আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট এর প্রেম, বিচ্ছেদ ও শেষ বয়স
আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘দ্য হলো মেন’, ‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ কিংবা ‘ফোর কোয়ার্টেটস’—তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা, সভ্যতার ভাঙন, সময়, মৃত্যু, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রশ্ন। কিন্তু এই গম্ভীর কবির আরেকটি দিকও ছিল। বিড়াল নিয়ে লিখেছিলেন মজার সব ছড়া, যা বহু বছর পর অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবারের বিখ্যাত সংগীতনাট্য ‘ক্যাটস’-এর ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৮৮৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্ম নেওয়া টমাস স্টার্নস এলিয়ট সাহিত্যজগতে পরিচিত হন টি এস এলিয়ট নামে। কবি হিসেবে খ্যাতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাহিত্য সমালোচক, সম্পাদক ও প্রকাশক। হার্ভার্ডে পড়াশোনার পর প্যারিস ও অক্সফোর্ডে দর্শন নিয়ে পড়েন। ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডে স্থায়ী হন এবং ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। আধুনিক কবিতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৪৮ সালে পান সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার।
দর্শনের ছাত্র থেকে আধুনিক কবি
কবি হওয়ার আগে দর্শনের প্রতি এলিয়টের গভীর আগ্রহ ছিল। হার্ভার্ডে পড়ার সময় ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের লেখায় প্রভাবিত হন তিনি। ১৯১০ ও ১৯১১ সালের দিকে লেখা তাঁর কয়েকটি কবিতা পরবর্তী সময়ে আধুনিক কবিতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে ওঠে।
এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘দ্য লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক’। কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন আত্মসংশয়ে ভোগা ও দ্বিধাগ্রস্ত নগরবাসী। মানুষের কাছে যেতে চাইলেও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় তাকে আটকে রাখে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে—এই অনুভূতিও তাকে তাড়া করে।
১৯১৫ সালে কবিতাটি প্রকাশিত হলে সাহিত্যজগতে এলিয়টের পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সময় এজরা পাউন্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাউন্ড এলিয়টের প্রতিভায় আস্থা রাখতেন এবং সমকালীন সাহিত্যিক মহলে তাঁর পরিচিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর পাণ্ডুলিপি সম্পাদনাতেও পাউন্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এলিয়ট কবিতাটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন ‘ইল মিগলিয়র ফাব্রো’ নামে, যা দান্তের একটি পঙ্ক্তি থেকে নেওয়া এবং অর্থ ‘শ্রেষ্ঠ কারিগর’।
প্রথম স্ত্রী ভিভিয়েন, অস্থির দাম্পত্য
১৯১৫ সালে এলিয়ট বিয়ে করেন ভিভিয়েন হেইগ-উডকে। বিয়ের শুরু থেকেই তাঁদের সম্পর্ক ছিল জটিল। ভিভিয়েনের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা সময়ের সঙ্গে গুরুতর হয়ে ওঠে।
১৯৩৩ সালের পর তাঁরা আলাদা বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে ভিভিয়েনকে একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখা হয়। ১৯৪৭ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
এলিয়টের ব্যক্তিজীবন ও ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাম্পত্যের অস্থিরতা কবিতাটির কিছু অংশের পটভূমি বুঝতে সহায়ক হতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-কে শুধু একটি অসুখী দাম্পত্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখলে কবিতাটির ব্যাপ্তি অনেকটাই কমিয়ে দেখা হয়।
১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা, বিশ্বাসের সংকট ও সাংস্কৃতিক ভাঙনের ছবি উঠে আসে। পুরাণ, ধর্ম, সাহিত্য, আধুনিক নগরজীবন, যৌনতা, মৃত্যু, স্মৃতি ও একাকিত্ব—সব মিলিয়ে এলিয়ট নির্মাণ করেন এক ভাঙাচোরা অথচ গভীর কাব্যজগৎ।
কবির পাশাপাশি সম্পাদক ও প্রকাশক
এলিয়ট শুধু কবি ছিলেন না। ১৯২২ সালে তিনি ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন’ নামে একটি সাহিত্যপত্র শুরু করেন এবং ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এর সম্পাদক ছিলেন। ইউরোপীয় সাহিত্য ও চিন্তার জগতে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯২৫ সালে তিনি ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবারে যোগ দেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকও হন। সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে বহু নতুন লেখককে সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।
সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও এলিয়টের প্রভাব ছিল গভীর। ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত প্রতিভার সম্পর্ক, কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি ও কবিতার সম্পর্ক এবং সাহিত্যের মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর প্রবন্ধগুলো বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
‘ওল্ড পসাম’ ও বিড়ালের জগৎ
এত গম্ভীর সাহিত্যিক পরিচয়ের আড়ালে ছিলেন অন্য এক এলিয়ট। বিড়াল নিয়ে লেখা তাঁর ছড়াগুলো ছিল রসিকতা ও আনন্দে ভরা।
‘ওল্ড পসাম’ ছিল তাঁর ডাকনাম। এজরা পাউন্ড তাঁকে এই নামে ডাকতেন। ১৯৩৯ সালে এই নামেই প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত বই ‘ওল্ড পসামের প্র্যাকটিক্যাল ক্যাটস’।
বইটিতে একের পর এক বিড়াল চরিত্র—জেলিকল, ম্যাকাভিটি, মুংজেরি, রামপেলটিজার ও স্কিম্বলশ্যাঙ্কস—নিজস্ব স্বভাব ও কাণ্ডকারখানা নিয়ে হাজির হয়। এখানে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর গম্ভীর কবিকে পাওয়া যায় না। বরং দেখা যায় শব্দ, ছন্দ ও প্রাণীর বিচিত্র স্বভাব নিয়ে খেলতে থাকা এক রসিক লেখককে।
আর এই ছড়াগুলোই বহু বছর পর নতুন জীবন পায় মঞ্চে। ১৯৭৮ সালে অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবার এলিয়টের বিড়ালবিষয়ক কবিতায় সুর বসিয়ে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই তৈরি হয় বিখ্যাত সংগীতনাট্য ‘ক্যাটস’। ১৯৮১ সালে লন্ডনে প্রথম মঞ্চায়নের পর ১৯৮২ সালে এটি ব্রডওয়েতে যায় এবং ১৯৮৩ সালে সাতটি টনি পুরস্কার জেতে।
ভাঙন থেকে আধ্যাত্মিকতার পথে
এলিয়টের ব্যক্তিজীবন ও কবিতাতেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের পাশাপাশি তিনি অ্যাংলিকান ধর্মমতের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর তাঁর কবিতায় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ এবং ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এ সময়, স্মৃতি, মৃত্যু, ইতিহাস, বিশ্বাস ও আত্মিক অনুসন্ধানের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে আসে।
‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর চারটি কবিতা—‘বার্ন্ট নর্টন’, ‘ইস্ট কোকার’, ‘দ্য ড্রাই স্যালভেজেস’ ও ‘লিটল গিডিং’—এলিয়টের পরিণত কাব্যচিন্তার অন্যতম প্রকাশ।
‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এ যেখানে ভাঙন ও অনুর্বরতার অনুভূতি প্রবল, ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এ সেখানে সেই ভাঙনের মধ্যেই অর্থের সন্ধান রয়েছে। যেন শূন্যতা থেকে অর্থের দিকে, ভাঙন থেকে বিশ্বাসের দিকে এক দীর্ঘ যাত্রা।
এমিলি হেলের সঙ্গে দীর্ঘ চিঠির সম্পর্ক
এলিয়টের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এমিলি হেলকে ঘিরে। ১৯১০-এর দশকের গোড়ায় তাঁদের পরিচয় হয়। পরে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৩০ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এলিয়ট হেলকে এক হাজারের বেশি চিঠি লিখেছিলেন। ২০২০ সালে সেই চিঠিগুলো গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত হলে সাহিত্যজগতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।
চিঠিগুলো এলিয়টের ব্যক্তিজীবনের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, অনুশোচনা ও আত্মসংঘাত সম্পর্কে নতুন তথ্যের সুযোগ তৈরি করে। তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন নানা ব্যাখ্যা থাকলেও একে সরল প্রেমের গল্পের বদলে দীর্ঘস্থায়ী এক মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক হিসেবে দেখাই বেশি সংগত।
৬৮ বছর বয়সে নতুন সংসার
ভিভিয়েনের মৃত্যুর এক দশক পর, ১৯৫৭ সালে ৬৮ বছর বয়সে এলিয়ট বিয়ে করেন এস্মে ভ্যালেরি ফ্লেচারকে। ভ্যালেরি তখন ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবারে তাঁর সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁদের বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩৮ বছর।
বিয়েটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। ঘনিষ্ঠজনেরা পরে তাঁদের দাম্পত্যকে সুখী বলে বর্ণনা করেছেন। জীবনের শেষ পর্বে ভ্যালেরি শুধু এলিয়টের ব্যক্তিগত সঙ্গীই ছিলেন না, তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৫ সালে এলিয়টের মৃত্যুর পর বহু বছর ধরে তাঁর লেখা, চিঠি ও অন্যান্য সাহিত্যিক সম্পদ সংরক্ষণের কাজ করেন ভ্যালেরি।
নোবেল পুরস্কার ও বিতর্ক
১৯৪৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান টি এস এলিয়ট। আধুনিক কবিতায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
তবে এলিয়টের সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর কিছু লেখা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। তাঁর কয়েকটি কবিতা ও গদ্যে ইহুদিদের সম্পর্কে এমন ভাষা ও ধারণা পাওয়া যায়, যেগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ উঠেছে। এসব লেখার ব্যাখ্যা নিয়েও সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তাই এলিয়টকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ সাহিত্যিক অবদানের পাশাপাশি তাঁর লেখার বিতর্কিত দিকগুলোও আলোচনায় এসেছে। একজন বড় সাহিত্যিকের জীবন ও কাজ সব সময় একরৈখিক হয় না—প্রতিভা, সীমাবদ্ধতা, সময়ের প্রভাব ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস সেখানে পাশাপাশি থাকে।
শেষ জীবনে কিছুটা স্থিরতা
১৯৬৫ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডনে ৭৬ বছর বয়সে মারা যান টি এস এলিয়ট।
পেছন ফিরে তাঁর জীবন দেখলে একাধিক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘দ্য হলো মেন’, ‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ ও ‘ফোর কোয়ার্টেটস’; অন্যদিকে বিড়ালদের নিয়ে মজার ছড়া। একদিকে দর্শনের ছাত্র ও কঠিন সাহিত্য সমালোচক, অন্যদিকে ব্যাংকার, সম্পাদক ও প্রকাশক। একদিকে অস্থির দাম্পত্য, অন্যদিকে জীবনের শেষ দিকে পাওয়া ব্যক্তিগত শান্তি।
তাঁর কবিতার দীর্ঘ যাত্রাটিও কম বিস্ময়কর নয়। শুরুতে আছে নিঃসঙ্গতা, আত্মসংশয় ও যুদ্ধোত্তর সভ্যতার ক্লান্তি। এরপর ধীরে ধীরে আসে ধর্ম, সময়, স্মৃতি ও আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান।
সম্ভবত এখানেই টি এস এলিয়টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তিনি শুধু একটি ভেঙে পড়া পৃথিবীর কবি নন; সেই ভাঙনের মধ্যেও অর্থ খুঁজতে থাকা মানুষের কবি।
‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর অনুর্বর ভূমি থেকে ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান পর্যন্ত তাঁর পথচলা তাই শুধু একজন কবির সাহিত্যিক বিবর্তনের ইতিহাস নয়, নিজের ভেতরে অর্থ খুঁজে ফেরারও এক দীর্ঘ যাত্রা।
যে কবি অনুর্বরতার কথা লিখেছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ পর্বে এসে যেন কিছুটা স্থিরতাও ফিরে এসেছিল। আর তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার মনে করিয়ে দেয়—একজন কবিকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলো নয়, তাঁর জীবনের বৈপরীত্যগুলোর দিকেও তাকাতে হয়। সেখানে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর কবির পাশে হঠাৎ দেখা যায় কয়েকটি বিড়ালকে—আর সেই দৃশ্যটিই হয়তো টি এস এলিয়টকে আরও মানবিক করে তোলে।
কালের আলো/এসএ

আপনার মতামত লিখুন
Array