একটি কার্ড। মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা। আর সেই অর্থ যাবে সরাসরি পরিবারের হাতে। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নয়, থাকবে ডিজিটাল পরিচয় ও গভর্নমেন্ট টু পারসন বা জি-টু-পি পদ্ধতি। দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রচলিত কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এবার পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করেছে সরকার। ‘ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন নীতিমালা ২০২৬’-এর আওতায় দেশের প্রায় ২ কোটি অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে নিয়মিত নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
গত শনিবার (২৯ আগস্ট) সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে নীতিমালাটি প্রকাশ করা হয়। এই কর্মসূচির বিশেষ দিক হলো—সহায়তা দেওয়া হবে ব্যক্তি ধরে নয়, পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করে। আর পরিবারে নারী সদস্যের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কার্ডটি সাধারণত পরিবারের মা, বয়োজ্যেষ্ঠ বা দায়িত্বশীল নারীর নামে ইস্যু করা হবে।
সমতল থেকে দুর্গম পাহাড়—বাদ যাবে না কেউ
ফ্যামিলি কার্ড শুধু শহর বা সমতলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ থাকছে না। নীতিমালায় দেশের তৃণমূল থেকে শুরু করে পার্বত্য অঞ্চলের দুর্গম পাড়া পর্যন্ত সব জনগোষ্ঠীকে কর্মসূচির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি কাজ করবে। অর্থাৎ ভৌগোলিক অবস্থান বা দুর্গমতার কারণে যাতে দরিদ্র পরিবার বাদ না পড়ে, সে লক্ষ্যেই তৈরি করা হচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ের বাছাই কাঠামো। এর আগে পরীক্ষামূলকভাবে ৩ লাখ ২০ হাজার পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পাইলট কর্মসূচির আওতায় রাজধানীর কড়াইল, অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তিসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার নির্বাচিত এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ছিল রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ। পাইলট পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করেই এবার বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নের কাঠামো তৈরি হলো।
মাসে ২,৫০০ টাকা, তবে পরিবারের আকারেও আছে হিসাব
নীতিমালা অনুযায়ী, লক্ষ্যভুক্ত পরিবারকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। তবে পাঁচ সদস্যের বেশি পরিবারকে সর্বোচ্চ দুটি কার্ড এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা ১০ জনের বেশি হলে ক্ষেত্রবিশেষে তিনটি কার্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ পরিবারের সদস্যসংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সহায়তার পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে বৃহৎ ও অতি দরিদ্র পরিবারগুলো তুলনামূলক বেশি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তবে কারা এই সুবিধা পাবেন, তার পাশাপাশি কারা পাবেন না—নীতিমালায় সেটিও স্পষ্ট করা হয়েছে।
আট কারণে মিলবে না ফ্যামিলি কার্ড
নীতিমালায় একটি ‘নেগেটিভ লিস্ট’ নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক, পেশাগত ও সম্পদগত সক্ষমতা থাকলে পরিবারটি এই সুবিধার বাইরে থাকবে। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাওয়া নারীপ্রধান, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী কিংবা নিয়মিত সরকারি পেনশনভোগী পরিবার এই সুবিধা পাবে না। একইভাবে পরিবারের কোনো সদস্যের নামে ৫ লাখ টাকার বেশি জাতীয় সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট থাকলেও বাদ পড়তে হবে। তিন বা চার চাকার মোটরযান, বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসা থাকলেও মিলবে না কার্ড। পরিবারের কোনো সদস্য নিয়মিত করদাতা হলে কিংবা করযোগ্য আয় থাকলেও পরিবারটি অযোগ্য বিবেচিত হবে। এ ছাড়া বসতভিটাসহ মোট আবাদি জমি শূন্য দশমিক ৫০ একর বা তার বেশি হলে এবং কোনো অকৃষি বা বাণিজ্যিক জমি বা স্পেসের বাজারমূল্য ৫ লাখ টাকার বেশি হলেও পরিবারটি কর্মসূচির বাইরে থাকবে।
বড় চ্যালেঞ্জ বাছাইয়ে স্বচ্ছতা
ফ্যামিলি কার্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে এর ডিজিটাল কাঠামো। অনন্য একক পরিচিতি এবং জি-টু-পি পদ্ধতিতে সরাসরি উপকারভোগীর কাছে অর্থ পৌঁছানোর ফলে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানোর সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রকৃত দরিদ্র পরিবার চিহ্নিত করা। স্থানীয় পর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে বাছাইয়ের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাব, তথ্যের ভুল এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুধু ডিজিটাল কার্ড করলেই হবে না; তথ্য যাচাই ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও শক্তিশালী করতে হবে।
ব্যক্তি নয়, পরিবার—দর্শনে বড় পরিবর্তন
সরকারের নীতিমালায় এই কর্মসূচির মূল দর্শন—‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এর মাধ্যমে শুধু নগদ অর্থ দেওয়া নয়, পরিবারকে একটি স্বনির্ভর ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে নারীর নামে কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সামাজিক নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বয়স্ক, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক নারীদের পরিবারের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে ২ কোটি পরিবারকে নিয়মিত অর্থ দেওয়া যেমন বিশাল কর্মযজ্ঞ, তেমনি এর সঠিক বাস্তবায়নও বড় পরীক্ষা। ফ্যামিলি কার্ড শেষ পর্যন্ত দরিদ্র মানুষের হাতে নিয়মিত সহায়তার নিশ্চয়তা হয়ে উঠবে, নাকি বাছাই ও বাস্তবায়নের দুর্বলতায় হারিয়ে যাবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array