বিশ্বস্ত অভিভাবক দেশনেত্রীর চিরবিদায়
এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান, অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো:
বেগম খালেদা জিয়া। আপসহীনতার প্রতীক। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের প্রয়োজনে হাল ধরেছিলেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। লাজুক গৃহবধূ থেকে সময়ের প্রয়োজনে আশির দশকেই হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান মুখ। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখে পেয়েছিলেন ‘আপসহীন নেত্রী’র খ্যাতি-উপাধি। নীতির প্রশ্নে কখনও আপস করেননি। দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে হয়েছেন কখনও কারাবন্দি কখনও গৃহবন্দি। তার ‘আপসহীন’ তকমাটি কাগুজে নয় বরং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। তিনি প্রমাণ করেছেন নেতৃত্ব জন্মসূত্রে নয় বরং সঙ্কটেই তাঁর জন্ম।
স্বামী-সন্তান হারানোর বেদনা ছিল তাঁর জীবনে। কঠিন লড়াই-সংগ্রামের গল্প যেমন ছিল তেমনি সাফল্যমণ্ডিতও করেছেন নিজেকে। তার ওপর চাপানো হয়েছিল মামলার পাহাড়। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় রাজনীতি, প্রতিরোধ ও প্রত্যয়ের যেন এক মহাকাব্যিক দলিল। ভোট রাজনীতিতে জীবনভর অপরাজিত থেকেছেন, হারেননি কখনও। কিন্তু মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় জীবনের কাছে হেরে গেলেন। টানা ৩৭ দিন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে দেশবাসীকে কাঁদিয়ে দেশের মাটিতেই ত্যাগ করলেন শেষ নি:শ্বাস। যে দেশই ছিল তাঁর কাছে একমাত্র ঠিকানা। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চিরবিদায় জানালেন দেশনেত্রী জাতির বিশ্বস্ত অভিভাবক বেগম খালেদা জিয়া (৮০)। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস ও কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন।
‘মাইনাস টু ফর্মুলার’ এক-এগারোর জরুরি সরকারের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা এবং বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করা বেগম খালেদা জিয়ার জীবন প্রকৃত অর্থেই এক ত্যাগের মহাকাব্য। বিজয় মাসের শেষ মুহুর্তে তাঁর মৃত্যুতে দলমত নির্বিশেষে কাঁদছে সবাই। শোকস্তব্ধ দেশে দলীয় নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সমর্থক ও সাধারণ মানুষও বাকরুদ্ধ। বিএনপি চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে দলটি। এছাড়া তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও আগামীকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। তাঁর জানাজা আগামীকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বাদ জোহর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও এর সংলগ্ন মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। তাঁকে তাঁর স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে দাফন করা হবে। তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসছেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ ইসহাক দার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের মন্ত্রী ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা এই জানাজায় উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। শোকের সঙ্গে চলছে তার রাজনৈতিক জীবনের অবিচলতা নিয়ে নানামুখী স্মরণ।
শোকার্ত কণ্ঠ প্রধান উপদেষ্টার, একটি যুগের বিদায়, শোকাহত বিশ্বনেতারাও
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এভারকেয়ার হাসপাতালে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মির্জা ফখরুল কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা আবারও আশা করছিলাম আগের মতোই তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। কিন্তু আজ ভোর ৬টায় আমাদের গণতন্ত্রের মা, আমাদের অভিভাবক, আমাদের জাতির অভিভাবক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’ এদিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূস শোকার্ত হৃদয় নিয়ে বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতি এক মহান অভিভাবককে হারিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের পুরো জাতি গভীর শোক ও বেদনায় নিস্তব্ধ। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির শীর্ষ নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর আমাদের মাঝে নেই। তার ইন্তেকালে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত।’

রাজনীতির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেওয়া নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে গভীরভাবে শোকে মুহ্যমান দেশবাসী মনে করে-তাঁর সক্রিয় রাজনৈতিক জীবন অবসান কার্যত কোনো মৃত্যুশোক নয়। এটি একটি যুগের বিদায়। মহাকাব্যিক সংগ্রামের নীরব সমাপ্তির বেদনাময় দলিল। তিনি আর থাকবেন না রাজপথে কিংবা সভামঞ্চে মাইক্রোফোনের সামনে। কিন্তু তিনি চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন দেশের রাজনৈতিক স্মৃতির প্রতিটি স্তরে, দেশের মানুষের হৃদমাঝে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংকটে অনুভূত হবে তাঁর গভীর শূন্যতার।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ বিশ্ব নেতাদের অনেকে শোক জানিয়েছেন। শোক জানিয়ে বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শোক জানানো হয়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন। শোক প্রকাশ করেছেন দলটির সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গওে। খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীও।
জাতীয় নির্বাচনে ভোটে কখনও পরাজিত হননি
জাতীয় নির্বাচনে ভোটে কখনও পরাজিত হননি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি পাঁচটি পৃথক আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিনটি আসনেই জয়ী হয়েছেন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, ফেনী-১ ও চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে জয়লাভ করেন। ১৯৯৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হন ফেনী-১ আসন থেকে। ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, ফেনী-১, লক্ষ্মীপুর-২ ও চট্টগ্রাম-১ আসন থেকে জয়ী হন। একইভাবে বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, খুলনা-২, ফেনী-১ ও লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিজয়ী হন। বগুড়া-৬, বগুড়া-৭ ও ফেনী-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।

গৃহবধূ থেকে ৪৩ বছরের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন
অবিভক্ত ভারতের দিনাজপুর জেলার জলপাইগুড়িতে জন্ম খালেদা জিয়ার। সময়টা ১৯৪৫ সাল। বাবা ইসকান্দার আলি মজুমদারের চায়ের ব্যবসা ছিল সেখানে। ব্যবসার কথা চিন্তা করেই দেশভাগের সময় সপরিবার বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরে চলে আসেন। যদিও খালেদা জিয়ার আদি বাড়ি বাংলাদেশের ফেনী জেলার ফুলগাজীতে। আর নানার বাড়ি ছিল তৎকালীন উত্তর দিনাজপুরে চাঁদবাড়ি এলাকায়। ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদার বিয়ে হয়। জন্মের সময় তার নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খানম পুতুল। বিয়ের পরে অবশ্য স্বামীর নামের প্রথম দুই অক্ষরকেই পদবী হিসাবে ব্যবহার করেন। পরিচিত ছিলেন খালেদা জিয়া নামেই। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় স্বামী সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের পাশে থাকতে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। বাংলাদেশে ফিরে থাকতে শুরু করেন চট্টগ্রামে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ছয় বছর পরে, ১৯৭৭ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন খালেদার স্বামী জিয়াউর রহমান। তার পরের বছর দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ করতে তৈরি করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পদাধিকার বলে ‘ফার্স্ট লেডি’ হন তার পত্নী খালেদা। সেই প্রথম আপাত অন্তর্মুখী স্বভাবের পুতুল জনসমক্ষে আসেন। তখনও অবশ্য রাজনীতিতে আগ্রহ ছিল না তার। তবে ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তাদের গুলিতে খুন হওয়ার পর মত বদলান খালেদা জিয়া। সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৮২ সালে স্বামীর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ করেন। দলের সহ-সভাপতি হন ১৯৮৩ সালে। গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসে ৪৩ বছর পার করেছেন খালেদা জিয়া। জলপাইগুড়ির সেই সহজ-সরল এবং লাজুক স্বভাবের মেয়েটি হয়ে উঠেন বিশ্বের এক আপহীন নেত্রী। ১৯৮৪ সালের দলের শীর্ষপদে আসীন হন খালেদা জিয়া।

কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array