খুঁজুন
                               
, ,
           

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস

এ এইচ এম ফারুক:
প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৪৬ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস

প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিকভাবে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস’ পালিত হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি বিশ্বের প্রান্তিক ও নিপীড়িত নৃগোষ্ঠীগুলোর অধিকার রক্ষার বার্তা নিয়ে এলেও, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘আদিবাসী’ বা Indigenous শব্দটির ব্যবহার কেবল একটি শব্দগত বা সাংস্কৃতিক বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এক গভীর ঐতিহাসিক, নৃবিজ্ঞানিক এবং সার্বভৌম ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করার যে তৎপরতা গত কয়েক দশকে দেখা যাচ্ছে, তা ঐতিহাসিক সত্যের অপলাপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের মারপ্যাঁচে দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ডের জাতীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলার শামিল। ঐতিহাসিক দলিল, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও নৃবিজ্ঞানের আলোকে বিচার করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে, বাংলাদেশের একমাত্র ভূমিপুত্র বা প্রাক-ঔপনিবেশিক আদি বাসিন্দা হলো মূল স্রোতধারা বাঙালি ও তাদের পূর্বপুরুষ অনার্য প্রাকৃতজন।

এক. ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বিচারে বাঙালির প্রাচীনত্ব ও ভূমিপুত্র পরিচয়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক সীমান্তে ‘ভূমিপুত্র’ বা ‘আদিবাসী’ কারা, তা নির্ধারণে প্রাচীন ইতিহাস ও নৃবিজ্ঞানের সাহায্য নেওয়া অপরিহার্য। ঐতিহাসিক বিচারে এ ভূখণ্ডের অবিনশ্বর পলিমাটিতে হাজার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা সভ্যতার কারিগর ছিল এ দেশের অনার্য প্রাকৃত জনগোষ্ঠী, যারা কালক্রমে বাঙালি জাতি হিসেবে রূপ লাভ করেছে।

পণ্ডিতজনদের বয়ান
মহামহোপাধ্যায় শ্রীযুক্ত হরপ্রাসাদ শাস্ত্রী তাঁর অপ্রকাশিত নিবন্ধ ‘Bengal, Bengali’s, Their manners, customs and Literature’—এ প্রাচীন বাংলার সভ্যতার গৌরবময় ইতিহাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, যখন আর্যরা মধ্য এশিয়া থেকে পাঞ্জাবে এসে পৌঁছায়, তখনও বাংলা এক উন্নত ও সমৃদ্ধ সভ্যতার অধিকারী ছিল। আর্যরা এলাহাবাদ পর্যন্ত বসতি বিস্তার করে বাংলার সমৃদ্ধি ও সভ্যতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বাঙালিদের ‘ধর্মজ্ঞানশূন্য পক্ষী’ বলে বর্ণনা করেছিল।

ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙালার ইতিহাস’ গ্রন্থে হরপ্রাসাদ শাস্ত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, বুদ্ধদেবের জন্মের বহু পূর্বেই বাঙালিরা জলে ও স্থলে এতটাই পরাক্রান্ত ছিল যে, বঙ্গরাজের ত্যাজ্যপুত্র বিজয় সিংহ সাত শত সঙ্গী নিয়ে নৌপথে লঙ্কাদ্বীপ জয় করেন এবং তাঁর নামানুসারেই সেই দ্বীপের নাম হয় ‘সিংহল’। প্রাচীনকালে লোহা ব্যবহারের পূর্বেও বাঙালিরা বেতে বাঁধা ‘বালাম নৌকায়’ করে নানা দেশে ধান-চাল বিক্রি করতে যেত এবং সেখান থেকেই ‘বালাম চাল’ নামের উৎপত্তি। তাম্রলিপ্ত ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান বন্দর।

খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে বঙ্গদেশ থেকে ‘লাক-লোঙ’ নামক এক বীর সমুদ্রপথে আনাম (বর্তমান ভিয়েতনাম) গমন করে স্থানীয় রাজাকে পরাজিত করে ‘বন-লাঙ’ নামক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। পন্ডিত জেরিনির মতো প্রখ্যাত গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে, আনামের এই ‘বন’ বা ‘বঙ’ জাতি মূলত বঙ্গদেশ থেকেই গিয়েছিল এবং তারা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতক পর্যন্ত সেখানে রাজত্ব করে।

প্রাচীন বঙ্গ সভ্যতা, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ও অনার্য শিকড়
রামায়ণে উল্লেখিত মহাবালী রাজাকে ইতিহাসবিদরা প্রাচীন বাংলার পরাক্রমশালী শাসক হিসেবে শনাক্ত করেছেন। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স প্রায় ২০ হাজার বছর। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত কাঠের দুটি নৌকার আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর এবং পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। ১৮৮৬ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে প্রাপ্ত অশ্মীভূত কাঠের তৈরি নব্যপ্রস্তর যুগের অস্ত্র প্রমাণ করে, বহু হাজার বছর পূর্বেই এ অঞ্চলে মানব বসতি গড়ে উঠেছিল।

ড. রশীদ ও সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতগণের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী শিলালিপির বহু পূর্ব থেকেই এখানে সুসংগঠিত জনপদ ছিল। বৈদিক সাহিত্যের ঐতরেয় আরণ্যক ও ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ (Aitareya Brahmana 7.6) উল্লিখিত অনার্য ‘পুণ্ড্র’ গোত্র থেকেই বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড় বা পুণ্ড্রনগরের নামকরণ হয়েছে।

প্রাচীন ভূগোলে বাংলার ব্যাপ্তি ও সংমিশ্রণ
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রমেশ চন্দ্র মজুমদার তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রাচীন হিন্দু যুগে সমগ্র বাংলা কোনো একক নামে পরিচিত ছিল না; বরং বরেন্দ্র, তাম্রলিপ্ত, সমতট, হরিকেল, বঙ্গ ও বঙ্গাল প্রভৃতি খণ্ডে বিভক্ত ছিল। হেমচন্দ্রের ‘অভিধান চিন্তামণি’ গ্রন্থ অনুসারে ‘বঙ্গ’ ও ‘হরিকেল’ ছিল একার্থবোধক। বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রাম মূলত প্রাচীন হরিকেল ও বঙ্গ রাজ্যেরই অবিচ্ছেদ্য ভৌগোলিক অংশ ছিল।
রমেশ চন্দ্র মজুমদার ও সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় স্পষ্ট করেছেন যে, আর্যদের আগমনের বহু পূর্বেই অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা অস্ট্রিক (যাদের বৈদিক গ্রন্থে ‘নিষাদ জাতি’ বলা হয়েছে) এবং আলপাইন জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে বাঙালি জাতির উদ্ভব ঘটেছিল। বিজ্ঞানী প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিশের নৃতাত্ত্বিক পরিমাপও নিশ্চিত করে যে, বাঙালি ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য গোষ্ঠী থেকে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও বিশিষ্ট জাতি।

গঙ্গরিডই জাতির শৌর্যবীর্য
খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে মেসিডোনিয়ার আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমণ করেন, তখন ব্যাসাস, ডিওডোরাস ও প্লিনির মতো গ্রীক ঐতিহাসিকরা গঙ্গা অববাহিকার পরাক্রমশালী ‘গঙ্গরিডই’ (Gangaridai) জাতির উল্লেখ করেন। গ্রীক লেখকদের বিবরণ অনুযায়ী, গঙ্গরিডইদের চার হাজার সুসজ্জিত রণহস্তী ও অপরাজেয় সামরিক শক্তির কথা শুনেই আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী অগ্রসর হওয়ার সাহস হারায়। নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, এই শক্তিশালী সামরিক কাঠামোর অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে প্রাচীন বাংলায় সুবিন্যস্ত রাজ্য ও নাগরিক সভ্যতা বিদ্যমান ছিল। অতএব, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য-প্রমাণ একবাক্যে নিশ্চিত করে যে, প্রাচীন বঙ্গভূমির অনার্য প্রাকৃতজন—যারা পরবর্তীকালে হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম ধর্মে রূপান্তরিত হয়ে আজকের বাঙালি জাতি হিসেবে বিকাশ লাভ করেছে—তারা এবং কেবল তারাই এই ভূখণ্ডের প্রাক-ঔপনিবেশিক মূল অধিবাসী বা ভূমিপুত্র।

দুই. পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অভিবাসনের ইতিহাস
পার্বত্য চট্টগ্রাম হলো বৃহত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা। ১৮৬০ সালের আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা বর্তমানের ৩ টি জেলার কোনোটিউ ছিল না। বৃটিশ প্রশাসন তাদের শাসনের সুবিধার্থে ১৮৬০ সালে চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়ি এলাকার বৃহদ অংশটি ভাগ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামটি সৃষ্টি করে। বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খিয়াং প্রভৃতি নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ হলেও, ঐতিহাসিকভাবে তারা এই ভূখণ্ডের প্রাক-ঔপনিবেশিক আদি বাসিন্দা নয়।

নৃতাত্ত্বিক গঠন ও আদি উৎস
নৃতাত্ত্বিক বিচারে সমতলের বাঙালিদের সাথে পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলোর দৈহিক গঠনে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, তারা মঙ্গোলীয় মহাজাতির তিব্বতি-বর্মি ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী স্যার হার্বার্ট রিজলি তাঁর গবেষণায় এদের আদি বসতি হিসেবে দক্ষিণ চীন, তিব্বত, মায়ানমার সীমান্ত ও মঙ্গোলীয় মালভূমিকে চিহ্নিত করেছেন।

ঔপনিবেশিক দলিলের তথ্য
ব্রিটিশ আমলের প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিলসমূহ নিশ্চিত করে যে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়ন, গোত্রীয় সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে স্থানান্তরিত হয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। আর. এইচ. এস হাচিনসন (R. H. S. Hutchinson): ১৯০৬ সালে প্রকাশিত ‘Gazetteer of the Chittagong Hill Tracts’ গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করেছেন কীভাবে চাকমা ও মারমারা মায়ানমারের আরাকান এবং ত্রিপুরা রাজ্য থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে বিতাড়িত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে।

ক্যাপ্টেন জে. পি. লুইন (Captain J. P. Lewin): ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত ‘The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বেও পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলো যাযাবর জীবনযাপন করত (জুম চাষের স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে) এবং নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের ওপর তাদের স্থায়ী বা একচ্ছত্র মালিকানা ছিল না। কাজেই, ঐতিহাসিক সত্য এটাই যে, তারা বিভিন্ন শতাব্দীতে বিশেষ করে ১৬ থেকে ১৮ শতকের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে পার্বত্য অঞ্চলে অভিবাসিত হয়েছিল।

তিন. আঞ্চলিক প্রেক্ষিত: ভারত ও মায়ানমারের নীতি
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘আদিবাসী’ শব্দটির ব্যবহার যতটা সহজভাবে দেখা হয়, আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও কৌশলগত জাতীয় নীতি অনুসরণ করে। ভারতের স্বাধীনোত্তর অবস্থান ছিল—দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী সকলেই এই মাটির সন্তান। কাউকে এককভাবে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দিলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে পরোক্ষভাবে ‘বহিরাগত’ বা ‘সেটলার’ বানানোর ঝুঁকি তৈরি হয়, যা রাষ্ট্রের অখণ্ডতার পরিপন্থী। অন্যদিকে মায়ানমার নিজস্ব ১৩৫টি গোত্রকে নিজস্ব জাতিসত্তা হিসেবে মেনে নিলেও ‘আদিবাসী’ পরিচয় বর্জন করেছে, কারণ তা রাষ্ট্রের ভেতরে পৃথক আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পথ খুলে দেয়।

যে নৃগোষ্ঠীগুলো ভারত বা মায়ানমারে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত নয়, বাংলাদেশে এসে কয়েকশো বছর উপজাতি হিসেবে থেকে এখন আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থা ও বিশেষ কিছু এনজিও-র সহায়তায় তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা একটি দ্বিমুখী ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

ভূ-রাজনৈতিক সংকট, আইএলও ১৬৯ ও জাতীয় নিরাপত্তা
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১১ শতাংশ (বা এক-দশমাংশ)। এই কৌশলগত ভৌগোলিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবিটি কেবল একটি নামীয় দাবি নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সুবিধা নেওয়ার এক কৌশল।

আইএলও কনভেনশন ১৬৯ ও অনুচ্ছেদ ৩০-এর ফাঁদ
২০০৭ সালের জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র’ (UNDRIP) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৬৯ নম্বর কনভেনশন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এর ঝুঁকি প্রকাশ পায়। আইএলও কনভেনশন ১৬৯-এর ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী- কোনো ভূখণ্ডে কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে, তাদের প্রত্যক্ষ সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্র সেখানে কোনো সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা, সেনানিবাস স্থাপন বা নিরাপত্তা চৌকি রাখতে পারবে না। যদি বাংলাদেশ এই কনভেনশনে অনুস্বাক্ষর করে বা তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর সার্বভৌম কর্তৃত্ব আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। রাষ্ট্র নিজের সীমান্ত রক্ষা বা পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র সন্ত্রাস দমন করতে আন্তর্জাতিক আদালতের বাধার মুখোমুখি হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ ‘ডেথ ট্র্যাপ’ বা মরণফাঁদ।

ভূমির মালিকানা, ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে ও রাজস্ব বঞ্চনা
সমতলের প্রতিটি ইঞ্চি জমি ভূমিসর্বস্ব জরিপ বা ক্যাডাস্ট্রাল রেকর্ডের অন্তর্ভুক্ত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে পূর্ণাঙ্গ ভূমি জরিপ সম্পন্ন হতে দেওয়া হয়নি। ইনকিলাব (২০১০) ও কালের কণ্ঠ (২০২৬)-এ প্রকাশিত বিভিন্ন অনুসন্ধানী নিবন্ধে দেখানো হয়েছে, ভূমি জরিপ না থাকার কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং পাহাড়ে এক প্রকার প্রথাগত সামন্ততান্ত্রিক ভূমি দখলদারিত্ব টিকে রয়েছে।

দেশের ভূমি নীতি অনুযায়ী “সরকারের এক ইঞ্চি জমির রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই”। সমতলের ন্যায় পাহাড়েও অভিন্ন ভূমি আইন, আধুনিক জরিপ ও দালিলিক স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। আদিবাসী দাবির আড়ালে মূলত ভূমি জরিপের বিরোধিতা করা হয়, যাতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও আইনি নিয়ন্ত্রণ সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে।

১৯৭১ সালে লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে এবং পরবর্তী সংশোধনীতে সকল নাগরিকের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। আমাদের সংবিধানে প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যা রাষ্ট্র অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে।

তবে সাংস্কৃতিক সুরক্ষার নাম করে ঐতিহাসিক সত্যকে বিকৃত করার সুযোগ নেই। ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতাত্ত্বিক দলিল প্রমাণ করে—বাংলাদেশের একমাত্র প্রাক-ঔপনিবেশিক মূল জনধারা হলো বাঙালি ও অনার্য প্রাকৃত সমাজ। পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ও পূর্ণ অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক, কিন্তু তারা ঐতিহাসিকভাবে এই ভূমির ‘আদিবাসী’ নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে আগত অভিবাসী। ভারত ও মায়ানমার যে ঐতিহাসিক সত্য ও ভূ-রাজনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে ‘আদিবাসী’ তত্ত্ব প্রত্যাখ্যান করেছে, সার্বভৌম বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেই একই অবস্থান বজায় রাখা জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১% ভূমিতে রাষ্ট্রের পূর্ণ প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখা, দ্রুত ভূমি জরিপ সম্পন্ন করা এবং সমগ্র দেশে অভিন্ন আইনি কাঠামো বজায় রাখাই স্বাধীন বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার একমাত্র পথ।

তথ্যসূত্র:
১. Gazetteer of the Chittagong Hill Tracts (1906) – R. H. S. Hutchinson.
২. The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein (1869) – Captain J. P. Lewin.
৩. বাঙালার ইতিহাস (দ্বিতীয় খণ্ড) – রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় (পৃষ্ঠা: ১৯-২১)।
৪. Origin and Development of the Bengali Language (1926) – Suniti Kumar Chatterji.
৫. History of Bengal (Vol 1) – R. C. Majumdar.
৬. ‘একদশমাংশ ভূমির মালিকানা নিশ্চিত না হওয়ায় সরকার বঞ্চিত হচ্ছে রাজস্ব থেকে’ (দৈনিক ইনকিলাব, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১০)।
৭. ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির মালিকানা জটিলতা: জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি’ (দৈনিক কালের কণ্ঠ, ১ মে ২০২৬)।
৮. ভারতের সংবিধান (Scheduled Tribes সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ ৩৪২)
৯. মায়ানমার নাগরিকত্ব আইন ১৯৮২।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও গবেষক।
ahmfarukcht@gmail.com

আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে সবুজ ধানখেতে। পাশে কালভার্ট, বসার জন্য ছোট বেঞ্চ, দোলনা আর সেলফি কর্নার। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কচুখালীতে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট ক্যাফের নাম ‘শেষ বিকেলের চায়ের আড্ডা’।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মুন্সিগঞ্জ কলেজের ছয় শিক্ষার্থী নিজেদের শ্রম ও উদ্যোগে তৈরি করেছেন ক্যাফেটি। মুন্সিগঞ্জ কচুখালীতে কারিতাস কার্যালয়ের কাছে কালভার্টের পাশে, মুনসুর সরদার গ্যারেজ-হরিনগর বাজার সড়কের পাশে বাঁশ, কাঠ ও খড় দিয়ে নির্মিত এই টংঘর ক্যাফের উদ্বোধন করা হয় গত ১৪ অক্টোবর।

উদ্যোক্তা ছয় বন্ধু হলেন তায়িব, মিলন হোসেন, মেহেদী হাসান, বিপ্লব হোসেন, ইমন হোসেন ও রাকিবুল হাসান। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগে কিছু করার আগ্রহ থেকেই একসঙ্গে কাজ শুরু করেন তাঁরা।

উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে অবসর সময়ে প্রায়ই আড্ডা দিতাম। একসময় মনে হলো, শুধু আড্ডা না দিয়ে এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করা যায়। পুঁজি খুব বেশি ছিল না, তবে নিজেদের শ্রম আর ইচ্ছা ছিল। সেই ভরসাতেই ক্যাফেটি গড়ে তুলেছি।’

ছয় বন্ধু প্রত্যেকে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বাঁশ, কাঠ ও খড়ের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে নিজেরাই সাজিয়েছেন ক্যাফেটি। বাহারি সাজসজ্জার পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সাদামাটা পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরিতে।

ক্যাফেতে চা-কফির পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে হালকা খাবারও। দাম রাখা হয়েছে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে। অপরাজিতা ফুলের চা ও দুধ চায়ের দাম ২০ টাকা করে, মালাই চা ২৫ টাকা এবং ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা। মালাই রুটি ও ফুচকার দাম ৩০ টাকা করে। এ ছাড়া রয়েছে সেলফি কর্নার, দোলনা ও বিভিন্ন ধরনের বসার ব্যবস্থা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, তাঁদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়; এলাকার পরিবেশ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখা। তাঁদের দাবি, কচুখালীর এই কালভার্ট এলাকায় আগে বখাটেদের উৎপাত ছিল। সেখানে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডও ঘটত। জায়গাটিকে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অবসর কাটানোর উপযোগী করে তুলতে তাঁরা ক্যাফেটি গড়ে তুলেছেন।

উদ্যোক্তা মো. মিলন হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই, জায়গাটি মানুষের কাছে ভালো একটি স্থান হিসেবে পরিচিত হোক। তরুণেরা এখানে আসবেন, চা খাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবেন। জায়গাটিতে মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি বাড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড কমাতে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করি।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টুও উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, ছয় কলেজশিক্ষার্থীর এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাঁরা নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ ভালো রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন।

স্বল্প পুঁজিতে ছয় বন্ধুর এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কচুখালীতে মানুষের অবসর কাটানোর জন্য তৈরি হয়েছে নতুন একটি জায়গা, যেখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জমে উঠতে পারে বন্ধুত্বের গল্প।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

শরতের নীল আকাশ, সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি ঝরনা আর হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, আবার কিছু কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।

হোটেল-রিসোর্টে আগাম বুকিংয়ের চাপ

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে থাকার জায়গা বুকিংয়ের ব্যস্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলোতে আগাম বুকিংয়ের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কমলগঞ্জের টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, পূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।শ্রীমঙ্গলের বালিসিরা কটেজের মালিক ও রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক জানান, তাঁদের কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদ বলেন, উৎসবের সময়ে হোটেল-রিসোর্টে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। জেলার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

চা-বাগান, ঝরনা ও হাওরের টানে পর্যটকেরা

মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ, পাহাড়ি পথ, ঝরনার পানি এবং হাওরের বিস্তৃত জলরাশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে। জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। শরতের আবহে এসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটির সময় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পর্যটকদের আকর্ষণ শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের বৈচিত্র্যও মৌলভীবাজার ভ্রমণকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। ফলে পূজার ছুটিতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের আকর্ষণ

কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ে মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ‘মাঙাল ময়ুম’ স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে। সেখানে মণিপুরি নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটির উদ্যোক্তা নিরঞ্জন সিংহ বলেন, পর্যটকেরা এখানে এসে মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে পর্যটন কার্যক্রমের সুফল স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন চান পর্যটনসংশ্লিষ্টরা

পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লেও পর্যটনশিল্পের বিকাশে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। ট্যুর গাইড অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম সিলেট-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

পূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। শ্রীমঙ্গল জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক থাকবে। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে পূজার আগে, চলাকালে ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে মৌলভীবাজারের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পূজার ছুটিতে আগাম বুকিংয়ের উচ্চ হার স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বড় হারের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিং ব্যর্থতায় জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট হয়েছে তাওহিদ হৃদয়ের দল। আবুধাবিতে শনিবার ৯৯ রানের জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করেছে জিম্বাবুয়ে। ম্যাচে শুরুতে বল হাতে জিম্বাবুয়েকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশ। মাত্র ২৪ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দলটি। কিন্তু ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিনের বড় জুটি জিম্বাবুয়েকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। পরে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

টেলর-আরভিনের ১৫০ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়াল জিম্বাবুয়ে

টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ের সামনে বিপাকে পড়ে জিম্বাবুয়ে। মাত্র ২৪ রানের মধ্যে তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। তবে এই অবস্থায় দলের হাল ধরেন ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিন। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৫০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। টেলর ১০১ বলে ৮১ রান করেন। আরভিনের ব্যাট থেকে আসে ১০৬ বলে ৯৩ রান। তাঁদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান সংগ্রহ করে দলটি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭২ রান।

তাসকিনের তিন উইকেটেও থামেনি জিম্বাবুয়ে

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৪৪ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। শুরুতে তাঁর বোলিংয়েই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। এ ছাড়া শরীফুল ইসলাম ও সাইফ হাসান দুটি করে উইকেট শিকার করেন। তবে টেলর ও আরভিনের জুটি ভাঙতে দেরি হওয়ায় জিম্বাবুয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে সক্ষম হয়।

২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু সৌম্য সরকার ৯ রান করে ব্লেসিং মুজারাবানির বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরতেই ছন্দপতন শুরু হয়। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ৪৬ রান করে তাঁর বিদায়ের পর বাংলাদেশের চাপ আরও বাড়ে। নাজমুল হোসেন শান্তও বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। তিনি করেন ১৩ রান। দলীয় ৯৭ রানে চতুর্থ উইকেট হিসেবে আউট হন অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। ২১ বলে ১৩ রান করে সিকান্দার রাজার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। অধিনায়কের বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয়ের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।

নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ১৭২ রানেই শেষ

হৃদয়ের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। মোসাদ্দেক হোসেনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। শেষ দিকে রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ ২৬ বলে ৩২ রানের জুটি গড়ে হারের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন। রিশাদ করেন ২৩ রান, আর তাসকিন ১৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তবে তাঁদের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দলের ইনিংস। জিম্বাবুয়ের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্র্যাড ইভান্স। তিনি নেন ৪ উইকেট। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি