ভাবুন তো, এমন এক সমাজের কথা—যেখানে প্রেম করা বৈধ, কিন্তু বিয়ের আগে যৌনসম্পর্ক পুরোপুরি নিষিদ্ধ। তবে বছরের একটি নির্দিষ্ট রাতে মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় সরকার। অবিবাহিতরা তখনই নিজেদের ইচ্ছেমতো সম্পর্কে জড়াতে পারেন। সময় শেষ হলেই আবার আগের আইন কার্যকর।
শুনতে কল্পবিজ্ঞানের কোনো রাজনৈতিক ডিস্টোপিয়ার মতো মনে হলেও এমনই এক অদ্ভুত পৃথিবীকে রোমান্টিক কমেডির গল্পে রূপ দিয়েছেন পরিচালক উইল গ্লাক। তাঁর নতুন সিনেমা ‘ওয়ান নাইট অনলি’ মুক্তি পেয়েছে ৭ আগস্ট। মুক্তির পর থেকেই সিনেমাটির ব্যতিক্রমী গল্প ও রাজনৈতিক ইঙ্গিত নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।
সিনেমার কাল্পনিক যুক্তরাষ্ট্রে বিয়ের আগে যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ করার আইন চালু হয়েছে কয়েক বছর আগে। তবে সরকার বছরে একবার ‘ন্যাশনাল সেক্স নাইট’ নামে একটি রাত নির্ধারণ করেছে। ওই রাতের ১২ ঘণ্টায় অবিবাহিত ব্যক্তিরা আইনত যৌনসম্পর্ক করতে পারেন।
এই আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নাগরিকদের শরীরে বিশেষ প্রযুক্তির বায়োসেন্সর পরতে হয়। শরীরের রাসায়নিক পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে ওই ডিভাইস শনাক্ত করতে পারে কেউ যৌনসম্পর্কে জড়িয়েছে কি না। নির্ধারিত সময়ের বাইরে আইন ভাঙলে রয়েছে শাস্তির ব্যবস্থা।
ফলে বছরের ওই রাতটি হয়ে ওঠে দেশটির মানুষের কাছে এক বিশেষ উৎসব। ডেটিং অ্যাপগুলোতে বাড়ে ব্যস্ততা, রেস্তোরাঁ ও বারে জমে ওঠে ভিড়। কেউ পুরোনো সঙ্গীর সঙ্গে সময় কাটানোর প্রস্তুতি নেয়, কেউ আবার নতুন সম্পর্কের সন্ধানে বের হয়।
গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র ওভেন। ম্যানহাটনে একটি ছোট পিৎজারিয়ার মালিক সে। স্বভাবের দিক থেকে শান্ত ও কিছুটা অন্তর্মুখী ওভেনও বছরের বিশেষ রাতটির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। দীর্ঘদিনের প্রেমিকা মালিকার সঙ্গে রাতটি কাটানোর পরিকল্পনা ছিল তার।
কিন্তু দেখা হওয়ার পর মালিকা জানায়, এবার সে অন্য একজনের সঙ্গে রাত কাটাতে চায়। সম্পর্কের বাইরে অন্য অভিজ্ঞতা নিতে চাওয়ার কথা জানিয়ে দেয় সে। এতে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে ওভেনের পরিকল্পনা।
অন্যদিকে অ্যালি গান গাওয়ার স্বপ্ন দেখলেও পেশাগতভাবে খুব একটা সফল হতে পারেনি। জীবিকা চালাতে তাকে ওষুধ কোম্পানির বিজ্ঞাপনের জন্য জিঙ্গেল গাইতে হয়।
বছরের বিশেষ রাতটিও তার পরিকল্পনামতো এগোয় না। যার সঙ্গে বের হওয়ার কথা ছিল, সে অন্য একজনের সঙ্গে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত বন্ধুর দেওয়া পোশাক পরে একাই শহরের রাতের উৎসবে বের হয় অ্যালি।
এরপরই ভাগ্যের টানে ওভেন ও অ্যালির দেখা। প্রেমিকার আচরণে হতাশ হয়ে ওভেন এরই মধ্যে কয়েক পেগ পান করে ফেলেছে। নতুন পরিচিত অ্যালির সামনে দাঁড়িয়েই প্রায় বমি করে ফেলে সে। বিরক্ত হয়ে সেখান থেকে চলে যায় অ্যালি।
কিন্তু রাত যত বাড়তে থাকে, ততই বিভিন্ন জায়গায় তাদের আবার দেখা হতে থাকে। নিউইয়র্কের ব্যস্ত রাত, সাবওয়ে, রাস্তা আর বিভিন্ন আড্ডার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসতে শুরু করে দুজন।
ওভেন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যালাম টার্নার, আর অ্যালির ভূমিকায় আছেন মনিকা বারবারো। দুই অভিনেতার অভিনয়ই সিনেমাটির অন্যতম আকর্ষণ। ওভেনের সরলতা ও অস্বস্তি যেমন টার্নার বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরেছেন, তেমনি বারবারোর অ্যালি চরিত্রে আত্মবিশ্বাস ও সংবেদনশীলতার মিশেলও প্রশংসা পেয়েছে।
তাদের কথোপকথন, হাস্যরস ও ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া সম্পর্কই গল্পের আবেগের মূল জায়গা।
নাম ও মূল ধারণা দেখে সিনেমাটিকে শুধুই যৌনতা নিয়ে তৈরি কমেডি মনে হতে পারে। কিন্তু গল্প এগোনোর সঙ্গে ওভেন ও অ্যালির সম্পর্ক অন্য দিকে মোড় নেয়।
শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে তারা নিজেদের স্বপ্ন, ব্যর্থতা, ভয় এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। ওভেন উপলব্ধি করে, জীবনের সবকিছু আগেভাগে পরিকল্পনা করে রাখা সম্ভব নয়। অ্যালিও নিজের স্বপ্নের পথে এতদিন যে বাধাগুলো তৈরি করে রেখেছিল, সেগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
এই যাত্রায় ‘ন্যাশনাল সেক্স নাইট’ হয়ে ওঠে দুই অপরিচিত মানুষের একে অপরকে আবিষ্কারের পটভূমি।
সিনেমায় নিউইয়র্ক শহরকে শুধু গল্পের স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। রাতের সাবওয়ে, ব্রুকলিন ব্রিজ, ছোট পিৎজারিয়া, ক্যাফে এবং শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্রের পাশাপাশি শহরের তুলনামূলক কম পরিচিত এলাকাও তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দর্শক যেন পর্যটকের বদলে শহরের একজন সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে নিউইয়র্ককে দেখার সুযোগ পান।
হাস্যরস ও প্রেমের গল্পের আড়ালে সিনেমাটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে। একজন মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর রাষ্ট্রের কতটা নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত? আইন দিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি না? আর স্বাধীনতা কি শুধু আইনি অধিকার, নাকি ব্যক্তিগত পছন্দ ও অনুভূতির সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে?
নির্মাতা এসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি। বরং ওভেন ও অ্যালির ব্যক্তিগত গল্পের মধ্য দিয়ে দর্শককে নিজের মতো করে ভাবার সুযোগ দিয়েছেন।
সিনেমাটি মুক্তির পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এর রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে। সমালোচকদের একটি অংশের মতে, বিয়ের আগে যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ করা এবং রাষ্ট্রের নজরদারির মতো গুরুতর বিষয়কে রোমান্টিক কমেডির কাঠামোয় আটকে রাখায় গল্পের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
তাদের মতে, এমন একটি ধারণা সহজেই ব্যক্তিস্বাধীনতা, রক্ষণশীলতা, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে গভীর বক্তব্যের জায়গা তৈরি করতে পারত। কিন্তু সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত সেই পথে খুব বেশি দূর এগোয়নি।
অন্যদিকে আরেকটি মত হলো, ‘ওয়ান নাইট অনলি’কে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। এটি মূলত একটি অসম্ভব পরিস্থিতির মধ্যে দুই মানুষের সম্পর্ক ও আত্ম-আবিষ্কারের গল্প। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি গল্পের একটি ব্যতিক্রমী পটভূমি মাত্র।
তবে সমালোচকদের মধ্যে যে বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন, তা হলো—সিনেমাটির মূল ধারণাটি এতটাই অস্বাভাবিক ও রাজনৈতিক যে দর্শকের মনে স্বাভাবিকভাবেই আরও অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও প্রজনন অধিকার নিয়ে বাস্তব রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে, তখন ‘ওয়ান নাইট অনলি’র কাল্পনিক পৃথিবীকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখাও কঠিন।
সুতরাং ‘ওয়ান নাইট অনলি’ শেষ পর্যন্ত নিখাদ রোমান্টিক কমেডি, নাকি ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য—মুক্তির পরের বিতর্কই হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকবে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array