১৩৪ বছর পরও অমীমাংসিত লিজি বোর্ডেনের রহস্য
১৮৯২ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের ফল রিভারে নিজ বাড়িতে খুন হন অ্যান্ড্রু বোর্ডেন ও তাঁর স্ত্রী অ্যাবি বোর্ডেন। হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ গিয়ে পড়ে অ্যান্ড্রুর মেয়ে লিজি বোর্ডেনের ওপর। গ্রেপ্তার হন তিনি, আদালতে বিচারও হয়। কিন্তু ১৮৯৩ সালে সব অভিযোগ থেকে খালাস পান লিজি।
তাহলে কি সত্যিই বাবা ও সৎমাকে হত্যা করেছিলেন লিজি? ১৩৪ বছর পরও সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর মেলেনি। আদালতের রায়ে তিনি নির্দোষ; অন্যদিকে মামলার বিভিন্ন পরিস্থিতিগত প্রমাণ, অসংগতি ও পরবর্তী জল্পনা তাঁকে ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত করেছে।
এই পুরোনো হত্যাকাণ্ডই নতুন করে আলোচনায় এসেছে নেটফ্লিক্সের সিরিজ ‘মনস্টার: দ্য লিজি বোর্ডেন স্টোরি’-তে। ১৭ সেপ্টেম্বর মুক্তি পাওয়া ছয় পর্বের এই সিরিজটি নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় ‘মনস্টার’ অ্যানথোলজির চতুর্থ কিস্তি। এবারই প্রথম এই অ্যানথোলজির কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন নারী।
লিজির চরিত্রে এলা বিটি
সিরিজটির নির্মাতা রায়ান মারফি ও ইয়ান ব্রেনান। ব্রেনান শোরানার ও নির্বাহী প্রযোজক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ছয়টি পর্ব পরিচালনা করেছেন ম্যাক্স উইঙ্কলার এবং দুটি পর্ব পরিচালনা করেছেন সারা অ্যাডিনা স্মিথ।
লিজি বোর্ডেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন এলা বিটি। গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য চরিত্রে আছেন ভিকি ক্রিপস, চার্লি হানাম, রেবেকা হল, বিলি লর্ড, জেসিকা বার্ডেন ও সারা পলসন। ভিকি ক্রিপস অভিনয় করেছেন বোর্ডেন পরিবারের গৃহকর্মী ব্রিজেট ‘ম্যাগি’ সুলিভানের চরিত্রে। চার্লি হানাম অ্যান্ড্রু বোর্ডেন এবং রেবেকা হল অ্যাবি বোর্ডেনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। লিজির বড় বোন এমার ভূমিকায় আছেন বিলি লর্ড।
এলা বিটির জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। কারণ, ‘মনস্টার’ অ্যানথোলজির প্রথম নারীকেন্দ্রিক গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে তিনিই অভিনয় করেছেন।
১৮৯২ সালের সেই হত্যাকাণ্ড
১৮৯২ সালের ৪ আগস্ট ফল রিভারের বোর্ডেন পরিবারের বাড়িতে অ্যান্ড্রু ও অ্যাবির মরদেহ পাওয়া যায়। দুজনকেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছিল।
বাড়িতে তখন ছিলেন লিজি ও পরিবারের গৃহকর্মী ব্রিজেট সুলিভান। ফলে তদন্তের শুরু থেকেই লিজিকে সন্দেহ করা হয়। তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৮৯৩ সালে শুরু হয় বিচার।
তবে প্রসিকিউশনের হাতে ছিল মূলত পরিস্থিতিগত প্রমাণ। কোনো প্রত্যক্ষদর্শী লিজিকে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে দেখেননি। শেষ পর্যন্ত ২০ জুন ১৮৯৩ সালে জুরি তাঁকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।
আইনিভাবে মামলার সেখানেই সমাপ্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লিজি বোর্ডেনের গল্প থেমে থাকেনি।
কেন আজও সন্দেহের কেন্দ্রে লিজি?
লিজির বিরুদ্ধে সন্দেহের পেছনে ছিল বেশ কিছু ঘটনা। তদন্তে তাঁর বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরিবারের সম্পত্তি ও পারিবারিক সম্পর্ক নিয়েও নানা আলোচনা ছিল। হত্যাকাণ্ডের আগে বিষাক্ত প্রুশিক অ্যাসিড সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন লিজি—এমন তথ্যও মামলায় উঠে আসে। তবে সেটি বাবা ও সৎমাকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ ছিল—এমন প্রমাণ আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
লিজিকে ঘিরে সবচেয়ে পরিচিত বিষয়গুলোর একটি হলো একটি পুরোনো ছড়া। সেখানে বলা হয়, কুঠার দিয়ে সৎমাকে ৪০ বার এবং বাবাকে ৪১ বার আঘাত করেছিলেন লিজি। কিন্তু ঐতিহাসিক নথির সঙ্গে এই সংখ্যার মিল নেই। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, অ্যাবি বোর্ডেনকে ১৯ বার এবং অ্যান্ড্রু বোর্ডেনকে ১১ বার আঘাত করা হয়েছিল।
সিরিজে প্রেমের গল্প, ইতিহাসে প্রমাণ নেই
নতুন সিরিজের অন্যতম আলোচিত বিষয় লিজি ও ব্রিজেট সুলিভানের সম্পর্ক। গল্পে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়ে পরে তা প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়। এই সম্পর্ককে লিজির জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
বাস্তবে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক ছিল—এমন নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ব্রিজেট ছিলেন বাস্তব চরিত্র এবং বোর্ডেন পরিবারের গৃহকর্মী। হত্যাকাণ্ডের দিন তিনিও বাড়িতে ছিলেন। তবে লিজির সঙ্গে মিলে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন—এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
ইতিহাসের ফাঁক পূরণ করেছে নির্মাতাদের কল্পনা
পরিচালক ম্যাক্স উইঙ্কলার জানিয়েছেন, সিরিজটি কেবল পুরোনো হত্যাকাণ্ড পুনর্নির্মাণ করতে চায়নি। লিজির গল্পের মধ্য দিয়ে নারীর ওপর সামাজিক বিধিনিষেধ, দমিয়ে রাখা আকাঙ্ক্ষা ও ক্ষোভের মতো বিষয়ও তুলে ধরতে চেয়েছেন নির্মাতারা।
তাই সিরিজটি পুরোপুরি গম্ভীর ঐতিহাসিক নাটক নয়; এতে কালো রসিকতারও ব্যবহার রয়েছে। নির্মাতারা সে সময়ের পরিবেশ ও পোশাক-আশাকের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতি যতটা সম্ভব বিশ্বস্ত থাকার চেষ্টা করলেও, যেসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই, সেসব জায়গায় নিজেদের গল্প নির্মাণ করেছেন।
ফলে ‘মনস্টার: দ্য লিজি বোর্ডেন স্টোরি’কে সরাসরি ইতিহাসের পুনর্নির্মাণের চেয়ে সত্য ঘটনার ওপর নির্মিত একটি নাটকীয় ব্যাখ্যা হিসেবে দেখাই প্রাসঙ্গিক।
তাহলে মা–বাবাকে কি সত্যিই হত্যা করেছিলেন লিজি?
নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। লিজির বিরুদ্ধে পরিস্থিতিগত প্রমাণ ছিল, কিন্তু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে চূড়ান্তভাবে যুক্ত করার মতো প্রমাণ আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৮৯৩ সালের বিচারে তিনি খালাস পান।
পরবর্তী ১৩৪ বছরে বই, সিনেমা, টেলিভিশন ও নানা কল্পকাহিনিতে লিজিকে কখনো খুনি, কখনো নিপীড়িত নারী, আবার কখনো বিদ্রোহী তরুণী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। নতুন নেটফ্লিক্স সিরিজ সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক আগ্রহেরই আরেকটি অধ্যায়।
তাই সিরিজটি দেখার সময় একটি বিষয় আলাদা করে মনে রাখা দরকার—পর্দায় দেখানো সব ঘটনা ইতিহাসে প্রমাণিত নয়। ১৮৯২ সালের সেই বাড়িতে ঠিক কী ঘটেছিল, তার চূড়ান্ত উত্তর হয়তো আর কখনো জানা যাবে না।
আইনের বিচারে লিজি বোর্ডেন খালাস পেয়েছিলেন। আর ইতিহাসেও আজ পর্যন্ত এমন চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যার ভিত্তিতে তাঁকে হত্যাকারী বলা যায়। রহস্যটা সেখানেই—আর সেই রহস্যই ১৩৪ বছর পরও লিজি বোর্ডেনকে নতুন গল্পের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনছে।
কালের আলো/এসএ


আপনার মতামত লিখুন
Array