেতে বাঁধা ‘বালাম নৌকায়’ করে নানা দেশে ধান-চাল বিক্রি করতে যেত এবং সেখান থেকেই ‘বালাম চাল’ নামের উৎপত্তি। তাম্রলিপ্ত ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বন্দর।

খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে বঙ্গদেশ থেকে ‘লাক-লোঙ’ নামক এক বীর সমুদ্রপথে আনাম (বর্তমান ভিয়েতনাম) গমন করে স্থানীয় রাজাকে পরাজিত করে ‘বন-লাঙ’ নামক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পন্ডিত জেরিনির মতো প্রখ্যাত গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, আনামের এই ‘বন’ বা ‘বঙ’ জাতি মূলত বঙ্গদেশ থেকেই গিয়েছিল এবং তারা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত সেখানে রাজত্ব করে।

প্রাচীন বঙ্গ সভ্যতা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও অনার্য শিকড়
রামায়ণে উল্লেখিত মহাবালী রাজাকে ইতিহাসবিদরা প্রাচীন বাংলার পরাক্রমশালী শাসক হিসেবে শনাক্ত করেছেন। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স প্রায় ২০ হাজার বছর। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত কাঠের দুটি নৌকার আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর এবং পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। ১৮৮৬ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রাপ্ত অশ্মীভূত কাঠের তৈরি নব্যপ্রস্তর যুগের অস্ত্র প্রমাণ করে, বহু হাজার বছর পূর্বেই এ অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল।

ড. রশীদ ও সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতগণের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী শিলালিপির বহু পূর্ব থেকেই এখানে সুসংগঠিত জনপদ ছিল। বৈদিক সাহিত্যের ঐতরেয় আরণ্যক ও ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ (Aitareya Brahmana 7.6) উল্লিখিত অনার্য ‘পুণ্ড্র’ গোত্র থেকেই বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড় বা পুণ্ড্রনগরের নামকরণ হয়েছে।

প্রাচীন ভূগোলে বাংলার ব্যাপ্তি ও সংমিশ্রণ
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রমেশ চন্দ্র মজুমদার তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রাচীন হিন্দু যুগে সমগ্র বাংলা কোনো একক নামে পরিচিত ছিল না; বরং বরেন্দ্র, তাম্রলিপ্ত, সমতট, হরিকেল, বঙ্গ ও বঙ্গাল প্রভৃতি খণ্ডে বিভক্ত ছিল। হেমচন্দ্রের ‘অভিধান চিন্তামণি’ গ্রন্থ অনুসারে ‘বঙ্গ’ ও ‘হরিকেল’ ছিল একার্থবোধক। বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত প্রাচীন হরিকেল ও বঙ্গ রাজ্যেরই অবিচ্ছেদ্য ভৌগোলিক অংশ ছিল।
রমেশ চন্দ্র মজুমদার ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট করেছেন যে, আর্যদের আগমনের বহু পূর্বেই অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক (যাদের বৈদিক গ্রন্থে ‘নিষাদ জাতি’ বলা হয়েছে) এবং আলপাইন জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে বাঙালি জাতির উদ্ভব ঘটেছিল। বিজ্ঞানী প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের নৃতাত্ত্বিক পরিমাপও নিশ্চিত করে যে, বাঙালি ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট জাতি।

গঙ্গরিডই জাতির শৌর্যবীর্য
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে মেসিডোনিয়ার আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন ব্যাসাস, ডিওডোরাস ও প্লিনির মতো গ্রীক ঐতিহাসিকরা গঙ্গা অববাহিকার পরাক্রমশালী ‘গঙ্গরিডই’ (Gangaridai) জাতির উল্লেখ করেন। গ্রীক লেখকদের বিবরণ অনুযায়ী, গঙ্গরিডইদের চার হাজার সুসজ্জিত রণহস্তী ও অপরাজেয় সামরিক শক্তির কথা শুনেই আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী অগ্রসর হওয়ার সাহস হারায়। নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, এই শক্তিশালী সামরিক কাঠামোর অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে প্রাচীন বাংলায় সুবিন্যস্ত রাজ্য ও নাগরিক সভ্যতা বিদ্যমান ছিল। অতএব, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-প্রমাণ একবাক্যে নিশ্চিত করে যে, প্রাচীন বঙ্গভূমির অনার্য প্রাকৃতজন—যারা পরবর্তীকালে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে আজকের বাঙালি জাতি হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে—তারা এবং কেবল তারাই এই ভূখণ্ডের প্রাক-ঔপনিবেশিক মূল অধিবাসী বা ভূমিপুত্র।

দুই. পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস
পার্বত্য চট্টগ্রাম হলো বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা। ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা বর্তমানের ৩ টি জেলার কোনোটিউ ছিল না। বৃটিশ প্রশাসন তাদের শাসনের সুবিধার্থে ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়ি এলাকার বৃহদ অংশটি ভাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামটি সৃষ্টি করে। বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খিয়াং প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হলেও, ঐতিহাসিকভাবে তারা এই ভূখণ্ডের প্রাক-ঔপনিবেশিক আদি বাসিন্দা নয়।

নৃতাত্ত্বিক গঠন ও আদি উৎস
নৃতাত্ত্বিক বিচারে সমতলের বাঙালিদের সাথে পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলোর দৈহিক গঠনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, তারা মঙ্গোলীয় মহাজাতির তিব্বতি-বর্মি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী স্যার হার্বার্ট রিজলি তাঁর গবেষণায় এদের আদি বসতি হিসেবে দক্ষিণ চীন, তিব্বত, মায়ানমার সীমান্ত ও মঙ্গোলীয় মালভূমিকে চিহ্নিত করেছেন।

ঔপনিবেশিক দলিলের তথ্য
ব্রিটিশ আমলের প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিলসমূহ নিশ্চিত করে যে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়ন, গোত্রীয় সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে স্থানান্তরিত হয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। আর. এইচ. এস হাচিনসন (R. H. S. Hutchinson): ১৯০৬ সালে প্রকাশিত ‘Gazetteer of the Chittagong Hill Tracts’ গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে চাকমা ও মারমারা মায়ানমারের আরাকান এবং ত্রিপুরা রাজ্য থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে।

ক্যাপ্টেন জে. পি. লুইন (Captain J. P. Lewin): ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত ‘The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বেও পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলো যাযাবর জীবনযাপন করত (জুম চাষের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে) এবং নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের ওপর তাদের স্থায়ী বা একচ্ছত্র মালিকানা ছিল না। কাজেই, ঐতিহাসিক সত্য এটাই যে, তারা বিভিন্ন শতাব্দীতে বিশেষ করে ১৬ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পার্বত্য অঞ্চলে অভিবাসিত হয়েছিল।

তিন. আঞ্চলিক প্রেক্ষিত: ভারত ও মায়ানমারের নীতি
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার যতটা সহজভাবে দেখা হয়, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও কৌশলগত জাতীয় নীতি অনুসরণ করে। ভারতের স্বাধীনোত্তর অবস্থান ছিল—দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সকলেই এই মাটির সন্তান। কাউকে এককভাবে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে পরোক্ষভাবে ‘বহিরাগত’ বা ‘সেটলার’ বানানোর ঝুঁকি তৈরি হয়, যা রাষ্ট্রের অখণ্ডতার পরিপন্থী। অন্যদিকে মায়ানমার নিজস্ব ১৩৫টি গোত্রকে নিজস্ব জাতিসত্তা হিসেবে মেনে নিলেও ‘আদিবাসী’ পরিচয় বর্জন করেছে, কারণ তা রাষ্ট্রের ভেতরে পৃথক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়।

যে নৃগোষ্ঠীগুলো ভারত বা মায়ানমারে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত নয়, বাংলাদেশে এসে কয়েকশো বছর উপজাতি হিসেবে থেকে এখন আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থা ও বিশেষ কিছু এনজিও-র সহায়তায় তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা একটি দ্বিমুখী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

ভূ-রাজনৈতিক সংকট, আইএলও ১৬৯ ও জাতীয় নিরাপত্তা
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১১ শতাংশ (বা এক-দশমাংশ)। এই কৌশলগত ভৌগোলিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবিটি কেবল একটি নামীয় দাবি নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সুবিধা নেওয়ার এক কৌশল।

আইএলও কনভেনশন ১৬৯ ও অনুচ্ছেদ ৩০-এর ফাঁদ
২০০৭ সালের জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ (UNDRIP) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৬৯ নম্বর কনভেনশন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর ঝুঁকি প্রকাশ পায়। আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- কোনো ভূখণ্ডে কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে, তাদের প্রত্যক্ষ সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্র সেখানে কোনো সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা, সেনানিবাস স্থাপন বা নিরাপত্তা চৌকি রাখতে পারবে না। যদি বাংলাদেশ এই কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করে বা তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সার্বভৌম কর্তৃত্ব আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। রাষ্ট্র নিজের সীমান্ত রক্ষা বা পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাস দমন করতে আন্তর্জাতিক আদালতের বাধার মুখোমুখি হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ ‘ডেথ ট্র্যাপ’ বা মরণফাঁদ।

ভূমির মালিকানা, ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে ও রাজস্ব বঞ্চনা
সমতলের প্রতিটি ইঞ্চি জমি ভূমিসর্বস্ব জরিপ বা ক্যাডাস্ট্রাল রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে পূর্ণাঙ্গ ভূমি জরিপ সম্পন্ন হতে দেওয়া হয়নি। ইনকিলাব (২০১০) ও কালের কণ্ঠ (২০২৬)-এ প্রকাশিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, ভূমি জরিপ না থাকার কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং পাহাড়ে এক প্রকার প্রথাগত সামন্ততান্ত্রিক ভূমি দখলদারিত্ব টিকে রয়েছে।

দেশের ভূমি নীতি অনুযায়ী “সরকারের এক ইঞ্চি জমির রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই”। সমতলের ন্যায় পাহাড়েও অভিন্ন ভূমি আইন, আধুনিক জরিপ ও দালিলিক স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আদিবাসী দাবির আড়ালে মূলত ভূমি জরিপের বিরোধিতা করা হয়, যাতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও আইনি নিয়ন্ত্রণ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।

১৯৭১ সালে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে এবং পরবর্তী সংশোধনীতে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানে প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা রাষ্ট্র অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে।

তবে সাংস্কৃতিক সুরক্ষার নাম করে ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করার সুযোগ নেই। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতাত্ত্বিক দলিল প্রমাণ করে—বাংলাদেশের একমাত্র প্রাক-ঔপনিবেশিক মূল জনধারা হলো বাঙালি ও অনার্য প্রাকৃত সমাজ। পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ও পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক, কিন্তু তারা ঐতিহাসিকভাবে এই ভূমির ‘আদিবাসী’ নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে আগত অভিবাসী। ভারত ও মায়ানমার যে ঐতিহাসিক সত্য ও ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে ‘আদিবাসী’ তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে, সার্বভৌম বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থান বজায় রাখা জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১% ভূমিতে রাষ্ট্রের পূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখা, দ্রুত ভূমি জরিপ সম্পন্ন করা এবং সমগ্র দেশে অভিন্ন আইনি কাঠামো বজায় রাখাই স্বাধীন বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার একমাত্র পথ।

তথ্যসূত্র:
১. Gazetteer of the Chittagong Hill Tracts (1906) – R. H. S. Hutchinson.
২. The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein (1869) – Captain J. P. Lewin.
৩. বাঙালার ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড) – রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (পৃষ্ঠা: ১৯-২১)।
৪. Origin and Development of the Bengali Language (1926) – Suniti Kumar Chatterji.
৫. History of Bengal (Vol 1) – R. C. Majumdar.
৬. ‘একদশমাংশ ভূমির মালিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব থেকে’ (দৈনিক ইনকিলাব, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০)।
৭. ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির মালিকানা জটিলতা: জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি’ (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১ মে ২০২৬)।
৮. ভারতের সংবিধান (Scheduled Tribes সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ৩৪২)
৯. মায়ানমার নাগরিকত্ব আইন ১৯৮২।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।
ahmfarukcht@gmail.com

গুপ্তবাহিনী ১৯৯৬ সালে স্বৈরাচারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল : প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
গুপ্তবাহিনী ১৯৯৬ সালে স্বৈরাচারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখছি কিছু রাজনৈতিক দল বিশৃঙ্খলার চেষ্টা করছে। যেভাবে তারা স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। যেভাবে তারা ৮৬ সালে এই চট্টগ্রামের মাটিতে স্বৈরাচার বলেছিল, যারা নির্বাচনে যাবে তারা জাতীয় বেইমান হবে।


‎তিনি বলেন, কিন্তু সেই স্বৈরাচার ঢাকায় ফিরে গিয়ে আরেক স্বৈরাচারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল এবং তাদের সঙ্গে গুপ্ত বাহিনী জাতীয় বেইমান হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিল। এই গুপ্ত বাহিনীকে আমরা পরবর্তীতে দেখেছি, ৯৬ সালে দেশের মানুষের সঙ্গে গাদ্দারি করে স্বৈরাচারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। গণতন্ত্রের বিপক্ষে তারা অবস্থান নিয়েছিল।

‎রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে সহায়তা বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

‎তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছিল। কারণ মানুষ জানে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করে একমাত্র দল বিএনপি। আপনারা দেখেছেন শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সময় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছে, কীভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আপনারা আবারও আমাদের দেশ পরিচালনার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দল বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না।

‎প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেক দেশ আমাদের সঙ্গে স্বাধীন হয়ে অনেক এগিয়ে গেছে৷ কিন্তু আমরা বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়েও সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, দেশের উন্নয়নে কোনো বাধা মানবো না।

কালের আলো/এসএকে