আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার কখনোই সহজ কোনো গল্প ছিল না। বছরের পর বছর তার পরিচয় ছিল শুধু অর্জনে নয়, বরং বড় মঞ্চে বারবার ব্যর্থতার সঙ্গেও।
ক্লাব ফুটবলে Lionel Messi প্রায় সবকিছুই জিতেছেন। বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক শিরোপা জিতে তিনি আক্রমণভাগের একজন খেলোয়াড়ের পক্ষে সম্ভব এমন সাফল্যের সীমাই বদলে দিয়েছেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে দীর্ঘ সময় তার গল্প ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ডিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা এবং বিশ্বকাপ না জেতার আক্ষেপ তাকে ঘিরে থাকা বিতর্কের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল। অবশেষে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে সেই আক্ষেপ ঘুচে যায়।
৩৫ বছর বয়সে মেসি আর্জেন্টিনাকে ১৯৮৬ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ এনে দেন। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স শুধু একটি ট্রফিই এনে দেয়নি, বরং সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে তার দাবির শেষ বড় প্রশ্নটিরও উত্তর দিয়েছে।
তবে সেই বিশ্বজয়ের পথ ছিল দীর্ঘ হতাশায় ভরা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়—টানা তিনটি বড় ফাইনাল হারের পর মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। কয়েক মাস পর অবশ্য সিদ্ধান্ত বদলে ফিরে আসেন।
পরিস্থিতির পরিবর্তন আসে লিওনেল স্কালোনির অধীনে। তিনি এমন একটি দল তৈরি করেন, যেখানে মেসিকে প্রতিটি দায়িত্ব একা বহন করতে হয়নি। আর্জেন্টিনা হয়ে ওঠে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, আক্রমণাত্মক ও ঐক্যবদ্ধ।
এর ফলও আসে দ্রুত। ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জেতে আর্জেন্টিনা। এরপর ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে জেতে ফিনালিসিমা। এই সাফল্যগুলো শুধু দীর্ঘ শিরোপাখরা কাটায়নি, দলের মানসিকতাতেও বড় পরিবর্তন এনেছিল।
কাতার বিশ্বকাপে মেসি করেন ৭ গোল ও ৩ অ্যাসিস্ট। পরিসংখ্যানের বাইরেও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ, সুযোগ তৈরি এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার মূল চালিকাশক্তি।
২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা জেতেন মেসি। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। ৩৯ বছর বয়সে ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করে দলকে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলেন।
তবে ২০ জুলাই স্পেনের কাছে ফাইনালে হারের মধ্য দিয়ে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি আরেকটি হতাশায় শেষ হয়। বিশ্বজয়ী হিসেবে বিদায় নিলেও শেষ ম্যাচে আরেকটি ট্রফি যোগ করতে পারেননি তিনি।
এর কিছুদিন পর মেসির বাবা ও এজেন্ট হোর্হে মেসির মৃত্যু তার জীবনে গভীর শোকের ছায়া ফেলে। বিশ্বকাপ চলাকালেও কয়েকটি ম্যাচের পর মেসিকে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল। পরে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ইঙ্গিত দিতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত তিন পৃষ্ঠার এক চিঠিতে সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করেন।
২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার হয়ে অভিষেক হয়েছিল তার। প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে মেসি দেখেছেন দুই বিপরীত চিত্র—টানা তিন ফাইনালের পরাজয়, আবার বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও একটি ফিনালিসিমা জয়।
১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনায় পাড়ি দেওয়ার পর স্পেনের হয়ে খেলার সুযোগ থাকলেও মেসি বেছে নিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে। সেই সিদ্ধান্ত তাকে বছরের পর বছর সমালোচনার মুখে ফেললেও শেষ পর্যন্ত সেটিই তার আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।
অবসরের ঘোষণা দিয়ে মেসি লিখেছিলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য। যাও আর্জেন্টিনা!’
ক্লাব ফুটবলে ইন্টার মায়ামির হয়ে হয়তো তাকে আরও দেখা যাবে। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে তার অধ্যায় এখন শেষ।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটাই—মহত্ত্ব শুধু অবিচ্ছিন্ন সাফল্যে তৈরি হয় না। ব্যর্থতা, হতাশা, সমালোচনা আর বারবার ফিরে আসার মধ্য দিয়েও একজন কিংবদন্তির জন্ম হতে পারে। প্রায় দুই দশক একটি জাতির প্রত্যাশার ভার কাঁধে নিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই ভারকেই ইতিহাসের অন্যতম সেরা আন্তর্জাতিক উত্তরাধিকারে পরিণত করেছেন লিওনেল মেসি।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array