ইসরাইলের কারাগারগুলোতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের জীবন ভয়াবহ নির্যাতন, অনাহার, চিকিৎসাবঞ্চনা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে কাটছে বলে অভিযোগ করেছেন সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি সাংবাদিক রামেজ আওয়াদ। তাঁর ভাষায়, এসব কারাগার অনেকটা ‘জীবিতদের কবরস্থান’-এর মতো।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুই বছরের বন্দিজীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন আওয়াদ। তিনি জানান, এই সময়ে তিনি অফার ও নেগেভ কারাগারে বন্দি ছিলেন। দীর্ঘ বন্দিজীবনের পর মুক্তির অনুভূতিকে তাঁর কাছে ‘নতুন করে জন্ম নেওয়ার’ মতো মনে হয়েছে।
আওয়াদের বর্ণনা অনুযায়ী, কারাগারে প্রতিটি দিনই ছিল ভয় ও অনিশ্চয়তায় ভরা। পর্যাপ্ত ও মানসম্মত খাবারের অভাবে বন্দিদের প্রায়ই ক্ষুধার্ত থাকতে হতো। কারাগারের পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশেরও ছিল চরম সংকট। অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও অবহেলা করা হতো বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে বন্দিদের শারীরিক দুর্বলতার পাশাপাশি আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতাও বাড়ত।
মুক্তির পরও বন্দিজীবনের সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দিচ্ছে না বলে জানান আওয়াদ। তিনি বলেন, মুক্তির পরদিন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার সময় তাঁর সামনে খাবার দেওয়া হলে হঠাৎ চোখে পানি চলে আসে। একপর্যায়ে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দেন।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে আওয়াদ বলেন, খাবারের সামনে বসেই তাঁর মনে পড়ে যায় কারাগারে থাকা সহবন্দিদের কথা। তিনি পরিবারের নিরাপদ পরিবেশে বসে খাবার খাচ্ছেন, অথচ পরিচিত অনেক বন্দি তখনও কারাগারের ভেতরে ক্ষুধা, ভয় ও কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন-এই চিন্তা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
আওয়াদের অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে দাবি করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা। ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন B’Tselem-এর জানুয়ারি ২০২৬ সালের ‘Living Hell’ প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, অমানবিক পরিবেশ, ইচ্ছাকৃতভাবে খাবার কম দেওয়া এবং চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ইসরাইলি কারাগার ও আটককেন্দ্রে অন্তত ৮৪ জন ফিলিস্তিনি বন্দি মারা গেছেন।
বেতসেলেমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই ৮৪ জনের মধ্যে ৫০ জন গাজা উপত্যকার, ৩১ জন পশ্চিম তীরের এবং ৩ জন ইসরাইলের ফিলিস্তিনি নাগরিক ছিলেন। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, তাদের কাছে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে এই সংখ্যা পাওয়া গেছে এবং প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে প্রকাশিত বেতসেলেমের ‘Welcome to Hell’ প্রতিবেদনে মুক্তিপ্রাপ্ত ৫৫ জন ফিলিস্তিনির সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে মারধর, অপমান, যৌন নির্যাতন, অনাহার, ঘুম থেকে বঞ্চিত করা, অপর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে।
বন্দিদের সংখ্যা নিয়েও পরিস্থিতির ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়। বেতসেলেমের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইসরাইলের কারা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে ‘নিরাপত্তা’ সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ৯ হাজার ১২৮ জন ফিলিস্তিনি আটক বা বন্দি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৩৭৫ জন প্রশাসনিক আটক অবস্থায় ছিলেন।
প্রশাসনিক আটক হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার অধীনে প্রচলিত ফৌজদারি বিচার বা অভিযোগের নিষ্পত্তি ছাড়াই কাউকে আটক রাখা যায়। বেতসেলেমের পৃথক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশাসনিক আটক অবস্থায় থাকা ফিলিস্তিনির সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৩২৯।
ইসরাইলি হেফাজতে ফিলিস্তিনিদের নির্যাতন, অমানবিক ও অবমাননাকর পরিবেশ এবং হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ২০২৬ সালের এক নথিতে ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর নির্যাতন, নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ, অবমাননাকর আটক পরিস্থিতি এবং নির্যাতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হেফাজতে মৃত্যুর ‘গভীর উদ্বেগজনক’ অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন হতে পারে বলে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।
অন্য এক জাতিসংঘের নথিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ইসরাইলি হেফাজতে ৯৪ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যুর বিষয়ে তথ্য পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে পার্থক্য রয়েছে এবং এসব মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণে স্বচ্ছতার ঘাটতির কথাও জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে।
ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনি বন্দিদের পরিস্থিতি নিয়ে বেতসেলেম ও অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগের বিপরীতে ইসরাইলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ও হেফাজতে মৃত্যুর কারণ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি অব্যাহত রয়েছে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, বেতসেলেম, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR)
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array