র্যাবের সংস্কার সরকারের বিষয়, পেশাদার ও মানবিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় নতুন মহাপরিচালকের
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নতুন মহাপরিচালক হিসেবে প্রথম মতবিনিময় সভা। রোববার (০৫ এপ্রিল) দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় খোলামেলা অনেক প্রশ্নের জবাব দিলেন র্যাব মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ। তিনি র্যাবকে একটি পেশাদার, মানবিক ও প্রযুক্তি নির্ভর সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এই সংবাদ সম্মেলনে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয় র্যাব বিলুপ্তি সংক্রান্ত বিষয়েও। উত্তরে র্যাবের ১২তম মহাপরিচালক এই অতিরিক্ত আইজিপি বললেন, ‘যেহেতু আমরা রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেড়ে উঠছি, সে ক্ষেত্রে আমাদের মূল কাজই হচ্ছে র্যাবকে জনগণের সামনে ভালোভাবে উপস্থাপন করা, কাজের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। সুতরাং র্যাব সম্পর্কে যেকোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে।’
নাম পরিবর্তন, র্যাবের সংস্কার ও পুনর্গঠন সরকারের বিবেচনার বিষয় বলে মনে করেন র্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজটা করে যেতে চাই। আর অভ্যন্তরীণ কোনো ত্রুটি থাকলে সেগুলো আমরা অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করি। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ ছাড় পাচ্ছে না। আশা করি, বেলা শেষে ভালো অবস্থানে যেতে পারব এবং র্যাবের বিরুদ্ধে যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো আস্তে আস্তে সমাধান হয়ে যাবে।’ র্যাব গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোন সময় কী কী অপরাধের কারণে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আলোচনায় এল, তা বিশ্লেষণ করা দরকার বলে জানান র্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেই বুঝতে পারবেন যে কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা বিচ্যুতি হয়তো ছিল, কিছুটা পদস্খলন হয়তো ছিল বলে এ রকম একটা বিষয় এসেছে। তো আমরা যদি সেই জায়গাটা মেরামত করতে পারি, তাহলে নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলো থাকবে না।’
- র্যাব নিয়ে যেকোন সিদ্ধান্ত নেবে সরকার
- বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করব
- র্যাবের অপকর্ম বা অপকীর্তির ইতিহাস কিন্তু খুব বেশি নেই
- আমি মনে করি, এ ধরনের একটি সংগঠন থাকার প্রয়োজন আছে
- গত তিন মাসে র্যাবের আভিযানিক সাফল্যের বর্ণনা
সম্প্রতি র্যাবের বিভিন্ন সাফল্য এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সম্প্রতি র্যাবের বিভিন্ন অভিযানের তথ্য এবং র্যাবের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন র্যাব মহাপরিচালক। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে র্যাবের ক্রসফায়ারের মামলার নথি পর্যালোচনা করার কথা বলেছেন। তদন্ত শেষে প্রমাণ পেলে ট্রাইব্যুনালে বিচারের কথাও জানিয়েছেন।
বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করব
এ ক্ষেত্রে র্যাব সরকারকে সহায়তা করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে র্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদের কাছে যা আছে, যেটুকু তথ্য থাকবে, তার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ সহায়তা প্রদান করা হবে। যে তথ্য আমার কাছে নেই বা থাকবে না, আমার দেওয়ার সামর্থ্য বা সাধ্য নেই, সে ক্ষেত্রে হয়তো আমরা অপরাগতা প্রকাশ করতে পারব। কিন্তু যতটুকু সাধ্য বা সামর্থ্যের মধ্যে তথ্য আমাদের কাছে আছে, তা দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করব।’ সরকারের পক্ষ থেকে এই সহায়তা চাওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে আহসান হাবীব বলেন, এখন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল যোগাযোগ করেছে, এমন তথ্য আমার জানা নেই।
র্যাবের অপকর্ম বা অপকীর্তির ইতিহাস কিন্তু খুব বেশি নেই
র্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের অভিযোগের প্রসঙ্গে আহসান হাবীব বলেন, বিগত দেড় বছরে, বিশেষ করে পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে যদি র্যাবের কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন, দেখবেন, র্যাবের অপকর্ম বা অপকীর্তির ইতিহাস কিন্তু খুব বেশি নেই। তার মানে এতে প্রমাণিত হয় যে র্যাবকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা গেলে র্যাব সঠিক পথে পরিচালিত হতে পারে। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে ভালো কাজে সম্পৃক্ত করার জন্য। বিশ্বাস করি, র্যাব সঠিক পথে পরিচালিত হবে। এ বিষয়ে সরকারের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা আমরা পেয়েছি।’
আমি মনে করি, এ ধরনের একটি সংগঠন থাকার প্রয়োজন আছে
র্যাবকে আগে বাইরে থেকে এবং বর্তমানে প্রধান হিসেবে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে সংস্থাটির ১২তম মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘আমি মনে করি, এ ধরনের একটি সংগঠন থাকার প্রয়োজন আছে। এটি অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। র্যাব পুলিশেরই একটি সংগঠন। সুতরাং আলাদাভাবে আমি দেখছি না। র্যাবের প্রয়োজনের বিষয়েও দ্বিমত নেই। আমি বাইরে থেকে যা দেখেছি, এখানে এসে আরও বেশি সুসংগঠিত দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, সংগঠনটিকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি চাই, পেশাদার, মানবিক ও প্রযুক্তি নির্ভর সংগঠন গড়ে উঠুক। অপরাধ প্রতিরোধে র্যাব দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।’
সরকার পতনের পর জলদস্যু ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের তৎপরতার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এগুলো আমাদের দৃষ্টিগোচরে আছে। বিগত সময়ে নানা কারণে আমরা এটা নিয়ে কাজ করতে পারিনি। নির্বাচন ছিল আমাদের প্রায়োরিটির জায়গা। কিন্তু এখন আমাদের চিন্তাভাবনা আছে আমরা তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নেব।’ জঙ্গিবাদ দেশে আছে কি না, যদি থাকে সেটি নির্মূলে র্যাবের ভূমিকা কী হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে আহসান হাবীব বলেন, ‘জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ—এ বিষয়গুলো আছে কি না, সেই জবাব আমি দিতে চাই না। আমরা কাজ করছি, যে বাদই থাকুক না কেন। উগ্রবাদ থাক, জঙ্গিবাদ থাক, যাুই থাকুক না কেন বা আছে কি না, সেটায় না গিয়ে বরং যদি কিছু থেকে থাকে, এগুলোর ওপর আমরা কাজ করছি। কাজগুলো চলমান আছে। যে বাদই থাকুক, আমরা সব বাদকে নির্মূল করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।’
গত তিন মাসে র্যাবের আভিযানিক সাফল্য
মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, র্যাব ফোর্সেস গত তিন মাসে অস্ত্র সংক্রান্ত অভিযান পরিচালনা করে ৩৩১ টি অস্ত্রসহ সর্বমোট ১০৪ জনকে গ্রেফতার করেছে। উল্লেখযোগ্য অভিযানগুলো হলো গত ৮ ফেব্রুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জে, ৯ মার্চ সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানাধীন এলাকায়, ১০ মার্চ মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে এলাকায় এবং ২৭ মার্চ রাজধানীর রুপনগর এলাকায় পরিচালিত অভিযান। চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড থানার জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনার সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব সদস্য ডিএডি মোতালেব হোসেন নিহত হয়। পরবর্তীতে এ ঘটনায় ২৯ জনকে অভিযুক্ত করে র্যাব একটি মামলা দায়ের করে। এরপর গত ৯ মার্চ জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান পরিচালনার করে র্যাব এবং পুলিশ কর্তৃক সর্বমোট ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
এছাড়াও গত ৯০ দিনে হত্যা সংক্রান্ত মামলায় ৪৮৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অভিযান গুলোর মধ্যে গত ৮ মার্চ ঝিনাইদহ সদর থানাধীন এলাকায় এবং গত ২১ মার্চ মাদারীপুর জেলার সদর থানাধীন এলাকায় পরিচালিত অভিযান। গত তিন মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত প্রায় ১৭৫ জন, ছিনতাইকারী ৬১ জন, ডাকাত ১০৬ জন, মানবপাচারকারী ২৬ জনসহ ওয়ারেন্টভুক্ত আসামী এবং পর্নোগ্রাফি মামলায় ৩৪৭৩ জন আসামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়াও মাদক বিরোধী অভিযানে ১১১৫ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যান্য নানাবিধ দূবৃত্তিপূর্ণ/জঘন্য ঘটনার অপরাধিদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে র্যাব বিগত তিন মাসে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধের সাথে সম্পৃক্ত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার জনকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে র্যাব।
কালের আলো/এমএএএমকে



আপনার মতামত লিখুন
Array