খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ২৪ বৈশাখ, ১৪৩৩
           

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩: ঐতিহ্য, পরিচয় এবং বাঙালি কল্পনার পুনর্জাগরণ

ড. মতিউর রহমান:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:৫৬ অপরাহ্ণ
পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩: ঐতিহ্য, পরিচয় এবং বাঙালি কল্পনার পুনর্জাগরণ

পহেলা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে আবারও ফিরে এসেছে এক চিরচেনা অথচ নবতর অনুরণন নিয়ে। এটি কেবল একটি পঞ্জিকা পরিবর্তনের গাণিতিক দিন নয়; এটি এক সভ্যতাগত মুহূর্ত, যা আমাদের পরিচয়, সম্মিলিত স্মৃতি এবং জাতীয় অস্তিত্বকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করে। দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এবং বৈশ্বিক মূল্যবোধের পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ মনে করিয়ে দেয় যে, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতাই একটি জাতির সামাজিক সংহতির অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির কাছে পহেলা বৈশাখ এক অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব, যা শ্রেণি, ধর্ম ও ভূগোলের সীমা অতিক্রম করে এক অনন্য মহাজাগতিক মেলবন্ধন তৈরি করে। এই দিনটি বাঙালির আত্মোপলব্ধির দিন, নিজের শিকড়কে খুঁজে পাওয়ার দিন এবং বিশ্বমঞ্চে নিজের স্বকীয়তা তুলে ধরার দিন।

বাংলা সনের উদ্ভব মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজের বাস্তব প্রয়োজনে। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে ‘ফসলি সন’ বা পঞ্জিকার সংস্কার করা হয়েছিল, তা আজ বাঙালির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সম্রাট আকবরের নির্দেশে রাজজ্যোতিষী ফতুল্লাহ শিরাজী হিজরি চন্দ্রসন এবং সৌরসনের সমন্বয়ে যে নতুন পঞ্জিকা তৈরি করেছিলেন, তার মূলে ছিল প্রজার কল্যাণ। কৃষকরা ফসল সংগ্রহের পর স্বচ্ছন্দে খাজনা পরিশোধ করতে পারতেন বলেই এই সনটি দ্রুতই বাংলার ঘরে ঘরে সমাদৃত হয়। মুঘলদের সেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা সময়ের পরিক্রমায় একটি নিছক কর আদায়ের মাধ্যম থেকে বিবর্তিত হয়ে একটি সাংস্কৃতিক চিহ্নে পরিণত হয়েছে।

পহেলা বৈশাখ মানেই নবায়ন—অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের নতুন সূচনা। ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ প্রথা আজও সেই আস্থার সম্পর্কের সাক্ষ্য দেয়, যেখানে মিষ্টিমুখের মাধ্যমে পুরোনো পাওনা চুকিয়ে নতুন খাতা খোলার মাধ্যমে পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করা হয়। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পহেলা বৈশাখ পালন কেবল একটি উৎসব ছিল না, বরং তা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক ও একপেশে রাজনীতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ। ১৯৬৭ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান কেবল একটি সংগীত আয়োজন ছিল না, তা ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের এক শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ। আজও রমনার সেই আয়োজন বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা হিসেবে সগৌরবে টিকে আছে।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ কেবল একটি উৎসবের দিন নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের মহাকাব্যিক জয়গান। এটি আমাদের স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা এবং সৃজনশীলতার প্রতীক। প্রতিটি বছর পহেলা বৈশাখ আমাদের অতীতের গৌরব স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতের এক সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের আসনে আসীন। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর ‘অস্পৃশ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage of Humanity) হিসেবে স্বীকৃত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আজ বিশ্ববিখ্যাত। চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিপুণ হাতের কারুকাজে তৈরি বিশাল বিশাল সব শিল্পকাঠামো (যেমন: পাখি, সূর্য, বাঘের মুখ, লোকজ পুতুল) কেবল শিল্পের প্রদর্শনী নয়, বরং অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মঙ্গলের আবাহনের প্রতীক। এই শোভাযাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সম্মিলিত প্রতিরোধের মাধ্যমেই অন্ধকারের শক্তিকে পরাজিত করা সম্ভব।

শহর ও গ্রামে এই উৎসবের রূপ ভিন্ন হলেও মূল সুরটি এক। শহরগুলোতে দিনটি শুরু হয় ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় রবীন্দ্রসংগীতের মূর্ছনায়, আর গ্রামবাংলায় এটি এখনো সেই চিরচেনা মেলা, লোকজ বাদ্য আর গ্রামীণ ক্রীড়া উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু। লাল-সাদা পোশাক, আলপনা, মাটির সরা এবং লক্ষ্মীপেঁচার মতো লোকজ কারুশিল্পের প্রতি মানুষের এই তীব্র আকর্ষণ প্রমাণ করে যে, আধুনিকতার চাকচিক্য আমাদের শিকড়ের টানকে মুছে দিতে পারেনি। এই সাংস্কৃতিক সমন্বয় পহেলা বৈশাখকে আধুনিক সমাজেও অপরিহার্য ও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩-এর বিস্তারে প্রযুক্তি আজ এক বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অগমেন্টেড রিয়ালিটি (AR) ফিল্টারের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। প্রবাসী বাঙালিরা, যারা সুদূর নিউ ইয়র্ক, লন্ডন, সিডনি বা টোকিওতে বসবাস করছেন, তারা অনলাইন লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে ঢাকার রমনা বা চারুকলার আনন্দের সরাসরি অংশীদার হচ্ছেন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন উৎসবের আর্কাইভ বা স্মৃতির ভাণ্ডার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের সংস্কৃতিকে পৌঁছে দিচ্ছে।

তবে এই ডিজিটাল বিস্তার কিছু নতুন সমাজতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জও সামনে নিয়ে এসেছে। উৎসবের ‘ভার্চুয়ালাইজেশন’ কি মানুষের সরাসরি সান্নিধ্যের আনন্দকে কমিয়ে দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা দেখি যে, প্রযুক্তি আসলে উৎসবের পরিধি বাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত উপস্থিতি এবং স্পর্শের আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি মেটাতে পারেনি। বরং দেখা যাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারণার ফলে উৎসবে মানুষের সশরীরে অংশগ্রহণের হার আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। অর্থাৎ, ডিজিটাল জগত এখন বাস্তব জগতের উৎসবকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করে তুলছে।

পহেলা বৈশাখের অর্থনৈতিক গুরুত্ব বর্তমানে অপরিসীম। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বছরে এক বিশাল উদ্দীপনা বা ‘ইকোনমিক স্টিমুলাস’ সৃষ্টি করে। পোশাক শিল্প, বিশেষ করে হস্তচালিত তাঁত, জামদানি এবং বুটিক শিল্প এই সময়ে সবচেয়ে বেশি কর্মচঞ্চল থাকে। শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং শিশুদের পোশাকের এক বিশাল বাজার তৈরি হয় যা কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেনে পৌঁছায়। হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের উদ্যোক্তারা এই একটি উৎসবকে কেন্দ্র করে সারা বছরের আয়ের একটি বড় অংশ নিশ্চিত করেন।

গ্রামীণ মেলাগুলো কেবল চিত্তবিনোদনের জায়গা নয়, বরং এগুলো স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। নাগরদোলা থেকে শুরু করে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কাঠের খেলনা এবং লোকজ মিষ্টান্ন—সবকিছুর পেছনে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার গ্রামীণ কারিগরের শ্রম। যারা আধুনিক যান্ত্রিক শিল্পায়নের যুগে কিছুটা পিছিয়ে পড়ছিলেন, পহেলা বৈশাখের এই মৌসুম তাদের শিল্পকর্মকে মূলধারার বাজারে নিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন হারিয়ে যাওয়া লোকশিল্প রক্ষা পাচ্ছে, অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিত হচ্ছে।

বাঙালির উৎসবে খাদ্য এক অপরিহার্য বিষয়। পান্তা-ইলিশের বিতর্ক ছাপিয়ে পহেলা বৈশাখের খাবারের টেবিলে থাকে বাংলার চিরায়ত বৈচিত্র্য। পিঠা-পুলি, খৈ-মুড়কি, নাড়ু, মোয়া এবং বিভিন্ন ধরনের ভর্তা আমাদের কৃষিভিত্তিক খাবারের ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। খাদ্য এখানে কেবল পেট ভরার মাধ্যম নয়, বরং এটি পারিবারিক বন্ধন এবং শৈশবের স্মৃতির ধারক।

আধুনিক ডায়েট সচেতন প্রজন্মের কাছে গুড়, চিঁড়া বা দইয়ের মতো প্রাকৃতিক খাবারের পুষ্টিগুণ নতুনভাবে আদৃত হচ্ছে। রিফাইন্ড চিনির বদলে প্রাকৃতিক মিষ্টান্নের ব্যবহার বাড়ছে, যা একটি স্বাস্থ্যকর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। উৎসবের বিশেষ দিনগুলোতে মা-চাচিদের হাতের রান্নার যে সুবাস, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙালির হৃদয়ে এক অদৃশ্য সুতোর টান তৈরি করে রাখে। রেস্তোরাঁগুলোতে ঐতিহ্যবাহী খাবারের ‘ফিউশন’ তরুণদের কাছে আমাদের পুরোনো খাদ্যাভ্যাসকে আকর্ষণীয় করে তুলছে।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩-এর সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী বার্তা হলো সম্প্রীতি। এটি এমন একটি উৎসব যা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, বর্ণ বা সম্প্রদায়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। যখন বিশ্বে অসহিষ্ণুতা, উগ্রবাদ ও মেরুকরণ বাড়ছে, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় কীভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয় ধারণ করতে হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রায় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের ও সব মতের মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, আমাদের জাতীয় সত্তা আমাদের ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়েও বড়।

এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাই বাংলাদেশের মূল শক্তি। পহেলা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা প্রথমত বাঙালি, তারপর অন্য কিছু। এই ঐক্যবোধই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছিল এবং আজও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে এটিই আমাদের প্রধান হাতিয়ার। সামাজিক টানাপড়েনের সময়েও পহেলা বৈশাখ এক পরম শান্তির ও ঐক্যের স্মারক হয়ে দাঁড়ায়।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩-কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে আজকের ‘জেন-জি’ এবং তরুণ প্রজন্ম। তারা কেবল প্রথাগতভাবে উৎসব পালন করছে না, বরং তারা ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক ফ্যাশনের এক চমৎকার ফিউশন ঘটাচ্ছে। তারা লোকমোটিফ নিয়ে ডিজিটাল আর্ট করছে, পডকাস্টের মাধ্যমে লোকসংগীত ও লোকগাথা প্রচার করছে এবং ইউটিউব বা টিকটকের মাধ্যমে বিশ্ব-দরবারে বাঙালির নববর্ষকে তুলে ধরছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চারুকলা ও সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্রগুলোর ভূমিকা এই উৎসবের প্রাণশক্তি বজায় রাখছে। তরুণদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, বাঙালি সংস্কৃতি কোনো স্থবির বা মৃত বিষয় নয়, বরং এটি একটি গতিশীল খরস্রোতা নদী যা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ধারাকে গ্রহণ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করে এগিয়ে চলে। তাদের হাতেই বাঙালির উত্তরাধিকার নিরাপদ।

বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের যুগে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনে পরিবেশ সচেতনতা এখন এক অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের উৎসবের আলোচনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্লাস্টিকমুক্ত সাজসজ্জার বিষয়টি বিশেষভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে। মৃৎশিল্প, পাট, খড় এবং বাঁশের সামগ্রীর ব্যবহার বাড়িয়ে পরিবেশবান্ধব উদ্যাপন নিশ্চিত করার দিকে সবার নজর বাড়ছে।

প্রকৃতি-নির্ভর বাংলা সংস্কৃতির মূল দর্শনই হলো প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকা। ঋতুচক্রের এই আবর্তন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা প্রকৃতিরই অংশ। উৎসবের নামে আমরা যেন পরিবেশের ক্ষতি না করি, সেই শিক্ষা এখন মঙ্গল শোভাযাত্রার থিমগুলোতেও ফুটে উঠছে। পরিবেশ সচেতন এই নতুন ধারার উদ্যাপন পহেলা বৈশাখকে আরও অর্থবহ ও টেকসই করে তুলছে।

পহেলা বৈশাখ কেবল বাইরে দেখার উৎসব নয়, এটি বাঙালির মনের ভেতরেও এক বিশাল পরিবর্তনের ঢেউ তোলে। এটি শৈশব স্মৃতি, পারিবারিক মিলন এবং সম্প্রদায়ের আনন্দের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ। এই দিনে মানুষ পুরোনো ভেদাভেদ ভুলে শুভেচ্ছা বিনিময় করে, একে অপরের বাড়িতে যায় এবং নতুন বছরের জন্য শুভকামনা জানায়। এই সামাজিক মিথস্ক্রিয়া আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

ব্যস্ত যান্ত্রিক জীবনে আমরা যখন ক্রমশ একা হয়ে পড়ছি, তখন পহেলা বৈশাখ আমাদের শেখায় ‘আমরা’ হওয়ার আনন্দ। এটি একটি সামাজিক পুনরারম্ভের অনুভূতি সৃষ্টি করে। মানুষ নতুন কাপড় পরে যখন রাস্তায় বের হয়, তখন তাদের চোখেমুখে যে আশা ও উদ্দীপনা দেখা যায়, তাই একটি জাতির জীবনীশক্তি। এই আনন্দই আমাদের সামনের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার সাহস জোগায়।

বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালির বিস্তৃতি আজ অভাবনীয়। লন্ডন থেকে ক্যানবেরা, টরন্টো থেকে দুবাই—প্রতিটি বড় শহরে আজ পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। প্রবাসী বাঙালিরা তাদের নতুন প্রজন্মের কাছে দেশের সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই দিনটিকে বেছে নেন। বিদেশের মাটিতে লাল-সাদা শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করার দৃশ্য এখন সাধারণ। এইভাবে পহেলা বৈশাখ কেবল বাংলাদেশের উৎসব হিসেবে থাকেনি, এটি একটি বৈশ্বিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। এটি আমাদের জন্য এক বিশাল ‘সাফট পাওয়ার’ (Soft Power) যা বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালির শান্তিপ্রিয় ও শিল্পমনস্ক ভাবমূর্তিকে তুলে ধরছে।

পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ কেবল একটি উৎসবের দিন নয়, এটি বাঙালির অস্তিত্বের মহাকাব্যিক জয়গান। এটি আমাদের স্থিতিশীলতা, সহনশীলতা এবং সৃজনশীলতার প্রতীক। প্রতিটি বছর পহেলা বৈশাখ আমাদের অতীতের গৌরব স্মরণ করিয়ে দিয়ে ভবিষ্যতের এক সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্নে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।

রঙ, সংগীত, আনন্দ এবং ভ্রাতৃত্বের এই অমোঘ শক্তি আমাদের জাতীয় পরিচয়কে আরও উজ্জ্বল করুক। নববর্ষের এই আলোয় প্রতিটি বাঙালির মনে জাগ্রত হোক শুভবোধ এবং সম্মিলিত মঙ্গলের বাসনা। আমরা যেন আমাদের সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি—১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই মাহেন্দ্রক্ষণে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
শুভ নববর্ষ ১৪৩৩!

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী।

বাংলাদেশে আরেকটি শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে: দেবপ্রিয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৫:২৬ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশে আরেকটি শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে: দেবপ্রিয়

নতুন করে আরেকটি শিক্ষা আন্দোলনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এই আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থীদের স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য নয়, বরং শিক্ষার প্রকৃত মান ও ফলাফল নিশ্চিত করার আন্দোলন হতে হবে।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) সকালে রাজধানীতে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম আয়োজিত ‘সরকারের অগ্রাধিকার ও শিক্ষা খাত: বাজেট ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে যেতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা। কিন্তু শিক্ষার মান, বরাদ্দ, ব্যয়ের কাঠামো, ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, শিক্ষাখাত নিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা বা বয়ান চালু রয়েছে। কেউ বলেন, সরকার শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে আমরা অগ্রাধিকার বুঝি বরাদ্দ দিয়ে। বরাদ্দ যদি যথেষ্ট না হয়, তাহলে সেই অগ্রাধিকার বাস্তব নয়। আবার শুধু বরাদ্দ দিলেই হবে না, সেই বরাদ্দ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা কিংবা উচ্চশিক্ষা— কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ সেই ব্যয় অবকাঠামো নির্মাণে যাচ্ছে নাকি শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে। কেবল ভবন নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান বাড়ে না।

সরকারের উপবৃত্তি কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বিভিন্ন সময় বলা হয়েছে যে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু শুধু উপবৃত্তি দিয়ে শিক্ষার ব্যয় মোকাবিলা সম্ভব নয়। পরিবারের আরো নানা ধরনের খরচ রয়েছে, যা দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য বড় চাপ তৈরি করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সবাই শিক্ষার মান নিয়ে উদ্বিগ্ন। মানুষ মনে করছে, শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা দূর করা না গেলে এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার ভেতরে ধরে রাখা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা, বিশেষ করে মেয়েদের ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম বৃদ্ধিকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব সমস্যা সমাধান না হলে প্রকৃত অর্থে শিক্ষার অগ্রগতি হবে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও তুলনামূলক মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করাও সম্ভব হবে না।

সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী দিনের শ্রমবাজার বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স ও প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে প্রায় ৫৬ লাখ কর্মসংস্থান হারিয়ে যেতে পারে। আবার নতুন করে প্রায় ৫০ লাখ কাজের সুযোগও সৃষ্টি হবে। কিন্তু সেই নতুন ধরনের কাজের জন্য দেশের তরুণ সমাজ প্রস্তুত কি না, তা নিয়ে বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আগে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল সবাইকে শিক্ষার আওতায় আনা। এখন সময় এসেছে শিক্ষার ফলাফল নিশ্চিত করার। ইংরেজিতে যেটা বলা হয়, আগে ছিল ‘ফাইট ফর এডুকেশন’, এখন সময় এসেছে ‘ফাইট ফর আউটকাম অব এডুকেশন’ এর। শিক্ষা আন্দোলনকে শুধু কারিগরি মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। এটিকে রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। এ লক্ষ্যে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়েও একটি জোট গঠনের চিন্তা করা হচ্ছে, যাতে শিক্ষা সংস্কার ও মানোন্নয়নের দাবিকে আরো জোরালোভাবে সামনে আনা যায়।

কালের আলো/এসআর/এএএন

দীপু মনি, সাংবাদিক বাবু ও ফারজানাকে হাজিরের নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৫:১৯ অপরাহ্ণ
দীপু মনি, সাংবাদিক বাবু ও ফারজানাকে হাজিরের নির্দেশ ট্রাইব্যুনালের

রাজধানীর মতিঝিলে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাংবাদিক ফারজানা রুপা ও মোজাম্মেল বাবুকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ রাষ্ট্রপক্ষ থেকে এই আবেদন করা হয়। পরে তাদের ১৪ মে হাজিরের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

আদেশের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে হেফাজতের সমাবেশে হত্যাকাণ্ড ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ওই ঘটনায় অন্যদের সঙ্গে সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, ৭১ টিভির সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনে কার কী ভূমিকা ছিল, তা বিস্তারিত উল্লেখ করা হবে। আপাতত তিনজনের বিরুদ্ধে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট চাওয়া হয়েছে।

আগামী ৭ জুন এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে। এরই মধ্যে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ৫৮ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত সংস্থা।

কালের আলো/এসআর/এএএন

হাম ও উপসর্গে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬, ৫:১১ অপরাহ্ণ
হাম ও উপসর্গে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু

সারাদেশে একদিনে (গত ২৪ ঘণ্টায়) হাম ও হামের উপসর্গে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন করে হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে এমন শিশুর সংখ্যা ১ হাজার ৫২৪ জন।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

হাম আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে ঢাকায়। এছাড়া হামের উপসর্গে বরিশালে ১ জন, ঢাকায় ৫ জন, খুলনায় ১ জন, ময়মনসিংহে ১ জন, রাজশাহীতে ২ জন ও সিলেটে ১ জন মারা গেছে।

এর আগে ৪ মে হাম ও হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ২৭৯ শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানা গেছে। এ সময়ে হাম শনাক্তের পর মারা গেছে ৫৭ শিশু।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৪৫ হাজার ৪৯৮ শিশুর। এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩১ হাজার ৯১২ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ২৮ হাজার ২৩৮ শিশু বাড়ি ফিরেছে।

কালের আলো/এসআর/এএএন