তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে উচ্চকক্ষ, সংবিধানে যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব
সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের এখতিয়ার নির্ধারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, সংসদের উচ্চকক্ষের গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠকে এসব প্রস্তাব ও মতামত উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বৈঠকে সংবিধানের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন, সংশোধনপ্রক্রিয়ায় স্থিতিশীলতা ও নমনীয়তার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
বিচার বিভাগের এখতিয়ার স্পষ্ট করার প্রস্তাব
বৈঠকে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ, সংবিধান সংশোধনের বর্তমান বিধান এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত মৌলিক কাঠামো-সংক্রান্ত বিধান নিয়ে মতামত দেন শিক্ষাবিদরা। সংবিধানের ব্যাখ্যা, মৌলিক কাঠামো রক্ষা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিচার বিভাগের এখতিয়ার সাংবিধানিকভাবে স্পষ্ট করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর খবরদারি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রেখে তার এখতিয়ারও স্পষ্ট করা দরকার, যাতে সংবিধানের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে জনপ্রত্যাশা উপেক্ষিত না হয়।
সংবিধান সংশোধনের বর্তমান পদ্ধতিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান রয়েছে। এই পদ্ধতির বাইরে বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাখা যায় কি না, সে বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান কমিটির সভাপতি। তবে এসব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে বিকল্প ভাবনা
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বিন্যাস এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে অংশগ্রহণকারীদের অনেকে লিখিত মতামত দেবেন বলে জানিয়েছেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিকল্পগুলোর মধ্যে সর্বশেষ পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা বাদ দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচকদের মতামত পাওয়া গেছে।
তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কাঠামো কিংবা গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে বৈঠকে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনা ও লিখিত মতামত পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।
উচ্চকক্ষে কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নিয়েও আলোচনা
সংবিধানে উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টিও বৈঠকের আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। উচ্চকক্ষে কোন কোন শ্রেণি বা এলাকার প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব রাখা হবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা যায় কি না—এসব বিষয়ে মতামত দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দেশ। এ কাঠামোর মধ্যে উচ্চকক্ষের মতো ব্যবস্থায় কীভাবে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে আলোচকেরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন।
এসব মতামত লিখিতভাবে পাওয়ার পর সেগুলো পর্যালোচনা করে কমিটিতে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি। উচ্চকক্ষের গঠন, প্রতিনিধিত্বের ধরন কিংবা নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ও মৌলিক অধিকার
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় রাষ্ট্রের সামর্থ্য অনুযায়ী মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাব এসেছে।
শিক্ষাবিদদের এসব মতামত সংবিধানের বিভিন্ন অংশে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তা নির্ধারণের আলোচনার অংশ বলে জানান কমিটির সভাপতি। তাঁর মতে, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, কিন্তু জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে প্রয়োজন হতে পারে—এমন বিষয়ও সংশোধনপ্রক্রিয়ায় বিবেচনা করা দরকার।
তিনি বলেন, নির্বাচনি ইশতেহার ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য বিষয়ও সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
বিরোধী দলকে আবারও আলোচনায় আসার আহ্বান
সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজের সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হয়েছে। ওই কমিশনের সভাপতি ছিলেন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সহসভাপতি ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করছে। কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নাম দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁরা এখনো নাম দেননি। নাম দেওয়া হলে তাঁদের স্বাগত জানানো হবে।
তিনি জানান, কমিটির প্রতিটি বৈঠক এবং জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিরোধী দলকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সরকার চায়, সরকারি ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণে সমঝোতার ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন হোক।
তবে বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সরকারের অঙ্গীকার এবং এটি জাতির প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিরোধী দল চাইলে লিখিত মতামত দিতে পারে বলেও জানান কমিটির সভাপতি। প্রতিবেদন তৈরির পর সংবিধান সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দল তাতে অংশ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
২৪ অক্টোবর আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা
সংবিধান সংশোধন নিয়ে আরও মতামত সংগ্রহের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, আগামী ২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী আলোচনার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে।
তাঁর মতে, সংক্ষিপ্ত সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পুরোপুরি শোনা ও রেকর্ড করা কঠিন। এ কারণে তাঁদের মতামত বিস্তারিতভাবে শোনার জন্য দিনব্যাপী আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বৈঠকে ছিলেন শিক্ষাবিদ ও কমিটির সদস্যরা
মঙ্গলবারের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, অধ্যাপক গীতিআরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কে এইচ লুৎফুল এলাহী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম ও অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মো. মাহবুবুর রহমান ও অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদ।
কমিটির সদস্য ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নূরুল হক, মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, ফারজানা শারমীন এবং মো. মাহমুদুল হক রুবেলও বৈঠকে অংশ নেন।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array