দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন, এশিয়ায় কেন এত পিছিয়ে বাংলাদেশ?
দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলের সাফল্যের গল্প বেশ সমৃদ্ধ। সাফে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দুইবার, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় একাধিকবার নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সীমানা পেরিয়ে এশিয়ার বড় দলগুলোর সামনে দাঁড়ালেই বাস্তবতাটা যেন বদলে যায়।
এশিয়ান গেমসের এবারের আসরেও সেই বাস্তবতারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে। তিন ম্যাচে বাংলাদেশ জয় পায়নি, গোলও করতে পারেনি। বিপরীতে হজম করেছে ১৬ গোল। সবচেয়ে বড় বিষয়, তিন ম্যাচে প্রতিপক্ষের গোলমুখে লক্ষ্যে একটি শটও নিতে পারেনি বাংলাদেশ।
তবু শেষ ম্যাচে এসে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে দল। ওসাকার নাগাই স্টেডিয়ামে মিয়ানমারের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছে পিটার বাটলারের দল। র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে ৫২ ধাপ এগিয়ে থাকা দলের বিপক্ষে হার এড়ানো তাই পুরোপুরি নেতিবাচক ফলও নয়।
রুপনার সেভে বড় হার এড়ানো
উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের গোলরক্ষক রুপনা চাকমার ওপর দিয়ে গেছে বড় চাপ। দুই ম্যাচে তিনি আটটি সেভ করেছেন। তাঁর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধ না থাকলে বাংলাদেশের গোল হজমের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত।
তবে গোলরক্ষকের এমন পারফরম্যান্সও দলের মূল সমস্যাটা আড়াল করতে পারেনি। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ নিজেদের আক্রমণেও খুব একটা সুযোগ তৈরি করতে পারেনি।
শীর্ষ দলগুলোর সঙ্গে ব্যবধান বিশাল
উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের শক্তির ব্যবধান ছিল সবচেয়ে বেশি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে উত্তর কোরিয়া ১১ নম্বরে, বাংলাদেশ ১০৭ নম্বরে। ৯৬ ধাপের এই ব্যবধান শুধু কাগজে-কলমে নয়, মাঠেও স্পষ্ট হয়েছে।
বিশ্বকাপ, এশিয়ান কাপ, অলিম্পিক ও এশিয়ান গেমস—প্রায় প্রতিটি বড় মঞ্চেই উত্তর কোরিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।
দক্ষিণ কোরিয়াও একইভাবে এগিয়ে। র্যাঙ্কিংয়ে তাদের অবস্থান ১৯তম। বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবধান ৮৮ ধাপ। বিশ্বকাপ ও এশিয়ান গেমসে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের জন্য আক্রমণ গড়ে তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার সাফল্য কেন কাজে আসছে না?
পরিসংখ্যানেই এর একটি ছবি পাওয়া যায়। সাফে ৩১ ম্যাচে বাংলাদেশ করেছে ৭৯ গোল, হজম করেছে ৪৫টি। সাউথ এশিয়ান গেমসের দুই আসরে আট ম্যাচে গোল করেছে আটটি।
অর্থাৎ আঞ্চলিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মেয়েরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর বিপক্ষে খেলতে গেলে গতি, শারীরিক সক্ষমতা, বল দখল, আক্রমণ সংগঠন ও ম্যাচের চাপ সামলানোর জায়গায় পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গত মার্চে এশিয়ান কাপেও বাংলাদেশ তিন ম্যাচে ১১ গোল হজম করেছিল, কিন্তু কোনো গোল করতে পারেনি। এবার এশিয়ান গেমসেও প্রায় একই ধরনের চিত্র দেখা গেল।
বাটলারের চোখে ‘কঠিন শিক্ষা’
এশিয়ান গেমস শেষে বাংলাদেশের কোচ পিটার বাটলারও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচগুলো বাংলাদেশের জন্য কঠিন শিক্ষা। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশ এখনো ওই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
তবে মিয়ানমারের বিপক্ষে দলকে নিয়ে সন্তুষ্ট বাটলার। তাঁর মতে, আগের দুই ম্যাচের তুলনায় শেষ ম্যাচে বাংলাদেশ বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে খেলেছে এবং রক্ষণভাগও ভালো করেছে।
মিয়ানমারকে হারাতে না পারলেও ড্রয়ে অন্তত পরাজয়ের বৃত্ত থেকে বের হতে পেরেছে বাংলাদেশ।
সামনে এগোনোর পথটা এখানেই
এশিয়ান গেমসে তিন ম্যাচে গোল নেই, জয় নেই। ১৬ গোল হজমের বিপরীতে লক্ষ্যে নেই একটি শটও। তাই ফলাফল বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলছে না।
তবে এই কঠিন ম্যাচগুলো বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সামনে বাস্তব চিত্রটাও পরিষ্কার করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর এখন লক্ষ্য যদি এশিয়ার বড় দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা হয়, তাহলে সেই ব্যবধান কমানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা এবং প্রতিটি বিভাগে আরও প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।
এশিয়ান গেমস তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু ফলাফলের টুর্নামেন্ট নয়—নিজেদের বর্তমান অবস্থান বোঝারও একটি বড় পরীক্ষা হয়ে থাকল।
কালের আলো/এসএ



আপনার মতামত লিখুন
Array