খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ৩১ বৈশাখ, ১৪৩৩
           

বগুড়ার জনসভায় জামায়াতকে তোপ দেগেছেন প্রধানমন্ত্রী

সেই গুপ্ত বিভ্রান্তকারীরা আবারও বিভ্রান্ত করার কাজ শুরু করেছে

জারিফ নিহাল/শফিকুল ইসলাম পলাশ, বগুড়া থেকে
প্রকাশিত: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৫০ অপরাহ্ণ
সেই গুপ্ত বিভ্রান্তকারীরা আবারও বিভ্রান্ত করার কাজ শুরু করেছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজ জেলায় বগুড়ায় প্রথম সফর করলেন তারেক রহমান। সোমবার (২০ এপ্রিল) দিনমান তিনি বগুড়ায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার দেড়শ বছরে সিটি করপোরেশন পেলো উত্তরের জেলা বগুড়া। দীর্ঘ দুই দশক আগে বগুড়া সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তাঁর মা, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ক্ষমতায় এসেই মায়ের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করলেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্যে দিয়ে ১৩তম নগর সংস্থা হিসেবে বগুড়া সিটি করপোরেশন যাত্রা করল।

নিজ জেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সফর। সোমবার (২০ এপ্রিল) সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে সড়কপথে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বগুড়া সার্কিট হাউজে এসে পৌঁছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান সঙ্গে ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী বগুড়া জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত কোর্ট বিল্ডিংয়ের ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

সফরসূচি মোতাবেক জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত ভবনের ফলক উন্মোচন, ই-বেইলবন্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন, জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন, শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এরপর বাগবাড়ী নশিপুর এলাকায় চৌকিরদহ খাল খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পৈতৃক বাড়ি পরিদর্শন করেন। বিকেলে বগুড়া জেলা বিএনপি আয়োজিত নগরীর আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত জনসভায় জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে দেশের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে তোপ দেগেছেন। অভিযোগ করে বলেছেন, নির্বাচনের সময় যেসব গুপ্ত বিভ্রান্তকারী জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, সেই বিভ্রান্তকারীরা আবারও বিভ্রান্ত করার কাজ শুরু করেছে।’

জামায়াতকে ইঙ্গিত করে সরকারপ্রধান জনসভায় আরও বলেন, ‘এদের সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি, তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্তের চেষ্টা করেছে। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে আমরা দেখেছি, তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল। ১৯৯৬ সালেও আমরা দেখেছি, স্বৈরাচারের সঙ্গে গিয়ে দেশের মানুষকে কীভাবে বিভ্রান্ত করেছিল। ২০০৮ সালেও আমরা দেখেছি, ওয়ান ইলেভেনের সঙ্গে যোগ দিয়ে তারা কীভাবে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল।’

বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি ও বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশার সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন। এ সময় জনসভা মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন। সোমবার (২০ এপ্রিল) সকাল ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকার গুলশানের বাসভবন থেকে সড়কপথে বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বগুড়া সার্কিট হাউজে এসে পৌঁছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান সঙ্গে ছিলেন।

বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমাতে ই-বেইলবন্ড কার্যক্রমের উদ্বোধন
প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেলা ১১টার দিকে বগুড়া জেলা আইনজীবী সমিতির নবনির্মিত কোর্ট বিল্ডিংয়ের ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে তিনি নিজ জেলা বগুড়ায় বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ‘ই-বেইলবন্ড’ কার্যক্রমের উদ্বোধনন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বর্তমান সরকার বিচার বিভাগকে দেশের মানুষের জন্য ‘ন্যায় ও আস্থার’ প্রধান স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির পর দেশে জনগণের সরাসরি ভোটে একটি দায়বদ্ধ ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জনগণ তাদের হারানো রাজনৈতিক অধিকার ফিরে পেয়েছে। আর কোনো স্বৈরাচার যাতে জনগণের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।’ ‘আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া গণতন্ত্রের সুফল মিলবে না। ফ্যাসিবাদী আমলে বিচার বিভাগকে দলীয় আদালতে পরিণত করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ অন্ধকারের শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে। এখন আমাদের লক্ষ্য বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং বৈষম্যহীন করা’- যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি কমাতে ই-বেইলবন্ড বা ইলেকট্রনিক জামিননামা পদ্ধতির গুরুত্ব তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘আগে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর জেলখানা পর্যন্ত পৌঁছাতে ১৩টি ধাপ পার হতে হতো। এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই জামিননামা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে যাবে। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং জামিননামা জালিয়াতি বন্ধ হবে; জামিন আদেশ পাওয়ার পর কারামুক্তিতে আর দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হবে না; ই-বেইলবন্ড সিস্টেমকে পুলিশের সিডিএমএস, আদালতের কেস ম্যানেজমেন্ট এবং এনআইডি ভেরিফিকেশনের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। প্রাথমিকভাবে এদিন থেকে বগুড়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরা, রাজশাহী, নাটোর ও কুষ্টিয়া জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হলো। পর্যায়ক্রমে এটি সারা দেশে চালু করা হবে।

বিগত আমলের ‘গায়েবি মামলা’ ও ‘ভুয়া ওয়ারেন্টের’ সংস্কৃতির কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনলাইনে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট, রিলিজ অর্ডার এবং থানা থেকে ওয়ারেন্ট রিকলের কাজ সম্পন্ন করা হবে। এর ফলে এক জেলার আসামিকে অন্য জেলায় গ্রেপ্তার করে আটকে রাখা বা ভুয়া ওয়ারেন্টে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার পথ বন্ধ হবে।’ প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘কারাগারের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ সামান্য অর্থের অভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে না পেরে বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেল খাটছেন।’ এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি আইনমন্ত্রীকে বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন। বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী আইনজীবী ও বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের এই আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে বিচারপ্রার্থীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচার কোনো দয়া নয়, এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে প্রধানমন্ত্রী থেকে সাধারণ নাগরিকÑসবার জন্য আইন ও বিচার হবে সমান।’ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

তারেক রহমানের হাত ধরে সিটি করপোরেশন পেলো উত্তরের জেলা বগুড়া
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে পৌরসভা প্রতিষ্ঠার দেড়শ বছরে সিটি করপোরেশন পেয়েছে উত্তরের জেলা বগুড়া। সোমবার (২০ এপ্রিল) বেলা ১২টার দিকে পৌর ভবনে সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে ১৩তম নগর সংস্থা হিসেবে বগুড়া সিটি করপোরেশন যাত্রা করল। আগে থেকে থাকা ১২টি সিটি করপোরেশন হচ্ছে-ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ। ঐতিহাসিকভাবে বগুড়া পৌরসভার যাত্রা শুরু হয় ১৮৭৬ সালের ১ জুলাই, ব্রিটিশ শাসনামলে। উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন পৌরসভাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। পৌরসভাটির অধীনে বর্তমানে ২১টি ওয়ার্ড রয়েছে এবং ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এর জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। ২০০৬ সালে ক্ষমতায় থাকার সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ওই সময় আশপাশের ৪৮টি মৌজা যুক্ত করে পৌরসভার আয়তন বাড়িয়ে ৬৯.৫৬ বর্গকিলোমিটার করা হয়। একই সঙ্গে ওয়ার্ডসংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ২১ করা হয়। এরপর ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘ দুই দশকেও সেই পরিকল্পনা বা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। সরকার গঠনের দু’মাসের মাথায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়াবাসীর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বপ্ন পূরণ করলেন। বগুড়া সিটি করপোরেশনের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মীর শাহে আলম, বগুড়া সদর আসনের সংসদ সদস্য রেজাউল করিম বাদশা, স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল হাসান, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এবং জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গাবতলীর বাগবাড়িতে ৯১১ জন নারীর মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে হাসির রোল
‘বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে লক্ষ-কোটি টাকা পাচার হয়েছে’- এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে এনে তা ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে। এদিন দুপুরে বগুড়ার শহিদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে তিনি একথা জানান। নারীদেরও স্বাবলম্বী হতে পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মায়েরা এগিয়ে না গেলে দেশ আগাবে না। তাই দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও স্বাবলম্বী হতে হবে।’ তিনি জানান, এই মাসের মধ্যে আরও ২৩টি উপজেলায় নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে। আগামী ৫ বছরে, ৪ কোটি পরিবারের মধ্যে ম্যাক্সিমাম পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেয়া হবে বলেও জানান তিনি। হামের প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচার সরকারের সময়ে বাচ্চাদের টিকা বিদেশ থেকে আনা হয়নি ৫ আগস্টের পর যে সরকার আসলো তারাও টিকা আনেনি। কিছু মানুষের গাফিলতির কারণে অনেক শিশু প্রাণ হারিয়েছে।’ এদিন, বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়িতে ৯১১ জন নারীর মাঝে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে শুরুতেই অনুষ্ঠান মাতিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তার একাধিক রসিক মন্তব্যে হাসির রোল পড়ে যায় সভাস্থলে। বক্তব্যের একপর্যায়ে দর্শকসারিতে কিছুটা হইচই শুরু হলে প্রধানমন্ত্রী মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে হালকা সুরে বলেন, ‘এই ভাই, চুপ করতে হবে। না হলে তোরা বক্তব্য দে, আমি যাই। তার এই মন্তব্যে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় পুরো জনসভা। এর কিছুক্ষণ পরই আরও ঘরোয়া ভঙ্গিতে তিনি বলেন, ‘আরে, খিদে পেয়েছে আমার।

বাপের বাড়ি এসেছি, খেতে দেবেন না? আমি এখনো খাইনি, নামাজও হয়নি। সামনে আরও জনসভা আছে, অন্য প্রোগ্রাম আছে। তারপর আবার ঢাকায় ফিরতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এমন সোজাসাপ্টা ও আন্তরিক মন্তব্যে উপস্থিত জনতা করতালি দিয়ে সাড়া দেন। অনেকেই তার এই সহজ-সরল আচরণকে স্বাগত জানান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পাশে উপস্থিত ছিলেন তার স্ত্রী ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী জোবাইদা রহমান। স্বামীর এমন খুনসুটি উপভোগ করতে দেখা যায় তাকেও। মঞ্চে থাকা অন্য অতিথিদের মধ্যেও এ সময় প্রফুল্ল পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। বক্তব্য চলাকালে দর্শকসারি থেকে এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করে বলেন, ভাই, অন্তত দুই ঘণ্টা কথা বলুন। জবাবে হেসে প্রধানমন্ত্রী সংক্ষেপে বলেন, ‘সেটা সম্ভব না। আমি আবার আসবো।’ অনুষ্ঠান শেষে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মাধ্যমে স্থানীয় দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা হয়।

দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন, ২০ বছর পর পৈতৃক ভিটা ‘জিয়াবাড়ি’ পরিদর্শন
এদিন দুপুরে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ীর জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতাল থেকে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন-২০২৬ কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির সূচনা ঘোষণা করেন। প্রধানমন্ত্রী জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতাল পরিদর্শন করেন এবং পরিচালনা কমিটি, চিকিৎসক ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় টিকাদান কর্মসূচিকে সরকারের অন্যতম সফল উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে ঘিরে জিয়াউর রহমান গ্রাম হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সকাল থেকেই মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় নারী-পুরুষ, শিশুদের অভিভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এরপর বগুড়ার গাবতলীর বাগবাড়িতে দীর্ঘ ২০ বছর পর পৈতৃক ভিটা ‘জিয়াবাড়ি’ পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেল ৩টা ৫৫ মিনিটের দিকে তিনি তাঁর পিতা শহীদ জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতে প্রবেশ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান। প্রধানমন্ত্রী পুরো বাড়িটি ঘুরে দেখেন এবং বাড়ির তত্ত্বাবধায়কদের (কেয়ারটেকার) সাথে কথা বলেন। এর আগে সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি ‘জিয়াবাড়ি’তে গিয়েছিলেন।

পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা
বিকেল পৌনে ৪টার দিকে বগুড়ার বাগবাড়ী নশিপুরে চৌকিদহ খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, সবাই মিলে কাজ করলে ইনশাআল্লাহ দেশের পানিসংকট নিরসন সম্ভব হবে। খাল খননের মাধ্যমে বন্যার সময় মানুষ, সম্পদ, গবাদিপশু ও ফসল রক্ষা করা যাবে। তারেক রহমান বলেন, আজ আমরা যে চৌকিদহ খালটি পুনঃখনন করেছি, এলাকার প্রবীণরা নিশ্চয়ই মনে করতে পারেনÑএই খালটি ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করেছিলেন। প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল পুনঃখননের ফলে বর্ষায় অতিবৃষ্টির পানি জমে থাকবে, আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজে ব্যবহার করা যাবে। তিনি বলেন, খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এলাকার জলাবদ্ধতা কমবে এবং কৃষিকাজে সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি স্থানীয়দের খালের দুই পাশে গাছ লাগানো এবং মাছ চাষের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান তিনি। এতে বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং নারীরাও শাকসবজি চাষে যুক্ত হতে পারবেন। তারেক রহমান আরও বলেন, খাল ও নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন পানির সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বর্ষায় অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। তাই খাল খনন অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, আমি আপনাদের এলাকার সন্তান। যে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, তা সফল করতে সবাই দোয়া করবেন। কয়েকদিন পর আবারও আসব, ইনশাআল্লাহ।

সেই গুপ্ত বিভ্রান্তকারী আবারও বিভ্রান্ত করার কাজ শুরু করেছে
বিকেলে বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে বগুড়া জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ‘জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় দাঁড়িয়ে বিএনপি যে জুলাই সনদে সই করেছে, সেই জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর এক-এক করে বাস্তবায়ন করবেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি আরও বলেন, কিন্তু বারবার পরিষ্কারভাবে এ কথা বলে দেওয়ার পরও কিছু রাজনৈতিক দল সংসদে ও সংসদের বাইরে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কিছু কথাবার্তা বলা শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি কমিশন করেছিল জানিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, ‘১১টি কমিশনের মধ্যে সংবিধান, বিচার, প্রশাসনিক, স্বাস্থ্য, নারী আছে। আজকে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি আমরা। যারা এ সংস্কার সংস্কার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, যারা জুলাই সনদকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, তারা কিন্ত নারীর স্বাধীনতা বা নারীর উন্নয়ন নিয়ে কোনো কথা বলে না। চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য যে কমিশন করা হয়েছিল, সেটা নিয়ে তারা কোনো কথা বলে না। কীভাবে প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে, সেইটা তারা বলে না। কীভাবে আইনশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে, সেইটা তারা বলে না। তারা শুধু সংবিধান, সংবিধান বিষয়ে কথা বলে।’

নির্বাচনের সময় যেসব গুপ্ত বিভ্রান্তকারী জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, সেই বিভ্রান্তকারীরা আবারও বিভ্রান্ত করার কাজ শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, গতকাল রোববার ময়মনসিংহ বিভাগের একটি জেলায় প্রেমঘটিত একটি ব্যক্তিগত তুচ্ছ ঘটনা ঘটেছে। একটি পারিবারিক ও ব্যক্তিগত ঘটনাকে কারা রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে, জনগণ তা দেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশের মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড করতে চাই। ইমাম–মুয়াজ্জিনের জন্য ভাতা চালু করতে চাই, খাল খনন ও বৃক্ষ রোপণ করতে চাই। বেকার যুবকদের দেশে–বাইরে কর্মসংস্থান করতে চাই। এই সব ব্যাপারে তারা (বিরোধী দল) কোনো কাজ করে না। নির্বাচনের সময় বলেছিল, “রাখ তোর ফ্যামলি কার্ড”, মনে আছে? জনগণের স্বার্থে যে কাজ, তা তারা রেখে দেয়, ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতা কীভাবে কুক্ষিগত করতে হবে, সেই কাজের জন্য তারা এখন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।’

কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, খাল খনন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৃক্ষরোপণের মতো কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে জনসভায় উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যদি এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে আপনাদেরকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, তাদের অতীত ইতিহাস বলে দেয়, দেশ স্বাধীনের আগে ও পরে তারা কতবার চেষ্টা করেছে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে।’ ১৯৭১ সালে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আরও বলেন, ‘যারা দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্ত করতে চাচ্ছে, তারা তো এ দেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করেনি। এ দেশের অস্তিত্বেই তারা বিশ্বাস করেনি। যারা দেশের অস্বিত্বকেই বিশ্বাস করে না, তাদেরকে বিশ্বাস করা যায় না।’ সারা দেশে তারা গোলযোগ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে অভিযোগ করে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়া দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার যেমন বলেছিল, ‘এক মিনিটও শান্তিতে থাকতে দিব না,’ সেই একই ভূত কিন্ত এদের ওপরই সওয়ার করেছে। দেখেন, কেমন আন্দোলন-আন্দোলন কথা বলে আর ব্যক্তি ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দিতে চায়। ঠিক দিনাজপুরের ইয়াসমিনের ঘটনার মতো। ওই ঘটনাকে রাজনৈতিক রূপ দিয়ে দেশে অশান্তি তৈরি করা হয়েছিল। ১৭২ দিনের হরতাল দিয়েছিল।’

২০১৬ সালে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ভিশন-২০৩০ ঘোষণা ও পরবর্তীকালে বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান জনসভায় বলেন, দেশের অন্য কোনো দল সংস্কারের স-শব্দও উচ্চারণ করেনি স্বৈরাচারের ভয়ে। কিন্ত বিএনপি স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত সংস্কার কমিশনে বিএনপি জনগণের পক্ষে মতামত ও প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা সব সময় বলি, যা করব, স্বচ্ছভাবে করব। কোনো লুকোচুরি নেই। গণতন্ত্রে মতের পার্থক্য থাকবে। আমরা সেখানে অন্যান্য দলের সঙ্গে কতগুলো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছি, সেটা জনগণের কাছে আমরা পরিষ্কারভাবে তুলেও ধরেছি, কোন কোন বিষয়ে আমরা একমত, কোন কোন বিষয়ে আমরা দ্বিমত পোষণ করি।’

বগুড়ার উন্নয়নে একগুচ্ছ প্রতিশ্রুতি
প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার উন্নয়নের আশ্বাস দিয়ে বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মাণ বগুড়ার মানুষের অন্যতম প্রধান দাবি। তাঁরা শিগগিরই এ কাজ শুরু করবেন। বগুড়াসহ আশপাশের অঞ্চল কৃষিপ্রধান। তাঁরা চান, কৃষিজাত পণ্য দেশে যেমন থাকবে, তেমন বিদেশেও রপ্তানি হবে। বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো বিমান কীভাবে আসতে পারে, সে কাজ তাঁরা শুরু করে দিয়েছেন। বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শিগগির শুরু হবে। সেখানে কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসাসহ সব বিষয় থাকবে। তারেক রহমান বলেন, ‘আমি আপনাদের ভাই, আপনাদের সন্তান। যে প্রতিশ্রুতি আমরা নির্বাচনের আগে দিয়েছি, যে পরিকল্পনা আমরা বাস্তবায়ন শুরু করেছি, তা যদি বগুড়ার সন্তান হিসেবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তবে নিশ্চয়ই বগুড়ার প্রত্যেক মানুষের গৌরব বৃদ্ধি পাবে। আমি আপনাদের দোয়া যেমন চাই, সমর্থনও চাই।’ জনসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী সন্ধ্যায় বগুড়া প্রেসক্লাবের নবনির্মিত ভবন ও বায়তুর রহমান সেন্ট্রাল মসজিদের পুনঃসংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন।

কালের আলো/এসআর/ এএএন

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও অবকাঠামোগত চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি সংস্থাগুলোর সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণে ওয়াশিংটনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।

বুধবার (১৩ মে) ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।

এতে জানানো হয়, রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে চলমান সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করতে শেভরনের প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের লা রোজার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।

শেভরন বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে, যা সারাদেশে বাড়িঘর, শিল্প এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত এক্সেলারেট এনার্জির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্টিভেন কোবোসের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারিত এলএনজি ও জ্বালানি অবকাঠামোর মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানোর বিষয়ে আলোচনা করেন।

এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও পরিচ্ছন্ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ করা।

ক্রিস্টেনসেন সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত সিলেক্টইউএসএ ইনভেস্টমেন্ট সামিটে ২৫ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী নেতার একটি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।

এদিকে মার্কিন সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চ সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা, বিভিন্ন কোম্পানি ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

বাজার প্রবেশাধিকার উন্নত করা, বিনিয়োগ বাধা অপসারণ এবং বাণিজ্যিক সুযোগ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে উভয় পক্ষ।

কালের আলো/এসআর/এএএন

চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ‘যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো ভালো হবে’: ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৪ মে, ২০২৬, ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ‘যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো ভালো হবে’: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও ভালো হবে বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, দুই দেশের মধ্যে যখনই কোনো সমস্যা তৈরি হয়েছে, তারা দ্রুত সমাধান করতে পেরেছেন।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে আটটায় চীনের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠকের শুরুতে শি জিনপিংকে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনার সঙ্গে থাকতে পারা আমার জন্য সম্মানের, আপনার বন্ধু হতে পারা সম্মানের।’

গ্রেট হল অফ দ্য পিপলে একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং।

পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আরও ভালো হবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক ভালোই ছিল। যখনই কোনো সমস্যা হয়েছে, আমরা তা সমাধান করেছি। আমি আপনাকে ফোন করতাম, আপনি আমাকে ফোন করতেন। মানুষ এটা জানে না, কিন্তু যখনই কোনো সমস্যা হয়েছে, আমরা খুব দ্রুতই সমাধান করেছি। আমি সবাইকে বলি, আপনি একজন মহান নেতা।’

ট্রাম্প জানান, এই সফরে তিনি বিশ্বের ‘সেরা ব্যবসায়ী নেতাদের’ সঙ্গে নিয়ে এসেছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষায়, ‘আজ এখানে কেবল শীর্ষ পর্যায়ের মানুষই আছেন, যারা আপনাকে সম্মান জানাতে এসেছে।’

ট্রাম্প আরো বলেন, কেউ কেউ এই বৈঠককে ‘এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় শীর্ষ বৈঠক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং তিনি আলোচনার জন্য ‘অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে’ অপেক্ষা করছেন।

সূচনা বক্তব্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, ‘আমি সবসময় বিশ্বাস করি, আমাদের দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক স্বার্থ দ্বন্দ্বের চেয়ে বেশি। এক দেশের সাফল্য অন্য দেশের জন্য সুযোগ তৈরি করে, এবং স্থিতিশীল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বিশ্ব শান্তির জন্যও উপকারী।’

চীনের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই সহযোগিতা থেকে লাভবান হয়, আর বিরোধ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের উচিত প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার হওয়া। একে অপরের সাফল্য ও সমৃদ্ধিতে সহায়তা করা এবং নতুন যুগে বড় দেশগুলোর সম্পর্কের সঠিক পথ খুঁজে বের করা।’

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

এমআইএসটির ড্রোনে চোখ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার, আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বিশেষ গুরুত্ব

বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ১১:২০ অপরাহ্ণ
এমআইএসটির ড্রোনে চোখ প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার, আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বিশেষ গুরুত্ব

দেশের প্রযুক্তিগত শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশেও রেখেছে অনন্য অবদান। রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী পরিচালিত এই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গবেষণামুখী কার্যক্রম এবার সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। বুধবার (১৩ মে) তিনি এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেছেন। সামরিক খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও দেশীয় উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে এমআইএসটির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবিত রোবটিক্স, ড্রোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প ঘুরে দেখেছেন। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অভিযাত্রায় তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন।

আমন্ত্রিত শিক্ষক হিসেবে এমআইএসটির নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে পারমাণবিক সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ বক্তব্য রেখেছেন। যেখানে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা পারমাণবিক সুরক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত মাত্রা হিসেবে তুলে ধরেছেন। এমআইএসটিতে অধ্যয়নরত সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যেও তিনি সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনকে সামনে রেখে আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলবে না; প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হওয়ার বিষয়েও জোর দিয়েছেন। দেশের প্রযুক্তি নির্ভর উচ্চ শিক্ষা ও গবেষণার গৌরবময় অগ্রযাত্রার পথিকৃৎ এমআইএসটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠান কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং এটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র। এমআইএসটির গবেষণাগার, শ্রেণিকক্ষ, প্রকল্প ও একাডেমিক কার্যক্রমকে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।’

পারমাণবিক সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত
রাজধানীর মিরপুর সেনানিবাসে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) আমন্ত্রিত শিক্ষক হিসাবে পারমাণবিক সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষ বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেছেন, পারমাণবিক সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এমআইএসটির নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি ‘পারমাণবিক নিরাপত্তা: আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আওতায় জাতীয় দায়িত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব’ শীর্ষক বিষয়ে বক্তব্য দেন।

ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেন, ‘পারমাণবিক সুরক্ষা বিষয়ে বৈশ্বিক উদ্বেগ, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের আলোকে বাংলাদেশের দায়িত্ব, পারমাণবিক সুরক্ষায় বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং বাংলাদেশে পারমাণবিক সুরক্ষার বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে বিশদ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক সুরক্ষা শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।’ পারমাণবিক সুরক্ষায় বৈশ্বিক উদ্বেগ প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক স্থাপনা, উপাদান, প্রযুক্তি ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সুরক্ষা কেবল কোনো একক দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সন্ত্রাসবাদ, সাইবার হুমকি, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দুর্বলতা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা এখন পারমাণবিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।’ বাংলাদেশের অঙ্গীকার সম্পর্কে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা সংস্কৃতি, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, পারমাণবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত নীতিমালা, প্রশিক্ষিত জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় অপরিহার্য।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্থাপনার সুরক্ষায় পেশাদারিত্ব, সতর্কতা, প্রযুক্তিগত সচেতনতা এবং সমন্বিত নিরাপত্তা পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতীয় দায়িত্ববোধ, উচ্চমানের প্রস্তুতি এবং আন্তঃসংস্থাসমূহের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে পারমাণবিক সুরক্ষার চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরে তিনি বলেন, পারমাণবিক সুরক্ষা এখন বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বাস্তবায়নের অংশ। ভৌত নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ হুমকি প্রতিরোধ, জরুরি সাড়া প্রদান, প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ, জনসচেতনতা এবং তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এই ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

তিনি এই বিষয়ে গবেষণা, প্রশিক্ষণ, নীতিগত প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বক্তৃতা শেষে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা উপস্থিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং পারমাণবিক সুরক্ষার প্রায়োগিক, নীতিগত ও জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন। পরে এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাকে এমআইএসটিতে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জ্ঞানসমৃদ্ধ দিকনির্দেশনা প্রদানের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গবেষণামুখী কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ও উন্নয়ন অভিযাত্রায় তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন।

স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব একটি পবিত্র জাতীয় অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম এমআইএসটিতে অধ্যয়নরত সশস্ত্র বাহিনীর তরুণ কর্মকর্তাদের কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন-‘দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব কেবল একটি পেশাগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি পবিত্র জাতীয় অঙ্গীকার। দেশপ্রেম কোনো আবেগমাত্র নয়; বরং এটি শৃঙ্খলা, সততা, আত্মত্যাগ ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রমাণ করার বিষয়।’ তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জাতীয় সংকটময় সময়গুলোতে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী সবসময় জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিরুদ্ধে যেকোন ষড়যন্ত্র, বিশৃঙ্খলা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও সশস্ত্র বাহিনী দৃঢ় অবস্থানে থাকবে।’ জনগণের আস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি- যোগ করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।

এ সময় এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মোঃ হাকিমুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, শিক্ষক এবং সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের প্রশিক্ষণরত তরুণ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্ম কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনার ফল নয়; বরং এটি লাখো মানুষের রক্ত, ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ফসল। ১৯৭১ সালে জাতির ক্রান্তিলগ্নে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেশের মুক্তিকামী মানুষকে দিকনির্দেশনা ও সাহস জুগিয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক আহ্বান তরুণদের সংগঠিত করেছিল এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের মনোবলকে শক্তিশালী করেছিল।’ তিনি উল্লেখ করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে সামরিক সদস্য ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত আত্মত্যাগই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভিত্তি রচনা করেছে। তাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অবদানসহ মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করা তরুণ কর্মকর্তাদের জাতীয় দায়িত্ব।

সামরিক নেতৃত্বকে প্রযুক্তি ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হতে হবে
বর্তমান যুগে সামরিক নেতৃত্বকে শুধু অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হলেই চলবে না; প্রযুক্তি, তথ্য, মনস্তত্ত্ব ও কৌশলগত যোগাযোগেও সমান দক্ষ হতে হবে বলে মন্তব্য করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের পরিবর্তিত চরিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আধুনিক যুদ্ধ আর কেবল ট্যাংক, কামান, বিমান বা প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। বর্তমান সময়ে সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার, তথ্যযুদ্ধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। এখন কোন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই তার আর্থিক ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সামরিক যোগাযোগ, জনমত ও তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে আঘাত করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, পারমাণবিক নিরাপত্তা আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, নিরাপত্তা সংস্কৃতি ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ। পারমাণবিক নিরাপত্তা শুধু কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত নিরাপত্তা চিন্তার অংশ। তরুণ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে সচেতন, দায়িত্বশীল ও পেশাগতভাবে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। উপদেষ্টা দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন, স্বল্প ব্যয়ের ড্রোন, সাইবার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (অও) সিদ্ধান্ত সহায়তা ব্যবস্থা, নিরাপদ ট্যাকটিক্যাল কমিউনিকেশন, কমান্ড কন্ট্রোল ও সার্ভেইলেন্স সিস্টেম এবং তথ্য বিভ্রান্তি প্রতিরোধে গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন ও গবেষণা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে
তিনি বলেন, সীমিত প্রতিরক্ষা বাজেট থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও দেশীয় গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সবকিছু বিদেশ থেকে ক্রয় করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোন প্রযুক্তি বাংলাদেশ নিজস্ব সক্ষমতায় নকশা, পরীক্ষা, উন্নয়ন, উৎপাদন ও সুরক্ষা করতে পারে, তা চিহ্নিত করতে হবে। এটি শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। এই লক্ষ্যে সরকার দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পায়ন ও গবেষণা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

একজন সামরিক কর্মকর্তা কেবল একজন কমান্ডার নন; তিনি দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, দেশের তরুণ সামরিক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের জন্য উপযোগী, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব। তরুণ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, একজন সামরিক কর্মকর্তা কেবল একজন কমান্ডার নন; তিনি দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক। সৈনিকরা তাদের কর্মকর্তাদের আচরণ, সিদ্ধান্ত, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম অনুসরণ করে। তাই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে হতে হবে প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, নৈতিকভাবে দৃঢ় এবং জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল। দুর্যোগে জনগণের পাশে দাঁড়ানো, যুদ্ধে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকা এবং বিভ্রান্তির সময়ে সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া একজন কর্মকর্তার মৌলিক দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উগ্রবাদ, বিভাজনমূলক প্রচারণা, গুজব, ধর্মের অপব্যাখ্যা এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপতৎপরতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বাস, সহনশীলতা, সহাবস্থান ও মধ্যপন্থার দেশ। ধর্ম মানুষের চরিত্র, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও সাহসকে শক্তিশালী করে; কিন্তু ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা জাতীয় ঐক্য নষ্ট করতে পারে। তাই তরুণ কর্মকর্তাদের চরমপন্থা, সাম্প্রদায়িকতা, মব মানসিকতা এবং বিভ্রান্তিকর বয়ানের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।

প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতীয় চেতনা সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও প্রশ্ন করা জ্ঞানের অংশ; কিন্তু ইতিহাস বিকৃতি কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্বের ভিত্তি। জুলাইয়ের জাতীয় চেতনা রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও নবায়নের আহ্বানকে সামনে এনেছে। ১৯৭১ এবং জুলাইকে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানো যাবে না। একটি আমাদের স্বাধীনতার ভিত্তি, অন্যটি রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার পুনর্জাগরণের আহ্বান।

এমআইএসটি থেকে অর্জিত শিক্ষা বাহিনীর কাজে লাগাতে হবে
অর্জিত জ্ঞানকে কেবল সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তা বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তর করতে হবে বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘ইউনিট ও ফরমেশনে ফিরে গিয়ে এমআইএসটি থেকে অর্জিত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে বাহিনীর কাজে লাগাতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন, সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থে জ্ঞান প্রয়োগের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’ তরুণ কর্মকর্তাদের পাঠাভ্যাস, গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিতর্ক, সামরিক ইতিহাস অধ্যয়ন এবং সাম্প্রতিক যুদ্ধসমূহ থেকে শিক্ষা নেওয়ারও আহ্বান জানান উপদেষ্টা।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, শিল্পখাত, বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বড় দায়িত্ব ও প্রকল্পে নিয়োজিত হলে সততা, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতিমুক্ত পেশাগত জীবন বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। দুর্নীতি ও অনিয়ম শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এটি গড়ে উঠবে শৃঙ্খলাবদ্ধ চিন্তা, দেশপ্রেম, জ্ঞান, সাহস, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে।’ ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম তরুণ কর্মকর্তাদের ‘বাংলাদেশ প্রথম’ আদর্শ ধারণ করে দেশ ও জাতির সেবায় আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তরুণ কর্মকর্তাদের শিক্ষা যেন শুধু যোগ্যতার সনদে সীমাবদ্ধ না থাকে; তা যেন পেশাগত উৎকর্ষ, সৎ নেতৃত্ব, জাতীয় দায়িত্ববোধ, উদ্ভাবন, শৃঙ্খলা এবং সাহসের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। আল্লাহ যেন সবাইকে প্রিয় বাংলাদেশকে সেবা করার শক্তি, প্রজ্ঞা ও যোগ্যতা দান করেন, এই প্রার্থনা করেন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা।

কালের আলো/এমএএএমকে