দূষণ মাপতে ৬৯১ কোটি টাকার প্রকল্প, কিন্তু দূষণ কমানোর লক্ষ্যই নেই! বায়ুদূষণে বিপর্যস্ত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিবেশ আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। ৩৪টি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ১৩টি পরীক্ষাগার ও ১৫টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার স্থাপনের পাশাপাশি শিল্প-কারখানার নির্গমন নজরদারি জোরদার করা হবে। কিন্তু এত আয়োজনের পর বায়ু ও পানিদূষণ কতটা কমবে, তার পরিমাপযোগ্য কোনো লক্ষ্যমাত্রা নেই প্রকল্প প্রস্তাবে।
অর্থাৎ দূষণ শনাক্ত করার ব্যবস্থা বাড়বে, নমুনা পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়বে, নজরদারিও বিস্তৃত হবে; কিন্তু প্রকল্প শেষে পরিবেশের কতটা উন্নতি হবে, তার হিসাব নেই। ফলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে শেষ পর্যন্ত দূষণ মাপার অবকাঠামোতেই সাফল্য সীমিত থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
- ৩৪টি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, ১৩টি পরীক্ষাগার ও ১৫টি ভ্রাম্যমাণ ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা
- বায়ু-পানিদূষণ হ্রাসের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নেই
- ব্যয়ের ৯৯.২০ শতাংশ প্রকল্প সহায়তা
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং পরিবেশ আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা না গেলে শুধু যন্ত্রপাতি বসিয়ে দূষণ কমানো সম্ভব নয়। তাই প্রকল্পটির বড় প্রশ্ন অর্থের পরিমাণ নয়, বরং এই বিনিয়োগে বাস্তবে কতটা দূষণ কমবে।
‘ইন্টিগ্রেটেড পলিউশন ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট আন্ডার দ্য বিসিএপি’ নামের প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন পাঁচ কোটি ৫১ লাখ টাকা, আর প্রকল্প সহায়তা ৬৮৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা—মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৯.২০ শতাংশ। তবে সরবরাহ করা নথির অংশে এই সহায়তা ঋণ, নাকি অনুদান, তা উল্লেখ নেই।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছরে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্প যাচাই কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত ১১ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
৩৪ কেন্দ্রে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণ
প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে চালু থাকা ৩১টি বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (সিএএমএস) উন্নয়ন এবং নতুন তিনটি কৌশলগত কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। সব মিলিয়ে ২৮টি শহুরে, তিনটি গ্রামীণ ও তিনটি আঞ্চলিক স্থানে ৩৪টি কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দূষণের উৎস শনাক্ত এবং বায়ুর মানের পূর্বাভাস দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
শিল্প-কারখানার চিমনি ও যানবাহনের নির্গমন পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নির্গমন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে। বায়ুর মান সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য দিতে বসানো হবে ২০টি এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) ডিসপ্লে বোর্ড। তীব্র বায়ুদূষণের সময় করণীয় নির্ধারণে জরুরি পরিকল্পনা, পোড়ানো ইটের বিকল্প নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কৌশল এবং জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার পর্যালোচনাও করা হবে। ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য দ্বিতীয় জাতীয় পরিকল্পনা তৈরির কাজও প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত।
পরীক্ষাগার, আইন সংশোধন ও প্রশিক্ষণ
প্রকল্পের আওতায় তিনটি বিভাগীয় ও ১০টি জেলা পর্যায়ে পরীক্ষাগারসহ প্রশাসনিক কার্যালয় নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় সম্প্রসারণ করে পরীক্ষাগারের ব্যবস্থা করা হবে। ঢাকা বিভাগীয় বা কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার সংস্কারের পাশাপাশি সিলেট, বগুড়া, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার কার্যালয়ে পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। এ ছাড়া ১৫টি ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষাগার চালু এবং দুটি রেফারেন্স পরীক্ষাগারের আন্তর্জাতিক আইএসও/আইইসি ১৭০২৫ স্বীকৃতি অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে পরীক্ষাগার ও পর্যবেক্ষণ সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ব্যাহত হয় এবং নমুনা পরীক্ষায় বিলম্ব ঘটে। এতে দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন পরীক্ষাগার ও সরঞ্জামের মাধ্যমে পরীক্ষার সময় কমিয়ে আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
এ ছাড়া পরিবেশসংক্রান্ত আইন, বিধি ও নীতিমালা সংশোধন, বিভিন্ন শিল্পের জন্য নির্দিষ্ট নির্গমন মান তৈরি, পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইনে পানির মান পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা প্রণয়ন করা হবে। শিল্প-কারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন দাখিলের নিয়ম তৈরির পাশাপাশি বস্ত্র খাতে পুনর্ব্যবহার, প্লাস্টিক উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতা, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের নির্দেশনাও থাকবে। পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও বিধি প্রতিপালন বিষয়ে ৪০০ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ এবং দেশজুড়ে ৫০০টি সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
দূষণের ভয়াবহতা জানা, কমানোর হিসাব নেই
ডিপিপি অনুযায়ী, বাংলাদেশে বার্ষিক গড় পিএম২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৬০ থেকে ১০০ মাইক্রোগ্রাম; ঢাকায় ৯০ থেকে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। নথিতে উদ্ধৃত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশক মান পাঁচ মাইক্রোগ্রাম। সে হিসাবে দেশের গড় মাত্রা নির্দেশক মানের ১২ থেকে ২০ গুণ এবং ঢাকার মাত্রা ১৮ থেকে ২০ গুণ বেশি।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালিসিস উদ্ধৃত করে প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বায়ুদূষণের সঙ্গে বছরে প্রায় এক লাখ ৫৯ হাজার অকালমৃত্যু এবং অসুস্থ অবস্থায় কাটানো ২৫০ কোটি দিনের সম্পর্ক রয়েছে। দূষণের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির আর্থিক মূল্য ২০১৯ সালের জিডিপির প্রায় ৮.৩ শতাংশের সমান বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। দূষণের এমন ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরলেও প্রকল্পে বায়ুর মান কতটা উন্নত করা হবে, পানিদূষণ কতটা কমবে কিংবা দূষণজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি হ্রাসে কী ফল পাওয়া যাবে—এসবের কোনো নির্দিষ্ট পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য রাখা হয়নি। ফলে প্রকল্প শেষে বিনিয়োগের প্রকৃত সুফল যাচাই করা কঠিন হতে পারে।
‘দূষণ মাপা আর দূষণ নিয়ন্ত্রণ এক নয়’
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান নির্বাহী ও প্রাকৃতিক অধিকারকেন্দ্রিক সুশাসনের (এনআরএলজি) প্রণেতা এম জাকির হোসেন খান বলেন, ‘দূষণ পরিমাপ করা আর দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা এক বিষয় নয়। বায়ু ও পানিদূষণ হ্রাসের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা না থাকলে প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন কঠিন হবে।’
তিনি বলেন, শুধু যন্ত্রপাতি স্থাপন করে দূষণ কমানো সম্ভব নয়। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণ, শিল্প-কারখানার নির্গমন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি এবং পরিবেশ আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের সফলতা যাচাইয়ে দূষণ হ্রাসের পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ, তথ্য উন্মুক্তকরণ এবং স্বাধীন পরিবেশগত ও আর্থিক নিরীক্ষাও জরুরি।
এম জাকির হোসেন খানের মতে, ৬৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে কতটি যন্ত্র বসানো হলো, শুধু তা দিয়ে প্রকল্পের সাফল্য বিচার করা যাবে না। বরং কতটা দূষণ কমল, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি কতটা হ্রাস পেল এবং প্রকৃতির কতটা পুনরুদ্ধার হলো, তা পরিমাপ করতে হবে। তা না হলে বিপুল বিনিয়োগ দূষণ নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে ব্যয়বহুল পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে। যদিও ৬৯১ কোটি টাকার এই প্রকল্প পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু দূষণ কমানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং স্বাধীন জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে মূল প্রশ্ন থেকেই যাবে—এত টাকা খরচ করে দূষণ কমবে, নাকি শুধু দূষণের পরিমাপ আরও উন্নত হবে?
কালের আলো/এমএসএএকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]