নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের কাটাখালী খালের ওপর দীর্ঘ ৫১ বছর ধরে চলাচলের ভরসা ছিল বাঁশের সাঁকো। ঝুঁকিপূর্ণ সেই সাঁকো পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অনেকে। মুমূর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত কিংবা ব্যবসার মালামাল পরিবহন—প্রতিটি কাজেই পোহাতে হয়েছে দুর্ভোগ। অবশেষে উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে সেখানে নির্মিত হয়েছে কাঠের সেতু। এতে স্বস্তি ফিরেছে খালের দুই পাড়ের মানুষের জীবনে। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, অস্থায়ী এই কাঠের সেতুর জায়গায় একদিন নির্মিত হবে টেকসই পাকা সেতু।
হাতিয়ার তমরদ্দি বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণে কাটাখালী খালের ওপর নির্মিত সেতুটি দিয়ে এখন সাইকেল ও মোটরসাইকেল নিয়ে পারাপার হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সেতুটি দেখতে আশপাশের এলাকা থেকেও মানুষ আসছেন। দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর কাঠের সেতু পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে আনন্দ দেখা গেছে। তবে এই আনন্দের সঙ্গে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে অবহেলিত যোগাযোগব্যবস্থার স্মৃতি এবং স্থায়ী সমাধানের প্রত্যাশা।
৫১ বছর ধরে বাঁশের সাঁকোই ছিল ভরসা
জানা যায়, আশির দশকের শুরুর দিকেও কাটাখালী খালের ওপর ইট, রড, সিমেন্ট ও বালু দিয়ে নির্মিত একটি সেতু ছিল। ‘কাটাখালী ব্রিজ’ নামে পরিচিত ওই সেতুর ওপর দিয়ে যাত্রীবাহী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করত। তৎকালীন থানা সদর বাথানখালী থেকে তমরদ্দি বাজার হয়ে সোনাদিয়া ইউনিয়নের চরচেঙ্গা বাজার পর্যন্ত বাস চলাচল করত। সেখান থেকে জাহাজমারা পর্যন্তও যাতায়াতের পথ ছিল এটি।
একপর্যায়ে সেতুটি ভেঙে গেলে সরকারি উদ্যোগে দরপত্র আহ্বান করে সেটি অপসারণ করা হয়। কিন্তু পুরোনো সেতুর জায়গায় নতুন সেতু নির্মাণ না হওয়ায় বিপাকে পড়েন দুই পাড়ের বাসিন্দারা। নিজেদের প্রয়োজনে তাঁরা চাঁদা তুলে খালের ওপর বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন। এরপর বছরের পর বছর সেই সাঁকোই হয়ে ওঠে পারাপারের একমাত্র ভরসা।
বর্ষা মৌসুম শেষে সাঁকো মেরামত করতে হতো স্থানীয়দেরই। কখনো বাঁশ বদলাতে হয়েছে, কখনো ভাঙা অংশ জোড়া দিয়ে চলাচলের উপযোগী করতে হয়েছে। এভাবেই কেটে গেছে কয়েক দশক। বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তিন গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের দুর্ভোগ
কাটাখালী খালের দক্ষিণ পাড়ে রয়েছে পূর্ব জোড়খালী, জোড়খালী ও কোরালিয়া গ্রাম। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পরিবারের মানুষকে তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যেতে ওই খালের ওপরের সাঁকো পার হতে হতো।
উপজেলা সদর ওছখালি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলেছিল। বাজারে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো, চিকিৎসা নেওয়া কিংবা ব্যবসার মালামাল আনা-নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই সাঁকো পারাপার ছিল বড় বাধা।
বিশেষ করে বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ঝুঁকি আরও বেড়ে যেত। পিচ্ছিল ও দুর্বল সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, কেউ কেউ গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতাও হারিয়েছেন।
রোগী হাসপাতালে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ
সাঁকোর কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হতো মুমূর্ষু রোগী, বয়স্ক মানুষ ও গর্ভবতী নারীদের। খালের দক্ষিণ পাড়ে কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। স্থানীয়দের ভাষ্য, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় বিনা চিকিৎসায় বাড়িতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সিরাজ মিয়া (৮৫) জানান, ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই সাঁকো দিয়ে তমরদ্দি বাজারে যাতায়াত করেছেন। দিনের বেলায় কোনোভাবে পারাপার করা গেলেও রাতে চলাচল ছিল অত্যন্ত কঠিন।
তিনি জানান, একবার তাঁর ছেলের স্ত্রীর প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও রাতের অন্ধকারে খাল পার হওয়া সম্ভব হয়নি। সারারাত অপেক্ষার পর পরদিন সকালে নৌকায় করে তাঁকে খাল পার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সিরাজ মিয়ার ভাষ্য, যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে গ্রামের মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রেও অন্য এলাকার মানুষের অনীহা ছিল। বিভিন্ন নির্বাচনের সময় জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।
মালামাল পার করতে গিয়ে পঙ্গু ভ্যানচালক
কোরালিয়া গ্রামের বাসিন্দা নবির উদ্দিন (৫০) ও শমশের আলী (৬০) জানান, তাঁদের দোকানের মালামাল আনতে হয় তমরদ্দি বাজার থেকে। ভ্যানচালকেরা খালের ওপারে মালামাল রেখে দেন। এরপর মাথায় করে সাঁকো পার হয়ে সেগুলো দোকানে পৌঁছে দিতে হয়।
শমশের আলী জানান, গত বছর নুর ইসলাম নামের এক ভ্যানচালক চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান। এতে তাঁর এক হাত ও এক পা ভেঙে যায়। ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও তিনি সুস্থ হতে পারেননি। বর্তমানে তিনি পঙ্গু অবস্থায় বাড়িতে বসবাস করছেন।
শুধু ব্যবসায়িক মালামাল পরিবহন নয়, সাঁকো পারাপার করতে গিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদেরও দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।
শমশের আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের শিক্ষার্থীদের তমরদ্দি উচ্চবিদ্যালয় ও তমরদ্দি মাদ্রাসায় যেতে এই সাঁকো পার হতে হয়। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এক ছাত্রী সাঁকো থেকে খালে পড়ে ভেসে যেতে থাকলে সহপাঠীদের চিৎকার শুনে খালপাড়ের দোকান থেকে লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন।
২০ বছর আগেও হয়েছিল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০ বছর আগে কাটাখালী খালের ওপর নতুন সেতু নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। একজন ঠিকাদার কাজ পেয়ে নির্মাণকাজ শুরু করলেও মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির কারণে কাজ বন্ধ করে দেন বলে জানা যায়। পরে তিনি নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নিয়ে যান। ফলে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ আর বাস্তবায়িত হয়নি।
এর আগে ২০১৯ সালে কাটাখালী খালের ওপর দিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায়। তবু দীর্ঘ সময় ধরে সমস্যাটির স্থায়ী সমাধান হয়নি।
উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কাঠের সেতু
সম্প্রতি কোনো এক কাজে ওই এলাকায় গিয়ে বাঁশের সাঁকোটি দেখেন হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল। স্থানীয়দের কাছ থেকে সাঁকোটির দীর্ঘ ইতিহাস ও দুর্ভোগের কথা শুনে তিনি কাঠের সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে নির্মিত হয় নতুন সেতুটি।
সেতুটি পুরোপুরি কাঠ দিয়ে তৈরি। নিচে রয়েছে সিমেন্টের খুঁটি, তার ওপর কাঠের পাটাতন। দুই পাশে দেওয়া হয়েছে হাতল। রং করে সাজানো হয়েছে পুরো সেতু। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও এটি দেখতে আসছেন।
প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের সোনাদিয়া থেকে সেতুটি দেখতে আসেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর আরিয়ান ফরিদ। তাঁর মতে, বিশেষ রঙে সাজানো দীর্ঘ সেতুটি দূর থেকে দেখতে ছোট নদীর ওপর নির্মিত বড় সেতুর মতো মনে হয়। এটি এখন মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাসেল ইকবাল বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার অসুবিধার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাগুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন ছিল। এতে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। একটি সাঁকোকে সেতুতে রূপান্তরের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে ইট-পাথরের স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বলা হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ার প্রত্যাশা
কাটাখালী খালের ওপর কাঠের সেতু নির্মাণের ফলে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থায় স্বস্তি ফেরার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা করছেন ব্যবসায়ীরা।
তমরদ্দি বাজার বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি হোসেন আহম্মদ বলেন, সেতুটি নির্মিত হওয়ায় তমরদ্দি বাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য কয়েক গুণ বাড়বে বলে তাঁরা আশা করছেন। হাতিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের নিঝুম দ্বীপ, জাহাজমারা ও চরচেঙ্গা বাজারসহ বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে তমরদ্দি বাজারের ব্যবসায়িক যোগাযোগ আরও জমজমাট হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যাতায়াত সহজ হলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া, জরুরি চিকিৎসা নেওয়া এবং কৃষি ও ব্যবসার পণ্য পরিবহন আগের তুলনায় সহজ হবে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে তিন গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন আসবে।
স্বস্তি মিলেছে, অপেক্ষা এখন পাকা সেতুর
কাঠের সেতু নির্মাণের পর স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমেছে। তবে তাঁরা এটিকে স্থায়ী সমাধানের শেষ ধাপ হিসেবে দেখছেন না। তাঁদের প্রত্যাশা, কাঠের সেতুর জায়গায় দ্রুত একটি টেকসই পাকা সেতু নির্মাণ করা হবে, যাতে ভারী যানবাহন চলাচলসহ দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি সাঁকোর ওপর নির্ভর করে চলা মানুষের কাছে কাঠের সেতুটি তাই শুধু পারাপারের পথ নয়—এটি স্বস্তি, সম্ভাবনা ও দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে ওঠার নতুন আশার প্রতীক। এখন তাঁদের অপেক্ষা, সেই আশা কবে স্থায়ী সেতুতে রূপ নেবে।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি
আপনার মতামত লিখুন
Array