খুঁজুন
                               
, ,
           

মাঝারি গরমেও বিদ্যুতের হাহাকার

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৫৫ অপরাহ্ণ
মাঝারি গরমেও বিদ্যুতের হাহাকার

মাঝারি তাপমাত্রার আবহাওয়া। তবু কমছে না বিদ্যুতের সংকট। বরং গ্রাম থেকে রাজধানী—সর্বত্রই বাড়ছে লোডশেডিং। দিনের ব্যস্ত সময়েও কয়েক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি নিয়ে চলছে বিদ্যুৎ সরবরাহ। বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টায় দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। এতে চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশই মেটানো সম্ভব হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগের পর্যালোচনা বলছে, চলতি আগস্টের শুরুতে গ্যাসের তীব্র সংকটের সময় যে মাত্রায় লোডশেডিং হয়েছিল, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিও অনেকটা সেই পর্যায়ে ফিরে গেছে। সাধারণত লোডশেডিংয়ের বড় চাপ গ্রাম ও মফস্বল এলাকায় গিয়ে পড়লেও এবার রাজধানীর বাসিন্দারাও রেহাই পাচ্ছেন না। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে অনেক ক্ষেত্রে এক ঘণ্টার আগে তা ফিরছে না।

দিনে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট ঘাটতি
বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৫৩৪ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৬৬ মেগাওয়াটের কাছাকাছি। এই ঘাটতি সামাল দিতে প্রায় ২০ শতাংশ হারে লোডশেডিং করতে হয়েছে।দিনের বেলাতেও গড়ে ২ হাজার মেগাওয়াটের মতো লোডশেডিং হয়েছে। অর্থাৎ শুধু রাতের পিক আওয়ার নয়, দিনের স্বাভাবিক সময়েও বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

  • গ্রাম-শহরে সমানতালে লোডশেডিং
  • বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে ভোগান্তি
  • গ্যাস সংকটে কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন
  • দিনে ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি
  • ঢাকায় ৪–৫ বার, গ্রামে ১০–১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ যাচ্ছে

রাজধানীতেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। ২৪ আগস্ট দুপুর ১২টায় ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি (ডেসকো) এলাকায় ১ হাজার ৩৯৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১২০ মেগাওয়াট। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) এলাকায় ১ হাজার ৯৯৯ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ১৬৫ মেগাওয়াট। একই সময়ে পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় চাহিদা ছিল ২ হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট, সেখানে লোডশেডিং ছিল ৪৩৭ মেগাওয়াট। কয়েক দিনের ব্যবধানেই এসব এলাকায় লোডশেডিংয়ের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

রাজধানীতে দিনে ৪–৫ বার, গ্রামে আরও ভয়াবহ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পালা করে দিনে চার থেকে পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় এক ঘণ্টার বেশি সময়ও বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে। ঈদের ছুটির দিন বুধবারও কোথাও কোথাও টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।তবে রাজধানীর তুলনায় গ্রামের চিত্র আরও কঠিন। কয়েক দিন কিছুটা স্বস্তি মিললেও ফের দিনে ১০ থেকে ১২ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে শুধু গৃহস্থালি জীবনই নয়, ক্ষুদ্র ব্যবসা, সেচ, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় শিল্পকারখানার কাজও ব্যাহত হচ্ছে।

মূল সংকট গ্যাসে
বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে গ্যাসের ঘাটতি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা এখনো বড় মাত্রায় গ্যাসনির্ভর। কিন্তু প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় অনেক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পেট্রোবাংলা ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য গ্যাসের বরাদ্দ ৯৪০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৮৯০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামানো হয়েছে। সীমিত সরবরাহের অবশিষ্ট অংশ বাণিজ্যিক গ্রাহক ও সার কারখানায় দেওয়া হচ্ছে। ফলে ১২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো গত কয়েক সপ্তাহে গড়ে ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের মধ্যে উৎপাদন সীমাবদ্ধ রেখেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও কমিয়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামানো হয়েছে।

গ্যাস কম, বাড়ছে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক উৎপাদন
গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন কমলেও ঘাটতি সামাল দিতে ফার্নেস তেলচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ২ হাজার মেগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট করা হয়েছে।তবে এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। অর্থাৎ গ্যাস সংকট শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতিই তৈরি করছে না, একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এলএনজি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা
গ্যাসের ঘাটতি পূরণে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেখানেও তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। সাগরে থাকা মার্কিন এলএনজি টার্মিনালের মেরামত শেষ হলেও আমদানি করা গ্যাসের সরবরাহ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, ধীরে ধীরে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে গ্যাসের ঘাটতি কমানোর চেষ্টা চলছে। তবে নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী এলএনজি কার্গো সরবরাহেও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবও পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা কিছু এলএনজি কার্গো সময়মতো দেশে আসছে না। ফলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

১২ ডলারের গ্যাস এখন ২৪ ডলার
জ্বালানি বাজারে এই চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপর। যুদ্ধের আগে আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট এলএনজির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ১২ থেকে ১৩ ডলার। সর্বশেষ কেনাকাটায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৪ ডলারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কেনা এলএনজি পাওয়া যাচ্ছিল ৯ থেকে ১০ ডলারে। ফলে সস্তা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় ব্যয়বহুল স্পট এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরীর তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা গ্যাসের প্রতি ঘনফুটের দাম পড়ছে প্রায় ৭৫ টাকা। অথচ বিদ্যুৎকেন্দ্রে সেই গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ১৪ টাকা দরে। এই বিশাল ব্যবধান সরকারকে ভর্তুকির ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলছে।

ভর্তুকির চাপেও সমাধান মিলছে না
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় গ্যাস খাতে এক বছরের জন্য বরাদ্দ করা ভর্তুকির অর্থের বড় অংশ মাত্র দুই মাসেই ব্যয় হয়ে গেছে। ফলে সরকারের সামনে এখন দ্বিমুখী চাপ—একদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অন্যদিকে বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের বোঝা সামলানো। এই পরিস্থিতিতে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়ার উৎস খুঁজছে সরকার। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে গ্যাসের সরবরাহ না বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা কম।

সব মিলিয়ে বর্তমান লোডশেডিং কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতির গল্প নয়; এর পেছনে রয়েছে গ্যাস সরবরাহের সংকট, এলএনজি আমদানির অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বাড়তি দাম এবং ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান চাপ। ফলে আপাতত গ্রাম ও শহর—দুই জায়গার মানুষকেই ভাগ করে নিতে হচ্ছে একই দুর্ভোগ। বিদ্যুৎ সংকটের এই চক্র ভাঙতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কালের আলো/এম/এএইচ

ঢাকায় বসেই নজরে দেশের শ্রেণিকক্ষ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১০ অপরাহ্ণ
ঢাকায় বসেই নজরে  দেশের শ্রেণিকক্ষ

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক আছেন কি না, নির্ধারিত সময়ে পাঠদান হচ্ছে কি না কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন—এসব জানতে আর শুধু রুটিন পরিদর্শনের ওপর নির্ভর করতে চায় না সরকার। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) এবার প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষকে নিয়ে আসতে চাইছে রিয়েল টাইম মনিটরিংয়ের আওতায়। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকায় বসেই দেশের দূরবর্তী কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে চলমান পাঠদান সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।

  • সিসিটিভি ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে রিয়েল টাইম মনিটরিং
  • বাড়বে পাঠদানের মান ও জবাবদিহি
  • মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে মাউশির নতুন পদক্ষেপ

পরিদর্শনের অপেক্ষা নয়, চোখ থাকবে প্রতিদিন
প্রচলিত ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান যাচাই করতে পরিদর্শককে সরেজমিনে যেতে হয়। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র পেতে সময় লাগে এবং আকস্মিক অনিয়ম অনেক সময় পরিদর্শনের আগেই আড়াল হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় ডিজিটাল মনিটরিং সেই সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পারে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও কেন্দ্রীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থার মাধ্যমে মাউশির কর্মকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।

ফলে শিক্ষক যথাসময়ে ক্লাসে প্রবেশ করছেন কি না, পাঠদানের নির্ধারিত সময় ঠিকভাবে কাজে লাগছে কি না কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির চিত্র কী—এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া যাবে। এতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও হতে পারে আরও তথ্যভিত্তিক।

ক্যামেরার আগেই শুরু ‘লাইভ’ পর্যবেক্ষণ
কেন্দ্রীয় সিসিটিভি ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু হওয়ার আগেই এর প্রস্তুতি হিসেবে শুরু হয়েছে ভার্চুয়াল মনিটরিং। মাউশির কর্মকর্তারা হঠাৎ প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে হোয়াটসঅ্যাপে ভিডিও কল করে নির্দিষ্ট শ্রেণিকক্ষে যেতে বলছেন। সেখান থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ও পাঠদানের পরিবেশ সরাসরি দেখা হচ্ছে।

গত আগস্টে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব পর্যবেক্ষণে শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতিসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ধরা পড়েছে। ফলে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তাৎক্ষণিক সংশোধনের নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এটি দেখাচ্ছে, প্রযুক্তি শুধু নজরদারির মাধ্যম নয়; দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করার হাতিয়ারও হতে পারে।

বিদ্যমান ক্যামেরাই হতে পারে বড় সম্পদ
মাউশির তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫২ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে প্রায় ৫২ হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় মনিটরিং চালুর ক্ষেত্রে একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। বিদ্যমান অবকাঠামোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা গেলে তুলনামূলক দ্রুতই বড় পরিসরে ব্যবস্থা কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে।

মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, ৮ থেকে ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি রয়েছে। এগুলোকে অ্যাপের মাধ্যমে এক সূত্রে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়ন হলে প্রয়োজনের সময় যেকোনো প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে।

উপস্থিতি থেকে পাঠদানের মান—তথ্য হবে সিদ্ধান্তের ভিত্তি
এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা কেবল শিক্ষক উপস্থিতি যাচাইয়ে নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় বাস্তব তথ্যের ব্যবহার বাড়ানোয়। কোনো অঞ্চলে নিয়মিত শিক্ষক অনুপস্থিতির প্রবণতা থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। কোথাও শিক্ষার্থীর উপস্থিতি কম হলে কারণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে। একইভাবে অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ কিংবা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতিও নজরে আসতে পারে।

মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক মো. নাজমুল হকের মতে, ডিজিটাল মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র জানা গেলে দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। তাঁর মতে, নিয়মিত, তথ্যভিত্তিক ও ফলমুখী মনিটরিংয়ের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব।

পরীক্ষাকেন্দ্রের সাফল্য থেকে শ্রেণিকক্ষে
পরীক্ষাকেন্দ্র সিসিটিভির মাধ্যমে তদারকিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ইতোমধ্যে প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিচিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে এবার শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা যেহেতু শ্রেণিকক্ষ, সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি চালু হলে প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে দূরত্ব কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং কার্যকর নীতিমালার ওপর। কেন্দ্রীয়ভাবে বিপুলসংখ্যক ক্যামেরা থেকে আসা তথ্য কীভাবে বিশ্লেষণ করা হবে, কীভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে—সেই কাঠামোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

নজরদারির লক্ষ্য যখন মানসম্মত শিক্ষা
শ্রেণিকক্ষে ক্যামেরা বসানোই এই উদ্যোগের মূল সাফল্য নয়। প্রকৃত সাফল্য হবে তখনই, যখন এর মাধ্যমে শিক্ষককে শাস্তির ভয়ে নয়, দায়িত্ব পালনে আরও সচেতন করা যাবে; শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বাড়বে; শ্রেণিকক্ষ হবে আরও সুশৃঙ্খল এবং পাঠদান হবে সময়োপযোগী ও কার্যকর।

প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ তাই কেবল ‘কে ক্লাসে আছেন’ তা দেখার ব্যবস্থা নয়। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি হতে পারে শিক্ষা প্রশাসনের এমন একটি তথ্যভিত্তিক কাঠামো, যেখানে সমস্যা দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে সমস্যাকে আগেই শনাক্ত করে সমাধানের সুযোগ থাকবে। আর সেই পরিবর্তনই শ্রেণিকক্ষের নজরদারিকে ধীরে ধীরে রূপ দিতে পারে শিক্ষার মানোন্নয়নের কার্যকর ব্যবস্থায়।

এম/এএইচ

‘আমি হেরেছি, তুমি জিতেছো’—গাজী নজরুলের বাসায় পাওয়া চিঠিতে যা আছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৬ অপরাহ্ণ
‘আমি হেরেছি, তুমি জিতেছো’—গাজী নজরুলের বাসায় পাওয়া চিঠিতে যা আছে

সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া হাতে লেখা কয়েকটি চিঠিতে সম্পর্কের টানাপড়েন, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ ও মানসিক কষ্টের নানা কথা উঠে এসেছে। চিঠিগুলো জাতীয় সংসদের অফিশিয়াল প্যাড, সাদা কাগজ এবং লাল-কালো কালিতে লেখা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লেখাগুলোতে মরিয়ম খাতুনের নিজের অবস্থান, আক্ষেপ ও আত্মসম্মান রক্ষার কথাও রয়েছে।

উদ্ধার হওয়া চিঠিগুলোর কয়েকটিতে সম্পর্কের নানা আবেগঘন মুহূর্তের বর্ণনা রয়েছে। ভালোবাসার পাশাপাশি সেখানে প্রতারণার অভিযোগ, সম্পর্কের জটিলতা ও বিশ্বাসভঙ্গের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। কোথাও নিজেকে দাবার গুটি হিসেবে উল্লেখ করে কষ্টের কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও সম্পর্ক থেকে সরে দাঁড়ানোর দৃঢ়তার কথাও উঠে এসেছে।

জাতীয় সংসদের অফিশিয়াল প্যাডে কালো কালিতে লেখা একটি পাতায় বলা হয়েছে, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’

অন্য একটি পাতায় সম্পর্কের টানাপড়েন তুলে ধরে লেখা হয়েছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী। কাগজে-কলমে অধিকার ছিল তার বউয়ের। আর আমি ছিলাম বোকা…!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ…!!!’

আরেকটি লেখায় বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সে বলেছিল, আজ থেকে আমরা বন্ধু…চলো একটা গেমস খেলি। আমিও সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানত—আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি।’

জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা আরেকটি পাতায় ক্ষোভ ও পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘আমি হেরেছি…তুমি জিতেছো…কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো।’

লাল কালিতে লেখা একটি সংক্ষিপ্ত বার্তায় নিজের আত্মসম্মানের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখা, ‘শুধু মায়ায় পড়েছি বলে বারবার তোমার কাছে নত হই… তা না হলে যতটা সস্তা ভাবছো ততটা সস্তা আমি নই…!’

ধর্মীয় আমলের তালিকাও

চিঠিগুলোর সঙ্গে ‘১২-০৭-২০২৬’ তারিখ লেখা একটি পাতাও পাওয়া গেছে। ওই পাতায় ঘুমানোর আগে করণীয় কয়েকটি ধর্মীয় আমলের তালিকা রয়েছে। এতে কালেমা, দরুদ শরিফ, ঘুমের দোয়া, আয়াতুল কুরসি, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম, আস্তাগফিরুল্লাহসহ বিভিন্ন আমলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া এসব হাতে লেখা পাতায় সম্পর্ক, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, আক্ষেপ ও আত্মসম্মান রক্ষার নানা অনুভূতির প্রকাশ রয়েছে। একই সঙ্গে একটি লেখায় ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছে।

কালের আলো/এমএসআইপি 

পদ্মার চরাঞ্চল

পদ্মায় মাছ ধরেন, তবু জেলে কার্ড নেই—বঞ্চিত হাজারো জেলে

মাদারীপুর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৩১ অপরাহ্ণ
পদ্মায় মাছ ধরেন, তবু জেলে কার্ড নেই—বঞ্চিত হাজারো জেলে

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁ নদে দীর্ঘদিন ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা অনেক প্রকৃত জেলে ‘জেলে কার্ড’ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, পেশায় জেলে না হয়েও অনেকে তালিকাভুক্ত হয়ে সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন বলে দাবি স্থানীয় জেলেদের।

উপজেলার পদ্মার চরাঞ্চলখ্যাত চরজানাজাত, কাঁঠালবাড়ী ও বন্দরখোলা ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকার বহু মানুষ মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর মাছ ধরলেও অনেকের জেলে কার্ড হয়নি। ফলে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি সহায়তা থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় জেলেদের দাবি, জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তৈরি করা তালিকায় প্রকৃত জেলেদের অনেকের নাম বাদ পড়েছে। বিপরীতে পেশায় জেলে নন—এমন ব্যক্তিদের নামও তালিকায় রয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তার ক্ষেত্রে প্রকৃত জেলেরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, শিবচরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৪২ জন। এর মধ্যে শিবচর পৌরসভায় ২৯৯ জনসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ৬ হাজারের বেশি জেলে নিবন্ধিত রয়েছেন। তবে মাছ ধরার নিষিদ্ধ মৌসুমে সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন প্রায় আড়াই হাজার জেলে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, ইলিশের প্রজনন মৌসুম ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়। এ সময় সরকার থেকে চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়। কিন্তু জেলে কার্ড না থাকায় প্রকৃত অনেক জেলে সেই সুবিধা পান না।

চরজানাজাত ইউনিয়নের জেলে রাকিব বলেন, তার বাবা দীর্ঘদিন জেলে ছিলেন। বাবার কোনো জেলে কার্ড ছিল না। এখন তিনিও মাছ ধরলেও কার্ড পাননি। অথচ জেলে নন—এমন অনেকের নাম তালিকায় রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

আরেক জেলে রহিম মাদবর বলেন, তালিকা তৈরির সময় জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি জমা দিয়েছেন। একাধিকবার কাগজপত্র দিলেও তার কার্ড হয়নি। তার মতো আরও অনেক প্রকৃত জেলে তালিকার বাইরে রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

চরজানাজাত ইউনিয়নের সমাজসেবক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন বেপারী বলেন, যারা বছরের পর বছর পদ্মায় মাছ শিকার করে পরিবার চালান, সরকারি সহায়তার প্রকৃত দাবিদার তারাই। জেলে কার্ডের তালিকা পুনঃযাচাই করে অযোগ্যদের বাদ এবং বঞ্চিত প্রকৃত জেলেদের দ্রুত তালিকাভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

শিবচর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সত্যজিৎ মজুমদার বলেন, উপজেলায় জেলে তালিকায় ছয় হাজারের বেশি নাম রয়েছে। তবে সহায়তা পাচ্ছেন প্রায় আড়াই হাজার জেলে। তালিকাটি অনেক পুরোনো হওয়ায় বর্তমানে হালনাগাদের কাজ চলছে। যাচাই-বাছাই করে যোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত এবং অযোগ্যদের বাদ দেওয়া হবে।

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচএম ইবনে মিজান বলেন, প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত এবং জেলে নন এমন ব্যক্তিরা কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।

কালের আলো/এমএসআইপি