খুঁজুন
                               
, ,
           

ড্রোন হামলার জবাবে পাকিস্তানের অভিনব ‘জাল’ কৌশল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
ড্রোন হামলার জবাবে পাকিস্তানের অভিনব ‘জাল’ কৌশল

ড্রোন হামলা ঠেকাতে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়, এবার মাছ ধরার জালকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পুলিশ। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার হামলা থেকে পুলিশ সদস্যদের রক্ষা করতে ঝুঁকিপূর্ণ চৌকি ও ফাঁড়ির ওপর টানানো হচ্ছে এসব জাল।

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রদেশটির হাঙ্গু জেলার সারকি পিয়ালা পুলিশ চৌকিতে এমন জাল বসানোর পর থেকে সেখানে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি বলে দাবি করেছে পুলিশ।

হামলার পর বদলে গেল কৌশল

গত ১৬ এপ্রিল বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন দিয়ে সারকি পিয়ালা পুলিশ চৌকিতে হামলা চালানো হয়। ওই সময় পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খান ও তাঁর সহকর্মীরা আত্মরক্ষায় দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন। পরে চৌকিটি ঘিরে গুলি চালায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সদস্যরা।

আফগানিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের এই এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রায় সাত ঘণ্টা ধরে চলা ওই সংঘর্ষে একটি সাঁজোয়া গাড়ির চালক নিহত ও এক পুলিশ সদস্য আহত হন।

ফাইয়াজ খান বলেন, ওই হামলার সময় তারা প্রচণ্ড আতঙ্কের মধ্যে ছিলেন। কারণ, যুদ্ধের মাঝখানে থেকে শেষ পর্যন্ত জীবিত অবস্থায় ফিরতে পারবেন কি না, সেটিও তারা জানতেন না।

চার লাখ রুপির জালেই ভরসা

ড্রোন হামলার ঝুঁকি কমাতে এরপর পুলিশ চৌকির ছাদ ও সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে কয়েক মিটার উঁচুতে মাছ ধরার জাল টানিয়ে দেয়। দড়ি ও তার দিয়ে জোড়া লাগানো এসব জাল ওপর থেকে দেখতে অনেকটা ছাউনির মতো।

পুলিশের ভাষ্য, এ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কম খরচের। একটি সাধারণ পুলিশ চৌকি এ ধরনের জাল দিয়ে ঢাকতে প্রায় চার লাখ পাকিস্তানি রুপি, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলার খরচ হয়।

হাঙ্গু জেলা পুলিশ কর্মকর্তা তারিক হাবিব জানান, ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার হামলায় সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ঝুঁকিপূর্ণ পুলিশ স্টেশন ও চৌকিগুলোতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জালে আটকে যেতে পারে ড্রোন

পুলিশ কর্মকর্তা ফাইয়াজ খানের মতে, কোনো ড্রোন চৌকির ওপর দিয়ে আসার সময় জালে আটকে গেলে সেটিকে নিষ্ক্রিয় বা থামানো সম্ভব হতে পারে। এমনকি জালের ওপর ড্রোন বিস্ফোরিত হলেও সরাসরি নিচে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর বিস্ফোরণের টুকরা পড়ার ঝুঁকি কমতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

ফাইয়াজ খান বলেন, ড্রোনটি জালে আটকে না গিয়ে জালের ওপর বিস্ফোরিত হলেও বিস্ফোরণের শেল ও টুকরার বড় অংশ বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে। ফলে নিচে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমতে পারে।

তবে এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়; বরং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য একটি অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর হিসেবেই ব্যবহার করছে পুলিশ।

আরও এলাকায় বসছে জাল

হাঙ্গু জেলার পাশাপাশি খাইবার পাখতুনখাওয়ার আরও কয়েকটি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় এই ব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানের বিভিন্ন চেকপোস্ট ও পুলিশ ফাঁড়িতেও জাল বসানো হয়েছে। প্রদেশের কয়েকটি সামরিক চৌকিতেও ড্রোন ঠেকাতে একই কৌশল নেওয়া হয়েছে।

হাঙ্গু পুলিশের পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করতে প্রাদেশিক সরকারের কাছে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দও চাওয়া হয়েছে।

বদলে যাচ্ছে হামলার ধরন

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। আগে গুলিবর্ষণ ও মর্টার হামলার পাশাপাশি এখন ড্রোন ও কোয়াডকপ্টার ব্যবহার করেও হামলা চালানো হচ্ছে। এর ফলে পুলিশ ও সামরিক স্থাপনাগুলো নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

গত ২৯ জুলাই হাঙ্গুতে একটি পুলিশ ফাঁড়িতে বোমাযুক্ত কোয়াডকপ্টার দিয়ে হামলার পর স্থলপথেও হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনায় অন্তত ১১ পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন। কয়েক ঘণ্টার ওই সংঘর্ষে ১৫ হামলাকারীও নিহত হন। টিটিপি হামলার দায় স্বীকার করে।

এর আগে ও পরেও ওই অঞ্চলে একাধিক প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে ড্রোন হামলা ঠেকাতে কম খরচে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা খুঁজে বের করা পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

‘নিরাপত্তার বাড়তি স্তর’

পুলিশ কর্মকর্তা জিশান খান বলেন, মাছ ধরার জাল বসানোর পর সারকি পিয়ালা ও কাছের বালিয়ামেনা চৌকিতে কোনো ড্রোন বা কোয়াডকপ্টার হামলা হয়নি। তাঁর মতে, এই জাল পুলিশ সদস্যদের জন্য নিরাপত্তার একটি বাড়তি স্তর হিসেবে কাজ করছে।

তাঁর ধারণা, কোনো হামলা হলেও এই ব্যবস্থা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।

আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের যুগে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বদলে স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য মাছ ধরার জাল দিয়ে প্রতিরক্ষার এই অভিনব উদ্যোগ এখন খাইবার পাখতুনখাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ নিরাপত্তা চৌকিগুলোতে নতুন এক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।

কালের আলো/জেএন

সৌরবিদ্যুতে স্বনির্ভর ফটিকছড়ির প্রতিষ্ঠান, গ্রিডে যাবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ

চট্টগ্রাম সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪০ অপরাহ্ণ
সৌরবিদ্যুতে স্বনির্ভর ফটিকছড়ির প্রতিষ্ঠান, গ্রিডে যাবে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বাড়ছে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের মালিকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ ব্যয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার।

ফটিকছড়ির আল মাহাদুল ইসলামি বালক-বালিকা মাদরাসায় আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ হতো। বছরে এ ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। তবে প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে মাদরাসার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের পর বিদ্যুৎ বিল প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

মাদরাসাটির হেফজ ও এতিমখানায় প্রায় ৯৫০ শিক্ষার্থী রয়েছে। শ্রেণিকক্ষ, আবাসিক ভবন, রান্নাঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনায় নিয়মিত বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আবাসিক হওয়ায় দিন-রাত বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে নেট মিটারিং পদ্ধতিতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালুর পর নিজেদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়েই চাহিদার বড় অংশ মেটাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মাসে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা সাশ্রয় হওয়ায় বছরে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার থেকে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয় কমছে। সে হিসাবে প্রায় ৬ লাখ টাকার বিনিয়োগ এক থেকে দেড় বছরের মধ্যেই উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

মাদরাসার সহকারী পরিচালক হাফেজ মো. এমদাদ বলেন, আগে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাবদ উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হতো। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের পর বিল প্রায় শূন্যে নেমেছে। এতে নিয়মিত ব্যয় কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও আবাসিক কার্যক্রমও নির্বিঘ্নে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে।

শুধু মাদরাসা নয়, ফটিকছড়ির আবাসিক ভবনেও বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার। উপজেলার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে এক প্রবাসীর ছয়তলা ভবনের ছাদে সাড়ে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। ভবনটির বিদ্যুতের চাহিদা ৬ থেকে ৭ কিলোওয়াট। বাতি, ফ্যান, ২৬টি সিসি ক্যামেরা, লিফট ও পানির মোটর চালানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রয়েছে।

ভবনের মালিক মো. আলম বলেন, সৌর প্যানেল স্থাপনের পর বিদ্যুৎ বিলের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পাশাপাশি নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ ফটিকছড়ি জোনাল কার্যালয়ের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার আবুল বাসার শামছুদ্দিন আহম্মদ বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে নেট মিটারিং কার্যকর একটি পদ্ধতি। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হলে তা নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, বড় ভবন ও প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে অব্যবহৃত জায়গাকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে লাগানো সম্ভব। এতে বিদ্যুৎ ব্যয় কমার পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন স্থাপনায় এ ধরনের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

ফাঁদ, বিষটোপে চলছে পাখি শিকার, বিপন্ন চলনবিলের জীববৈচিত্র্য

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৭ অপরাহ্ণ
ফাঁদ, বিষটোপে চলছে পাখি শিকার, বিপন্ন চলনবিলের জীববৈচিত্র্য

শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে নাটোরসহ চলনবিলের বিভিন্ন জলাশয়, বিল, নদী ও ফসলের মাঠে বাড়তে শুরু করেছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখির আনাগোনা। খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে প্রতিবছর শীত মৌসুমে এসব এলাকায় পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে। তবে পাখির এই আগমনকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে ওঠে একশ্রেণির অসাধু শিকারি। ফাঁদ, জাল, বিষটোপ ও এয়ারগান ব্যবহার করে নির্বিচারে পাখি শিকার ও বিক্রি চলছে। এতে দিন দিন কমছে পাখির সংখ্যা, হুমকিতে পড়ছে চলনবিলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য।

শীতকালে অতিথি ও দেশীয় পাখি শিকার এবং কেনাবেচা সম্পূর্ণ অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান থাকলেও তা উপেক্ষা করে বিভিন্ন এলাকায় পাখি শিকার করছে চক্রটি। স্থানীয় প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে শিকারিদের কারাদণ্ড, জরিমানা এবং পাখি উদ্ধার করলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এ অবৈধ কর্মকাণ্ড।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলনবিল অধ্যুষিত নাটোরের সিংড়া, গুরুদাসপুর, নলডাঙ্গার হালতিবিল এবং লালপুর উপজেলার পদ্মাচরে শীতের শুরু থেকেই ফাঁদ, জাল ও বিষটোপ দিয়ে পাখি শিকার করা হয়। পরে এসব পাখি স্থানীয় হাট-বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও চায়ের দোকানে গোপনে বিক্রি করা হয়। পাখির চাহিদা থাকায় শিকারিরাও উৎসাহিত হচ্ছে।

গত শনিবার (৩ অক্টোবর) থেকে সোমবার পর্যন্ত চলনবিল ও হালতিবিল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, বিলের ধানক্ষেত ও জলাশয়ের পাশে লতাপাতা দিয়ে বিশেষ ফাঁদ বা ‘কিল্লাঘর’ তৈরি করা হয়েছে। এসব ফাঁদে একটি জীবন্ত পাখিকে আটকে রেখে তার ডাকের মাধ্যমে অন্য পাখিকে আকৃষ্ট করা হয়। পরে জালে ধরা পড়া পাখি খাঁচায় বন্দি করে বিক্রি করা হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, শিকারিরা কখনো কখনো ধরা পড়া পাখির চোখ অন্ধ করে দেয়। আবার কোনো পাখির পা সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির সাহায্যে গাছের মগডালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। পাখিটি ছটফট ও ডাকাডাকি করলে আশপাশের অন্য পাখি কাছে আসে এবং জালে আটকা পড়ে।

চলতি সপ্তাহে সিংড়া উপজেলার পাটশাঐল মৌজার ধানক্ষেতে কয়েকজন শিকারিকে বড় পাতার ফাঁদ ও টোপ হিসেবে ব্যবহৃত পাখি নিয়ে তৎপর থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়ভাবে প্রতি জোড়া পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। এক শিকারি জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে শখের বশে পাখি শিকার করছেন। প্রতিদিন ছয়-সাতটি পাখি শিকার করে প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় হয় বলেও জানান তিনি।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনটির বিভিন্ন অভিযানে এ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার বক, ৭৩৯টি ঘুঘু, ১০৫টি শামুকখোল, ২২০টি টিয়া, ১৭১টি শালিক, ৮৫টি পাতি সরালি, ৫৫টি ডাহুক, ৩৫০টি চাকলা, ৩০টি মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পেঁচা, মদনটাক, হিমালয় গৃধিনী শকুন, পানকৌড়ি ও হটটিটিসহ বিভিন্ন বিরল প্রাণীও উদ্ধার করা হয়েছে।

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পাখি শিকারের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা, ৪২ জনকে জরিমানা এবং ৭২ জনের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১০টি এয়ারগান জব্দ, ১৬০টি কিল্লাঘর ফাঁদ ধ্বংস এবং প্রায় ৫০ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১০টি বাটুল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে।

চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক পাখি ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফসল রক্ষা করে, আবার কিছু পাখি বীজ ছড়িয়ে উদ্ভিদের বংশবিস্তারে সহায়তা করে। পাখির সংখ্যা কমে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

তিনি জানান, ২০১২ সালে সংগঠনটি গঠিত হয়। ২০১৪ সাল থেকে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ (রাজশাহী বিভাগ) থেকে লাইসেন্স নিয়ে সংগঠনটি পাখি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় কাজ করছে।

সিংড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিশাত আনজুম বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিযোগ পেলে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। শনিবার চলনবিল এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন শিকারিকে একদিন করে কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এ সময় অর্ধশতাধিক বক পাখি অবমুক্ত এবং ১০টি কিল্লাঘরের ফাঁদ ধ্বংস করা হয়।

রাজশাহী বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ফাঁদ পেতে পাখি শিকার সম্পূর্ণ অবৈধ। বন বিভাগ সচেতনতামূলক প্রচার, নিয়মিত টহল, মোবাইল কোর্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেমিনার ও লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে।

নাটোর পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পাখি শিকার বন্ধে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবুল হায়াত বলেন, শুধু প্রশাসনিক অভিযান চালিয়ে পাখি শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য জনসচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনগুলোকে জলাশয় ও পাখির আবাসস্থলে নিয়মিত নজরদারি এবং পাখি কেনাবেচা বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পরিবেশবিদদের মতে, নিয়মিত নজরদারি, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমেই চলনবিলকে দেশি ও পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে রক্ষা করা সম্ভব। একই সঙ্গে বাজারে শিকার করা পাখি কেনা থেকে বিরত থাকা এবং কোথাও পাখি শিকার বা বিক্রি হতে দেখলে প্রশাসন, পুলিশ কিংবা বন বিভাগকে জানানো প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

নগর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের বৈঠক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৫৭ অপরাহ্ণ
নগর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সরকারের বৈঠক

নগর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘ইমপ্রুভমেন্ট অব আরবান পাবলিক হেলথ প্রিভেন্টিভ সার্ভিসেস প্রজেক্ট’-এর কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পৃথক দুটি নতুন প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নিতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলকে অনুরোধ করা হয়েছে।

বুধবার (৭ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রকল্পটির অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে ক্রিস্টোফ লেমিয়েরের নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরামর্শকদের মধ্যে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বৈঠকে জানানো হয়, নগর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রকল্পটির আওতায় মশা ও অন্যান্য বাহকবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতাল-বহির্ভূত চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দাবদাহ, বায়ু ও শব্দদূষণসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া আচরণগত পরিবর্তনমূলক যোগাযোগ কৌশলের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অসংক্রামক রোগ কমাতে প্রয়োজনীয় সুবিধা তৈরির উদ্যোগও রয়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় রয়েছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভার ও তারাব পৌরসভা।

প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।

নগরের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও জানান তিনি।

সভায় মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা, পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরিদর্শন অনুবিভাগের মহাপরিচালক শিবির বিচিত্র বড়ুয়া, স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. রবিউল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি