কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাপী নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁর মতে, এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি নতুন সংস্থা প্রয়োজন, যা পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার আদলে কাজ করবে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে আলোচনাও করতে চান গেটস। তাঁর পরবর্তী চীন সফরে নভেম্বরে এ বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাঁর মুখপাত্র জানিয়েছেন।
গেটস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিপজ্জনক এআই মডেল তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে, তাহলে চীনসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশও একই ধরনের উদ্যোগে যুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব এআই মডেল মানুষের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেগুলোর প্রকাশ ও ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক সমন্বিত নীতিমালা চান তিনি।
এআইয়ের মাধ্যমে ক্ষতিকর রাসায়নিক অণু তৈরি এবং জৈবিক হামলার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন গেটস। এ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের জন্য দেশগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রস্তাব দিতে চান তিনি। তাঁর মতে, এতে প্রযুক্তি খাতের স্বাভাবিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত না করেও বিপজ্জনক ব্যবহার ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
সম্প্রতি এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে তাঁর উদ্বেগ আরও বেড়েছে। গেটসের ভাষ্য অনুযায়ী, এআই এখন সাইবার হামলা চালাতে সক্ষমতা দেখাচ্ছে, একই সঙ্গে মানুষের চাকরি প্রতিস্থাপন এবং ব্যবহারকারীদের ওপর মানসিক প্রভাব তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও মেটার প্রযুক্তি বাস্তব ওয়েবসাইটে হ্যাকিংয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে উল্লেখ করে গেটস বলেন, এসব নিরাপত্তা ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। তাঁর মতে, প্রযুক্তির কারণে কিছু মানুষের চাকরি হারানোর বিষয়টি শুধু সাময়িক পরিবর্তন হিসেবে দেখলে চলবে না; সমাজ ও অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এআই ব্যবহার করে মানুষের শ্রম প্রতিস্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর আরোপের ধারণাও দিয়েছেন গেটস। সেই অর্থ দিয়ে চাকরি হারানো মানুষদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ও পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি সমাজে কিছু কাজ মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার কথাও বলেছেন।
গেটস তাঁর সাম্প্রতিক লেখায় এআইয়ের এমন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে প্রযুক্তির কারণে বৈষম্য বাড়বে না এবং সমাজের দুর্বল শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
তাঁর প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক সংস্থাটি কীভাবে কাজ করবে, তার পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে গেটসের বক্তব্যে স্পষ্ট, এআইয়ের বিকাশকে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে না দেখে এর নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি ও মানবসমাজের ওপর প্রভাব বিবেচনা করে বৈশ্বিক নীতিমালা তৈরির সময় এসেছে।
গেটসের এই সতর্কবার্তা এমন সময়ে এলো, যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এআই নিয়ন্ত্রণে নিজেদের নীতিমালা তৈরির চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, দেশভিত্তিক বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও এখন জরুরি।
সূত্রঃ রয়টার্স
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array