খুঁজুন
                               
, ,
           

শতবর্ষে নূরজাহান: শিশুশিল্পী থেকে ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০৪ অপরাহ্ণ
শতবর্ষে নূরজাহান: শিশুশিল্পী থেকে ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’

একসময় তাঁর কণ্ঠ শুনে পরিবারের একজন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন—এই মেয়েই একদিন পরিবারের ভাগ্য বদলে দেবে। কথাটি যে এত দ্রুত সত্যি হবে, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি। মাত্র ছয় বছর বয়সে সংগীতের তালিম নেওয়া সেই মেয়েটিই কয়েক বছরের মধ্যে মঞ্চে উঠলেন, শিশুশিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্রে এলেন, পরে হয়ে উঠলেন জনপ্রিয় নায়িকা। মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্রজগতে এমন সাফল্য পেলেন যে দেশভাগের সময় ভারত ছাড়ার সময় পেছনে রেখে গেলেন প্রতিষ্ঠিত এক তারকার জীবন।

কিন্তু তাঁর গল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় তখনো বাকি ছিল।

নতুন দেশ পাকিস্তানে গিয়ে তাঁকে আবার শুরু করতে হয়েছিল। দেশটি তখন নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে তোলার সংগ্রামে। নূরজাহান সেখানে শুধু গান গাওয়া কিংবা অভিনয়ের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। প্রযোজনা করেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হয়েছেন, পরিচালনায় এসেছেন, নিজের পারিশ্রমিক নিজেই নির্ধারণ করেছেন। পরে অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি মন দেন সংগীতে।

আর সেই সংগীতই তাঁকে এমন উচ্চতায় নিয়ে যায়, যেখানে তাঁর নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয় ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’—সুরের রানি।

আজ নূরজাহানের জন্মের ১০০ বছর। ১৯২৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাবের কাসুরে জন্মেছিলেন তিনি। সংগীত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী পরবর্তী সময়ে শুধু পাকিস্তানের নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ও চলচ্চিত্র ইতিহাসে নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেন।

ছয় বছর বয়সে সংগীতের হাতেখড়ি

নূরজাহানের জন্ম এমন একটি পরিবারে, যেখানে গান ছিল দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। তাঁর বাবা মাদাদ আলী সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরিবারের আরও কয়েকজন নারী মঞ্চে কাজ করতেন। ছোট বয়সেই নূরজাহানের কণ্ঠে অসাধারণ সম্ভাবনা দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা।

মাত্র ছয় বছর বয়সে শুরু হয় তাঁর সংগীতের তালিম। পরে কলকাতায় গিয়ে সংগীতের আরও বড় পরিসর পান তিনি। শিশুশিল্পী হিসেবে তখনই পরিচিতি তৈরি হয় ‘বেবি নূরজাহান’ নামে।

মঞ্চ ও চলচ্চিত্র—দুই জায়গাতেই অল্প বয়সে তাঁর যাত্রা শুরু হয়। ১৯৩৫ সালের পিন্ড দি কুড়ি চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। এরপর পাঞ্জাবি ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর কাজ বাড়তে থাকে।

যে বয়সে অন্য শিশুরা স্কুল, খেলাধুলা আর পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সেই বয়সেই নূরজাহান স্টুডিও, মঞ্চ, রেকর্ডিং ও ক্যামেরার সামনে কাজ শুরু করেছিলেন।

১৯৩৮ সালে গুল বাকাওলি ছবির জন্য গান রেকর্ড করেন তিনি। চলচ্চিত্রের জন্য তাঁর শুরুর দিককার উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।

মুম্বাইয়ে তারকা হয়ে ওঠা

কলকাতার পর নূরজাহানের ক্যারিয়ার তাঁকে নিয়ে যায় লাহোর ও মুম্বাইয়ে। চল্লিশের দশকে মুম্বাই ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে আর শিশুশিল্পী হিসেবে থেমে থাকেননি তিনি; হয়ে ওঠেন পূর্ণাঙ্গ নায়িকা ও গায়িকা।

১৯৪২ সালের খানদান তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ছবিতে অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর গানের জনপ্রিয়তাও তাঁকে দ্রুত বড় তারকায় পরিণত করে।

এরপর একে একে আসে জিনাত, আনমোল ঘড়িজুগনু-এর মতো চলচ্চিত্র।

১৯৪৫ সালের জিনাত-এর ‘বুলবুলো মাত রো’ গানটি তাঁকে বিশেষভাবে আলোচনায় নিয়ে আসে। অন্যদিকে আনমোল ঘড়িতে অভিনয় ও সংগীত—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর উপস্থিতি দর্শকের নজর কাড়ে।

১৯৪৭ সালের জুগনুতে দিলীপ কুমারের বিপরীতে অভিনয় তাঁকে তৎকালীন ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সারির নায়িকাদের একজন করে তোলে।

দেশভাগে বদলে গেল জীবন

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। লাখ লাখ মানুষের মতো নূরজাহানের জীবনও বদলে গেল রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

স্বামী ও চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পাকিস্তানে চলে যান।

তখন পাকিস্তানের নিজস্ব চলচ্চিত্রশিল্প খুবই নবীন। দেশভাগের কারণে শিল্পী, প্রযুক্তিবিদ, প্রযোজক ও অর্থ—সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। লাহোরকে চলচ্চিত্রের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চললেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল সীমিত।

নূরজাহান সেখানে গিয়ে আবার শুরু করলেন।

তবে এবার তিনি শুধু শিল্পী ছিলেন না। ভারতীয় চলচ্চিত্রে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছিল চলচ্চিত্র কীভাবে তৈরি হয়, তারকা কীভাবে গড়ে ওঠে এবং দর্শকের কাছে একটি চলচ্চিত্রকে কীভাবে পৌঁছে দিতে হয়।

১৯৫১ সালে মুক্তি পায় চানভে। এতে নূরজাহান অভিনয় ও সংগীতের পাশাপাশি পরিচালনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের প্রথম নারী চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর নাম ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

নায়িকা থেকে কণ্ঠের সম্রাজ্ঞী

চানভে-এর পর দুপাট্টা, পাতে খান, ইন্তেজার, আনারকলিকোয়েল-এর মতো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন নূরজাহান।

তবে পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে তিনি বুঝতে শুরু করেন, পর্দায় অভিনয়ের চেয়ে তাঁর কণ্ঠের জন্য মানুষের অপেক্ষা বেশি। শেষ পর্যন্ত অভিনয় ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতে মন দেন।

১৯৫৯ সালের পর তাঁর অভিনয়জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন মূলত প্লেব্যাক ও গজলশিল্পী।

নায়িকার ঠোঁটে গান থাকলেও দর্শকের কাছে সেই গানের আবেগকে আলাদা মাত্রা দিত নূরজাহানের কণ্ঠ। ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠই হয়ে ওঠে পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের অন্যতম বড় আকর্ষণ।

নিজের পারিশ্রমিক নিজেই ঠিক করতেন

নূরজাহানের ব্যক্তিত্বের একটি দিক ছিল তাঁর আত্মবিশ্বাস। পাকিস্তানি চলচ্চিত্রে যখন অনেক গায়িকা একটি গানের জন্য প্রায় ৩৫০ রুপি পারিশ্রমিক পেতেন, নূরজাহান দাবি করতেন প্রায় ২ হাজার রুপি।

অর্থাৎ অন্যদের তুলনায় তাঁর পারিশ্রমিক ছিল কয়েক গুণ বেশি।

তাঁর কাছে এটি শুধু জনপ্রিয়তার বিষয় ছিল না; নিজের শিল্পের মূল্য সম্পর্কেও তিনি স্পষ্ট ছিলেন। তিনি জানতেন, একটি চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ দর্শক টানার অন্যতম কারণ হতে পারে।

নিজের স্টুডিও ও কাজের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। প্রযোজক, পরিচালক কিংবা অন্য সহকর্মী—কাজের জায়গায় নিজের অবস্থান নিয়ে আপস করতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না তিনি।

ব্যক্তিজীবনেও ছিল নানা বাঁক

নূরজাহানের ব্যক্তিজীবনও ছিল ঘটনাবহুল।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে চলচ্চিত্র পরিচালক শওকত হুসেইন রিজভিকে বিয়ে করেন তিনি। দুজনের দাম্পত্য জীবনের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্কও জড়িয়ে ছিল। তাঁদের সংসারে সন্তান আসে। পরবর্তী সময়ে সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়।

১৯৫৯ সালে অভিনেতা এজাজ দুররানিকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন নূরজাহান। এরপর তাঁর অভিনয়জীবনও শেষের দিকে চলে আসে।

তবে পর্দা থেকে সরে গেলেও সংগীত থেকে সরে যাননি তিনি। বরং এরপরই তাঁর কণ্ঠ আরও স্বাধীনভাবে বিকশিত হয়।

ছয় সন্তানের মা হয়েও নিজের পেশাগত পরিচয়কে আলাদা করে রেখেছিলেন নূরজাহান। পরিবার ও কাজ—দুটিই নিজের মতো করে সামলানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।

ফয়েজের কবিতা, নূরজাহানের কণ্ঠ

নূরজাহানের কণ্ঠের বড় শক্তি ছিল শুধু সুর নয়, শব্দের আবেগও তুলে ধরতে পারা। এ কারণেই কবিদের সঙ্গে তাঁর কাজ বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের ‘মুঝসে পেহলি সি মোহাব্বত’ তাঁর কণ্ঠে নতুন মাত্রা পেয়েছিল। প্রেম, হতাশা ও সামাজিক বোধ—সবকিছুই তাঁর গায়কিতে আলাদা আবেগ তৈরি করেছিল।

প্রেমের গান, বিরহ, গজল, লোকগীতি কিংবা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক গান—বিভিন্ন ধারায় নিজের স্বাক্ষর রেখেছেন নূরজাহান।

যুদ্ধের সময় কণ্ঠ হয়ে উঠেছিল জাতীয় আবেগের প্রতীক

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় নূরজাহানের কণ্ঠ নতুন এক ভূমিকা নেয়। রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারিত দেশাত্মবোধক গান দিয়ে তিনি পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে যুদ্ধকালীন আবেগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করেন।

সেই সময় তাঁর গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের সংগীত-ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

নূরজাহানের কণ্ঠ তখন আর শুধু চলচ্চিত্রের নায়িকার কণ্ঠ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল জাতীয় আবেগ প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।

লতা মঙ্গেশকরের আদর্শ

ভারত ও পাকিস্তানের সংগীত ইতিহাসে নূরজাহান ও লতা মঙ্গেশকরের নাম প্রায় পাশাপাশি উচ্চারিত হয়েছে।

দুজনকে নিয়ে বহুবার তুলনা হলেও নূরজাহানের প্রতি লতা মঙ্গেশকরের শ্রদ্ধা ছিল প্রকাশ্য। লতা জানিয়েছিলেন, ছোটবেলা থেকে নূরজাহানের গান শুনে তিনি বড় হয়েছেন এবং নূরজাহান তাঁর আদর্শ ছিলেন।

দেশভাগের পর দুই শিল্পীর ক্যারিয়ার দুই দেশে আলাদা পথে এগোলেও একজনের শিল্প অন্যজনের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থেকেছে।

দীর্ঘ বিরতির পর ভারতে ফেরেন

দেশভাগের কয়েক দশক পর ১৯৮২ সালে ভারতে গিয়েছিলেন নূরজাহান। এটি ছিল তাঁর উল্লেখযোগ্য সীমান্তপারের সফরগুলোর একটি।

তত দিনে পাকিস্তানে তিনি কিংবদন্তি। কিন্তু ভারতে তাঁর পুরোনো শ্রোতাদের স্মৃতিও তখনো অমলিন ছিল।

যে মুম্বাই একসময় তাঁকে তারকা বানিয়েছিল, যে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তিনি ক্যারিয়ারের অন্যতম উজ্জ্বল সময় কাটিয়েছিলেন, কয়েক দশক পর সেই ভূখণ্ডে ফিরলেন তিনি অন্য পরিচয়ে—পাকিস্তানের ‘মালিকা-ই-তারান্নুম’ হিসেবে।

প্রায় ১০ হাজার গানের কিংবদন্তি

নূরজাহানের মোট গানের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। কোথাও কয়েক হাজার, আবার কোথাও প্রায় ১০ হাজার গানের কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তানি সরকারি সূত্রেও প্রায় ১০ হাজার গানের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে।

সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও তাঁর কণ্ঠের ব্যাপ্তি নিয়ে প্রশ্ন নেই। উর্দু, পাঞ্জাবি, সিন্ধিসহ বিভিন্ন ভাষায় গান গেয়েছেন তিনি।

তাঁর বিশেষত্ব ছিল—তিনি শুধু গান গাইতেন না, গানের চরিত্র ও আবেগকেও নিজের কণ্ঠে ধারণ করতেন। এ কারণেই তাঁর বহু পুরোনো গান আজও নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে ফিরে আসে।

শেষ পর্যন্ত সংগীতের সঙ্গেই

জীবনের শেষ দশকেও সংগীত থেকে দূরে যাননি নূরজাহান। ১৯৯৬ সালে তাঁর শেষ রেকর্ডিংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন জীবনীমূলক সূত্রে।

অর্থাৎ ছয় বছর বয়সে যে সংগীতযাত্রা শুরু হয়েছিল, জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল।

২০০০ সালের ২৩ ডিসেম্বর করাচিতে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান নূরজাহান। বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

একজন সংগীতশিল্পীর পরিবারের ছোট্ট মেয়ে থেকে শিশুশিল্পী, সেখান থেকে মুম্বাইয়ের নায়িকা; দেশভাগে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত; নতুন দেশে গিয়ে আবার নিজের সাম্রাজ্য তৈরি—নূরজাহানের জীবন যেন নিজেই একটি দীর্ঘ চলচ্চিত্র।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো একটি চলচ্চিত্র বা গান নয়। তাঁর কণ্ঠ, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের সময়ের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার গল্পই তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার সংগীতের ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

আজ জন্মের শতবর্ষে তাই নূরজাহান শুধু একটি নাম নন—তিনি উপমহাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্রের এক দীর্ঘ ইতিহাসের জীবন্ত প্রতীক।

কালের আলো /এসএ

পদ্মায় ইলিশের সংকট, বিপাকে হাজারো জেলে পরিবার

মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:২০ অপরাহ্ণ
পদ্মায় ইলিশের সংকট, বিপাকে হাজারো জেলে পরিবার

মানিকগঞ্জের পদ্মায় জাল ফেলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না জেলেরা। মাছের সংকটে নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে গিয়ে খরচও উঠছে না অনেকের। ফলে বাধ্য হয়ে কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন, আবার কেউ নৌকা-জাল বিক্রি করে রিকশা চালানোসহ বিকল্প পেশা বেছে নিচ্ছেন।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ পদ্মা ও যমুনার ওপর নির্ভরশীল। এসব এলাকার জেলেদের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস ছিল পদ্মার ইলিশ। তবে কয়েক বছর ধরে নদীতে ইলিশের পরিমাণ কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছেন তারা।

মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে হয় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টন হলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে আসে ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আহরণ আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে।

অর্থাৎ চার বছরের ব্যবধানে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন বা প্রায় ৪৬ শতাংশ। শুধু ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যেই আহরণ কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।

হরিরামপুরের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক হোসেন ব্যাপারী বলেন, শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজ করতে হচ্ছে। তাঁর মতে, নদীর আগের গভীরতা না থাকায় মাছও কমে গেছে।

ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লার ভাষ্য, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি যান্ত্রিক নৌযান ও জাহাজের শব্দের কারণেও ইলিশের বিচরণ কমেছে। আর জীবিকার সংকটে দড়িকান্দি গ্রামের নিবন্ধিত জেলে লিটন নৌকা-জাল বিক্রি করে রিকশা চালানো শুরু করেছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর ভৌগোলিক ও পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশের বিচরণে প্রভাব ফেলছে। পলি জমে ডুবোচর ও চর সৃষ্টি হওয়া, পানির লবণাক্ততা ও প্রবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, বর্জ্যে পানিদূষণ এবং নদীর খাদ্যচক্র নষ্ট হওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এ ছাড়া কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জালের ব্যবহারে জাটকা ও মা ইলিশ নিধনও ইলিশের প্রজননচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইলিশ সুরক্ষায় মানিকগঞ্জে ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩ মেট্রিক টন ইলিশ ও ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০৯টি মামলা, ৭০ জনকে কারাদণ্ড এবং ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, নদীতে চর জেগে ওঠা, জলযান চলাচল, দূষণ ও অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে। অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নাব্যতা সংকট, দূষণ ও অসচেতনতার কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সুরক্ষায় সরকারি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

কালের আলো/এমএসআইপি 

চট্টগ্রামে শেষ হলো অল উইমেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দ্বিতীয় আসর

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:১৬ অপরাহ্ণ
চট্টগ্রামে শেষ হলো অল উইমেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের দ্বিতীয় আসর

ছয় দেশের ৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল অল উইমেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এর দ্বিতীয় আসর।

১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর তিন দিনব্যাপী এই চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হয় আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রামে। নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র প্রদর্শন, তাঁদের কাজের সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং নির্মাতাদের মধ্যে যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ফিল্ম ফর আস ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ফিল্ম ক্লাব যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করে।

এবারের উৎসবে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ফিকশন, ডকুমেন্টারি ও ডিজিটাল স্টোরিটেলিং—এই তিন বিভাগে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। বিভিন্ন দেশের নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ছিল নির্বাচিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বিশেষ আয়োজন।

প্রথমবার যুক্ত হলো ডিজিটাল স্টোরিটেলিং

এবারের আসরে প্রথমবারের মতো যুক্ত করা হয় ডিজিটাল স্টোরিটেলিং কম্পিটিশন বিভাগ। চলচ্চিত্রের প্রচলিত কাঠামোর বাইরে ছবি, ভিডিও, লেখা, শব্দ, অ্যানিমেশনসহ বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে গল্প বলার কাজগুলোকে এই বিভাগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

আয়োজকদের মতে, নতুন এই বিভাগ তরুণ নির্মাতা ও ডিজিটাল মাধ্যমে গল্প বলায় আগ্রহীদের জন্য ভিন্ন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

ইরানি নারী নির্মাতাদের চলচ্চিত্র প্রদর্শন

উৎসবের অন্যতম বিশেষ আয়োজন ছিল ইরানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। ইরানের নারী নির্মাতাদের নির্মিত চলচ্চিত্র নিয়ে আয়োজিত এই বিশেষ প্রদর্শনীর মাধ্যমে চট্টগ্রামের দর্শকদের তাঁদের কাজ, ভাবনা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

বিশেষ করে তরুণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এই আয়োজন ছিল ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। উৎসবের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্রপ্রেমী দর্শক, শিক্ষার্থী ও তরুণ নির্মাতাদের অংশগ্রহণ ছিল।

তিন বিভাগে পুরস্কার

১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সঙ্গীতা রায়মাঝি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বিজয়ী নির্মাতাদের হাতে উৎসবের ক্রেস্ট তুলে দেন।

এবারের উৎসবে তিন বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন—

  • বেস্ট ফিকশন: তাবাসসুম তানহা — What If
  • বেস্ট ডকুমেন্টারি: সুরাইয়া তাসনিন সাথী — Reshma
  • বেস্ট ডিজিটাল স্টোরিটেলিং: ফাতিমা তকাওয়ি

এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর উৎসবের প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর ড. গুরুপদ চক্রবর্তী।

নির্মাতা ও দর্শকের যোগাযোগকে গুরুত্ব

উৎসবের পরিচালক ও ফিল্ম ফর আস-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মাসুদুর রহমান বলেন, নারী নির্মাতাদের জন্য এমন একটি জায়গা তৈরি করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য, যেখানে তাঁরা নিজেদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পাশাপাশি দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।

তিনি বলেন, দুই বছর পর এসে তাঁরা মনে করছেন, ধীরে ধীরে সেই জায়গা তৈরি হচ্ছে। এ বছর ছয় দেশের ৪৫টি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে এবং নতুন করে ডিজিটাল স্টোরিটেলিং বিভাগ যুক্ত হয়েছে।

তাঁর মতে, উৎসবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্মাতা, শিক্ষার্থী ও দর্শকদের একসঙ্গে এসে চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হওয়া।

অধ্যাপক মাসুদুর রহমান আরও বলেন, চলচ্চিত্র উৎসবকে শুধু প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্মাতা ও দর্শকদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চান তাঁরা। একজন নির্মাতা তাঁর দর্শক খুঁজে পাওয়া, কোনো চলচ্চিত্র দেখে একজন শিক্ষার্থীর চলচ্চিত্র নির্মাণে আগ্রহী হওয়া কিংবা উৎসবে পরিচিত হওয়া দুই নির্মাতার ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করা—এসবকেও তাঁরা উৎসবের সাফল্যের অংশ হিসেবে দেখেন।

সহযোগিতায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান

এবারের আয়োজনে স্পন্সর হিসেবে সহযোগিতা করেছে ‘কানেক্ট হার’। উৎসবের কো-অর্গানাইজার ছিল এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ফিল্ম ক্লাব। এছাড়া লিখালিখি ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য চট্টগ্রাম উৎসবটির সঙ্গে সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিল। বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজও এবারের আয়োজনকে সমর্থন করেছে।

আয়োজনে যুক্ত ছিলেন ফিল্ম ফর আস-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া আফরিন, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ফিল্ম ক্লাবের সভাপতি তাসনিম তাবাস্সুম সুবাহ এবং লিখালিখির প্রতিষ্ঠাতা সাইয়েদা ফারজানা জামান রুপা।

সমাপনীতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে উৎসবে অংশ নেওয়া সব চলচ্চিত্র নির্মাতা, জুরি সদস্য, অতিথি, স্বেচ্ছাসেবক, শিক্ষার্থী, দর্শক, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

কালের আলো/এসএ

সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনযুগ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:১০ অপরাহ্ণ
সরকারি চাকরিতে নতুন বেতনযুগ

১১ বছরের ব্যবধানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো জারি করেছে সরকার। নতুন কাঠামোয় একদিকে সর্বনিম্ন গ্রেডের একজন কর্মচারীর মোট বেতন ভাতাসহ ৩৩ হাজার টাকার বেশি হবে, অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মতো বিশেষ গ্রেডের কর্মকর্তাদের মোট বেতন দাঁড়াবে প্রায় আড়াই লাখ টাকা। শুধু বেতন নয়, উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ, পেনশন বৃদ্ধি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিভিন্ন বিশেষ ভাতার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে।

  • সর্বনিম্ন মোট বেতন ৩৩ হাজারের বেশি
  • সর্বোচ্চ ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা
  • মূল বেতন, পেনশন ও ভাতায় বড় স্বস্তি
  • পদোন্নতি ছাড়াও উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ

তবে নতুন কাঠামোর পুরো আর্থিক সুবিধা একসঙ্গে মিলছে না। মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর হবে। অধিকাংশ নতুন ভাতা কার্যকর হবে আরও প্রায় দেড় বছর পর, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। ফলে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়ার নতুন দিগন্ত খুলছে, অন্যদিকে এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থ জোগান দেওয়া সরকারের জন্য বড় আর্থিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সর্বনিম্ন বেতন ৩৩ হাজার, ঢাকায় আরও বেশি
নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে কর্মস্থলভেদে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, টিফিন ও মুঠোফোন ভাতা যুক্ত হবে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সর্বনিম্ন মোট বেতন দাঁড়াবে ৩৩ হাজার ২৫০ টাকা। ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়িভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় একই গ্রেডে মোট বেতন হবে ৩৬ হাজার ২৫০ টাকা।

অন্যদিকে বিসিএসসহ নবম গ্রেডে যোগ দেওয়া তরুণ কর্মকর্তাদের মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। ভাতাসহ তাঁদের মোট আয় ৬০ হাজার টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ সরকারি চাকরির প্রবেশপর্যায়ের বেতনেও দৃশ্যমান পরিবর্তন আসছে।

সর্বোচ্চ বেতন প্রায় আড়াই লাখ
নতুন কাঠামোয় নির্ধারিত সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। তবে এর বাইরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব ও জ্যেষ্ঠ সচিবদের জন্য বিশেষ গ্রেড রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ঢাকায় বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, মুঠোফোন ও ধোলাই ভাতা মিলিয়ে তাঁদের মোট বেতন দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে সার্বক্ষণিক গাড়িসহ অন্যান্য সরকারি সুবিধা রয়েছে। অর্থাৎ নতুন কাঠামোয় বেতন ব্যবস্থার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তর—দুই প্রান্তেই পরিবর্তন এসেছে।

তিন ধাপে বাড়বে মূল বেতন
নতুন আদেশ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলেও কর্মচারীরা সেদিন থেকেই পুরো বর্ধিত মূল বেতন পাচ্ছেন না। ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ধাপে ধাপে পূর্ণ বেতন কার্যকর হবে। নবম ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তারা প্রথম পর্যায়ে বর্ধিত বেতনের ৪০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ৭০ শতাংশ পাবেন। ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শতভাগ বর্ধিত মূল বেতন কার্যকর হবে। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ, পরের ধাপে ৭৫ শতাংশ এবং শেষ পর্যায়ে শতভাগ কার্যকর হবে। ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় অঙ্কের ব্যয়ের চাপ কিছুটা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পদোন্নতি ছাড়াও বাড়বে বেতন
নতুন কাঠামোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো পদোন্নতি না পেলেও নির্দিষ্ট শর্তে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ। একই পদে আট বছর চাকরি পূর্ণ হলে এবং রেকর্ড সন্তোষজনক থাকলে নবম বছরে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে। পরবর্তী পর্যায়েও নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে আরও একটি উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিশেষ করে পদোন্নতির সুযোগ সীমিত এমন পদে দীর্ঘদিন কাজ করা কর্মচারীদের জন্য এটি আর্থিক অগ্রগতির বিকল্প পথ তৈরি করবে। ফলে শুধু পদোন্নতির ওপর নির্ভর না করেও চাকরির মেয়াদ ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে বেতন বৃদ্ধির সুযোগ থাকছে।

পেনশনে বড় স্বস্তি
অবসরপ্রাপ্তদের জন্যও নতুন কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার বেশি রাখা হয়েছে। ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশনে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি নির্ধারণ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে বেশি পেনশনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার কমে ৫৫ শতাংশে নামবে। তবে ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পেনশন ৭০ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে নিম্ন পেনশনভোগীদের আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তুলনামূলক বড় পরিবর্তন আসছে।

ভাতায়ও নতুন চিত্র
নতুন কাঠামোয় বাড়িভাড়ার হার কর্মস্থল ও গ্রেডভেদে নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৬ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া নির্ধারিত হয়েছে। চিকিৎসা, টিফিন, যাতায়াত, শিক্ষা সহায়তা, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের ভাতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। তবে অধিকাংশ নতুন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।

বাড়তি ব্যয়ের টাকা আসবে কোথা থেকে?
নতুন বেতনকাঠামোর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি বেতন নিয়ে নয়, অর্থায়ন নিয়ে। মূল বেতন ও ভাতা বাড়ার ফলে সরকারের নিয়মিত পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। চলতি অর্থবছরেই বর্ধিত মূল বেতনের দুই ধাপ বাস্তবায়নে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন অর্থায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, আগামী দেড়-দুই বছরে রাজস্ব আয় প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়লে বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন হতে পারে। ঋণনির্ভর অর্থায়ন বা ব্যয় সংকোচনের পথ নিতে হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

তবে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে সরকারও রাজস্ব আয় বাড়ানো, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় নির্ধারণ এবং বাজেট ব্যবস্থাপনায় সময় পাচ্ছে। ফলে নতুন কাঠামোর সাফল্য শুধু বেতন বাড়ানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজস্ব সংগ্রহ ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর সক্ষমতাও।আয় বাড়ার সঙ্গে বাড়ুক সেবার মাননতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে প্রণোদনা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রবেশপর্যায়ের বেতন বৃদ্ধি, উচ্চতর গ্রেডের সুযোগ এবং পেনশন বৃদ্ধির ফলে সরকারি চাকরি আরও কাঠামোবদ্ধ আর্থিক সুবিধার আওতায় আসছে।

এখন চ্যালেঞ্জ হবে এই বাড়তি সুবিধার সঙ্গে সরকারি সেবার মান ও কর্মদক্ষতার প্রত্যাশিত উন্নতি নিশ্চিত করা। কারণ একটি আধুনিক বেতনব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য শুধু কর্মচারীর বেতন কত বাড়ল, তা দিয়ে নয়; সেই বিনিয়োগের বিনিময়ে রাষ্ট্র কতটা দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব সেবা দিতে পারল—শেষ পর্যন্ত তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন কাঠামোর পূর্ণ সার্থকতা।

এম/এএইচ