খুঁজুন
                               
, ,
           

কাজের ছুটি, জীবনের নয়: অবসরে শুরু হোক নতুন পথ চলা

ড. রাধেশ্যাম সরকার
প্রকাশিত: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৪:১৪ অপরাহ্ণ
কাজের ছুটি, জীবনের নয়: অবসরে শুরু হোক নতুন পথ চলা

চাকরিজীবীদের অধিকাংশই অবসরগ্রহণের পর হতাশা, বিষাদ, একাকিত্বতা ও পুঞ্জিভূত ক্ষোভ বুকে ধারণ করে দিনাতিপাত করেন। বাস্তবতা হলো, আমাদের সমাজে অবসরকে এখনো অনেকেই জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে দেখে থাকেন। ফলে অবসরজীবনের সূচনালগ্নেই বহু মানুষের জীবন কষ্ট, অনিশ্চয়তা ও হতাশার এক অদৃশ্য আবরণে ঢাকা পড়ে যায়। এই হতাশা মূলত বাসা বাঁধে মানুষের মনোজগতে।

শারীরিক সক্ষমতা কিছুটা কমে যাওয়া যতটা না মানুষকে দুর্বল করে, তার চেয়ে বেশি দুর্বল করে তোলে মানসিক অস্থিরতা, অতীতের হিসাব নিকাশ এবং অপূর্ণতার বোধ। অথচ অবসর জীবনের কোনো ব্যতিক্রমী বা অস্বাভাবিক অধ্যায় নয়। এটি জীবনচক্রের একটি স্বাভাবিক ও অবধারিত ধাপ, যা সময়ের নিয়মেই আসে। জীবনের অন্য সব পর্যায়ের মতো এটিকেও নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে বরং নতুন বাস্তবতায় নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

অবসরগ্রহণের পর অনেকেই নিজের সঙ্গে নিজের ভেতর দীর্ঘ এক সংলাপে লিপ্ত হয়ে পড়েন। মনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। ভাবতে থাকেন, জীবনে আসলে কী পেলাম। কত কষ্ট করলাম, কোনো কাজে ফাঁকি দিইনি, মিথ্যার আশ্রয় নিইনি। একটি টাকাও ঘুষ খাইনি। সততা, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমকে পুঁজি করে সারাজীবন দায়িত্ব পালন করেছি। অথচ অমুক তো সারা জীবন ফাঁকি দিয়ে, ঘুষ খেয়ে, অসৎ পথ অবলম্বন করে গাড়ি বাড়ি আর কত কী করে ফেলেছে। আমিও তো পারতাম, না করে ভুলই করেছি। এ ধরনের ভাবনা অনেকের মনেই আসে এবং আসাটাই স্বাভাবিক।

হ্যাঁ, আপনিও হয়তো অনেক কিছু করতে পারতেন। কিন্তু একবার শান্তভাবে নিজেকে প্রশ্ন করুন, অবৈধ ও ফাঁকিবাজ সেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলো করার যোগ্য করে কি আপনি নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। পারেননি, কারণ আপনার বিবেক আপনাকে বারবার বাধা দিয়েছে। সেই বিবেকই আপনাকে সারাজীবন সঠিক পথে রেখেছে এবং একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। যা আপনার নেই, অথবা করতে পারলেও যা আপনি করেননি, ভাবুন সেগুলো আপনার জন্য বরাদ্দ ছিল না। যা আছে, তাতেই কৃতজ্ঞ থাকার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। প্রাপ্তির পরিসর ছোট হোক বা বড়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে শেখাই হলো মানসিক শান্তির প্রথম শর্ত। বাড়তি অর্থ, ক্ষমতা বা ভোগবিলাসের পেছনে অকারণে ছুটে নিজের মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করা কখনোই বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না।

অনেকে আবার সহকর্মী বা বন্ধুবান্ধবের সাফল্য দেখে গভীর হতাশায় ভোগেন। প্রায়ই শোনা যায়, অমুক তো আমার চেয়ে খারাপ ছাত্র ছিল। কোনোরকমে পাশ করে মামার জোরে চাকরি পেয়েছে। আমার ডিগ্রি ও ফলাফল ছিল অনেক ভালো, অথচ আমি পদোন্নতি পেলাম না। আমার ভাগ্যটাই খারাপ। বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কোনো সহকর্মী মেধা তালিকায় নিচে থেকেও পদোন্নতি পেয়ে গেছেন। এর পেছনে নানা কারণ কাজ করতে পারে।

সারা জীবন চাকরির ব্যস্ততায় হয়তো নিজেকেই সময় দেওয়া হয়নি। প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে উৎসবগুলোও ঠিকভাবে উপভোগ করা হয়নি। আপনার স্ত্রী হয়তো চাকরি করতেন কিংবা ছিলেন গৃহিণী। তার প্রতি প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া হয়নি, এমনকি মন দিয়ে তাকানোও হয়নি হয়তো। কত শত অভিযোগ আর অভিমান জমে আছে মনে। সেই জমে থাকা অভিযোগগুলো মিটিয়ে দেওয়ার সুযোগই তো এই অবসর। তাই ঘরে বসে অবান্তর চিন্তায় ডুবে না থেকে কারুকার্য করা হলুদ ফতুয়াটা পরে প্রিয় মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন।

কেউ হয়তো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় ভালোভাবে করতে পেরেছেন, কেউবা কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের ধরনে ছিলেন বেশি কৌশলী ও সময়োপযোগী। মনে রাখতে হবে, ভালো ছাত্র হওয়া আর কর্মজীবনে ভালো করা এক বিষয় নয়। চাকরিজীবনে দক্ষতা, যোগাযোগ, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, বাস্তবতা বোঝার শক্তি এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও বড় ভূমিকা রাখে। তাই অবসরে অন্যের সাফল্য দেখে আফসোস করা বা নিজেকে ব্যথিত করা একেবারেই অর্থহীন। মনে রাখা উচিত, অন্যের সাফল্য কখনোই নিজের ব্যর্থতার সমার্থক নয়। অন্যদের সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে নিজেকে হারিয়ে ফেলা মানসিকভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়ার শামিল।

তবে বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষই অবসরগ্রহণের পর প্রথম দিকে খুব বেশি গভীর চিন্তাভাবনায় যান না। অবসরের শুরুটা অনেকের কাছে যেন উৎসবের মতোই আসে। সময় কেটে যায় আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ, আড্ডা, ভ্রমণ আর নানা আনন্দ ফুর্তিতে। কিন্তু বয়স যত বাড়তে থাকে, শারীরিক সক্ষমতা কমার পাশাপাশি মানসিক একাকিত্বও ধীরে ধীরে মানুষের জীবনে প্রবেশ করে। তখন হতাশা, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ এবং অন্যের প্রতি অভিযোগ অনুযোগ বাড়তে থাকে। এই সময়েই মানুষ জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনের লাভ ক্ষতির হিসাব কষেন।

কেউ কেউ মনে করেন, তখন তো চাকরির এত সংকট ছিল না। এই চাকরিটা না করে অন্য চাকরিটা নিলে হয়তো ভালো হতো। আবার অনেকের ধারণা, চাকরির বদলে ব্যবসা বাণিজ্যে গেলে জীবন আরও সচ্ছল হতো, থাকত টাকা পয়সা, বাড়ি গাড়ি আর সামাজিক প্রতিপত্তি। এভাবে অতীতের ভুল বা সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলার বদলে বরং এটাই ভাবা উচিত যে, যা আপনার জন্য উপযুক্ত ছিল এবং যা আপনার ভাগ্যে বরাদ্দ ছিল, সেটাই আপনি পেয়েছেন। তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করুন। অতীতকে সামনে টেনে এনে নিজেকে বারবার কষ্ট দেওয়ার কোনো মানে নেই। অতীতকে তার জায়গায় রেখে নতুন সময়কে বরণ করুন এবং বর্তমানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখুন। দেখবেন, মন ধীরে ধীরে হালকা হচ্ছে, চিন্তার ভার কমছে।

ইতিবাচকভাবে ভাবতে শেখার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ভেতরে এক ধরনের নতুন মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম নেয়, যা অবসরজীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়ক হয়ে ওঠে। তখন অবসর আর দায় বা বোঝা বলে মনে হয় না; বরং এটি নিজের জন্য সময় দেওয়ার, নিজেকে নতুন করে বোঝার এবং দীর্ঘদিনের অবহেলিত অনুভূতিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার এক মূল্যবান সুযোগে পরিণত হয়। এই সময়টিকে অর্থবহ করে তুলতে সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত প্রয়োজন।

সামর্থ্য অনুযায়ী ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন কল্যাণমূলক কাজে দান ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু সমাজই উপকৃত হয় না, ব্যক্তিগত জীবনেও এক ধরনের আত্মতৃপ্তি, মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়, যা অবসরজীবনকে করে তোলে সম্মানজনক ও অর্থপূর্ণ। মনে রাখতে হবে, অবসর কখনোই হতাশা, বিষাদ, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু কিংবা জীবনের সমাপ্তির প্রতীক নয়। বরং অবসর হলো দীর্ঘ ও কর্মব্যস্ত চাকরিজীবনের একটি স্বাভাবিক পরিণতি, যেখানে মানুষ পেছনে ফেলে আসা জীবনের পথচলার দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পায়। সেই দীর্ঘ পথে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, অর্জন ও সুখস্মৃতিগুলোকে ধীরে ধীরে নতুন করে অনুভব করার মধ্যেই লুকিয়ে আছে অবসরজীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য। সচেতন মানসিকতায় অবসরকে গ্রহণ করতে পারলে এই সময় জীবনকে নতুন অর্থ, গভীরতা ও প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারে।

সারা জীবন চাকরির ব্যস্ততায় হয়তো নিজেকেই সময় দেওয়া হয়নি। প্রিয়জনদের সঙ্গে নিয়ে উৎসবগুলোও ঠিকভাবে উপভোগ করা হয়নি। আপনার স্ত্রী হয়তো চাকরি করতেন কিংবা ছিলেন গৃহিণী। তার প্রতি প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া হয়নি, এমনকি মন দিয়ে তাকানোও হয়নি হয়তো। কত শত অভিযোগ আর অভিমান জমে আছে মনে। সেই জমে থাকা অভিযোগগুলো মিটিয়ে দেওয়ার সুযোগই তো এই অবসর। তাই ঘরে বসে অবান্তর চিন্তায় ডুবে না থেকে কারুকার্য করা হলুদ ফতুয়াটা পরে প্রিয় মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। ঘুরে আসুন রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, বনানী লেক কিংবা হাতিরঝিলে। প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে মন আপনাতেই শান্ত হয়ে আসে। ক্লান্ত হয়ে চারুকলা অনুষদের বকুলতলায় বসে সুরের মূর্ছনায় ফিরে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের তারুণ্যে। নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে এভাবে অবসরের সময়কে বর্ণিল করে তোলা একেবারেই সম্ভব।

তাই পেছন ফিরে নয়, সবসময় সামনের দিকে তাকান। দেখবেন, আপনার জীবনকে রাঙিয়ে দিতে সামনে অপেক্ষা করছে প্রচুর ঝলমলে আলো। অবসরজীবন শেষ নয়, বরং সচেতন মানসিকতায় গ্রহণ করতে পারলে এ জীবনও হতে পারে নতুন রঙে রাঙানো এক সুন্দর অধ্যায়।

লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান, ডিআরপি ফাউন্ডেশন।

আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে সবুজ ধানখেতে। পাশে কালভার্ট, বসার জন্য ছোট বেঞ্চ, দোলনা আর সেলফি কর্নার। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কচুখালীতে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট ক্যাফের নাম ‘শেষ বিকেলের চায়ের আড্ডা’।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মুন্সিগঞ্জ কলেজের ছয় শিক্ষার্থী নিজেদের শ্রম ও উদ্যোগে তৈরি করেছেন ক্যাফেটি। মুন্সিগঞ্জ কচুখালীতে কারিতাস কার্যালয়ের কাছে কালভার্টের পাশে, মুনসুর সরদার গ্যারেজ-হরিনগর বাজার সড়কের পাশে বাঁশ, কাঠ ও খড় দিয়ে নির্মিত এই টংঘর ক্যাফের উদ্বোধন করা হয় গত ১৪ অক্টোবর।

উদ্যোক্তা ছয় বন্ধু হলেন তায়িব, মিলন হোসেন, মেহেদী হাসান, বিপ্লব হোসেন, ইমন হোসেন ও রাকিবুল হাসান। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগে কিছু করার আগ্রহ থেকেই একসঙ্গে কাজ শুরু করেন তাঁরা।

উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে অবসর সময়ে প্রায়ই আড্ডা দিতাম। একসময় মনে হলো, শুধু আড্ডা না দিয়ে এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করা যায়। পুঁজি খুব বেশি ছিল না, তবে নিজেদের শ্রম আর ইচ্ছা ছিল। সেই ভরসাতেই ক্যাফেটি গড়ে তুলেছি।’

ছয় বন্ধু প্রত্যেকে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বাঁশ, কাঠ ও খড়ের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে নিজেরাই সাজিয়েছেন ক্যাফেটি। বাহারি সাজসজ্জার পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সাদামাটা পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরিতে।

ক্যাফেতে চা-কফির পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে হালকা খাবারও। দাম রাখা হয়েছে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে। অপরাজিতা ফুলের চা ও দুধ চায়ের দাম ২০ টাকা করে, মালাই চা ২৫ টাকা এবং ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা। মালাই রুটি ও ফুচকার দাম ৩০ টাকা করে। এ ছাড়া রয়েছে সেলফি কর্নার, দোলনা ও বিভিন্ন ধরনের বসার ব্যবস্থা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, তাঁদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়; এলাকার পরিবেশ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখা। তাঁদের দাবি, কচুখালীর এই কালভার্ট এলাকায় আগে বখাটেদের উৎপাত ছিল। সেখানে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডও ঘটত। জায়গাটিকে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অবসর কাটানোর উপযোগী করে তুলতে তাঁরা ক্যাফেটি গড়ে তুলেছেন।

উদ্যোক্তা মো. মিলন হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই, জায়গাটি মানুষের কাছে ভালো একটি স্থান হিসেবে পরিচিত হোক। তরুণেরা এখানে আসবেন, চা খাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবেন। জায়গাটিতে মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি বাড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড কমাতে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করি।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টুও উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, ছয় কলেজশিক্ষার্থীর এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাঁরা নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ ভালো রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন।

স্বল্প পুঁজিতে ছয় বন্ধুর এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কচুখালীতে মানুষের অবসর কাটানোর জন্য তৈরি হয়েছে নতুন একটি জায়গা, যেখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জমে উঠতে পারে বন্ধুত্বের গল্প।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

শরতের নীল আকাশ, সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি ঝরনা আর হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, আবার কিছু কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।

হোটেল-রিসোর্টে আগাম বুকিংয়ের চাপ

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে থাকার জায়গা বুকিংয়ের ব্যস্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলোতে আগাম বুকিংয়ের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কমলগঞ্জের টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, পূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।শ্রীমঙ্গলের বালিসিরা কটেজের মালিক ও রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক জানান, তাঁদের কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদ বলেন, উৎসবের সময়ে হোটেল-রিসোর্টে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। জেলার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

চা-বাগান, ঝরনা ও হাওরের টানে পর্যটকেরা

মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ, পাহাড়ি পথ, ঝরনার পানি এবং হাওরের বিস্তৃত জলরাশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে। জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। শরতের আবহে এসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটির সময় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পর্যটকদের আকর্ষণ শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের বৈচিত্র্যও মৌলভীবাজার ভ্রমণকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। ফলে পূজার ছুটিতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের আকর্ষণ

কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ে মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ‘মাঙাল ময়ুম’ স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে। সেখানে মণিপুরি নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটির উদ্যোক্তা নিরঞ্জন সিংহ বলেন, পর্যটকেরা এখানে এসে মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে পর্যটন কার্যক্রমের সুফল স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন চান পর্যটনসংশ্লিষ্টরা

পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লেও পর্যটনশিল্পের বিকাশে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। ট্যুর গাইড অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম সিলেট-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

পূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। শ্রীমঙ্গল জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক থাকবে। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে পূজার আগে, চলাকালে ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে মৌলভীবাজারের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পূজার ছুটিতে আগাম বুকিংয়ের উচ্চ হার স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বড় হারের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিং ব্যর্থতায় জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট হয়েছে তাওহিদ হৃদয়ের দল। আবুধাবিতে শনিবার ৯৯ রানের জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করেছে জিম্বাবুয়ে। ম্যাচে শুরুতে বল হাতে জিম্বাবুয়েকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশ। মাত্র ২৪ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দলটি। কিন্তু ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিনের বড় জুটি জিম্বাবুয়েকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। পরে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

টেলর-আরভিনের ১৫০ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়াল জিম্বাবুয়ে

টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ের সামনে বিপাকে পড়ে জিম্বাবুয়ে। মাত্র ২৪ রানের মধ্যে তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। তবে এই অবস্থায় দলের হাল ধরেন ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিন। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৫০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। টেলর ১০১ বলে ৮১ রান করেন। আরভিনের ব্যাট থেকে আসে ১০৬ বলে ৯৩ রান। তাঁদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান সংগ্রহ করে দলটি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭২ রান।

তাসকিনের তিন উইকেটেও থামেনি জিম্বাবুয়ে

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৪৪ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। শুরুতে তাঁর বোলিংয়েই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। এ ছাড়া শরীফুল ইসলাম ও সাইফ হাসান দুটি করে উইকেট শিকার করেন। তবে টেলর ও আরভিনের জুটি ভাঙতে দেরি হওয়ায় জিম্বাবুয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে সক্ষম হয়।

২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু সৌম্য সরকার ৯ রান করে ব্লেসিং মুজারাবানির বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরতেই ছন্দপতন শুরু হয়। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ৪৬ রান করে তাঁর বিদায়ের পর বাংলাদেশের চাপ আরও বাড়ে। নাজমুল হোসেন শান্তও বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। তিনি করেন ১৩ রান। দলীয় ৯৭ রানে চতুর্থ উইকেট হিসেবে আউট হন অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। ২১ বলে ১৩ রান করে সিকান্দার রাজার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। অধিনায়কের বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয়ের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।

নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ১৭২ রানেই শেষ

হৃদয়ের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। মোসাদ্দেক হোসেনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। শেষ দিকে রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ ২৬ বলে ৩২ রানের জুটি গড়ে হারের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন। রিশাদ করেন ২৩ রান, আর তাসকিন ১৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তবে তাঁদের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দলের ইনিংস। জিম্বাবুয়ের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্র্যাড ইভান্স। তিনি নেন ৪ উইকেট। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি