খুঁজুন
                               
, ,
           

৪০০ বছর আগে যে ১০টি নিরীহ আচরণকে ঘিরে তৈরি হতে পারত জাদুবিদ্যার অভিযোগ

ফিচার ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৫১ অপরাহ্ণ
৪০০ বছর আগে যে ১০টি নিরীহ আচরণকে ঘিরে তৈরি হতে পারত জাদুবিদ্যার অভিযোগ

আজ আপনি বাড়িতে বিড়াল পুষছেন, অসুস্থ প্রতিবেশীকে ভেষজ ওষুধ দিয়ে সাহায্য করছেন কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজের মতামত স্পষ্ট করে জানাচ্ছেন—এসবই স্বাভাবিক জীবনের অংশ। কিন্তু প্রায় ৪০০ বছর আগে, অর্থাৎ সপ্তদশ শতকের কোনো কোনো সমাজে, এমন সাধারণ আচরণও কারও কারও চোখে সন্দেহজনক হয়ে উঠতে পারত। পরিস্থিতি, সামাজিক অবস্থান ও স্থানীয় বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে আপনার বিরুদ্ধে উঠতে পারত জাদুবিদ্যা চর্চার অভিযোগ। আর সেই অভিযোগ কখনো কখনো ডেকে আনত বিচার, সামাজিক বর্জন, এমনকি নির্মম নির্যাতন।

কল্পনা করুন, এমন এক সময়ে আপনি বাস করছেন, যখন রোগের কারণ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান সীমিত, প্রকৃতির অনেক রহস্যের ব্যাখ্যা অজানা, আর ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকজ কুসংস্কার দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। কোনো শিশুর অসুস্থতা, গবাদিপশুর মৃত্যু, ফসলহানি কিংবা হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ভাগ্যের পেছনে অদৃশ্য শক্তির হাত রয়েছে বলে কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ কিংবা সমাজের প্রচলিত রীতির বাইরে থাকা মানুষকে ঘিরে সন্দেহ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারত।

ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পরবর্তী সময়ে উত্তর আমেরিকার কিছু উপনিবেশে ডাইনি শিকার ও বিচার ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। এসব অভিযোগের শিকার হয়েছেন নারী-পুরুষ উভয়ই। তবে অনেক অঞ্চলে নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে ছিলেন। সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় আতঙ্ক, গুজব ও ব্যক্তিগত বিরোধ কখনো কখনো নিরীহ মানুষকে অভিযুক্ত করার পরিবেশ তৈরি করেছিল।

আজকের চোখে যে আচরণগুলো একেবারেই স্বাভাবিক, সেগুলোর কয়েকটি নিয়েই ছিল নানা ধরনের কুসংস্কার। ইতিহাসের সেই প্রেক্ষাপটে ফিরে তাকালে দেখা যায়, শুধু অপরাধ নয়, কখনো কখনো সাধারণ জীবনযাপনও কাউকে সন্দেহের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারত।

১. বাড়িতে বিড়াল পোষা, বিশেষ করে কালো বিড়াল
আজকের দিনে বিড়াল অনেকের আদরের পোষা প্রাণী। কিন্তু ইউরোপের কিছু অঞ্চলে বিড়ালকে ঘিরে প্রচলিত ছিল নানা অতিপ্রাকৃত বিশ্বাস। বিশেষ করে কালো বিড়ালকে অশুভ শক্তি কিংবা জাদুবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা লোককথা ও কুসংস্কারে দেখা যায়।

ধরুন, আপনি বাড়িতে একটি বিড়াল পুষেছেন। রাতে সেটি ঘুরে বেড়ায়, অন্ধকারে তার চোখ জ্বলে ওঠে, কখনো প্রতিবেশীর বাড়ির আশপাশেও দেখা যায়। এসব স্বাভাবিক আচরণকেই সন্দেহপ্রবণ কেউ অশুভ কিছুর ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারতেন। কোনো প্রতিবেশী অসুস্থ হয়ে পড়লে কিংবা পরিবারে দুর্ভাগ্য নেমে এলে বিড়ালটিকে ঘিরেও গুজব ছড়াতে পারত।

অবশ্য বিড়াল পোষা মানেই ডাইনি সন্দেহে পড়তে হতো, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম ছিল না। বরং প্রাণীটিকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগে থেকেই থাকা সন্দেহ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারত।

২. ভেষজ উদ্ভিদ ও লোকজ চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা
গাছপালা ও ভেষজ উপাদান সম্পর্কে আপনার ভালো ধারণা আছে। গ্রামের কেউ মাথাব্যথা বা অন্য কোনো সমস্যায় ভুগলে আপনি তাকে পরিচিত ঔষধি গাছ দিয়ে তৈরি পানীয় খেতে দিলেন। রোগী সুস্থ হয়ে উঠলে আপনার জ্ঞানকে সবাই প্রশংসা করবে—এমন নিশ্চয়তা তখন ছিল না।

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে বিভিন্ন সমাজে মানুষ ভেষজ উপাদান ও লোকজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করত। ধাত্রী, ভেষজ চিকিৎসক এবং পরিচর্যাকারীরা মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। কিন্তু চিকিৎসার ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে ভালো কিংবা খারাপ হলে কেউ কেউ তার ব্যাখ্যা খুঁজতেন অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের মধ্যে।

কোনো রোগী সুস্থ হলে সন্দেহ করা হতে পারত, চিকিৎসক অস্বাভাবিক কোনো ক্ষমতার অধিকারী। আবার রোগীর অবস্থার অবনতি হলে অভিযোগ উঠতে পারত, তার ক্ষতি করা হয়েছে। অর্থাৎ সাহায্য করার উদ্দেশ্যে অর্জিত জ্ঞানও কোনো কোনো পরিস্থিতিতে সন্দেহের কারণ হয়ে উঠতে পারত।

৩. নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলা
কাজ করতে করতে নিজের মনে কথা বলা, কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনের প্রস্তুতি নেওয়া—মানুষের পরিচিত আচরণ। কিন্তু চার শতাব্দী আগে এমন দৃশ্যকে সবাই একইভাবে দেখত না।

কুসংস্কারে বিশ্বাসী কেউ আপনার বিড়বিড় করে কথা বলাকে অদৃশ্য আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ, মন্ত্রপাঠ কিংবা অতিপ্রাকৃত শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের লক্ষণ বলে ধরে নিতে পারতেন। অথচ আপনি হয়তো বাজারের হিসাব করছেন কিংবা কোনো সমস্যার সমাধান খুঁজছেন।

সপ্তদশ শতকের সমাজে এমন আচরণ দেখলেই কাউকে ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত করা হতো, এমন প্রমাণ নেই। তবে মানুষের অজানা আচরণকে রহস্যময় বা ভীতিকর হিসেবে দেখার প্রবণতা আগে থেকে থাকা সন্দেহকে আরও উসকে দিতে পারত।

৪. নিজের মতামত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা—বিশেষ করে নারী হলে
আপনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলেন কিংবা প্রভাবশালী কারও সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। বর্তমান সময়ে এগুলো ব্যক্তিস্বাধীনতার স্বাভাবিক প্রকাশ। কিন্তু অতীতের অনেক সমাজে সামাজিক নিয়ম ভেঙে কথা বলার মূল্য দিতে হতো।

বিশেষ করে নারীদের আচরণ নিয়ে ছিল নানা সামাজিক প্রত্যাশা। কোনো নারী প্রচলিত ভূমিকার বাইরে গিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করলে বা প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রকাশ্যে বিরোধে জড়ালে তিনি অপছন্দের পাত্র হয়ে উঠতে পারতেন। সেই বিরোধের সঙ্গে ধর্মীয় আতঙ্ক কিংবা জাদুবিদ্যা সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাস মিশে গেলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলার পরিবেশ তৈরি হতে পারত।

তবে ডাইনি শিকারের ইতিহাসকে শুধু স্পষ্টভাষী নারীদের নিপীড়নের ইতিহাস হিসেবে দেখাও যথাযথ নয়। অভিযোগের পেছনে সম্পত্তি, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক বিরোধ, স্থানীয় রাজনীতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসসহ নানা কারণ কাজ করেছে। অঞ্চলভেদে অভিযুক্তদের সামাজিক পরিচয় ও পরিস্থিতিও ছিল ভিন্ন।

৫. বাঁ হাতে লেখা বা কাজ করা
বাঁ হাতে লেখেন, খাবার খান কিংবা দৈনন্দিন কাজ করেন? বর্তমান বিশ্বে এটি মানুষের স্বাভাবিক শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি। কিন্তু ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বাঁ দিককে ঘিরে নেতিবাচক ধারণা ও প্রতীকী অর্থ প্রচলিত ছিল।

ইংরেজি sinister শব্দটির লাতিন উৎসের অর্থ ছিল ‘বাম’ বা ‘বাঁ দিক’; পরবর্তী ব্যবহারে শব্দটি অশুভ বা ভয়ংকর অর্থও ধারণ করে। ভাষার এই ইতিহাস বাঁ দিক সম্পর্কে পুরোনো নেতিবাচক ধারণার একটি উদাহরণ।

তবে বাঁহাতি হলেই সপ্তদশ শতকে কাউকে ডাইনি হিসেবে চিহ্নিত করা হতো—এমন সাধারণ নিয়ম ছিল না। বরং সমাজের প্রচলিত ধারণা থেকে কোনো ব্যক্তির ভিন্নতা, তার বিরুদ্ধে থাকা গুজব কিংবা স্থানীয় কুসংস্কার একসঙ্গে কাজ করলে সেই পার্থক্যকে সন্দেহের পক্ষে ব্যবহার করা হতে পারত।

৬. অজানা রোগে আক্রান্ত হওয়া, কিংবা অন্যদের চেয়ে সুস্থ থাকা
গ্রামে হঠাৎ অসুস্থতা ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ খিঁচুনিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, কেউ অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছেন, আবার কারও আচরণে দেখা দিচ্ছে আকস্মিক পরিবর্তন। কিন্তু রোগের কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে কখনো কখনো অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের আশ্রয় নিত।

অতীতে রোগের বহু কারণ মানুষের অজানা ছিল। ফলে কিছু অস্বাভাবিক শারীরিক বা মানসিক উপসর্গকে অভিশাপ, অশুভ আত্মা কিংবা জাদুবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত করা হতো। কোনো রোগ ছড়িয়ে পড়ার পরও কেউ সুস্থ থাকলে, বিশেষ করে তার সঙ্গে অন্যদের বিরোধ থাকলে, তাকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হতে পারত।

তবে শুধু অসুস্থ হওয়া বা সুস্থ থাকার কারণে কাউকে ডাইনি বলা হতো—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অনিশ্চয়তা ও ভয়ের সময় কিছু মানুষ কীভাবে প্রমাণের বদলে কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করত।

৭. অন্যদের তুলনায় অসাধারণ দক্ষতা বা সাফল্য থাকা
আপনার বাগানে অন্যদের চেয়ে বেশি ফসল হয়। আপনি রান্নায় দক্ষ, পশুপালনে অভিজ্ঞ কিংবা এমন কোনো কাজ জানেন, যা আশপাশের অনেকের অজানা। এসবই আপনার পরিশ্রম, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ফল হতে পারে। কিন্তু কুসংস্কারে আচ্ছন্ন পরিবেশে ব্যতিক্রমী সাফল্যও কখনো সন্দেহের জন্ম দিতে পারত।

ধরুন, আপনার জমিতে ভালো ফসল হয়েছে, অথচ পাশের জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। বাস্তবে মাটি, আবহাওয়া, বীজ কিংবা পরিচর্যার পার্থক্য এর কারণ হতে পারে। কিন্তু আগে থেকেই আপনার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন এমন কেউ ঘটনাগুলোর মধ্যে অযৌক্তিক সম্পর্ক খুঁজে নিতে পারেন।

কোনো ব্যক্তির সাফল্যকে অন্যের দুর্ভাগ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এই প্রবণতা গুজব ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করে। বিশেষ করে যখন সমাজে জাদুবিদ্যা সম্পর্কে ভয় ও অবিশ্বাস আগে থেকেই সক্রিয় থাকে।

৮. প্রতিবেশীর সঙ্গে তর্ক কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতা
ডাইনি শিকারের ইতিহাসে ব্যক্তিগত বিরোধ ও পারস্পরিক অভিযোগের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহ তৈরির জন্য সব সময় ব্যতিক্রমী আচরণের প্রয়োজন হতো না; কখনো কখনো প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারত।

ধরুন, গ্রামের একজনের সঙ্গে আপনার তর্ক হয়েছে। কয়েক দিন পর তার গবাদিপশু মারা গেল কিংবা ফসল নষ্ট হলো। তিনি যদি বিশ্বাস করেন যে আপনি তাকে অভিশাপ দিয়েছেন, তাহলে ওই দুর্ভাগ্যের জন্যও আপনাকে দায়ী করার চেষ্টা করতে পারেন।

বাস্তবে তর্কের সঙ্গে গবাদিপশুর মৃত্যু বা ফসলহানির কোনো সম্পর্ক না-ও থাকতে পারে। কিন্তু গুজব, সন্দেহ এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষ একত্র হলে সাধারণ ঘটনাও অভিযোগের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই ডাইনি বিচারের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে—অভিযোগ সব সময় কোনো বাস্তব অপরাধের প্রমাণের ওপর নির্ভর করত না। কখনো কখনো মানুষের পারস্পরিক অবিশ্বাসই নিরীহ কাউকে বিপদের মুখে ঠেলে দিত।

৯. অদ্ভুত স্বপ্ন দেখা কিংবা স্বপ্নের কথা অন্যকে বলা
এক রাতে আপনি স্বপ্ন দেখলেন, আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছেন কিংবা এমন কাউকে দেখলেন, যার সঙ্গে বাস্তবে কখনো দেখা হয়নি। সকালে সেই স্বপ্নের কথা বন্ধুদের বললেন। বর্তমান সময়ে এটি নিছক কৌতূহলোদ্দীপক গল্প হতে পারে। কিন্তু অতীতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সমাজে নানা বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

কিছু মানুষ স্বপ্নকে ভবিষ্যতের সংকেত, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা কিংবা অদৃশ্য জগতের সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবে দেখতেন। তবে এসব ধারণা অঞ্চল, ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও লোকজ সংস্কৃতি অনুযায়ী ভিন্ন ছিল।

শুধু অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার কারণে কাউকে ডাইনি হিসেবে অভিযুক্ত করা হতো—এমন সর্বজনীন ঐতিহাসিক নিয়ম ছিল না। কিন্তু আপনার স্বপ্নের গল্প যদি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে আগে থেকেই ছড়িয়ে থাকা গুজব কিংবা অশুভ বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যেত, তাহলে সেটির ভুল ব্যাখ্যা হওয়ার আশঙ্কা থাকত।

১০. অন্যদের চেয়ে আলাদা জীবনযাপন করা
এই তালিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—কখনো কখনো কোনো বিশেষ কাজের চেয়ে একজন মানুষের সামাজিক অবস্থান ও পরিচিত নিয়মের বাইরে থাকা বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারত।

আপনি হয়তো একা থাকতে পছন্দ করেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে কম মেলামেশা করেন, আপনার পোশাক বা কথাবার্তা অন্যদের থেকে আলাদা। এসবের কোনোটিই অপরাধ নয়। কিন্তু ছোট সম্প্রদায়ে পরিচিত রীতিনীতি থেকে বিচ্যুত কাউকে ঘিরে সন্দেহ তৈরি হলে তার সাধারণ আচরণও নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে।

আগে থেকেই কোনো অভিযোগ থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারত। একজনের মুখে ছড়ানো কথা অন্যের কাছে নতুন রূপ নিত, আর সময়ের সঙ্গে গুজবই যেন প্রমাণের বিকল্প হয়ে দাঁড়াত। অভিযোগের মুখে পড়া ব্যক্তির পক্ষে নিজের নির্দোষিতা প্রতিষ্ঠা করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারত।

অতীতের ডাইনি শিকার আজও যে প্রশ্ন রেখে যায়
সপ্তদশ শতকের ডাইনি শিকারের ইতিহাস শুধু অতীতের কুসংস্কারের গল্প নয়। এটি দেখায়, ভয়, সামাজিক বৈষম্য, ধর্মীয় আতঙ্ক, ব্যক্তিগত শত্রুতা ও গুজব একসঙ্গে কাজ করলে কীভাবে নিরীহ মানুষ নিপীড়নের শিকার হতে পারেন।

তবে মনে রাখা জরুরি, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার সব অঞ্চলে ডাইনি বিচার একইভাবে পরিচালিত হয়নি। সময়, স্থান, বিচারব্যবস্থা ও সামাজিক পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযোগের ধরন এবং তার পরিণতিও ভিন্ন ছিল। একইভাবে তালিকায় থাকা প্রতিটি আচরণই ডাইনি অভিযোগের স্বীকৃত বা প্রচলিত কারণ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও ইতিহাসকে অতিসরল করে দেখা হবে।

এই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অজানা কোনো ঘটনা ঘটলেই তার পেছনে অশুভ শক্তি বা ষড়যন্ত্র খুঁজে নেওয়া বিপজ্জনক। কোনো ব্যক্তির ভিন্নতা, অসুস্থতা, মতামত কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধকে অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। যুক্তি, প্রমাণ ও মানবিকতার বদলে যখন গুজব ও অন্ধবিশ্বাস সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, তখন সমাজের যে কেউ অন্যায়ের শিকার হতে পারেন।

চারশ বছর আগের সেই অন্ধকার সময় পেরিয়ে এসেছে পৃথিবী। কিন্তু কাউকে না বুঝেই সন্দেহ করা, গুজবের ভিত্তিতে বিচার করা কিংবা ভিন্নতার কারণে কাউকে অপছন্দ করার প্রবণতা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। তাই ডাইনি শিকারের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়—কোনো মানুষকে অভিযুক্ত করার আগে প্রমাণের গুরুত্ব বোঝা এবং তার প্রতি ন্যায্য আচরণ নিশ্চিত করা শুধু আধুনিক মূল্যবোধ নয়, মানবিক সমাজেরও অপরিহার্য শর্ত।

কালের আলো/এএএন/জেএন

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে বৃষ্টি, কমতে পারে গরম

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:১২ অপরাহ্ণ
ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে বৃষ্টি, কমতে পারে গরম

দেশের আট বিভাগেই আগামী কয়েক দিন বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ প্রশমিত হওয়ার পাশাপাশি দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ভারতের অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করে বর্তমানে অন্ধ্র প্রদেশ ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছে। ঘূর্ণিঝড়টি আরও উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমশ দুর্বল হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী পাঁচ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবিরের দেওয়া পূর্বাভাসে এসব তথ্য জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার আট বিভাগেই বৃষ্টির সম্ভাবনা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৯টার মধ্যে রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় পাবনা, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও বরিশাল জেলাসহ ঢাকা, খুলনা, ময়মনসিংহ এবং সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু তাপপ্রবাহ প্রশমিত হতে পারে। পাশাপাশি সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমার সম্ভাবনা রয়েছে।

শুক্রবার কয়েক বিভাগে বৃষ্টি বাড়তে পারে
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায়ও দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। অন্যদিকে ঢাকা, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এদিন সারা দেশে তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

শনিবার বৃষ্টি সীমিত হতে পারে কয়েক বিভাগে
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং ময়মনসিংহ, খুলনা ও সিলেট বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আকাশ আংশিক মেঘলা থাকলেও আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকতে পারে। এদিন সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই।

রোববার খুলনা বিভাগে বৃষ্টির আভাস
রোববার (১ নভেম্বর) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগের দুয়েক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের অন্যান্য এলাকায় আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে এবং আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

পাঁচ দিন পর তাপমাত্রা কমার সম্ভাবনা
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন পর সারা দেশে তাপমাত্রা কমতে পারে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বৃষ্টি হলেও তাপমাত্রার পরিবর্তন সীমিত থাকতে পারে। ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের অবস্থান ও গতিপথের প্রেক্ষাপটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে কোন এলাকায় কখন বৃষ্টি হবে, তা আবহাওয়ার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তাই বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় চলাচলের সময় স্থানীয় আবহাওয়ার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

কিংবদন্তি অ্যান্ডারসনের বিদায়ে ‘অসম্মান’, ল্যাংকাশায়ারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ব্রড

ক্রীড়া ডেস্ক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:১১ অপরাহ্ণ
কিংবদন্তি অ্যান্ডারসনের বিদায়ে ‘অসম্মান’, ল্যাংকাশায়ারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ব্রড

ইংল্যান্ডের ক্রিকেটে ২৬ বছরের স্মৃতি, অসংখ্য সাফল্য আর রেকর্ডের সঙ্গী। অথচ ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে জেমস অ্যান্ডারসনকে প্রাপ্য সম্মানটুকুও দেওয়া হয়নি—এমন অভিযোগ তুলেছেন তাঁর দীর্ঘদিনের সতীর্থ স্টুয়ার্ট ব্রড। অভিজ্ঞ এই পেসারের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাউন্টি ক্লাব ল্যাংকাশায়ার। ক্লাবটির এমন সিদ্ধান্তকে ‘অসম্মানজনক’ বলে সমালোচনা করেছেন ব্রড।

ইংল্যান্ডের হয়ে দীর্ঘদিন একসঙ্গে বল হাতে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের শাসন করেছেন অ্যান্ডারসন ও ব্রড। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সফল এই পেস জুটির অর্জন ১ হাজার উইকেটেরও বেশি। সেই জুটির অন্যতম সদস্য অ্যান্ডারসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ল্যাংকাশায়ারের সিদ্ধান্ত তাই নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

‘কিংবদন্তিদের আরও ভালোভাবে বিদায় জানানো উচিত’
‘ফর দ্য লাভ অব ক্রিকেট’ পডকাস্টে ল্যাংকাশায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন ব্রড। তাঁর মতে, অ্যান্ডারসনের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটারের সঙ্গে বিষয়টি আরও সম্মানজনকভাবে সামলানো উচিত ছিল।

ব্রড বলেন, “ল্যাংকাশায়ারের সিদ্ধান্তটা আমার ভালো লাগেনি। বিষয়টি যথাযথভাবে হয়নি। আমার মনে হয়েছে, এটা অসম্মানজনক। খেলাটির কিংবদন্তি বা সেরাদের আরও ভালোভাবে বিদায় জানানো উচিত।”

শুধু চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্তই নয়, বিষয়টি যেভাবে পরিচালনা করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইংল্যান্ডের সাবেক এই পেসার। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে ক্লাবের নেতৃত্বের আরও সক্রিয় ভূমিকা থাকা উচিত ছিল।

ব্রডের ভাষায়, “এমন সিদ্ধান্ত ক্লাবটির নেতৃত্বের অভাবকে সামনে এনেছে। বিষয়টি সঠিকভাবে করার মানসিকতারও অভাব প্রকাশ করে। পল ফারব্রেস নতুন, কিন্তু ক্লাবের চেয়ারম্যান কোথায়? পরিচালনা পর্ষদ কোথায়? তাদের তো নিশ্চিত করা উচিত ছিল, কাজটি আরও ভালোভাবে হচ্ছে।”

রেকর্ড গড়া জুটির এক সদস্য এখনো খেলতে চান
অ্যান্ডারসন ও ব্রডের সম্পর্ক কেবল সতীর্থের নয়; ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটের বহু স্মরণীয় সাফল্যের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তাঁদের নাম। দুজনের জুটিতে এসেছে ১ হাজার ৩৯টি টেস্ট উইকেট, যা টেস্ট ইতিহাসে কোনো বোলিং জুটির সর্বোচ্চ সংগ্রহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অ্যান্ডারসনের উইকেটসংখ্যা ৯৯১। অন্যদিকে ব্রড ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিয়েছেন ৮৪৭ উইকেট। দীর্ঘ সময় ধরে ইংল্যান্ডের বোলিং আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়া এই দুই পেসার নিজেদের ধারাবাহিকতা ও সাফল্যে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন।

তাই অ্যান্ডারসনের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুধু একটি কাউন্টি ক্লাবের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তাঁর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অর্জন এবং এখনো খেলার সামর্থ্য—দুটিই সামনে আসছে।

অ্যান্ডারসনেরও হতাশা, তবে শুভকামনা ক্লাবকে
ল্যাংকাশায়ারের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন অ্যান্ডারসন নিজেও। তবে ক্লাবটির খেলোয়াড় ও সমর্থকদের প্রতি শুভকামনা জানিয়েছেন তিনি। ইংল্যান্ডের এই কিংবদন্তি পেসার বলেন, “সিদ্ধান্তটা যদি আমার হাতে থাকত, তবে শেষটা অন্তত এভাবে হতো না। তবে ক্লাবটির খেলোয়াড় ও সমর্থকদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।”

অ্যান্ডারসন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবসরের ঘোষণা দেননি। ফলে তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ার এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বরং কাউন্টি ক্রিকেটে নতুন কোনো দলের হয়ে তাঁকে দেখা যেতে পারে—এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েকটি কাউন্টি ক্লাব তাঁকে দলে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

৪৪ বছরেও থামতে চান না অ্যান্ডারসন
বয়স ৪৪ বছর হলেও অ্যান্ডারসনের বোলিং সামর্থ্য নিয়ে আশাবাদী ব্রড। তাঁর মতে, অভিজ্ঞ এই পেসারের এখনো ক্রিকেটকে দেওয়ার মতো অনেক কিছু রয়েছে।

ব্রড বলেন, “অনেক ক্লাবই তাকে চাইবে। তিনি এখনো অনেক কিছু দিতে পারেন। এখনো দেশের অন্যতম সেরা বোলার তিনি।”

গত মৌসুমে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ৫০ উইকেট নিয়েছেন অ্যান্ডারসন। ল্যাংকাশায়ারের অধিনায়কত্বও করেছেন তিনি। তবে ভবিষ্যতের দল গঠনের পরিকল্পনা সামনে রেখে অভিজ্ঞ এই পেসারকে ছাড়াই এগোতে চায় ক্লাবটি। নতুন ক্রিকেট পরিচালক পল ফারব্রেসের পরিকল্পনায় অ্যান্ডারসনকে না রাখার সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন না করার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বিদায়ের মঞ্চ কি অন্য কোথাও?
অ্যান্ডারসনের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারের শেষটা কেমন হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। ল্যাংকাশায়ারের সঙ্গে সম্পর্কের এই অধ্যায় শেষ হলেও ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেননি তিনি। অন্য কোনো কাউন্টি ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ তৈরি হলে তাঁর ক্যারিয়ার আরও দীর্ঘ হতে পারে।

তবে ব্রডের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে অন্য একটি প্রশ্ন—দীর্ঘদিনের সাফল্য ও অবদানের পর একজন কিংবদন্তি ক্রিকেটারকে বিদায় জানানোর ক্ষেত্রে ক্লাবের আরও সংবেদনশীল হওয়া উচিত ছিল কি না। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, অ্যান্ডারসনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের চেয়েও সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন তাঁকে বেশি হতাশ করেছে।

ল্যাংকাশায়ারের সিদ্ধান্তে অ্যান্ডারসনের সামনে নতুন পথ খুলবে, নাকি এটিই তাঁর দীর্ঘ কাউন্টি ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেবে—সেদিকেই এখন নজর ক্রিকেটপ্রেমীদের।

কালের আলো/এএএন/জেএন

প্রবৃদ্ধি আছে, স্বস্তি নেই—মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক চাপে ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক , কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৬ অপরাহ্ণ
প্রবৃদ্ধি আছে, স্বস্তি নেই—মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক চাপে ট্রাম্প

অর্থনীতির সূচকে ইতিবাচক বার্তা, কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন এমন এক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সংকটের মুখে, যেখানে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ও ভোটারদের অভিজ্ঞতার মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান। কর্মসংস্থান ও শেয়ারবাজারের চিত্র আশাব্যঞ্জক হলেও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, জ্বালানি ব্যয় এবং সংসারের বাড়তি খরচ নিয়ে অসন্তোষ কাটছে না মার্কিন নাগরিকদের।

মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে এই ব্যবধান ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি সামাল দিতে না পারায় সেই প্রতিশ্রুতি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।

অর্থনীতির সামগ্রিক সূচক ভালো থাকলেই যে সাধারণ মানুষ সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট থাকবেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিস্থিতি যেন সেই ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

সূচকে ইতিবাচক চিত্র, মানুষের মনে অসন্তোষ
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি একেবারে খারাপ নয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ২ দশমিক ২ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। শেয়ারবাজারও রয়েছে প্রায় রেকর্ড উচ্চতার কাছাকাছি।

ট্রাম্প প্রশাসন এসব সূচককে নিজেদের নীতির সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। প্রেসিডেন্টের দাবি, জো বাইডেনের কাছ থেকে তিনি দুর্বল অর্থনীতি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন। তাঁর প্রশাসনের নীতির কারণে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

তবে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্যের হিসাব ভিন্ন। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কত, গাড়িতে জ্বালানি ভরতে কত খরচ হচ্ছে কিংবা মাস শেষে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য বিল পরিশোধের পর হাতে কত টাকা থাকছে—এসব বিষয়ই তাদের সন্তুষ্টি নির্ধারণ করছে। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতি এগোলেও সেই অগ্রগতির সুফল পরিবারগুলোর দৈনন্দিন ব্যয়ে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

দাম বাড়ছে, মজুরি পিছিয়ে
ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য সংকটের অন্যতম কারণ আয় ও ব্যয়ের মধ্যকার ব্যবধান। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে ৩ শতাংশ। অন্যদিকে পণ্যের দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। এর অর্থ, গড় মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যবৃদ্ধির হারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

এখানেই মূল্যস্ফীতি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের ব্যাখ্যা এবং সাধারণ মানুষের উপলব্ধির পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়; বরং দাম আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়তে পারে। কিন্তু যেসব পরিবারকে প্রতিদিন বেশি দামে খাবার, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হচ্ছে, তাদের কাছে এই পার্থক্য খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।

ডেমোক্র্যাটদের প্রবীণ জরিপকারী সেলিন্ডা লেকের মতে, অর্থনীতিবিদ ও ভোটাররা মূল্যস্ফীতির বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখেন। অর্থনীতিবিদদের কাছে মূল্যবৃদ্ধির গতি কমা ইতিবাচক সংকেত হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক সময় থাকে, দাম কমে আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের এই দূরত্বই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

শুল্কনীতি ও ইরান সংঘাত বাড়াচ্ছে চাপ
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব নীতিরও ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন কয়েকজন অর্থনীতিবিদ। বিশেষ করে আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি আমদানি পণ্যের ব্যয় বাড়ানোর বিতর্ক তৈরি করে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, এসব শুল্কের কারণে ভোক্তা পণ্যের দাম প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে।

পরবর্তী সময়ে কিছু শুল্ক স্থগিত করা, নতুন বাণিজ্য চুক্তি এবং শুল্ক আরোপে জরুরি ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বাধার কারণে সম্ভাব্য প্রভাব কিছুটা সীমিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার চাপ পড়ে পেট্রলের দামে। আর যুক্তরাষ্ট্রের বহু পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের সঙ্গে গাড়ি ও জ্বালানির খরচ সরাসরি জড়িত। ফলে জ্বালানির দাম বাড়া মানে শুধু গাড়ি চালানোর ব্যয় বৃদ্ধি নয়; পরিবহন ও পণ্য সরবরাহের খরচের মাধ্যমেও তা বৃহত্তর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ পিটার মরিসি শুল্কনীতি ও যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবকে মূল্যস্ফীতির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে না।

বাইডেনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছেন ট্রাম্প?
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০২৪ সালে জো বাইডেনের প্রশাসনের অভিজ্ঞতার মিল রয়েছে। তখনও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির কয়েকটি সূচক শক্তিশালী থাকলেও মূল্যস্ফীতি নিয়ে জনঅসন্তোষ বাইডেন প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠেছিল।

তবে দুই প্রশাসনের পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে। বাইডেনের সময় করোনা মহামারির পর সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নসহ বৈশ্বিক নানা কারণ মূল্যস্ফীতিকে প্রভাবিত করেছিল। অন্যদিকে ট্রাম্পের সময় শুল্কনীতি ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন উঠছে।

ট্রাম্পের সহযোগী ও অর্থনৈতিক ভাষ্যকার ল্যারি কুডলো শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের পরিস্থিতিকে প্রশাসনের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু এসব অর্জন সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ কমাতে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতির সামগ্রিক অগ্রগতির দাবি রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট হবে কি না, তা নির্ভর করছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফেরানোর ওপর।

ভোটারদের মন জয়ে নতুন উদ্যোগ
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ কমাতে হোয়াইট হাউস কর হ্রাস, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং প্রেসক্রিপশনের ওষুধের ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপকে সামনে আনছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারে সীমা আরোপের প্রস্তাব দিয়েছেন।

এ ছাড়া রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিন নাগরিকদের পাঁচ হাজার ডলার দেওয়ার একটি ধারণাও আলোচনায় এসেছে। তবে এ ধরনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে কি না, তা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সংশ্লিষ্ট নীতির ওপর নির্ভর করবে।

এসব উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু অর্থনৈতিক চাপ কমানো নয়, ভোটারদের কাছে প্রশাসনের কার্যকারিতার বার্তা পৌঁছে দেওয়াও। কারণ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ বাড়লে প্রবৃদ্ধি বা শেয়ারবাজারের সাফল্যের যুক্তি অনেক সময় যথেষ্ট হয় না।

শেষ পর্যন্ত নির্ধারক হবে মানুষের অভিজ্ঞতা
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির ইতিবাচক পরিসংখ্যানকে মানুষের বাস্তব জীবনের স্বস্তিতে রূপান্তর করা। প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ভালো চিত্র প্রশাসনের পক্ষে যুক্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও ঋণের খরচ নিয়ে অসন্তোষ থাকলে সেই যুক্তির প্রভাব সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

বাইডেন প্রশাসন অর্থনৈতিক সূচক ও জনমতের মধ্যকার ব্যবধান দূর করতে পারেনি—এমন মূল্যায়ন থেকে ট্রাম্পও পুরোপুরি মুক্ত নন। বরং নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রশ্নে তাঁর ওপর প্রত্যাশার চাপ আরও বেশি।

শেষ পর্যন্ত ভোটাররা শুধু অর্থনীতি কতটা বড় হচ্ছে, তা দেখবেন না; বরং সেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি তাদের নিজেদের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনছে, সেটিও বিবেচনা করবেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন