সিডনি ম্যারাথনে রেকর্ড গোবনার, ক্যানসার নিয়েও দৌড়ে অনন্য ফুলার
একই পথে ছুটেছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, অপেশাদার দৌড়বিদ, হুইলচেয়ার অ্যাথলেট এবং কেমোথেরাপি নেওয়া এক ক্যানসার রোগী। তবে সবার লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। কেউ শিরোপার জন্য, কেউ নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য, আবার কেউ প্রমাণ করতে চেয়েছেন-কঠিন অসুস্থতাও মানুষের এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাকে থামাতে পারে না।
গতি, রেকর্ড ও জীবনজয়ের এমন নানা গল্প নিয়ে রোববার সিডনিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ম্যারাথন। এবারের আসরে ১৪০টির বেশি দেশের ৪০ হাজারেরও বেশি দৌড়বিদ অংশ নেন।
সিডনি সময় সকাল সাড়ে ৬টায় নর্থ সিডনি থেকে শুরু হয় মূল হাই-পারফরম্যান্স দৌড়। হারবার ব্রিজসহ শহরের বিভিন্ন পথ পেরিয়ে ৪২ দশমিক ২ কিলোমিটার দূরের সিডনি অপেরা হাউসে গিয়ে শেষ হয় প্রতিযোগিতা।
পুরুষদের দৌড়ের শেষ কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল তীব্র লড়াই। পাঁচজনের অগ্রবর্তী দল তখনও কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। শেষ মুহূর্তে গতি বাড়িয়ে সবাইকে পেছনে ফেলেন ইথিওপিয়ার ২১ বছর বয়সী আদ্দিসু গোবনা।
২ ঘণ্টা ৪ মিনিট ৪২ সেকেন্ডে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করে শিরোপা জয়ের পাশাপাশি নতুন কোর্স রেকর্ড গড়েন গোবনা। গত বছর স্বদেশি হাইলেমারিয়াম কিরোসের গড়া ২ ঘণ্টা ৬ মিনিট ৬ সেকেন্ডের রেকর্ড তিনি ভাঙেন ১ মিনিট ২৪ সেকেন্ডের ব্যবধানে।
গত বছর সিডনি ম্যারাথনে দ্বিতীয় হয়েছিলেন গোবনা। সেই দৌড়ের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করে এক বছর প্রস্তুতি নিয়ে এবার ফিরেছিলেন তিনি। প্রত্যাবর্তনের দৌড়েই শিরোপার সঙ্গে গড়লেন নতুন রেকর্ড।
মাত্র চার সেকেন্ড পর ২ ঘণ্টা ৪ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে দ্বিতীয় হন গোবনার স্বদেশি চিমদেসা দেবেলে গুদেতা। লেসোথোর তেবেলো রামাকোঙ্গোয়ানা ২ ঘণ্টা ৪ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডে তৃতীয় হন। পুরুষ বিভাগের প্রথম তিনজনই আগের কোর্স রেকর্ডের চেয়ে কম সময়ে দৌড় শেষ করেন।
নারীদের বিভাগে অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোনো সুযোগ দেননি কেনিয়ার পেরেস জেপচিরচির। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও সাবেক অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ৩১ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে শিরোপা জেতেন।
কেনিয়ার ইরিন চেপতাই ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট ১১ সেকেন্ডে দ্বিতীয় এবং ইথিওপিয়ার শুর ডিমাইজ ২ ঘণ্টা ২২ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে তৃতীয় হন। তবে মাত্র ৯ সেকেন্ডের জন্য নারীদের কোর্স রেকর্ড ভাঙতে পারেননি জেপচিরচির। গত বছর সিফান হাসানের গড়া রেকর্ডটি ছিল ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিট ২২ সেকেন্ড।
হুইলচেয়ার বিভাগেও ছিল রেকর্ডের ছড়াছড়ি। পুরুষ বিভাগে যুক্তরাষ্ট্রের ড্যানিয়েল রোমানচুক ১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে গত বছরের মার্সেল হাগের রেকর্ড ভেঙে দেন।
নারীদের বিভাগে সুইজারল্যান্ডের প্যারালিম্পিয়ান ম্যানুয়েলা শার সময় নেন ১ ঘণ্টা ৪২ মিনিট ৪ সেকেন্ড। সুজান্না স্কারোনির আগের রেকর্ডের চেয়ে ২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড কম সময়ে দৌড় শেষ করেন তিনি। এর মাধ্যমে অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরসের আটটি কোর্সেই জয় পাওয়া প্রথম অ্যাথলেট হওয়ার কীর্তিও গড়েন শার।
স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার হয়ে পুরুষদের মধ্যে সবার আগে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছান অ্যান্ডি বুকানন। তার সময় ছিল ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট ১৪ সেকেন্ড। নারীদের মধ্যে প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে দৌড় শেষ করেন এলি প্যাশলি। তিনি সময় নেন ২ ঘণ্টা ২৮ মিনিট ২৮ সেকেন্ড।
তবে দিনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী গল্পটি ছিল ফাইভ ডকের টবি ফুলারের। ২৩ বছর বয়সে মাল্টিপল মায়েলোমা নামের রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত হন তিনি। কেমোথেরাপির ধকল সামলেই এবারের ম্যারাথনের স্টার্ট লাইনে দাঁড়ান ফুলার।
তার লক্ষ্য ছিল না শিরোপা কিংবা রেকর্ড। লড়াইটা ছিল নিজের শরীর ও অসুস্থতার বিরুদ্ধে। সেই লড়াই ৩ ঘণ্টা ১৮ মিনিটে শেষ করেন তিনি। কেমোথেরাপি নেওয়া অবস্থায় দ্রুততম ম্যারাথন সম্পন্ন করার কীর্তি হিসেবে তার অর্জন গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের স্বীকৃতি পেয়েছে।
দৌড়টি তার জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল বলে জানান ফুলার। প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগলেও শেষ পর্যন্ত নিজের সর্বোচ্চটা দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত তিনি। দৌড় শেষে প্রিয়জনদের সঙ্গে কারি খেয়ে এই অর্জন উদযাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অ্যাবট ওয়ার্ল্ড ম্যারাথন মেজরসের মর্যাদা পাওয়ার পর টানা দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হলো সিডনি ম্যারাথন। আয়োজকদের হিসাবে, এই ম্যারাথনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে দাতব্য কর্মকাণ্ডের জন্য সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ৩৮ মিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার ছাড়িয়েছে।
রোববার সিডনি অপেরা হাউসের সামনে তাই শুধু বিজয়ীদের নাম ও সময়ের হিসাব হয়নি। একদিকে ২১ বছরের এক তরুণ গত বছরের ব্যর্থতা পেছনে ফেলে রেকর্ড গড়েছেন, অন্যদিকে হুইলচেয়ার অ্যাথলেটরা ভেঙেছেন নিজেদের সীমা। আর ক্যানসারের চিকিৎসা চলা এক তরুণ দেখিয়েছেন—কিছু জয় পদক দিয়ে নয়, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার সাহস দিয়ে মাপা হয়।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array