ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার ঘটনা তদন্তে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের দাবিতে বড় ধরনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে অনুষ্ঠিত এ বিক্ষোভে হাজারো মানুষ অংশ নেন। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটির সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এই সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবি, ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও পরে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী ধরনের ব্যর্থতা ছিল, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা খতিয়ে দেখে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নির্বাচনের আগে তদন্তের দাবিতে জোরালো আন্দোলন
ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানী তেল আবিবের হোস্টেজেস স্কয়ারে আয়োজিত সমাবেশে হামলায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, সাবেক জিম্মি এবং নিহতদের স্বজনেরা অংশ নেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারাও।
‘অক্টোবর কাউন্সিল’ নামের একটি সংগঠন এই বিক্ষোভের আয়োজন করে। সংগঠনটিতে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, সাবেক জিম্মি এবং নিহতদের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন। হামলার প্রায় তিন বছর পরও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা। আয়োজকদের দাবি, সমাবেশে এক লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তবে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সঠিক সংখ্যা সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, ৭ অক্টোবরের হামলা শুধু একটি নিরাপত্তা বিপর্যয় ছিল না, বরং এর আগে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল, তা জানাও অত্যন্ত জরুরি। এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকাশ করা না হলে নিহতদের পরিবারের কাছে প্রকৃত সত্য অধরাই থেকে যাবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
সরকারের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে হামলায় নিহত জিম্মি ওরি দানিনোর বাবা এলহানান দানিনো সরকারের বিরুদ্ধে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, সরকার স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে রাজি না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। এলহানান দানিনো অভিযোগ করেন, সরকারের কাছে হয়তো এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা প্রকাশ্যে আসুক, তা তারা চায় না। এ কারণেই তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়ে অনীহা দেখানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলার প্রায় তিন বছর পার হয়ে গেলেও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় তদন্ত শুরু হয়নি। তাঁর মতে, হামলার আগে কী ধরনের সতর্কসংকেত ছিল, নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ সেগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করেছিল এবং হামলা ঠেকাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া প্রয়োজন। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, এত বড় একটি নিরাপত্তা বিপর্যয়ের পরও স্বাধীন তদন্তের উদ্যোগ না নেওয়ায় সরকারের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে তদন্ত পরিচালনা করতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ না থাকে।
নিরাপত্তা ব্যর্থতার পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহির দাবি
সমাবেশে আরেক জিম্মির মা ভিকি কোহেন বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলায় ঠিক কী ঘটেছিল, সেই সত্য কোনোভাবেই চাপা পড়ে থাকতে দেওয়া যাবে না। তাঁর বক্তব্য, হামলার সময় ও তার আগে নিরাপত্তা বিভাগের দায়িত্ব পালনে যেসব ব্যর্থতা ছিল, সেগুলোর বিষয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে পরিবর্তন ঘটেছে। নিরাপত্তা বিভাগের ব্যর্থতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্মকর্তারা দায়িত্ব থেকে সরে গেলেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ভিকি কোহেনের মতে, শুধু নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভূমিকা পর্যালোচনা করলেই চলবে না। হামলার আগে ও পরে রাজনৈতিক পর্যায়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। নিহতদের স্বজনদের বক্তব্য, একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করা হলে ঘটনার বিভিন্ন দিক সামনে আসতে পারে। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের বিপর্যয় প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়াও সহজ হবে।
বিক্ষোভে যোগ দিলেন নেতানিয়াহুর বিরোধী নেতারা
তেল আবিবের এই সমাবেশে ইসরায়েলের বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকোট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান, ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির নেতা আভিগদর লিবারম্যান এবং দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদ। বিরোধী নেতারা ৭ অক্টোবরের হামলার ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবির প্রতি সমর্থন জানান। তাঁদের বক্তব্যে নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান বলেন, নির্বাচনের পর বুধবার থেকেই তাঁরা সত্য উদ্ঘাটন এবং নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেবেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার প্রকৃত কারণ এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা সম্পর্কে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে তাঁদের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে নির্বাচনের পর এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিরোধী নেতাদের অংশগ্রহণের কারণে বিক্ষোভটি শুধু নিহতদের পরিবারের দাবি জানানোর সমাবেশে সীমাবদ্ধ থাকেনি। নির্বাচনের আগে এটি সরকারের নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশনের ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন বড় ধরনের জাতীয় বিপর্যয় বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার তদন্তের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা হিসেবে বিবেচিত। এ ধরনের কমিশন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করতে পারে এবং তদন্তের ভিত্তিতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সম্পর্কে সুপারিশ দিতে পারে। এ কারণে ৭ অক্টোবরের হামলার মতো বড় একটি নিরাপত্তা বিপর্যয়ের ক্ষেত্রে স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ ধরনের কমিশন গঠনে সম্মতি দেননি। তাঁর যুক্তি, সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ দেওয়া একটি স্বাধীন কমিশন সরকারের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে। ফলে তদন্ত কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া নিয়েও দেশটিতে রাজনৈতিক মতবিরোধ রয়েছে। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের দাবি, তদন্তের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্যই একটি স্বাধীন কমিশন প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সরকারের অধীনে বা রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে পরিচালিত কোনো তদন্তের পরিবর্তে এমন একটি ব্যবস্থা দরকার, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা সমানভাবে পর্যালোচনা করা যাবে।
সত্য উদ্ঘাটন ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় নিহতদের পরিবার
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের অভিযোগ, হামলার আগে নিরাপত্তাব্যবস্থায় কী ধরনের দুর্বলতা ছিল এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা এখনো পর্যাপ্তভাবে পরিষ্কার হয়নি। পরিবারগুলোর কাছে তদন্তের দাবি শুধু রাজনৈতিক জবাবদিহির বিষয় নয়, বরং স্বজন হারানোর পর সত্য জানার অধিকার এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
সমাবেশে বক্তব্য দেন সাবেক জিম্মি ড্যানিয়েল আলোনি। তিনি বলেন, ওই দিন শুধু মানুষকে অপহরণ করা হয়নি, মানুষের নিরাপত্তাবোধও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে হামলার ফলে ইসরায়েলি সমাজে তৈরি হওয়া ভয়, অনিশ্চয়তা ও মানসিক ক্ষতির বিষয়টি উঠে আসে। ড্যানিয়েল আলোনি আশা প্রকাশ করেন, আসন্ন নির্বাচনের পর এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে, যেখানে শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ ও ভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
নির্বাচনের আগে সরকারের ওপর বাড়ছে চাপ
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের আগে তেল আবিবের এই বিক্ষোভ নেতানিয়াহু সরকারের ওপর স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের চাপ আরও বাড়িয়েছে। নির্বাচনের প্রচারে নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং ৭ অক্টোবরের হামলার তদন্তের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে নিহতদের পরিবার ও বিক্ষোভকারীরা হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর অবস্থানের কারণে কমিশন গঠনের পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে বিক্ষোভকারীদের অবস্থান স্পষ্ট, ৭ অক্টোবরের হামলার প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের দাবি অব্যাহত থাকবে। সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
কালের আলো/এসএ/আরআইকে
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]