খুঁজুন
                               
, ,
           

নুরুন্নাহার মুন্নির গল্প

জোড়া শালিক আর স্মৃতির ভায়োলিন

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ৩:৩১ অপরাহ্ণ
জোড়া শালিক আর স্মৃতির ভায়োলিন

অথচ লিকলিকে আপাদমস্তক, পাতলা ফ্যাশন, একটু বড় এলোমেলো চুলের হাওয়াই মিঠাইকেই তো আমার বেশ পছন্দ ছিল! প্রতিদিনের অভ্যাসে মফস্বলের সেই পল্লিগ্রাম, দিনে বিশ-পঁচিশবার বিদ্যুতের আসা-যাওয়া, বদরপুর মেলা থেকে কিনে আনা গ্রাম্য রমণীর হাতের কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলা হাতপাখা কিংবা বেতের তৈরি পাখার কদর ছিল অভাবনীয়। চার্জ লাইটের নামটা তখন বেশ নতুন, সন্ধ্যার লগ্ন শুরু আর বিদ্যুতের চোর-পুলিশ খেলার মতোই অবশেষে দূরের দোকানঘরগুলো হ্যাজাকের স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করতো পল্লিগ্রামের সেই স্মৃতির বাগান। সবার ঘরে ঘরে টেলিভিশনও ছিল না। প্রতি শুক্রবার বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে সংশপ্তক নাটক দেখে কান্নায় চোখ ভাসিয়ে কষ্ট নেওয়া। দুপুর আড়াইটায় শাবানা অভিনীত রজনীগন্ধা কিংবা ববিতা অভিনীত স্বরলিপি সিনেমা দেখার জন্য আগেভাগেই ব্যাটারির ব্যবস্থা করে রাখা। যাতে বিদ্যুৎবিভ্রাটেও সমস্যা না হয়। এমন এমন স্মৃতির খনির আদ্যোপন্ত ছিল টলমলে কৈশোর। সেই যে, অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন প্রথম বয়ঃস্বন্ধিকালের গুমোট গন্ধ মেখে, প্রথম ঠোঁটে লিপস্টিক মেখে স্কুলে পরিতোষ স্যারের কড়া বকুনি, শাস্তি, মাথার মাঝখানে সিঁথি এঁকে লম্বা দুই বেনী! স্কুল ড্রেসের ক্রস ওড়নার মাঝখানে ফেলে রাখা বাড়ন্ত দুগ্ধবৃন্ত ছুঁয়ে পড়া অনুভূতি; সেও এখন স্মৃতিতে পলি জমায়।

কুয়াশা জড়ানো বাড়ন্ত সকাল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে গরম হতে থাকে সূর্যের আলিঙ্গনে ধোঁয়া ওড়া স্কুলের মাঠ, বাবার চাকরির সুবাদে জেলা শহর থেকে উপজেলা শহরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামীণ পরিবেশের খোলা হাওয়ায় বেড়ে ওঠা আমার কৈশোরকাল। সবুজের হাতছানি আর মেঠো জীবন যাপনে একদম সরল সাধারণের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে। বংশগত কারণেই মস্তিষ্ক মেধা ধারণে একটু বেশিই সক্ষম ছিল। তখন আমি শ্যামল ছিপছিপে একদম লাজুক একটি মেয়ে। যার বেড়ে ওঠার বয়স আর মেধাবী পরিচয়ের সাথে যুক্ত হতে থাকে এক এক করে অনেক নাম। বন্ধুমহল বড় হতে থাকে। উপস্থিত বক্তৃতায় একবার তাক লাগিয়ে দেওয়া মেয়ে হিসেবে ‘কুড়িতে বুড়ি নয় বিশের আগে বিয়ে নয়’ শিরোনামের পক্ষে বক্তব্য পেশ করে পুরো স্কুলে তথাকথিত বিস্ময় বালিকা হয়ে উঠি। সেই সাথে মুগ্ধ হতে থাকে আমার আশেপাশের বন্ধু-বান্ধব।

গোলাপের পাঁপড়ি মাখানো খামহীন খোলা চিঠি টিফিন পিরিয়ডে একটার পর একটা আসতে থাকে। কখনো বেঞ্চের ওপর ছেড়ে যাওয়া বই-খাতার ভেতর, কখনো বান্ধবীদের হাতের মুঠোয়। এতো এতো ডিজাইনের স্কুল ব্যাগ, ওয়াটার বোতল, রং পেন্সিল, আর্ট পেপারের বাহারি ব্যবহার খুব একটা চোখে পড়েনি। ছিল না বললেই চলে। ছয়টি পাঠ্যবই আর কিছু রাফখাতা বুকের ওপর এক হাতে চেপে স্কুলে যাওয়ার চিত্র এখন স্মৃতির ল্যানটিনে চুম্বনের জীবাশ্মের মতো। কী মোহনীয়তা? কখনো কখনো বন্ধুরা জোড়া শালিক দেখে চেঁচিয়ে উঠতো, কেন উঠতো কখনো জানতে চাইনি। তবে এখনো জোড়া শালিক দেখলে মনের ভেতর সুখ অনুভব হয়। কেন হয় জানি না। হয়তো জানি, হয়তো এ জানার মানেটা ছিল অন্যরকম। রোজকার চিঠির বক্স হয়ে ওঠে আমার বইঘর।

একদিন একটি চিঠি হৃদয়ের সমস্ত মুগ্ধতা চুরি করে নেয়। চমৎকার দৃষ্টিনন্দন হাতের লেখা আর সাবলীল ভাষায় লেখা চিঠির প্রেমে পড়ে মন উন্মাদ হয়ে গেল। সুন্দর হাতের লেখাই কি তবে সে ভালো লাগার প্রথম কারণ? স্কুল ছুটির পর এক দারুণ চঞ্চল মন নিয়ে ছুটছিলাম বাসার পথে। মাঝপথে দুই যুবক দাঁড়ানো দেখে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। দুজনই বেশ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। আমার হাত-পা সব হিম হয়ে আসছিল। জানি না কেন ওইটুকু বয়সে এত অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। একজন লাল শার্ট পরা, সুন্দর বেশ স্নিগ্ধ দেখতে। ডলি সায়ন্তনীর ‘লাল শার্ট পড়া যুবক’ গানটি তখন সুপারহিট। আর একজনের গায়ে ছিল আকাশি রঙের শার্ট, একটু বড় চুল, শ্যামবর্ণের মায়াবী চেহারা, চাহনিতে ছিল নিবিড় মাদকতা।

দাঁড়ানোর স্টাইলটা ছিল অতি আধুনিক। সেই সময়ের আধুনিকতার সবটুকু ছোঁয়া তার আপাদমস্তকে দৃশ্যমান ছিল। এক পলকের মুগ্ধতা কেড়ে নিল মন-প্রাণ। সেদিনের ফর্সা ছেলেটি আমার ভালো লাগার ছায়াও মাড়াতে পারেনি অথচ শ্যামবর্ণের স্বাস্থ্যহীন ছেলেটি আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। তখনো জানতে পারিনি স্কুল থেকে বাড়ির যাত্রা পথে ওই দুই যুবকের এমন উৎসুক আচরণের কী কারণ। রাতে পড়ার টেবিলে বই খুলতেই চোখের সামনে ভেসে এলো গোলাপের পাঁপড়ি মাখা চিঠিটা। একদিকে মা-বাবার শাসনের দৃষ্টি; অন্যদিকে চিঠিপ্রেম। অসম্ভব ভয় আর অন্যরকম দোলাচলে নিমগ্ন ছিল সেই রাত। ওই রাতের প্রেমময় অনুভূতি আজন্মকালের স্মৃতিচিহ্ন আর মোহনীয় কাল হয়ে আছে। ভোর হতেই যেন অপেক্ষা। শুধু ভাবনার এপিঠ-ওপিঠ তেলেভাজা করে রাত কেটে যায়। চিঠির মতোই হবে হয়তো সে, যে এই চিঠিটা লিখেছে! যেমন তার শব্দ চয়ন; তেমনই অপূর্ব হাতের লেখা।

ভাবলাম আর একবার পড়ি চিঠিটা…
ডিয়ার লাবন্য,
হৃদয় এমনই এক অবুঝ, যারে চায় শুধু তাকেই চায়। নাহি মানে কোনো লাজ ভয়। আসলে পৃথিবীর আঙিনায় হাজারো মানুষ বিচিত্র ধরনের মন নিয়ে বাস করে। বিন্দু বিন্দু জলকণার সমন্বয়ে যেমন বিশাল সমুদ্রের সৃৃৃৃৃৃৃষ্টি; তেমনই আবেগ, অনুভূতি, প্রেম, ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের মায়ায় মানুষের জীবনকে সবচেয়ে ব্যাকুল করে তোলে। সৃষ্টির লগ্ন থেকে দেখা যায় মায়ার বন্ধনে পৃথিবীটা আবদ্ধ। আর স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা ও মমতা আছে বলেই মানুষের জীবনে এক উষ্ণ ছোঁয়ার আবেগ ও অনুভূতি কাজ করে।

শুধু একটি কথাই মনে রেখ লাবন্য, মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত পথিক যেমন মরীচিকার পেছনে পেছনে ছুটে হয়রান হয়; তেমনই আমিও বন্ধুত্বের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে নিজের মনটাকে হারিয়ে ফেলেছি শুধু একজনের কাছে। সেটা হলে একমাত্র তুমি। জানি না এর গন্তব্য কোথায় গিয়ে শেষ হয়। তবে এতটুকু বলতে পারি তোমার স্বরলিপির মাধুর্য্য থেকে যেন কোনো দিন বঞ্চিত না হই। তুমি তো একটা কথা জানো যে, লাভ ইজ ভ্যালুয়েবল এসেটস্ হয়েন টু মাইন্ড রিলেশান উইথ ওয়ান কাইন্ড। পুরুষের জীবন যখন জটিলতায় পরিপূর্ণ, প্রাণ যখন ক্লান্তিতে জর্জরিত; ঠিক সেই নিঃস্ব অবস্থায় পুরুষ শান্তি খুঁজে পায় নারীর ভালোবাসায়। প্রেয়সী নারী তার প্রেম ও বন্ধুত্বের মায়ার শেকলে তার মনকে সিক্ত করে তোলে। আমার মতো নগণ্য মানুষের জন্য কি তুমি এত বড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারবে, বলো তো লাবন্য?

আমি একটা নগণ্য গরিব, দুঃখী, আমার জীবনটা দুঃখে জর্জরিত। যাক আমার আশা এবং প্রত্যাশা তুমি আমার দুঃখের ভাগ নেবে।পরিশেষে সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করি, তোমার জীবন হোক ধূপের মতো দহনে দহনে দিতে তৃপ্তি, মঙ্গল হোক তোমার ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা। এই আশা ও প্রত্যাশায়…
ইতি, তোমার কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি ‘ফাহিম’।

চিঠি আদান-প্রদানের কাল দীর্ঘ হতে হতে আমাদের প্রেম গড়াতে থাকে, চোখে নেশা ধরার মতোই এক বেলার মাতাল দৃষ্টির অপেক্ষায় কেটে গেছে আমাদের দুজনের নীলাদ্রি প্রহর। সবচেয়ে বিভীষিকাময় ছিল শুক্রবারটি। স্কুল বন্ধ থাকার কারণে ফাহিমকে দেখতে পেতাম না। বাসায় শুক্রবার নিয়ে হৈ হৈ আমেজ থাকলেও আমার বর্ণিল আকাশে মেঘ জমে থাকতো। দেখা হতো না কারও সাথে কারোর, ফাহিমের পাঠানো শেষ চিঠিটা আমার মনের গভীরে সুঁইফোঁড়ের সেলাইয়ের মতো রক্তাক্ত গিঁট বেঁধে আছে। চিঠিটা মন ও মগজে আজও ভেসে আসে অকারণেই।

আমার মুক্সোল কলি,
হে স্বপ্নের মাধুরী, পৃথিবীর আঙিনায় কোটি কোটি মানুষের প্রেম, প্রীতি, ইতিহাস শুনে সত্যি উল্লসিত মনে তাদের স্বাগত জানাতে ইচ্ছে করে কিন্তু আবার কাঁচের পাত্রের ন্যায় বিলীন হয়ে যায় স্মৃতির পটে আটকে থাকা কথাগুলো। যে আবেগ অতি তাড়াতাড়ি আসে, সে আবেগ বিলীন হতেও অনেক সময় বিলম্ব হয় না। তবে প্রকৃত প্রেম সত্যি যেমন মানব জীবনকে দেয় উৎসর্গ; তেমনই মৃত্যুকেও দেয় মহিমা। আমরা কি পারব সেই সত্যের আদর্শকে রক্ষা করতে? তাছাড়া আমার ভয় হয়, প্রেম ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে অনেকে নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিচয় দিতে ভুলে যায়। তখন টেনশন আর ভাবনা ছাড়া আর কোনো সম্বল থাকে না। পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষ সমান হয়ে জন্ম নেয় না। যেমন তোমার সমান হয়ে আর কেউ…

লাবন্য, তোমার ভাব, ব্যবহার ও চারিত্রিক মাধুর্য সত্যিই আমাকে নিয়ে যায় নিকট থেকে আরও নিকটে। রজনীগন্ধার অনাবিল সৌরভের ছোঁয়া হৃদয় স্পন্দনে জাগরিত হয় বারবার শুধু ওই একটি কারণে সেটা হলো তোমার মধুময় কথা আর ছন্দমাধুর্য চরণগুলো দেখে। একটি নাম, একটি স্মৃতি, একটি মানুষকে কেন্দ্র করেই গঠিত হলো আমার জীবন। আর কী হবে আমার জীবন ইতিহাস শুনে? আমার জীবন ইতিহাস শোনালে হয়তো তোমাকে দুঃখ ছাড়া আর কিছুই উপহার দিতে পারবো না। শুনতে পারবে যখন দুজন থাকবো আরও কাছাকাছি আরও পাশাপাশি। যেখানে থাকবে না কোনো দ্বিধা, থাকবে না কোনো বাধা ও ভয়। লক্ষ্মীটি আমার, প্রতিটি রোজা রাখবে। নামাজ পড়বে। লেখাপড়া চলমানের মতো ধরে রাখবে। মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করবে, যেন শেষপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছতে পারি। পরিশেষে উপরওয়ালার নিকট প্রার্থনা করি, তোমার ভবিষ্যৎ হোক চন্দনের মতো ক্ষয়ে ক্ষয়ে দিতে শান্তি। উত্তর পেতে বিলম্ব হলে নিজেকে অপরাধী মনে করবো।
ইতি, তোমারই ‘ফাহিম’।

এরপর চিঠির জবাব হাতে ফাহিমের সাথে শেষ দেখা, ফাহিম বলেছিল যেখানেই থাকো ভালো থেকো। বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই দেখা হবে। এরপর আর দেখা হয়নি আমাদের। ইউরোপের সেই নিশ্চিন্তে ঘুমানো আইসল্যান্ডবাসী যেমন হঠাৎ উল্কাপিণ্ড ভলকানোর বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল, ভুলতে পারেনি সেই চিরস্থায়ী আঘাতের দাগ। তেমনই ভুলতে পারিনি আমার ভেতরের ছোট দ্বীপ হয়ে বেড়ে ওঠা ফাহিম নামক একটা সম্পর্কের নাম। যে দ্বীপে আলো জ্বলে আজও, নেভে না।

পিরোজপুরে বাবার বদলি আমাদের জীবনের বাঁকবদল করে দিয়েছিল। ওখানে গিয়ে নতুন পরিবেশ, কলেজ জীবনের নিয়ম শৃঙ্খলা, কলেজের বখাটে ছেলেদের উৎপাত, রাজনীতির গরম হাওয়া, আধুনিকতার ছোঁয়া লেগে মেয়েদের অশালীন চলাফেরা, গায়েগায়ে ঘেঁষে উন্মুক্ত মাঠে ঠোঁটের উষ্ণতার মঞ্চে মদ গেলা; সবকিছুই যেন আমার ভাবনার ঋণাত্মক। নৈবেদ্য প্রেম শিখিয়েছিল আমায় ফাহিম। কখনো হাত ছুঁয়ে না দেখলেও হৃদয় ছুঁয়ে যেত প্রতি মুহূর্তে। বৈরী পরিবেশেও মনের ভেতরের জোড়া শালিক খেলে গেছে আমাকে নিয়ে, আনন্দ দিয়ে গেছে, কাঁদিয়েছে। ভেতরের সুতো আলগা করে কেউ কোনদিন হৃদয়টা ছুঁতে পারেনি যার জন্য; সেই নামটা ফাহিম।

পিরোজপুরের কলেজ জীবন শেষ করে ঢাকা মহানগরীতে পড়াশোনার যাত্রা। যৌবনের সিঁড়িতে পা দিয়েছি কিন্তু যৌবনের একেক বসন্ত কেটে গেছে আমার শুধু অপেক্ষায়। ঠিকানাবিহীন দুটো অনন্ত অপেক্ষার যাত্রী হয়ে কাটিয়ে দিয়েছি লক্ষ্য-লক্ষ্য প্রহর। ভালোবাসা আজ মুঠোফোনের চোরাবালিতে আড়ষ্ট সময় পার করে। এখন আর অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয় না। মন চাইলেই ভিডিও কলে দেখতে পায় দুজন দুজনকে। আজ এতটা বছর পর আমার হাতেও স্মার্টফোন। ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি নাম্বারে অনেকেই আছে। ফাহিম নেই। ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে হাজার হাজার বন্ধু কিন্তু সেই লিস্টে নেই ফাহিম। আজও সব আধুনিকতার বাইরে গিয়ে যার স্মৃতি চিহ্নগুলো বয়ে নিয়ে চলি।

যে জোড়া শালিক বহু বছর পূর্বে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেই ফাহিম আজ আমার মুখোমুখি। সকালের জার্নিটা শুরু হয়েছিল আমার আজিমপুর থেকে। গন্তব্য গাজীপুর। কিছু পথ পেরোতেই বেশ ক’জন যাত্রী উঠলো বাসে। প্রতিটি সিট ফিলাপ হয়ে বাকি তিনজনের ভাগ্যে পড়লো বাসের বাঁদুড়ঝোলা হ্যান্ড বেল্ট। স্বাভাবিক ভাবেই লেডিস সিট থেকে চোখ আটকে যায় ওই তিনজনের দিকে। কখনো ভাবতেই পারিনি এমন চলন্ত সময়ে এতটা বছর পর জোড়া শালিক মুখোমুখি হবে। সময়ের হাতছানিতে ফাহিমের চোখে চশমা উঠেছে, কাঁচা-পাকা চুলের মিশ্রণে সেই ফাহিম আজ আর অতটা লিকলিকে নেই। সুঠাম দেহ আর ক্যাজুয়াল লুকে বেশ আধুনিক অন্যরকম লাগলেও আমার চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। অসুবিধা হয়নি ওরও আমাকে চিনতে। দুজনের দৃষ্টি একটুও নড়েনি। বেশ নাটকীয় রিলের মতোই স্মৃতি আওড়াতে আওড়াতে হঠাৎ কানে ভেসে এলো আব্দুল্লাহপুর কে কে নামবেন। নেমে যান।

আচমকা দুজনেরই সম্ভিত ফিরে এলো। ফাহিমকে বেশ চিন্তিত মনে হলো। হঠাৎ কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করে বাস থেকে নামার জন্য সামনে এগিয়ে এলো। ঠিক এক হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে ফাহিম। দুজনই বেশ ইতস্তত আর বেশ তাড়াহুড়োতে দুজনের মুখ থেকে এক সাথেই বেরিয়ে এলো কেমন আছ? কে আর কার জবাব দেয়! বাস থামলো, সময় কয়েক সেকেন্ড। ‘আজ আমার একটা বিপদের দিন লাবন্য। দেখা হবে নিশ্চয়ই।’ ফাহিম নেমে গেল। এত বছর পর দেখা তা-ও কথা হলো না, ঠিকানা জানা হলো না। ফোন নাম্বার, ফেসবুক আইডি কিছুই জানতে পারলাম না। তবে কি ফাহিম আমাদের সব স্মৃতি মাড়িয়ে গেছে? ভুলে গিয়েছিল আমায়? জাস্ট সৌজন্যতা করল? নাও তো নামতে পারতো ইত্যাদি ভাবতে ভাবতে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম এত ভিড়ের মাঝেও ছোট্ট করে বলেছিল, ‘আজ আমার বিপদের দিন লাবন্য’। কী বিপদ! কী হয়েছে? আমি কী করে জানবো? ইস! কেন যে এভাবে দেখা হলো আমাদের।

এরপর প্রায়ই আজিমপুর বাসস্টপ থেকে কারণে-অকারণে ছুটে গেছি আব্দুল্লাহপুর। কখনো কখনো ছুটির দিনেও। আমাদের আর দেখা হয়নি। উন্মুক্ত আকাশে বিচ্ছিন্ন হওয়া জোড়া শালিক আর এক হয়ে হাঁটেনি, ঠোঁটে ঠোঁটে খাবার নিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে একসাথে ছোটা হয়নি। ফাহিমও কি খুঁজেছিল আমায়, নাকি খোঁজেনি? নাকি আমার মতোই দ্বিগভ্রান্ত হয়ে নস্টালজিয়াকে সাথে নিয়ে এভাবে ছুটে চলেছে আজিমপুর টু আবদুল্লাহপুর!

কালের আলো/এম/এএইচ

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৫ অপরাহ্ণ
জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন ভিশন ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।

সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রাথমিক উদ্দেশ্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়া। সেখানে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে সাইডলাইনে অনেক বৈঠক হয়ে থাকে।

প্রধানমন্ত্রী কখন যাবেন এবং কার কার সঙ্গে বৈঠক করবেন, তা যথাসময়ে জানানো হবে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো কিছুই গোপন রাখা হবে না।

এদিকে দ্বিপক্ষীয়ভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের আগ্রহ রয়েছে বলেও জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, দিল্লির সঙ্গে ঢাকা নতুন ও কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে চায়।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বেসামরিক মানুষ হত্যার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সীমান্তে হত্যা ও মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা চলছে।

এ ছাড়া পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সরকার কাজ করছে বলেও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় প্রধানমন্ত্রী, বার্তা কি শুধু ‘সাদামাটা’ চলাফেরার?

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০০ অপরাহ্ণ
লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় প্রধানমন্ত্রী, বার্তা কি শুধু ‘সাদামাটা’ চলাফেরার?

বাংলাদেশ সচিবালয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় উঠেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ের কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকটি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ তথ্য জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে পৌঁছানোর পর ষষ্ঠ তলায় ওঠার সময় লিফটের পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহার করেন। তাঁর সঙ্গে থাকা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তারক্ষীরাও সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠেন। একটি সরকারি বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্ত আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ঘটনা হলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরে এটি আলাদা করে নজর কেড়েছে।

কারণ, একজন সরকারপ্রধানের প্রতিটি প্রকাশ্য আচরণই অনেক সময় তাঁর কাজের ধরন ও জনসম্পৃক্ততার প্রতীকী বার্তা বহন করে। লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি ব্যবহারকে তাই কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসেবে দেখার পাশাপাশি তাঁর সরল ও সরাসরি কর্মপদ্ধতির একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন অনেকে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে দেশের কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি, মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং কৃষকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষির গুরুত্ব বিবেচনায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের এ বৈঠককে নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, বাজার ব্যবস্থাপনা, কৃষি উপকরণের প্রাপ্যতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব—এসব প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরেই কৃষি খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।

এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর সামনে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা নানাবিধ তথ্য ও প্রস্তাব তুলে ধরছেন এবং সেখান থেকে কী ধরনের নির্দেশনা আসছে, সেটিই বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, মাঠপর্যায়ে সেই সিদ্ধান্ত কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই কৃষকদের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টি নির্ভর করবে। সিঁড়ি বেয়ে ষষ্ঠ তলায় ওঠার ঘটনাটি তাই দিনের আলোচিত একটি দৃশ্য। ভিআইপি প্রটোকল মেনে সাধারণত সচিবালয়ে লিফট ব্যবস্থা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হলেও প্রধানমন্ত্রী সরাসরি সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যান এবং হেঁটে ষষ্ঠ তলায় পৌঁছান। আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—কৃষি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ।

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরার পর থেকেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজে একের পর এক প্রথাভাঙা কর্মকাণ্ড করছেন তারেক রহমান। বিশেষ করে বিমানবন্দর থেকে জনসমাবেশে যাওয়া কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি একাধিকবার প্রথাগত ভিআইপি প্রটোকল এড়িয়ে বাসে যোগ দিচ্ছেন। ঢাকায় চলাচলেও অতীতের প্রধানমন্ত্রীর মতো থাকে না রাস্তায় কড়াকড়ি। চলার পথে নিয়মিতই পথচারীদের সঙ্গে করেন সালাম বিনিময়।

কালের আলো/এম/এএইচ

ইউরোপের স্বপ্নে ঘরে ফেরে লাশ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২২ অপরাহ্ণ
ইউরোপের স্বপ্নে ঘরে ফেরে লাশ

বিদেশে গিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় প্রতি বছর বিপজ্জনক সমুদ্রপথে পাড়ি জমাচ্ছেন বাংলাদেশি তরুণদের একটি অংশ। ইউরোপে পৌঁছানোর আশ্বাসে দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে শুরু হয় এই যাত্রা। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযান, খাদ্য ও পানির সংকট, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পাচারকারীদের নির্যাতনের কারণে পথেই অনেকে মারা যাচ্ছেন। অনেকে নিখোঁজ থাকছেন বছরের পর বছর। যারা গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন, তাদের একটি অংশও পাচারকারীদের হাতে জিম্মি হয়ে মুক্তিপণের শিকার হচ্ছেন।সাগরপথে অবৈধভাবে ইউরোপ বা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় প্রতিবছর কত বাংলাদেশি মারা যাচ্ছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি হিসাব নেই।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরেই এ ধরনের ঘটনায় বাংলাদেশিদের মৃত্যু অর্ধ সহস্রাধিক হতে পারে। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, উদ্ধার না হওয়া মরদেহ এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারণে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সমুদ্রপথে বাড়ছে প্রাণহানি
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর ও পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন রুট দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার সময় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক অভিবাসী মারা যান বা নিখোঁজ হন। এসব রুটে বাংলাদেশিরাও উল্লেখযোগ্যসংখ্যায় রয়েছেন। আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এসব সমুদ্রপথে ৫৯৮ জন মারা যান। ২০২৫ সালে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬০ জনে। এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

আইওএমের হিসাবে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে সাড়ে ৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হন। তাদের মধ্যে ৮৯০ জনের বেশি মারা যান। এসব তথ্য পুরোপুরি বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হিসাব নয়; তবে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চল থেকে অনিয়মিত সমুদ্রপথে যাত্রার ঝুঁকির মাত্রা এতে স্পষ্ট হয়।

চলতি বছরের এপ্রিলেও আন্দামান সাগরে একটি নৌকাডুবির ঘটনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাংলাদেশি নাগরিকসহ প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ হন। ১৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) এ তথ্য জানায়।

স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে দালাল
বিদেশে যাওয়ার আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে মানব পাচারকারী ও অভিবাসী চোরাচালান চক্র। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের তরুণদের একটি অংশ এসব ঝুঁকিপূর্ণ রুটে যাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি যুক্ত হচ্ছে। দালালরা অনেক সময় বৈধ চাকরি, ভিসা কিংবা নিরাপদ বিদেশযাত্রার কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেয়। পরে যাত্রাপথ পরিবর্তন করে অবৈধ রুটে পাঠানো হয়। সমুদ্রযাত্রায় নৌযানে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ তোলা, পর্যাপ্ত খাবার ও পানির ব্যবস্থা না থাকা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস উপেক্ষা করার মতো কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।

শুধু দুর্ঘটনাই নয়, পথিমধ্যে পাচারকারীদের হাতে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে। বিদেশে পৌঁছানোর পরও অনেককে আটকে রেখে দেশে থাকা পরিবারের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। অর্থ না দিলে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে
মানব পাচার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে দালাল ও পাচারকারীদের গ্রেপ্তার করছে। তবে এসব অভিযানের পরও পুরো চক্রের কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। কারণ, মাঠপর্যায়ের দালালদের একটি অংশ গ্রেপ্তার হলেও অর্থদাতা, নিয়ন্ত্রক ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষাকারীদের বড় একটি অংশ শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, মানব পাচারের মামলায় সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় মামলার দীর্ঘসূত্রতা, বাদী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি এবং অনেক ক্ষেত্রে আদালতের বাইরে আপস-মীমাংসার প্রবণতা। ফলে মামলা হলেও সব ক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে পাচারকারী চক্রের ওপর কার্যকর চাপ তৈরি হচ্ছে না। একজন দালাল গ্রেপ্তার হলেও তার জায়গায় অন্য ব্যক্তি যুক্ত হয়ে একই রুটে নতুন করে লোক পাঠানোর সুযোগ পাচ্ছে।

ফিরে আসাদের বয়ানে ভয়াবহতা
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতায় উঠে আসে পাচারচক্রের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক। তাদের কেউ দিনের পর দিন সমুদ্রে খাবার ও পানির সংকটে ছিলেন, কেউ অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌযানে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে ভেসেছেন। আবার কারও ক্ষেত্রে ছিল পাচারকারীদের মারধর ও জিম্মি করে রাখার ঘটনা।

ফিরে আসা ব্যক্তিদের অনেকের পরিবার বিদেশ যাওয়ার জন্য জমি, বসতভিটা বা অন্যান্য সম্পদ বিক্রি করেছে। যাত্রা ব্যর্থ হলে সেই পরিবারগুলোকে ঋণের বোঝা বহন করতে হয়। আর কেউ নিখোঁজ হলে পরিবারকে একই সঙ্গে আর্থিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়।

বৈধ পথের বিকল্প তৈরি জরুরি
সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থান, অভিবাসন ও ভ্রমণের ক্ষেত্রে সরকার অনুমোদিত বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের জন্য জনগণকে পরামর্শ দিয়েছে। মানব পাচার, জাল ভিসা, অভিবাসী চোরাচালান বা এ ধরনের অপরাধের তথ্য জানা থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সিআইডিকে জানানোর আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে এই প্রবণতা ঠেকানো সম্ভব নয়। বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পেছনে থাকা কর্মসংস্থানের সংকট, দারিদ্র্য, দ্রুত আয় করার প্রত্যাশা এবং দালালদের প্রতারণার বিরুদ্ধে একযোগে ব্যবস্থা নিতে হবে। বৈধ অভিবাসনের সুযোগ ও তথ্য সহজলভ্য করার পাশাপাশি প্রতিটি পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পাচারচক্রের নিচের স্তরের সদস্যদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অর্থের উৎস, যোগাযোগব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। কারণ, সমুদ্রপথে একজন তরুণের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এর পেছনে রয়েছে সংগঠিত একটি অপরাধচক্র। সেই চক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় না আনা গেলে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরযাত্রা এবং মৃত্যুর এই ধারাবাহিকতা থামানো কঠিন।

কালের আলো/এম/এএইচ