খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩
           

জনগণের স্বপ্ন পূরণে নতুন দিগন্তের পথে তারেক রহমানের সরকার

আহসান হাবিব বরুন
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
জনগণের স্বপ্ন পূরণে নতুন দিগন্তের পথে তারেক রহমানের সরকার

নতুন সরকার কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও বার্তা দিচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের সূচনা অনেকের কাছেই এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অবিশ্বাস ও বিভাজনের পর যে প্রত্যাশা নিয়ে জনগণ ভোট দিয়েছে—তার প্রতিফলন যেন সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

এই সরকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোকে কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে না রেখে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া। রাজনৈতিক ইতিহাসে আমরা প্রায়ই দেখেছি, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার পর ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। কিন্তু বর্তমান সরকারের প্রথম দিককার পদক্ষেপগুলো সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে জনগণের ভোটের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রতিশ্রুতির প্রতি দায়বদ্ধতার একটি নতুন বার্তা প্রদান করছে।

রাজনৈতিক শিষ্টাচারের নতুন দৃষ্টান্ত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধিতাকে প্রায় শত্রুতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বিরাজ করেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর পরাজিত রাজনৈতিক নেতাদের বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করা, ইফতারে অংশ নেওয়া এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান—এসব উদ্যোগ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত বহন করে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিক সৌজন্যের মধ্যে রাখার যে চেষ্টা এই সরকার শুরু করেছে, তা দীর্ঘদিনের বিভাজিত রাজনৈতিক পরিবেশে এক ইতিবাচক বার্তা বলেই মনে হচ্ছে।

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার
রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। জুলাই যোদ্ধা ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের আসামিদের ভারতে গ্রেপ্তার নিশ্চিত করার কূটনৈতিক ও আইনি প্রচেষ্টা সেই দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি প্রমাণ করে যে, অপরাধ যত বড়ই হোক, কিংবা অপরাধী দেশের সীমানার বাইরে থাকুক—ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সরকার কিছুতেই আপস করবে না।

একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার ঘোষণাও আইনের শাসনের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতিকে স্পষ্ট করেছে। এটি কেবল অতীতের জবাবদিহির প্রশ্ন নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি বার্তা বহন করে যে,রাষ্ট্রের ক্ষমতা কখনোই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঢাল হতে পারে না।

রাজনৈতিক ঐকমত্যের নতুন চর্চা
বিএনপি সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত ছিল জুলাই সনদের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধীদলের জন্য ছেড়ে দেওয়া। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এটি একটি বিরল ঘটনা। সাধারণত ক্ষমতাসীন দল সংসদের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজেদের দখলে রাখতে চায়। এক্ষেত্রে সরকারের এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করে যে,গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার নাম নয়; বরং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক কাঠামোর নাম। বিরোধীদলের জন্য সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদ ছেড়ে দেওয়া সেই অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির দরজা উন্মোচন করার ইঙ্গিত বলেই আমি মনে করি।

এখানে স্মরণ করা যেতে পারে যে , নির্বাচনী মাঠে বিরোধীদের নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও তারেক রহমানের দলীয় নেতাকর্মীদের জুলাই সনদের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি ইঙ্গিত। সরকার প্রধানের এই উদার দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, এই সরকার অন্তত একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে চায়, যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কারগুলো এগিয়ে যাবে।

সামাজিক সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার। সেই লক্ষ্যেই শুরু হয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি—যার মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে সরাসরি রাষ্ট্রের সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব ছিল। ফ্যামিলি কার্ড সেই ব্যবস্থাকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এর পাশাপাশি কৃষি খাতকে শক্তিশালী করার জন্য চালু করা হচ্ছে কৃষি কার্ড, যা কৃষকদের সরকারি সহায়তা, ভর্তুকি ও ঋণ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। কৃষকদের জন্য দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ মওকুফের ঘোষণাও গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনো কৃষি ও গ্রামীণ উৎপাদন। তাই কৃষকের আর্থিক স্বস্তি নিশ্চিত করা মানেই সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করা।

স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্ত
স্বাস্থ্যসেবা খাতে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগও সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অংশ। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে একটি মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় বহু পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এমনটি বহু গবেষণায় উঠে এসেছে। সেই প্রেক্ষাপটে হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে।

পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ
পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হলো খাল খনন কর্মসূচি। বাংলাদেশের বহু খাল ও জলপথ দীর্ঘদিন অবহেলায় ভরাট হয়ে গেছে, যার ফলে পানি নিষ্কাশন ও সেচ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

সুতরাং খাল পুনঃখনন শুধু জলাবদ্ধতা দূর করবে না; বরং এটি কৃষি উৎপাদন বাড়াতেও সহায়ক হবে। একই সঙ্গে সরকার দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি শুরু করছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

রাষ্ট্র পরিচালনায় মিতব্যয়িতা
সরকারি ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে সরকার একটি প্রতীকী কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে যে, ব্যয়বহুল ইফতার পার্টি এড়িয়ে যাওয়া। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনেক সময় সরকারি অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় দেখা যায়। সেই প্রেক্ষাপটে কৃচ্ছতা সাধনের এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনা আমি মনে করি।
এছাড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকারি অফিসগুলোতে অতিরিক্ত লাইট ও এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আরোপের সিদ্ধান্তও একটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ।

প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন
রাষ্ট্র পরিচালনায় আচরণগত পরিবর্তনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি প্রশাসনের জন্য ইতোমধ্যেই একটি ইতিবাচক আবহ তৈরি করেছে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী সিদ্ধান্ত হলো—ভিভিআইপি প্রোটোকল কমিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা। লালবাতি ও সাইরেন ব্যবহার না করে সাধারণ যানবাহনের মতো সড়ক নিয়ম মেনে চলা জনগণের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় যে রাষ্ট্রের শাসকও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। একইভাবে পরিবারের সদস্যদের জন্য এসএসএফ নিরাপত্তা না নেওয়ার সিদ্ধান্তটিও ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে একটি সংযমী অবস্থানের প্রতিফলন।

মাঠপর্যায়ে প্রশাসনিক তৎপরতা
সরকারের নীতিগত ঘোষণার পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রীরা ইতোমধ্যেই সরেজমিন পরিদর্শনে মাঠে নেমেছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তারা জনসেবা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধ, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সময়মতো অফিসে উপস্থিত হয়ে নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে মন্ত্রীরা আকস্মিক অফিস পরিদর্শন শুরু করছেন। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবহেলিত সেবা খাতগুলোকে সক্রিয় করতে এই ধরনের নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই উদ্যোগ প্রশাসনের ভেতরেও একটি বার্তা দিচ্ছে যে,সরকার কেবল নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। ফলে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ বাড়ার পাশাপাশি জনসেবার মান উন্নত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। জনগণের মধ্যেও এই উদ্যোগ আশাবাদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন মহলে তা প্রশংসিত হচ্ছে।

সংগ্রামীদের প্রতি দায়িত্ব
জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের দায়িত্ব গ্রহণের ঘোষণাও সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ। ইতিহাসে যেসব আন্দোলন রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে, তাদের অংশগ্রহণকারীদের সম্মান ও স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবেই দেখা হয়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ
বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির কথা বলা হয়। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে একটি শক্ত বার্তা দিয়েছে। অবশ্য ঘোষণার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হবে এর বাস্তবায়ন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই তখনই কার্যকর হয়, যখন তা রাজনৈতিক পরিচয় ছাপিয়ে পরিচালিত হয় এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়।

শেষ কথা
সরকারের প্রথম দিককার উদ্যোগগুলো জনমনে নিঃসন্দেহে একটি আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—সবকিছু মিলিয়ে সরকার পরিচালনা একটি জটিল কাজ।

তবুও যদি রাজনৈতিক সৌজন্য, আইনের শাসন, সামাজিক সুরক্ষা, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহিমূলক শাসনের এই উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যায়, তাহলেই কেবল জোর দিয়ে বলা যাবে যে, জনগণের স্বপ্ন পূরণের পথে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন সেই পথচলার দিকেই তাকিয়ে আছে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ঢাকা।

পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ণ
পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

পুশইনের মাধ্যমে ভারত সরকার কূটনৈতিক সৌজন্য, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ না নেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সীমান্ত হত্যা, পুশইন ও কাঁটাতারের রাজনীতি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার অভিবাসী নাগরিককে অন্য দেশের মানুষ বলে জোরপূর্বক সীমান্তের শূন্যরেখায় দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে রেখে নির্যাতন করে ঠেলে পাশের দেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। এর আগে মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাদের নাগরিকদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক যুগ হতে যাচ্ছে, ২০ লাখের বেশি শরণার্থীর হৃদয়বিদারক জীবন চেয়ে চেয়ে দেখছে বিশ্ববাসী। তাদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

মঞ্জু বলেন, ভারত সরকার বলেছিল নির্বাচিত সরকার এলে তারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তাদের সহযোগিতার এই নৃশংস নমুনা অতীতের মতোই আমাদের দেখতে হচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের কাঁটাতারের রাজনীতি, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের মতো শত্রুসুলভ কার্যক্রম তুলে ধরার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলতাফ হোসাইন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হালিম নান্নু, মশিউর রহমান মিলু, প্রবাসী নেতা নুরুন্নবী নয়ন, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফ, বরিশালের নেতা জাকির হোসেন ও ইমরান সরদার উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসআর/এএএন

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আজকের আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ওপর। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নিছক দুটি রাষ্ট্র সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে এসেছে। আগামী দিনের লক্ষ্য উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের ক্রম, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতীকবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের আধুনিক উন্নয়নের অন্যতম সফল মডেল। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনশক্তি। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রম রপ্তানি নয়, দক্ষ জনশক্তি গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এই সফরে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।

অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রনিকস, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে। তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে চীনকে ঘিরে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বহু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তা রয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের ইতিহাসে সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বহু প্রকল্পের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে চীনা বিনিয়োগ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা সংকট, ভাঙন, পানির স্বল্পতা এবং সেচ সমস্যার কারণে এ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট উৎপাদন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আগামী দিনের অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যদি এসব খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে এই সফরগুলোর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই লক্ষ্য করেছেন যে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিবেশী ভারতও সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র কোন দেশকে কখন অগ্রাধিকার দেবে, সেটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

এখানে মনে রাখা দরকার, বিএনপির কূটনৈতিক দর্শন কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসৃত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকেও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান প্রত্যাশিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কোনো ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আদর্শ এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং বিএনপির কূটনৈতিক রেওয়াজে হঠাৎ করে মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই কম। দলটি ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, আবার কোনো দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত পুশ-ইন, ভিসা ও কূটনৈতিক যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু অস্বস্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

তবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার। সেই কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বাস্তবতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে—এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডে বিচার করা পরিপক্ব কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারতেরও উপলব্ধি করা উচিত যে আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ নয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান তাকে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তেমনি সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। কারণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সমতা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।

আজকের বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি।

তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদি মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। যদি এই সফরের মাধ্যমে অর্জিত সমঝোতা ও সহযোগিতাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙল ইরানের ৩ তেলবাহী জাহাজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:৫২ অপরাহ্ণ
মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙল ইরানের ৩ তেলবাহী জাহাজ

গত দুই মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন নৌ অবরোধ অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটগুলো। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ট্যাংকার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির (এনআইটিসি) মালিকানাধীন তিনটি ট্যাংকার তেলভর্তি অবস্থায় অবরোধরেখা অতিক্রম করে আরব সাগরে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- ‘হিরো ২’ ও ‘ডিওনা’ নামে দুটি সুপারট্যাংকার বা অত্যন্ত বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ। এই দুটি জাহাজ মিলে মোট ৩৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছে এবং তারা ভারতের দক্ষিণ উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এছাড়াও সোনিয়া ১ নামে আরেকটি সুয়েজম্যাক্স শ্রেণির ট্যাংকার, যা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে এগোচ্ছে বলে জানায় ট্যাংকার ট্র্যাকার্স।

এরআগে গতকাল ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইরানের বন্দর থেকে ৩টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং ২টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী কার্গো জাহাজসহ মোট ৫টি জাহাজ কোনো বাধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক জলসীমার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় জাহাজগুলো যাত্রা শুরু করেছে, যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকের প্রথম কার্যকরী বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করে তেহরান।

এদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি শুরু থেকেই তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি আমরা শুরু থেকেই জোর দিয়েছিলাম। এখন তা শুরু হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগেই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে’।

এর আগে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে জানান, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল-গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

জবাবে এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর এই নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা প্রায় তিন মাস ধরে কার্যকর ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির ফলে এখন থেকে ইরানের তেল ট্যাঙ্কার ও পণ্যবাহী জাহাজগুলো ইরানি এবং আন্তর্জাতিক উভয় জলসীমায় সম্পূর্ণ অবাধে চলাচল করতে পারবে।

এদিকে ইরানি তেল পুনরায় বিশ্ববাজারে প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার প্রবণতা দেখা গেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭৮.৪২ ডলারে এবং মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৭৫.৩৪ ডলারে নেমে এসেছে।

সূত্র: বিবিসি, আলজাজিরা

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ