বহু প্রতীক্ষিত ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ সংসদের যাত্রা শুরু
ঐকতানে শুরু সকাল, বিরোধী দলের ওয়াক আউটে শেষ প্রথম দিন
অন্তর্বর্তী সরকারের পথ পেরিয়ে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০ মাস পর ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের যাত্রা শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) এই অধিবেশনের শুরুতেই এক ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা গেছে। যেখানে নতুন স্পিকার নির্বাচনের আগেই একজন ‘সাময়িক সভাপতি’ নির্বাচন করতে হয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর অনুপস্থিতিতে সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে প্রবীণ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছেন। সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সাংসদরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তারেক রহমান এই প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন।
এদিন সকালটি ছিল ঐকতানের। সরকারি-বিরোধী উভয় দলের মুখে ছিল হাসি। একে অপরে উষ্ণ শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্য নজর কাড়ে। সব মিলিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক আশাব্যঞ্জক সূচনা। কিন্তু দিন গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। রাষ্ট্রপতির ভাষণকে কেন্দ্র করে ফিরে আসে চেনা উত্তাপ, স্লোগান আর শেষ পর্যন্ত বিরোধীদলের ওয়াকআউট। তবে ঐকমত্যের এই আবহ আরও স্পষ্ট হয় শোক প্রস্তাব আলোচনায়। জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী সদ্য প্রয়াত খালেদা জিয়া, হত্যার শিকার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করেন স্পিকার। পরে জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ কয়েকজনের নাম অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব দেন সরকার দলীয় চিফ হুইপ। আবরার ফাহাদ ও ফেলানী খাতুনের নাম যুক্ত করার প্রস্তাব আসে বিরোধী দল। সব প্রস্তাবই গৃহীত হয় সর্বসম্মতিতে। দুপুরে নামাজের বিরতির পর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদ আবার বসলে কক্ষে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, এটাই হোক আমাদের মূলমন্ত্র।’
১৯৭৩ সালের পর প্রথম ‘সাময়িক সভাপতি’, সূচনা বক্তব্য প্রধানমন্ত্রীর
অধিবেশন শুরুতে সংসদ সচিবালায়ের সচিব কানিজ মাওলা কার্যক্রমের সূচনা করেন। তারপর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। এরপর সূচনা বক্তব্য রাখেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে সংসদে ‘সাময়িক সভাপতি’ নির্বাচনের ঘটনা ঘটেছিল স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম আইনসভায়। সংসদ সচিব কানিজ মওলা এদিন অধিবেশনে সেই ঐতিহাসিক নজিরটি তুলে ধরেন। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের গণপরিষদের প্রথম বৈঠকেও স্পিকার নির্বাচনের আগে একইভাবে একজন সভাপতি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেবার তৎকালীন পরিষদ নেতার প্রস্তাবে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচন করা হয় এবং তাঁর সভাপতিত্বেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হয়েছিলেন। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর আজ আবারও সেই ঐতিহাসিক নজির অনুসরণ করল জাতীয় সংসদ।
মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য কায়সার কামাল নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে তাঁদের নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করান। অধিবেশনের শুরুতে সভার সভাপতি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, স্পিকার পদে একটিমাত্র মনোনয়নপত্র পাওয়া গেছে। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের নাম প্রস্তাব করেন বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম। এই প্রস্তাবে সমর্থন জানান খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম। এরপর সভাপতি প্রস্তাবটি সংসদে ভোটাভুটির জন্য উপস্থাপন করলে তা সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। পরে হাফিজ উদ্দিন আহমদকে স্পিকার হিসেবে ঘোষণা করেন সভাপতি খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
অন্যদিকে, স্পিকার নির্বাচনের পর ডেপুটি স্পিকার হিসেবে কায়সার কামালের নাম প্রস্তাব করেন নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। এই প্রস্তাবে সমর্থন করেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফউদ্দীন নিজাম। সভাপতি জানান, ডেপুটি স্পিকার পদেও একটিমাত্র মনোনয়ন পাওয়া গেছে। এ কারণে তিনি কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচিত করতে সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটের জন্য উপস্থাপন করেন এবং তা বিপুল ভোটে জয়ী হয়। সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অধিবেশনে ৩০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হয়। এই বিরতির সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদ ভবনে নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালকে শপথ পড়ান। শপথ গ্রহণ শেষে তাঁরা পুনরায় সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসসহ বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা। এদের মধ্যে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমানও। অধিবেশনে স্পিকারের দুই পাশের ভিভিআইপি লাউঞ্জসহ চারপাশের দর্শক গ্যালারিগুলোতে উপস্থিত হন আমন্ত্রিত অতিথিরা। দর্শকসারিতে দেখা যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন, সাবেক আইন উপদেষ্টা ড.আসিফ নজরুলকে। ভিভিআইপি লাউঞ্জে ডান পাশের গ্যালারিতে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানের মা সৈয়দা ইকবাল মান্দবানু, প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী শামিলা রহমান সিঁথি, বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা এবং জুবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান বিন্দু। এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন প্রমুখ।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রীর
স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ায় কোনো বিরোধ থাকতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন সংসদীয় উপনেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টার পর সংসদে শুরু হওয়া প্রথম অধিবেশনে এই মন্তব্য করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি।’ এ সময় তিনি প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তারেক রহমান বলেন, ‘দল-মত নির্বিশেষে আমি দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করাই বিএনপির লক্ষ্য। এভাবে বিএনপি স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চায়।’ সবার সহযোগিতা চেয়ে সংসদীয় নেতা বলেন, ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ায় কোনো বিরোধ থাকতে পারে না, বিরোধ নেই।’
নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নন। আপনারা এই সংসদের স্পিকার। স্পিকারের বক্তব্যের পর শুভেচ্ছা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারকে উদ্দেশ্যে বলেন, আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নয়। আপনারা এই সংসদের স্পিকার। আজকের এ সংসদ বাংলাদেশের জনগণের সংসদ। দেশের মানুষ এ সংসদের দিকে প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে। দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমরা এই সংসদকে অর্থবহ করতে চাই। তিনি আরও বলেন, গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জনগণকে দুর্বল জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা হয়েছিল এবং সংসদকে মানুষের অধিকার লুণ্ঠনকারীদের ক্লাবে পরিণত করা হয়েছিল। বিগত দেড় দশকে যারা নিজেদের এমপি পরিচয় দিতেন, তারা কেউ জনগণের ভোটে নির্বাচিত ছিলেন না। কিন্তু আজকের সংসদ জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদ। এটি বাংলাদেশের জনগণের সংসদ। তারেক রহমান বলেন, বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয় বরং সুনির্দিষ্ট যুক্তি ও বিতর্কের মাধ্যমে সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলতে চাই আমরা। এক্ষেত্রে স্পিকারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে সংসদ পরিচালনায় আমরা স্পিকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবো। বক্তব্যের শেষদিকে স্পিকারকে নতুন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা, অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে সংসদে সাময়িক উত্তেজনা, বিরোধী দলের ওয়াকআউট
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ ঘিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদে সাময়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণ প্রত্যাখ্যান করে প্রায় পাঁচ মিনিট বিক্ষোভের পর সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ রাষ্ট্রপতিকে ভাষণের জন্য সংসদে আমন্ত্রণ জানালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাহিদ ইসলাম কিছু বলার জন্য স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। স্পিকার মাইক না দিলে নাহিদ ইসলাম দাঁড়িয়ে বলেন, ‘কিলার ইন দা পার্লামেন্ট!’ তিনি ‘নো, নো’ বলে প্রতিবাদ জানান। এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সব সদস্য নানা বক্তব্য দিয়ে তৈরি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে থাকেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে শুধু জামায়াতের আমির তাঁর আসনে বসে ছিলেন। স্পিকার বিরোধীদলীয় সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতেই থাকেন।
একপর্যায়ে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ‘কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু’ বলে স্লোগান দেন। এই হইচইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদে স্পিকারের আসনের পাশে আসেন। স্পিকার তাঁকে চেয়ারে বসার অনুরোধ জানান। তখনো বিক্ষোভ চলছিল। একপর্যায়ে স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে তাঁর ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান। রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে তখন বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক ছিলেন। কিন্তু আপনি সেই অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন। অন্য সংসদ সদস্যরা ‘গেট আউট, গেট আউট’ বলে স্লোগান দেন। এ সময় কিছু সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিরোধী দলের সদস্যরা ‘ফ্যাসিবাদের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘স্বৈরাচারের দালালেরা, হুঁশিয়ার সাবধান’, ‘ফ্যাসিবাদ আর গণতন্ত্র, একসাথে চলে না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণ শুরু করেন। তখন বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি দলের সদস্যদের দিকে তাকিয়ে ‘লজ্জা লজ্জা’ হলে বিদ্রূপ করেন। স্পিকার এ সময় বারবার সংসদ সদস্যদের প্রতি সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করার আহ্বান। কিন্তু বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। শেষে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ‘ওয়াকআউট’ করার ঘোষণা দিয়ে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান। অন্যদিকে ভাষণ চালিয়ে যেতে থাকেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হয়। এর পরপরই অধিবেশন ১৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন স্পিকার। বিরোধীদলীয় সদস্যরা আর সংসদ অধিবেশনে যোগ দেননি।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের বিরোধিতা করে তারা প্ল্যাকার্ড না দেখালেও পারতেন : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছাত্র-জনতার গণপ্রত্যাশা পূরণই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অঙ্গীকার বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কক্সবাজার-১ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে বক্তব্য দেওয়ার সময় এমন মন্তব্য করেন তিনি। বক্তব্যে প্রয়াত বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আজ সংসদে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। যত আসনেই নির্বাচন করেছেন সব আসনেই খালেদা জিয়া জিতেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আজকে সেই গণতন্ত্রের মা আমাদের মাঝে নেই। তবে তিনি মানুষের মাঝে আছেন। গণতন্ত্রের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি জীবিত থাকবেন। তিনি একাত্তর ও জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে সংসদের বিরোধীদলের ওয়াকআউট করার অধিকার আছে মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তবে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের বিরোধিতা করে তারা প্ল্যাকার্ড না দেখালেও পারতেন। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ওয়াকআউটের ঘটনা সংসদের কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত তৈরি করবে না। এটা গণতান্ত্রিক সভ্যতার মধ্যে আছে, পার্লামেন্টারি সংস্কৃতির মধ্যে আছে।’ তিনি বলেন, ‘আজ হচ্ছে সেই দিন, যে দিনের জন্য পুরো জাতি ১৭-১৮ বছর অপেক্ষা করেছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে, গণতন্ত্র উত্তরণের পথ পরিষ্কার হয়েছে, আজ নতুনভাবে আমরা সেই নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করেছি।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জাতীয় সংসদে যেন জাতির সব ইস্যুগুলো আমরা আলোচনা করি ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করি এবং এর মধ্য দিয়ে আমরা এমন একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখব যে, সত্যিকার অর্থে আমরা একটি গণতান্ত্রিক শক্তিশালী বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে পারব।’ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওয়াকআউটের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বিধি মোতাবেক ওয়াকআউট করতে পারেন। তারা ওয়াকআউট করেছেন। এটা ব্যতিক্রম কিছু নয়।’ ‘তারা আবার আসবেন যেদিন সংসদ বসবে। এটা কোনো নজিরবিহীন ঘটনা নয়। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের অধিকার আছে, কোনো বিষয়ে যদি তারা সিদ্ধান্ত নেন যে ওয়াকআউট করবেন, তারা করতে পারেন। তবে তারা প্ল্যাকার্ড না দেখালেও পারতেন’, বলেন সালাহউদ্দিন।
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে স্লোগান দিলেন জামায়াত আমির
জাতীয় সংসদ যেন কারও চরিত্রহননের জায়গায় পরিণত না হয়-এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, অতীতে সংসদে দেশের মানুষের কল্যাণের বিষয় নিয়ে আলোচনা কম হলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্রহননের জন্য অনেক সময় ব্যয় হয়েছে। নতুন সংসদে সেই মন্দ নজির আর না ঘটুক এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে বিরোধী দলীয় নেতার বক্তব্যে এসব কথা বলেন শফিকুর রহমান। স্পিকারকে উদ্দেশ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধী দল আলাদা কিছু হবে না-এমনটাই আমরা আশা করি। আপনার কাছে সুবিচার পাব। জাতির কল্যাণে আমরা যে কথাগুলো বলতে চাই, তা বলার সুযোগ পাব। ‘আপনার নেতৃত্বে এটি একটি গতিশীল সংসদ হবে আমরা এটা আশা করতে চাই। আমরা আশা করতে চাই অতীতে যে মন্দ নজির সৃষ্টি হয়েছিল বিভিন্ন সময়ে এটি নতুন করে আর হবে না। আজকের এই সংসদে অনেক নতুন তরুণ সদস্য এসেছেন। বয়সে একটু বেশি হলেও আমিও তরুণ্। আমার জীবনে এটা প্রথম সংসদ। সুতরাং আমিও তরুণদের একজন।’ ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘অতীতের সংসদগুলোতে দেশের মানুষের কল্যাণের বিষয় নিয়ে আলোচনা কম হয়েছে। বরং অনেক সময় ব্যয় হয়েছে ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্রহননে।’ স্পিকারকে অনুরোধ করে বিরোধীদলীয় এই নেতা বলেন, ‘এই সংসদ যেন আর কারও চরিত্রহননের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। আপনার কাছ থেকে এ ব্যাপারে কেউ যেন সামান্যতম সুযোগও না পায়।’ বক্তব্যের শেষে স্পিকারের কাছে আবারো ন্যায়বিচার চেয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময় অসংখ্য মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অনেকে জীবন দিয়েছেন, গুমের শিকার হয়েছে। জুলাইয়ে একটা স্লোগান ছিল ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, আমি এখনও সেই স্লোগান দিতে চাই ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।
পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের কারণ হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতির তিন অপরাধে তার ভাষণ বর্জন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের শুরুতেই বিরোধী দলের তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। একপর্যায়ে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াক আউট করেন। ওয়াক আউট শেষে সংসদে সাংবাদিকদের সামনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘এই সংসদ জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, এই সংসদে ফ্যাসিস্টের দোসর, খুনির কোনো দোসর যেন বক্তব্য রাখতে না পারে।’ রাষ্ট্রপতি তিনটি অপরাধে অপরাধী বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, ‘এই প্রেসিডেন্ট তিনটা কারণে অপরাধী। তার বক্তব্য এই মহান সংসদে আমরা শুনতে পারি না। প্রথম কারণ, তিনি সব খুনের সহযোগী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন। তৃতীয় কারণ হিসেবে জামায়াত আমির বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে অর্ডিন্যান্স স্বাক্ষর করেছেন। নির্বাচনে দুটি ভোট হবে, এতে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন তারা সংস্কার সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় শপথ একই ব্যক্তি পড়াবেন। এই শপথ দুটি আমরা নিলেও সরকারি দল নেয়নি। রাষ্ট্রপতির প্রথম দায়িত্ব ছিল অধ্যাদেশ জারির ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা। তিনি সেই অধিবেশন ডাকেননি। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি এই ৭০ শতাংশ মানুষকে অপমান করেছেন। এখানেও তিনি অপরাধ করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘স্পিকারের কাছে নিবেদন থাকবে, কোনো ফ্যাসিস্ট বা তার দোসর যেন বক্তব্য দিয়ে সংসদকে কলুষিত করতে না পারেন।’

খালেদা জিয়াকে নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করলেন মির্জা ফখরুল
জাতীয় সংসদে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে কবি আল মাহমুদ রচিত ‘খালেদা’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে শোকপ্রস্তাবকালে এই কবিতা আবৃত্তি করেন তিনি। বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠনের পর কবিতাটি লিখেছিলেন আল মাহমুদ। ১৯৯২ সালের ২০ নভেম্বর শুক্রবার দৈনিক যুগান্তরের সাহিত্য সাময়িকীতে তা প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন ১৯৯২ সালের ১৯ নভেম্বর। দৈনিক সন্ধানী বার্তার পাঠকদের জন্য আল মাহমুদ রচিত কবিতাটি হুবহু তুলে ধরা হলো- খালেদা-আল মাহমুদ। তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছে বাংলার ভোরের আকাশ/এদেশের গুল্মলতা ছুঁতে চায় পল্লবিত আঁচল তোমার/যেন এক প্রতিশ্রুতি হেঁটে যায় আমাদের কণ্টকিত কালের ভিতরে/লাঞ্ছিতের আহ্বানে যেন মাটি জন্ম দিল শস্যগন্ধী মাটিরই কন্যাকে/প্রত্যাশার কণ্ঠস্বর কে জানে কি মন্ত্রবলে তুমি/কেবল ছড়িয়ে দিচ্ছ, মাঠঘাট আদিগন্ত শস্যের কিনারে/আমরাও সাক্ষ্য দেব, হাঁ আমরা একদা দেখেছি/দেখেছি মাতাকে এক অনিঃশেষ আঁধারে দাঁড়িয়ে/আলোর ডানার মত মেলে দিয়ে ব্যাগ্র দুই বাহু/এগারো কোটির মাঝে নেমেছিল বিদ্যুৎবিভায়!/কখনো ভুলোনা যেন তোমার ঘোমটায় আছে মানুষের আশার বারুদ/ভুলোনা, তোমার বাক্য প্রতীক্ষিত নিঃশ্বাস জাতির/অবিচল, পিঙ্গলাক্ষী হে মাতৃকা, মানুষের আশাকে জাগাও।
কালের আলো/এম/এএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array