আলোচনায় প্রচারণায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’
কালের আলো রিপোর্ট:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বাকী এক মাসেরও কম। দীর্ঘ সময় পর ভোট উৎসবের আরাধ্য মাহেন্দ্রক্ষণ। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক মুহূর্ত। এই প্রথম একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। জাতীয় নির্বাচনে ভোট নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা বেশ তৎপর। কিন্তু প্রচারণায় গণভোট যেন ব্রাত্য! এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল স্বয়ং রাজনৈতিক দলগুলোও। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে গণভোটের বিষয়টি আলোচনায় আনার এবং গণভোটের পক্ষে জনমত তৈরির উদ্যোগ নিতেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল তাঁরা। যদিও এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটের প্রচারে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার পক্ষে নিজেদের সরাসরি অবস্থানের কথা জানায়। গণভোট নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির মধ্যে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানানোর মাধ্যমে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিও তাঁর অবস্থান খোলাসা করেছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের অনেকে গণভোটে ‘হ্যাঁ-এর পক্ষে বলছেন। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের ঠিকঠাক বোঝাতে সক্ষম হলে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে ফল আসার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গণভোট বিষয়ে ভোটারদের মাঝে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে প্রচারণায় জোর দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে নির্বাচন ও গণভোট সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিতে ২২ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে ১০টি ভোটের গাড়ি সুপারক্যারাভান। এসব গাড়ি পর্যায়ক্রমে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩০০টি উপজেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছড়িয়ে দিচ্ছে গণতন্ত্রের বার্তা। তৃণমূলে গণভোটের বিষয়ে অস্পষ্টতা দূর করতে মাঠপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা এবং বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিদের প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে।
- ‘নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়া’
অধ্যাপক আলী রীয়াজ
মুখ্য সমন্বয়ক
গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম
গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ। আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে আটটি বিভাগে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা ও অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় ও বিভাগীয় ইমাম সম্মেলন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। ইতোমধ্যেই বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশে বিভাগীয় ইমাম সম্মেলন শেষ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নাগরিক হিসেবে সবার দায়িত্ব গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়া।’

গণভোটে অংশগ্রহণ বাড়াতে নানা কর্মকৌশল প্রণয়ন করে এগোচ্ছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘দেশের মালিকানা জনগণের হাতে তুলে দেয়ার জন্যই গণভোট।’ সর্বাত্মক প্রচেষ্টার মাধ্যমে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে উপদেষ্টা উঠান বৈঠকের পাশাপাশি নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সমন্বয় বৃদ্ধিতেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে কর্মশালা করছেন। সিলেটে এসব কর্মসূচিতে তিনি জুলাই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য দেশের টেকসই পরিবর্তন চাইলে গণভোটে অংশগ্রহণ করা সকল সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন। গত রোববার (১১ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত নাগরিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও নগর উন্নয়ন বিষয়ক অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, রাষ্ট্রের সংস্কার চাইলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে গণভোটে যেতে হবে এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট না দিলে সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে না।
- ‘হ্যাঁ’ ভোট না দিলে সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে না
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
উপদেষ্টা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়
গণভোট নিয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে সরকারি উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এসব প্রচারণার মাধ্যমে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিংমেকার হিসেবে বিবেচিত তরুণ ভোটাররা উৎসাহী হচ্ছে। গণভোট সফল করতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ৬৪ জেলা ও চারটি উপজেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে প্রচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে গণভোটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটার, তরুণ প্রজন্ম, নারী ভোটার ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভোটারদের উৎসাহিত করতে অঞ্চলভিত্তিক জনপ্রিয় সংগীত তৈরি ও প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ‘ভোটালাপ’ ও ‘টেন মিনিট ব্রিফ’ কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে গণভোট বিষয়ে প্র্যাকটিক্যাল ডেমোনেস্ট্রেশন দেখানো হবে।

গণভোট সম্পর্কে বেশিরভাগ সাধারণ ভোটারের সুস্পষ্ট কোন ধারণা নেই। হ্যাঁ ভোটে কী হবে আর না ভোটে কী হবে, এখনো বুঝে উঠতে পারেনি অনেকেই। আর কেনই বা একসঙ্গে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট এ নিয়েও দ্বিধায় রয়েছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে জনসচেতনতা তৈরি করে ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের মাধ্যমে গণভোট সফল করার সরকারের চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে কাজ করছেন তথ্য ও সম্প্রচার সচিব মাহবুবা ফারজানা। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ ও রাজশাহী কলেজে নারী ভোটার এবং প্রথমবারের ভোটারদের জন্য তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত ‘গণভোট ও নির্বাচন ২০২৬ প্রচারণা’ অনুষ্ঠানে গণভোটের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন তিনি। তথ্য ও সম্প্রচার সচিব বলেছেন, ‘দীর্ঘ সময় একটা কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে আমরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারিনি। অনেকদিন পর একটি গণভোটের মাধ্যমে আমরা সেই অধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছি, অর্থাৎ সংস্কারের দিকে যাচ্ছি। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইলে গণভোটে হ্যাঁ বলতে হবে।’
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে গত অক্টোবরে তৈরি করা হয় জুলাই জাতীয় সনদ। এই সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে হবে গণভোট। এই ৪৮ প্রস্তাবকে চারটি বিষয়ে ভাগ করে গণভোটের প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে রাজশাহীতে সচিব বলেন, গণভোট হচ্ছে গণতান্ত্রিক উপায়ে নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া, গণভোটে চারটি প্রশ্ন রয়েছে, যে চারটি প্রশ্নের মধ্যে ১১-১২টি বিষয় রয়েছে। এরপর গণভোটের বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করে সচিব বলেছেন, ‘গণভোটের বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো, দশ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবে না; কেউ ইচ্ছেমতো সংবিধান সংস্কার করতে পারবে না- সংবিধান সংশোধনে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটতে হবে; গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আবার একটি গণভোট হবে; সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়বে-দেশে এ মুহূর্তে অর্ধেকের বেশি নারী রয়েছে, আমাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে; ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য সংসদে একটি উচ্চকক্ষ ও একটি নিম্নকক্ষ থাকবে; দেশের বিচার ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হতে হবে অর্থাৎ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হতে হবে; নাগরিকের মৌলিক অধিকার ইন্টারনেট সেবা কখনো বন্ধ হবে না; জনগণের মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করতে পারবেন না; কেবলমাত্র ভুক্তভোগী ক্ষমা করতে পারবেন। মাহবুবা ফারজানা বলেন, এসব সংস্কারের জন্য লিখিত দলিল হচ্ছে জুলাই সনদ। আমরা এসেছি একটি ন্যায্যতার জন্য, যেন দেশটা সুন্দরভাবে চলে।’

- কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইলে গণভোটে হ্যাঁ বলতে হবে
মাহবুবা ফারজানা
সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়
অংশগ্রহণকারী নারী ভোটারদের কন্যা, জায়া, জননী উল্লেখ করে সচিব বলেন আপনারা এক একজন পরিবর্তনের মুখপাত্র। আপনারা আপনাদের পরিবার, প্রতিবেশী এবং রাজশাহী জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই বার্তাগুলো ছড়িয়ে দিবেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হ্যাঁ-না ভোট বোঝে না, তাদেরকে হ্যাঁ-না ভোট বোঝাবেন। সচিব বলেন, জেলা তথ্য অফিস ৬৪ টি জেলা, ৪৯৫ টি উপজেলা এবং ৪ হাজার ৫৯৮টি ইউনিয়নে গণভোটের প্রচারে নিবিড় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা আপনাদের সহযোগিতা চাই। আপনাদের সহযোগিতা নিয়ে আমরা সবাইকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। ‘এবারের নির্বাচন হবে ইউনিক এবং শতাব্দীর সেরা নির্বাচন’-প্রধান উপদেষ্টার এই উক্তি উল্লেখ করে এসময় তিনি সকল ভোটারকে ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array