খুঁজুন
                               
, ,
           

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরাতে ৯ দাবি, সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবিকারীদের ভূরাজনৈতিক ধারণা নিয়ে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী নূরের

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:২৯ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফেরাতে ৯ দাবি, সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবিকারীদের ভূরাজনৈতিক ধারণা নিয়ে প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রী নূরের

পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজি রোধে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ভিপি নুরুল হক নুর। পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি দেশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলেও মন্তব্য করেছেন। শুধু তাই নয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যারা সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি তুলছে তাদের ভূরাজনৈতিক ধারণা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের উৎস ও সশস্ত্রগোষ্ঠীর অর্থায়নের পথ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের এই প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা কোন একক রাজনৈতিক ইস্যু নয়।

এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। তাই সরকার, বিরোধী দল ও নিরাপত্তা বাহিনী এবং সব অংশীজনকে একটি অভিন্ন জাতীয় অবস্থানে পৌঁছাতে হবে।’ বুধবার (১২ আগস্ট) বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক্স ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ষড়যন্ত্র, সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক  কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ভিপি নুরুল হক নুরের তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অপরিহার্যতাকে মোটা দাগে সামনে এনেছে। এই পাহাড় যে বাংলাদেশের একটি অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ সেটিও যুক্তির সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন।

সেমিনারে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে নয় দফা দাবি জানান ‘এক্স ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন’ এর সভাপতি লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ। এ সময় তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র সংগঠন সমূহ চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, গুম, অস্ত্র-গোলাবারুদ ও মাদকদ্রব্য চোরাচালানসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য গড়ে তুলেছে। এছাড়া, সোশাল মিডিয়ার গুজব, এনজিও এবং আইএনজিও এর সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা, প্রবাসী উপজাতিদের দেশ বিরোধী প্রচারণা, সেনাবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার, পার্শ্ববর্তী দেশের মদদসহ নানাবিধ কারণে পাহাড় অশান্ত।’

পাহাড় থেকে সেনাবাহিনীকে সরিয়ে দিলে অশান্তি বাড়বে বলে একই সেমিনারে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকুক, এটা অনেকে চায় না। তারা মূলত চাঁদাবাজি করার জন্য সেনাবাহিনী থাকুক, এটা চায় না। এ দেশে সেনাবাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। সব বিপদে সেনাবাহিনী সবসময় দেশের পাশে দাঁড়িয়েছে।’ এই সেমিনারে সিএইচটি সম্প্রতি জোটের আহ্বায়ক থোয়াই চিং মং চাকও বক্তব্য রাখেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ৯ দাবি
‘এক্স ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন’ এর সভাপতি লেফটেন্যান্ট (অব.) সাইফুল্লাহ খান সাইফ বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বিভিন্ন আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তার, নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী হওয়ায় অঞ্চলটির প্রায় ১৩ হাজার ২৯৪ বর্গকিলোমিটার, যা বাংলাদেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১০%। এই বিশাল এলাকাটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর।’

তিনি বলেন, ‘সশস্ত্র গ্রুপগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪১টি খাত হতে বছরে ১ হাজার থেকে ১২০০ কোটি টাকা চাঁদাবাজি করে। আত্মগোপনে থাকা মাইকেল চাকমার আবির্ভাব হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন অস্ত্র চোরাচালান সবকিছু বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক বছরে জেএসএস এবং ইউপিডিএফ-এর অন্তঃকোন্দলে ৪১ জনের মৃত্যু (নিরীহ জনগণসহ) হয়েছে। এছাড়া, জেএসএস ও ইউপিডিএফ এর মধ্যে গত ২ বছরে সংঘর্ষে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়েছে। বিগত ২ বছরে ১০৬ জন উপজাতি এবং বাঙালি এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মাধ্যমে অপহৃত হয়েছে। কিন্তু এতসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অন্যতম মাস্টার মাইন্ড মাইকেল চাকমা ঢাকার বুকে ঘুরে বেড়ালেও তাকে সরকার আটক করছে না। এমনকি তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও অস্ত্র মামলায় রাঙামাটি আদালত ৭ বছরের কারাদণ্ড দিলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সরকার তাকে আটক করছে না।’

গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং ভারতে বসবাসকারী জো সম্প্রদায়ের দ্বারা এক জাতি গঠনের জন্য মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী লালদুহোমা তার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। অপরদিকে, ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, চীন রাজ্যের ২টি প্রতিরোধ গোষ্ঠী মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ কমাতে এবং চিন জাতীয় পরিষদ গঠনের জন্য একটি স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, মিজোরাম রাজ্যের এমপি মি. ভানলালভেনা সিএনএফের সদর দপ্তর পরিদর্শন করেন এবং তাদের ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদানের আহ্বান জানান। এই সমস্ত কার্যকলাপ ভারতের সম্প্রসারণের অ্যাজেন্ডা নির্দেশ করে।’

সাইফুল্লাহ খান সাইফ বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় থাকলেও পাহাড়ের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সশস্ত্র তৎপরতা, অস্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন পক্ষের স্বায়ত্তশাসন ও ‘আদিবাসী’ পরিচয়কেন্দ্রিক দাবির প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয় কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, তা জাতির সামনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পাহাড়ের সব জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয়ের আরও দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী ভূমিকা প্রয়োজন।

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলকে শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোরও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান, নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোকে সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।’

বক্তব্য শেষে তিনি এক্স ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ৯ দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হচ্ছে- সশস্ত্র গোষ্ঠীকে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করা, শান্তিচুক্তি রিভিউ করা, ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়, ইয়েন ইয়েন, প্রসীত বিকাশ খীসা, মাইকেল চাকমা, নাথান বম, সন্তু লারমাসহ অন্যান্যের রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমের জন্য আইনের আওতায় আনা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব গোলযোগপূর্ণ এলাকায় সেনাবাহিনীর স্থায়ী ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন এবং বিজিবির বিওপি বাড়ানো, পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা জাতির সামনে স্পষ্ট করা, বাঙালিদের পাহাড়ে সমঅধিকার নিশ্চিত করা, উপজাতিরা পাহাড়ে এবং সমতলে জায়গা কিনতে পারলে বাঙালিরাও পাহাড়ে জায়গা কিনতে পারবে- এই আইন প্রণয়ন করা, উপজাতিদের আয়করের অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিদেশের মাটিতে যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা।

‘সেনাবাহিনীকে নিয়ে এনসিপির কেন এতো সমস্যা জানি না’
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান দৃঢ়তার সঙ্গেই সেমিনারে বলেছেন, ‘আজকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছে, তাদের ভূমিকা নিয়েও দেশের মানুষের প্রশ্ন রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীকে নিয়ে এনসিপির কেন এতো সমস্যা জানি না। তবে, গোপালগঞ্জের ঐ ঘটনায় সেনাবাহিনীই কিন্তু আপনাদেরকে উদ্ধার করেছে।’ রাশেদ বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ এবং আমরা সবাই বাংলাদেশি। পাহাড়ে যারা বসবাস করছে, তাদেরকে ছাড়া বাংলাদেশ হবে না। আমরা সবাইকে নিয়ে চলতে চাই।’

নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান বলেন, ‘এনসিপির নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী সেনাবাহিনীর দাড়ি নিয়ে কথা বলেছে। এর জন্য আপনি (পাটোয়ারী) জাতি এবং সেনাপ্রধানের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন। নাহিদ ইসলামের নির্দেশনায় নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী এসব খারাপ এবং উগ্র বক্তব্য দিচ্ছে।’ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করা আধিবাসীদেরকে আহ্বান জানিয়ে রাশেদ খান বলেন, ‘আপনারা নিজেদেরকে বাংলাদেশি হিসেবে পরিচয় দেবেন। আধিবাসী শব্দ নিয়ে কোনো বিতর্ক চলবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে জঙ্গল সলিমপুর ঠিক করেছে, সেভাবে পাহাড় ঠিক করতে হবে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম করতে দেওয়া হবে না।’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর এই রাজনৈতিক সহকারী বলেন, ‘ড. ইউনুস মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ঐসময় যাদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের বেশিরভাগ অযোগ্য ছিল। নাহিদ ইসলাম যে ৬ মাস দায়িত্ব পালন করেছে, তিনি গণমাধ্যমের সংস্কার করতে পারেনি। মাহফুজ আলমও পারেনি। তারা এখন বলছে, বিএনপি সরকারের পতন ঘটিয়ে, নতুন সরকার গঠন করেছে।’ এনসিপিকে উদ্দেশ করে রাশেদ খান বলেন, ‘জামায়াতের রগে আপনারা পড়েছেন। তারা একসময় জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলে, এখন জামায়াতের সাথে জোট করেছে। এই জোটের নেতৃত্বে আর কোনো গণঅভ্যুত্থান সফল হবে বলে মনে হয় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপি সরকারের পতন হলেও আপনারা কিন্তু দেশ চালাতে পারবেন না। নাকি আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার জন্য আপনারা এগুলো করছেন।’ কর্ণেল অলি নাসিরুদ্দিনের মতো কথা বলছে মন্তব্য করে রাশেদ খান বলেন, ‘কর্ণেল অলি এনসিপির নেতাদের ফাঁদে পা দিয়েছে এবং নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর মতো কথা বলছে। এভাবে তার (কর্ণেল অলি) অধঃপতন হবে, ভাবতেও পারিনি।’

‘অল ক্রেডিট গোস টু সেনাবাহিনী’
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে যারা সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি তুলছে তাদের ভূরাজনৈতিক ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী ভিপি নুরুল হক নুর। জুলাই অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘সেনা সদস্যরা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না নিলে দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেতো।’ তিনি বলেন, ‘সমন্বয়ক বনে যাই, এই এক দফার ঘোষক বনে যাই। সেনাবাহিনী যদি এই সিদ্ধান্তে উপনীত না হতো যে তাঁরা জনগণের বিরুদ্ধে গুলি চালাবে না তাহলে আরও লাশ পড়তো রক্ত ঝরতো। এবং বাংলাদেশে একটি গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যেতো। তাই অল ক্রেডিট গোস টু সেনাবাহিনী।’

নুরুল হক নুর বলেন, ‘ এই যে ননসেন্সের মতো কথা বলা, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী তুলে আনা তাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি, নিরাপত্তা এগুলো নিয়ে কোন ধারণা নাই। বিশেষ করে ভূরাজনীতি নিয়ে। বাংলাদেশের জন্ম বা আজকের পর্যন্ত বাংলাদেশ জিওপলিটিক্যালি কোন টেনশনকে মোকাবিলা করে আসছে, সরকারে যারা থাকে। আমি সরকারে ছিলাম না কিন্তু কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে, বুঝতে পারি বিভিন্ন অভিজ্ঞ লোকের সঙ্গে কথা বলে। কারণ রাজনীতিতে অনেক সেনা কর্মকর্তা আছে, তাদের কাছ থেকে শুনেছি। কীভাবে তারা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, জেনারেল এরশাদের আমরা যতই সমালোচনা করি এটা ঠিক বলতে হবে বাংলাদেশের ইকোনমি ডেভেলপমেন্টের ব্যাকবোন তৈরি করেছিল দুই সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে আজকে বড় বড় হাইওয়ে, অবকাঠামো ইন্ডাষ্ট্র্রি শিল্পায়ন যাই বলেন এগ্রিকালচারকে প্রমোট করে এটাও দুই সামরিক শাসকই করেছেন, শুনতে এটা খারাপ হলেও এটি বাস্তব। কারণ আমরা সামরিক শাসন চাই না। কারণ আমরা চাই না সামরিক বাহিনী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এটি আমরা চাই না। বাংলাদেশ একটি ডেমোক্রেটিক রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত করবে। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সময়ে বাংলাদেশে বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের অল্প সময়ে দেশে যে ধরনের দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ রেখেছে সেটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পলিসি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পলিসিতে। কারণ আজকে আমি যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছি এই মন্ত্রণালয়ে মিডলইস্টে প্রচুর প্রবাসীদের যাত্রা শুরু হয় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ১৯৭৬ সালে এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জিয়াউর রহমান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এর ফলেই আজকে আমাদের এই যে এক থেকে সোয়া কোটি মানুষ দেশের বাইরে আছে বড় একটি অংশের গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৭৫ পার্সেন্ট। বাকী অন্যান্য দেশে আছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

বিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে দেখা উড়ন্ত গাড়ি কি এবার বাস্তবে আসতে চলেছে? টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের নতুন রোডস্টার স্পোর্টস কারের প্রদর্শনী ঘিরে এমন প্রশ্নই উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি স্থাপনায় গাড়িটির বিশেষ প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে থ্রাস্টার ব্যবহার করে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা, মাঝআকাশে ঘোরানো এবং মাটিতে অবতরণের কৌশল দেখানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ির আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কোনো গাড়ি অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উঠতে পারা আর সেটিকে ব্যবহার করে নিয়মিত আকাশপথে যাতায়াত করা এক বিষয় নয়। গাড়িটির বাস্তব কার্যক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

প্রদর্শনীতে কী দেখালেন ইলন মাস্ক?

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আয়োজিত প্রদর্শনীতে মাস্ক বলেন, ‘আজ রাতে আপনারা কিছু অবিশ্বাস্য বিষয় দেখতে যাচ্ছেন।’ গাড়িটির প্রদর্শনী এআই দিয়ে তৈরি কোনো দৃশ্য নয়, তা প্রমাণ করার জন্যই দর্শকদের সামনে এটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। টেসলার দাবি, নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্সের মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ থ্রাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত গাড়ির বাইরে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রদর্শনীতে দেখানো প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং গাড়িটির কোন সংস্করণে এসব সুবিধা থাকবে, তা স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু আকর্ষণীয় প্রদর্শনী দিয়ে কোনো প্রযুক্তির দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায় না।

কীভাবে শূন্যে উঠবে গাড়ি?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটিতে উচ্চচাপে সংরক্ষিত বাতাস দ্রুত নির্গত করে থ্রাস্ট বা ধাক্কা তৈরির ব্যবস্থা ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। বাতাস দ্রুত বেরিয়ে গেলে বিপরীত দিকে বল সৃষ্টি হয়। এই বল কাজে লাগিয়ে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা বা ঘোরানোর মতো কৌশল দেখানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে থ্রাস্টের পরিমাণ, গাড়ির ওজন, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাতাসের চাপ ব্যবস্থাপনার ওপর। দীর্ঘ সময় বাতাসে থাকা কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আকাশপথে চলাচলের জন্য আরও জটিল প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই থ্রাস্টার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে শূন্যে ওঠার প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড্ডয়নক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

উড়ন্ত গাড়ি হতে হলে যেসব চ্যালেঞ্জ পেরোতে হবে

একটি পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়িকে একই সঙ্গে সড়ক ও আকাশপথে নিরাপদে চলাচলের উপযোগী হতে হবে। এর জন্য শুধু শক্তিশালী থ্রাস্টার থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রযুক্তি। এর পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা, শক্তির ব্যবহার, শব্দদূষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব পরিবেশে এসব শর্ত পূরণ না হলে প্রযুক্তিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে ব্যবহার করা কঠিন হবে।

২০২৮ সালে উৎপাদনের পরিকল্পনা

মাস্ক জানিয়েছেন, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উৎপাদন শুরুর নির্দিষ্ট সময়, গাড়ি সরবরাহের সূচি, চূড়ান্ত মূল্য এবং বিশেষ প্রযুক্তির বাস্তব কার্যক্ষমতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু হলেও গাড়িটির কোন সংস্করণে থ্রাস্টার প্রযুক্তি থাকবে এবং সেটি ক্রেতাদের জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে। উৎপাদনের ঘোষণা আর বাজারে পরীক্ষিত, অনুমোদিত ও ব্যবহারযোগ্য গাড়ি সরবরাহ—দুটি আলাদা বিষয়।

টেসলার প্রদর্শনী উড়ন্ত গাড়ির ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কিন্তু গাড়িটি দীর্ঘ সময় উড়তে পারে, আকাশপথে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তাশর্ত পূরণ করেছে—এমন প্রমাণ এই বর্ণনায় নেই। অতএব, এখনই টেসলার নতুন রোডস্টারকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ি বলা ঠিক হবে না। বরং এটিকে থ্রাস্টার প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি প্রদর্শনী হিসেবে দেখা যায়।

সূত্র: বিবিসি

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

‘বাবুই পাখিকে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই।’ কবি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তি বাংলা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে পরিচিত। নিজের হাতে তৈরি বাসার সৌন্দর্য আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বাবুই পাখির পরিচয়ও পেয়েছে বিশেষ মাত্রা। কিন্তু কবিতায় পরিচিত সেই পাখি ও তার নিপুণ বুননের বাসা এখন বাস্তবে অনেকের কাছেই অচেনা হয়ে উঠছে।

একসময় গ্রামবাংলার তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত বাবুই পাখির অসংখ্য বাসা। পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকত গ্রামের পথঘাট। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গ্রাম ও হাওরাঞ্চলেও ছিল এমন দৃশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কমেছে তালগাছ, সংকুচিত হয়েছে বাবুই পাখির আবাসস্থল। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকার এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের মতো নানা কারণে প্রকৃতির এই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবীণ শিক্ষক ও পাখিপ্রেমীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, মৌলভীবাজারের অনেক এলাকায় একসময় প্রচুর তালগাছ থাকলেও এখন সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোথাও কোথাও তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে আর আগের মতো বাবুই পাখির বাসা দেখা যায় না।

তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত শত বাসা

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের উত্তরভাগ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমানের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল সেই সময়ের গ্রামবাংলা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় গ্রামের মেঠোপথের পাশে সারি সারি তালগাছ ছিল। গাছগুলোর পাতায় পাতায় বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা ঝুলত। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত পুরো গ্রাম। মুজিবুর রহমান বলেন, শুধু তাঁর গ্রামেই নয়, আবহমান বাংলার বহু গ্রামেই এমন দৃশ্য দেখা যেত। কিন্তু এখন মৌলভীবাজারের গ্রাম-গঞ্জে তালগাছ খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই সঙ্গে কমে গেছে বাবুই পাখির উপস্থিতিও।

তাঁর স্মৃতিচারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্য কয়েক দশকের ব্যবধানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যে পাখি ও বাসা একসময় গ্রামীণ পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ ছিল, এখন তা দেখার জন্যও অনেক জায়গায় খোঁজ করতে হয়।

এক দশকেই বদলে গেছে গ্রামের চিত্র

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের সরকার বাজার এলাকার বাসিন্দা জনি দাসও দেখেছেন তালগাছ কমে যাওয়ার এমন পরিবর্তন। তাঁর মতে, প্রায় এক দশক আগেও তাঁদের এলাকায় যত তালগাছ ছিল, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। জনি দাস জানান, ২০০১-২০০২ সালের দিকে শুধু তাঁদের গ্রামেই রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন বাড়িতে অন্তত দুই শতাধিক তালগাছ ছিল। এসব গাছে বাবুই পাখির বাসাও দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে পুরো গ্রাম ঘুরেও একটি তালগাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাঁর।

বাবুই পাখির বাসার অবস্থা আরও করুণ বলে মনে করেন তিনি। একসময় যা ছিল গ্রামের পরিচিত দৃশ্য, এখন তা দেখা যেন জাদুঘরে বিরল কোনো নিদর্শন দেখার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের এমন অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তালগাছ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু গাছের সংখ্যা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পাখিদের বসবাসের সুযোগও।

এখনো রয়েছে বাবুইয়ের বাসা দেখার বিরল সুযোগ

তবে মৌলভীবাজারের সব জায়গা থেকেই বাবুই পাখির বাসা হারিয়ে যায়নি। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রূপসপুর বা ফুলবাড়ি এলাকায় পাশাপাশি থাকা দুটি তালগাছে এখনো অসংখ্য বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা দেখা যায়। এলাকার এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন বিকেলে সেখানে ভিড় করেন অনেকে। তালগাছের পাতায় ঝুলে থাকা বাসাগুলো এখনো প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। চারপাশে তালগাছ ও বাবুইয়ের বাসা কমে যাওয়ায় এমন জায়গাগুলো স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্বও পেয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা হাজী মো. ফজলুর রহমান মনে করেন, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে তালগাছ কমে যাচ্ছে। এতে বাবুই পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং পাখিটির টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টি শুধু পাখি সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্যও জড়িত।

কুলাউড়ায় তালগাছ আছে, নেই বাবুইয়ের বাসা

কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর এলাকার সোলেমান হোসেনের স্মৃতিতেও রয়েছে ছোটবেলায় দেখা অসংখ্য তালগাছ ও বাবুই পাখির বাসার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর এলাকার চিত্র বদলে গেছে। সোলেমান হোসেন জানান, বর্তমানে পুরো এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে মাত্র একটি তালগাছ রয়েছে। আগে সেই গাছেও বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেখানে আর কোনো বাসা চোখে পড়ছে না।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেই বাবুই পাখির উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। গাছের পাশাপাশি পাখির উপযোগী পরিবেশ, নিরাপত্তা ও খাদ্যের প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় বাবুই পাখি না থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াছিন আরাফাত রবিনও তাঁর শৈশবের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। ছোটবেলায় তাঁদের এলাকায় অসংখ্য তালগাছ দেখেছেন তিনি। এসব গাছে বাসা বাঁধত বাবুই পাখি। এখন তালগাছ যেমন কম দেখা যায়, তেমনি চোখে পড়ে না পাখিটির শৈল্পিক বাসাও।

তিন প্রজাতির বাবুই নিয়ে উদ্বেগ

পাখিপ্রেমী খোকন সিং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে খোঁজখবর করেন এবং ফটোগ্রাফির মাধ্যমে পাখিদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পাহাড়, টিলা ও হাওরসমৃদ্ধ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দাগি, বাংলা ও দেশি—এই তিন প্রজাতির বাবুই পাখির আবাস ছিল। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলা ও দাগি বাবুইয়ের দেখা প্রায় মেলেই না। তাঁর পর্যবেক্ষণে, কোনোরকমে টিকে আছে কিছু দেশি বাবুই পাখি।

খোকন সিংয়ের মতে, বাবুই পাখির বাসা তৈরির জন্য তালগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাখিটির আবাসস্থলও সংকটের মুখে পড়েছে। বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ রোপণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে কোনো প্রজাতির বর্তমান সংখ্যা, বিস্তৃতি কিংবা বিলুপ্তির ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের জরিপ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। পাখিপ্রেমীদের পর্যবেক্ষণ স্থানীয় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে পুরো জেলার প্রজাতিগত অবস্থা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

আবাসস্থল ধ্বংসে ঝুঁকিতে পাখি ও বন্যপ্রাণী

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, নানা কারণে গ্রামাঞ্চলে তালগাছ কাটা এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের ফলে বাবুই পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। তিনি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তালগাছ সংরক্ষণ এবং বাবুই পাখিকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নাজমুল হকের সতর্কবার্তা হলো, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় বাবুই পাখি বাস্তব জীবনের পরিচিত দৃশ্য থেকে হারিয়ে গিয়ে কেবল পাঠ্যপুস্তকের কবিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

তালগাছ রক্ষা ও নতুন করে রোপণ জরুরি

বাবুই পাখির বাসা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি গ্রামবাংলার পরিবেশ ও স্মৃতিরও অংশ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পাখির বাসা বিরল হয়ে পড়ার যে চিত্র স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তা আবাসস্থল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তালগাছ সংরক্ষণ, উপযুক্ত জায়গায় নতুন চারা রোপণ, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, পাখি শিকার প্রতিরোধ এবং কীটনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান বাবুইয়ের বাসা থাকা গাছগুলো রক্ষা করা এবং পাখির উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৭ পূর্বাহ্ণ
অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীর রমনায় অবস্থিত অফিসার্স ক্লাবের ভেতরে নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের বাইরে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।

মেয়েকে নিয়ে সকালে অফিসার্স ক্লাবে যান

অফিসার্স ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মো. মোশাররফ হোসেন তাঁর ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাবে প্রবেশ করেন। পরে ক্লাবের সুইমিংপুলের সামনে মেয়েকে রেখে তিনি পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে যান। এরপর প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা অংশে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। মোশাররফ হোসেন অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর বনানীর একটি বাড়িতে বসবাস করতেন।

তৃতীয় তলা থেকে পড়ে যাওয়ার কথা জানাল পুলিশ

ঘটনা সম্পর্কে রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, সকালে ছোট মেয়েকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবের সুইমিংপুলে গিয়েছিলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেন। তাঁর চোখে কম দেখার সমস্যা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে তিনি নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে যান। ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করেছে পুলিশ। তবে কীভাবে তিনি নিচে পড়ে যান, সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের বাইরে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত করাতে চাননি। এ কারণে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছেন রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মোশাররফ হোসেনের বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি দেশে ফেরার পর বাবার দাফন সম্পন্ন করা হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি