খুঁজুন
                               
, ,
           

আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট এর প্রেম, বিচ্ছেদ ও শেষ বয়স

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫২ অপরাহ্ণ
আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট এর  প্রেম, বিচ্ছেদ ও শেষ বয়স

আধুনিক কবিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি টি এস এলিয়ট। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘দ্য হলো মেন’, ‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ কিংবা ‘ফোর কোয়ার্টেটস’—তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে আধুনিক মানুষের নিঃসঙ্গতা, সভ্যতার ভাঙন, সময়, মৃত্যু, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রশ্ন। কিন্তু এই গম্ভীর কবির আরেকটি দিকও ছিল। বিড়াল নিয়ে লিখেছিলেন মজার সব ছড়া, যা বহু বছর পর অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবারের বিখ্যাত সংগীতনাট্য ‘ক্যাটস’-এর ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৮৮৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মিজৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্ম নেওয়া টমাস স্টার্নস এলিয়ট সাহিত্যজগতে পরিচিত হন টি এস এলিয়ট নামে। কবি হিসেবে খ্যাতির পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাহিত্য সমালোচক, সম্পাদক ও প্রকাশক। হার্ভার্ডে পড়াশোনার পর প্যারিস ও অক্সফোর্ডে দর্শন নিয়ে পড়েন। ১৯১৪ সালে ইংল্যান্ডে স্থায়ী হন এবং ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। আধুনিক কবিতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৪৮ সালে পান সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার।

দর্শনের ছাত্র থেকে আধুনিক কবি

কবি হওয়ার আগে দর্শনের প্রতি এলিয়টের গভীর আগ্রহ ছিল। হার্ভার্ডে পড়ার সময় ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের লেখায় প্রভাবিত হন তিনি। ১৯১০ ও ১৯১১ সালের দিকে লেখা তাঁর কয়েকটি কবিতা পরবর্তী সময়ে আধুনিক কবিতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে ওঠে।

এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘দ্য লাভ সং অব জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক’। কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন আত্মসংশয়ে ভোগা ও দ্বিধাগ্রস্ত নগরবাসী। মানুষের কাছে যেতে চাইলেও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় তাকে আটকে রাখে। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে—এই অনুভূতিও তাকে তাড়া করে।

১৯১৫ সালে কবিতাটি প্রকাশিত হলে সাহিত্যজগতে এলিয়টের পরিচিতি দ্রুত বাড়তে থাকে। এ সময় এজরা পাউন্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পাউন্ড এলিয়টের প্রতিভায় আস্থা রাখতেন এবং সমকালীন সাহিত্যিক মহলে তাঁর পরিচিতি তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।

১৯২২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর পাণ্ডুলিপি সম্পাদনাতেও পাউন্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এলিয়ট কবিতাটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলেন ‘ইল মিগলিয়র ফাব্রো’ নামে, যা দান্তের একটি পঙ্‌ক্তি থেকে নেওয়া এবং অর্থ ‘শ্রেষ্ঠ কারিগর’।

প্রথম স্ত্রী ভিভিয়েন, অস্থির দাম্পত্য

১৯১৫ সালে এলিয়ট বিয়ে করেন ভিভিয়েন হেইগ-উডকে। বিয়ের শুরু থেকেই তাঁদের সম্পর্ক ছিল জটিল। ভিভিয়েনের শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতা সময়ের সঙ্গে গুরুতর হয়ে ওঠে।

১৯৩৩ সালের পর তাঁরা আলাদা বসবাস করতে শুরু করেন। ১৯৩৮ সালে ভিভিয়েনকে একটি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে রাখা হয়। ১৯৪৭ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এলিয়টের ব্যক্তিজীবন ও ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা হয়েছে। তাঁর দাম্পত্যের অস্থিরতা কবিতাটির কিছু অংশের পটভূমি বুঝতে সহায়ক হতে পারে। তবে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-কে শুধু একটি অসুখী দাম্পত্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখলে কবিতাটির ব্যাপ্তি অনেকটাই কমিয়ে দেখা হয়।

১৯২২ সালে প্রকাশিত এই কবিতায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের ক্লান্তি, বিচ্ছিন্নতা, বিশ্বাসের সংকট ও সাংস্কৃতিক ভাঙনের ছবি উঠে আসে। পুরাণ, ধর্ম, সাহিত্য, আধুনিক নগরজীবন, যৌনতা, মৃত্যু, স্মৃতি ও একাকিত্ব—সব মিলিয়ে এলিয়ট নির্মাণ করেন এক ভাঙাচোরা অথচ গভীর কাব্যজগৎ।

কবির পাশাপাশি সম্পাদক ও প্রকাশক

এলিয়ট শুধু কবি ছিলেন না। ১৯২২ সালে তিনি ‘দ্য ক্রাইটেরিয়ন’ নামে একটি সাহিত্যপত্র শুরু করেন এবং ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এর সম্পাদক ছিলেন। ইউরোপীয় সাহিত্য ও চিন্তার জগতে পত্রিকাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯২৫ সালে তিনি ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবারে যোগ দেন। পরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকও হন। সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে বহু নতুন লেখককে সাহিত্যজগতে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল।

সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও এলিয়টের প্রভাব ছিল গভীর। ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত প্রতিভার সম্পর্ক, কবির ব্যক্তিগত অনুভূতি ও কবিতার সম্পর্ক এবং সাহিত্যের মূল্যবোধ নিয়ে তাঁর প্রবন্ধগুলো বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্যচিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

‘ওল্ড পসাম’ ও বিড়ালের জগৎ

এত গম্ভীর সাহিত্যিক পরিচয়ের আড়ালে ছিলেন অন্য এক এলিয়ট। বিড়াল নিয়ে লেখা তাঁর ছড়াগুলো ছিল রসিকতা ও আনন্দে ভরা।

‘ওল্ড পসাম’ ছিল তাঁর ডাকনাম। এজরা পাউন্ড তাঁকে এই নামে ডাকতেন। ১৯৩৯ সালে এই নামেই প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত বই ‘ওল্ড পসামের প্র্যাকটিক্যাল ক্যাটস’।

বইটিতে একের পর এক বিড়াল চরিত্র—জেলিকল, ম্যাকাভিটি, মুংজেরি, রামপেলটিজার ও স্কিম্বলশ্যাঙ্কস—নিজস্ব স্বভাব ও কাণ্ডকারখানা নিয়ে হাজির হয়। এখানে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর গম্ভীর কবিকে পাওয়া যায় না। বরং দেখা যায় শব্দ, ছন্দ ও প্রাণীর বিচিত্র স্বভাব নিয়ে খেলতে থাকা এক রসিক লেখককে।

আর এই ছড়াগুলোই বহু বছর পর নতুন জীবন পায় মঞ্চে। ১৯৭৮ সালে অ্যান্ড্রু লয়েড ওয়েবার এলিয়টের বিড়ালবিষয়ক কবিতায় সুর বসিয়ে কাজ শুরু করেন। সেখান থেকেই তৈরি হয় বিখ্যাত সংগীতনাট্য ‘ক্যাটস’। ১৯৮১ সালে লন্ডনে প্রথম মঞ্চায়নের পর ১৯৮২ সালে এটি ব্রডওয়েতে যায় এবং ১৯৮৩ সালে সাতটি টনি পুরস্কার জেতে।

ভাঙন থেকে আধ্যাত্মিকতার পথে

এলিয়টের ব্যক্তিজীবন ও কবিতাতেও ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসে। ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব গ্রহণের পাশাপাশি তিনি অ্যাংলিকান ধর্মমতের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর তাঁর কবিতায় ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ এবং ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এ সময়, স্মৃতি, মৃত্যু, ইতিহাস, বিশ্বাস ও আত্মিক অনুসন্ধানের বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে আসে।

‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর চারটি কবিতা—‘বার্ন্ট নর্টন’, ‘ইস্ট কোকার’, ‘দ্য ড্রাই স্যালভেজেস’ ও ‘লিটল গিডিং’—এলিয়টের পরিণত কাব্যচিন্তার অন্যতম প্রকাশ।

‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এ যেখানে ভাঙন ও অনুর্বরতার অনুভূতি প্রবল, ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এ সেখানে সেই ভাঙনের মধ্যেই অর্থের সন্ধান রয়েছে। যেন শূন্যতা থেকে অর্থের দিকে, ভাঙন থেকে বিশ্বাসের দিকে এক দীর্ঘ যাত্রা।

এমিলি হেলের সঙ্গে দীর্ঘ চিঠির সম্পর্ক

এলিয়টের জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এমিলি হেলকে ঘিরে। ১৯১০-এর দশকের গোড়ায় তাঁদের পরিচয় হয়। পরে তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

১৯৩০ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত এলিয়ট হেলকে এক হাজারের বেশি চিঠি লিখেছিলেন। ২০২০ সালে সেই চিঠিগুলো গবেষকদের জন্য উন্মুক্ত হলে সাহিত্যজগতে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়।

চিঠিগুলো এলিয়টের ব্যক্তিজীবনের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, অনুশোচনা ও আত্মসংঘাত সম্পর্কে নতুন তথ্যের সুযোগ তৈরি করে। তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন নানা ব্যাখ্যা থাকলেও একে সরল প্রেমের গল্পের বদলে দীর্ঘস্থায়ী এক মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক হিসেবে দেখাই বেশি সংগত।

৬৮ বছর বয়সে নতুন সংসার

ভিভিয়েনের মৃত্যুর এক দশক পর, ১৯৫৭ সালে ৬৮ বছর বয়সে এলিয়ট বিয়ে করেন এস্মে ভ্যালেরি ফ্লেচারকে। ভ্যালেরি তখন ফ্যাবার অ্যান্ড ফ্যাবারে তাঁর সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন। তাঁদের বয়সের ব্যবধান ছিল প্রায় ৩৮ বছর।

বিয়েটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত। ঘনিষ্ঠজনেরা পরে তাঁদের দাম্পত্যকে সুখী বলে বর্ণনা করেছেন। জীবনের শেষ পর্বে ভ্যালেরি শুধু এলিয়টের ব্যক্তিগত সঙ্গীই ছিলেন না, তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

১৯৬৫ সালে এলিয়টের মৃত্যুর পর বহু বছর ধরে তাঁর লেখা, চিঠি ও অন্যান্য সাহিত্যিক সম্পদ সংরক্ষণের কাজ করেন ভ্যালেরি।

নোবেল পুরস্কার ও বিতর্ক

১৯৪৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান টি এস এলিয়ট। আধুনিক কবিতায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

তবে এলিয়টের সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর কিছু লেখা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। তাঁর কয়েকটি কবিতা ও গদ্যে ইহুদিদের সম্পর্কে এমন ভাষা ও ধারণা পাওয়া যায়, যেগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ উঠেছে। এসব লেখার ব্যাখ্যা নিয়েও সাহিত্য সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

তাই এলিয়টকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর অসাধারণ সাহিত্যিক অবদানের পাশাপাশি তাঁর লেখার বিতর্কিত দিকগুলোও আলোচনায় এসেছে। একজন বড় সাহিত্যিকের জীবন ও কাজ সব সময় একরৈখিক হয় না—প্রতিভা, সীমাবদ্ধতা, সময়ের প্রভাব ও ব্যক্তিগত বিশ্বাস সেখানে পাশাপাশি থাকে।

শেষ জীবনে কিছুটা স্থিরতা

১৯৬৫ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডনে ৭৬ বছর বয়সে মারা যান টি এস এলিয়ট।

পেছন ফিরে তাঁর জীবন দেখলে একাধিক বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’, ‘দ্য হলো মেন’, ‘অ্যাশ-ওয়েডনেসডে’ ও ‘ফোর কোয়ার্টেটস’; অন্যদিকে বিড়ালদের নিয়ে মজার ছড়া। একদিকে দর্শনের ছাত্র ও কঠিন সাহিত্য সমালোচক, অন্যদিকে ব্যাংকার, সম্পাদক ও প্রকাশক। একদিকে অস্থির দাম্পত্য, অন্যদিকে জীবনের শেষ দিকে পাওয়া ব্যক্তিগত শান্তি।

তাঁর কবিতার দীর্ঘ যাত্রাটিও কম বিস্ময়কর নয়। শুরুতে আছে নিঃসঙ্গতা, আত্মসংশয় ও যুদ্ধোত্তর সভ্যতার ক্লান্তি। এরপর ধীরে ধীরে আসে ধর্ম, সময়, স্মৃতি ও আধ্যাত্মিকতার অনুসন্ধান।

সম্ভবত এখানেই টি এস এলিয়টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। তিনি শুধু একটি ভেঙে পড়া পৃথিবীর কবি নন; সেই ভাঙনের মধ্যেও অর্থ খুঁজতে থাকা মানুষের কবি।

‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর অনুর্বর ভূমি থেকে ‘ফোর কোয়ার্টেটস’-এর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান পর্যন্ত তাঁর পথচলা তাই শুধু একজন কবির সাহিত্যিক বিবর্তনের ইতিহাস নয়, নিজের ভেতরে অর্থ খুঁজে ফেরারও এক দীর্ঘ যাত্রা।

যে কবি অনুর্বরতার কথা লিখেছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ পর্বে এসে যেন কিছুটা স্থিরতাও ফিরে এসেছিল। আর তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার মনে করিয়ে দেয়—একজন কবিকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলো নয়, তাঁর জীবনের বৈপরীত্যগুলোর দিকেও তাকাতে হয়। সেখানে ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’-এর কবির পাশে হঠাৎ দেখা যায় কয়েকটি বিড়ালকে—আর সেই দৃশ্যটিই হয়তো টি এস এলিয়টকে আরও মানবিক করে তোলে।

কালের আলো/এসএ

আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৫ পূর্বাহ্ণ
আকাশে উঠল টেসলার রোডস্টার? উড়ন্ত গাড়ির দাবি নিয়ে যত প্রশ্ন

বিজ্ঞানের কল্পকাহিনিতে দেখা উড়ন্ত গাড়ি কি এবার বাস্তবে আসতে চলেছে? টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের নতুন রোডস্টার স্পোর্টস কারের প্রদর্শনী ঘিরে এমন প্রশ্নই উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের একটি স্থাপনায় গাড়িটির বিশেষ প্রযুক্তি প্রদর্শন করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে থ্রাস্টার ব্যবহার করে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা, মাঝআকাশে ঘোরানো এবং মাটিতে অবতরণের কৌশল দেখানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এই প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ির আত্মপ্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, কোনো গাড়ি অল্প সময়ের জন্য মাটি ছেড়ে উঠতে পারা আর সেটিকে ব্যবহার করে নিয়মিত আকাশপথে যাতায়াত করা এক বিষয় নয়। গাড়িটির বাস্তব কার্যক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগিতা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন।

প্রদর্শনীতে কী দেখালেন ইলন মাস্ক?

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) আয়োজিত প্রদর্শনীতে মাস্ক বলেন, ‘আজ রাতে আপনারা কিছু অবিশ্বাস্য বিষয় দেখতে যাচ্ছেন।’ গাড়িটির প্রদর্শনী এআই দিয়ে তৈরি কোনো দৃশ্য নয়, তা প্রমাণ করার জন্যই দর্শকদের সামনে এটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। টেসলার দাবি, নতুন রোডস্টারে স্পেসএক্সের মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে অনুপ্রাণিত বিশেষ থ্রাস্টার ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রচলিত গাড়ির বাইরে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দেখানোর পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। প্রদর্শনীতে দেখানো প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর এবং গাড়িটির কোন সংস্করণে এসব সুবিধা থাকবে, তা স্পষ্টভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু আকর্ষণীয় প্রদর্শনী দিয়ে কোনো প্রযুক্তির দৈনন্দিন ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা যায় না।

কীভাবে শূন্যে উঠবে গাড়ি?

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গাড়িটিতে উচ্চচাপে সংরক্ষিত বাতাস দ্রুত নির্গত করে থ্রাস্ট বা ধাক্কা তৈরির ব্যবস্থা ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। বাতাস দ্রুত বেরিয়ে গেলে বিপরীত দিকে বল সৃষ্টি হয়। এই বল কাজে লাগিয়ে গাড়িটিকে সাময়িকভাবে শূন্যে তোলা বা ঘোরানোর মতো কৌশল দেখানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ধরনের প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করে থ্রাস্টের পরিমাণ, গাড়ির ওজন, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ এবং বাতাসের চাপ ব্যবস্থাপনার ওপর। দীর্ঘ সময় বাতাসে থাকা কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আকাশপথে চলাচলের জন্য আরও জটিল প্রযুক্তি ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন। তাই থ্রাস্টার ব্যবহার করে সাময়িকভাবে শূন্যে ওঠার প্রদর্শনীকে পূর্ণাঙ্গ উড্ডয়নক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

উড়ন্ত গাড়ি হতে হলে যেসব চ্যালেঞ্জ পেরোতে হবে

একটি পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়িকে একই সঙ্গে সড়ক ও আকাশপথে নিরাপদে চলাচলের উপযোগী হতে হবে। এর জন্য শুধু শক্তিশালী থ্রাস্টার থাকলেই চলবে না; প্রয়োজন হবে নির্ভরযোগ্য দিকনির্দেশনা, ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ উড্ডয়ন ও অবতরণব্যবস্থা এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রযুক্তি। এর পাশাপাশি যাত্রীদের নিরাপত্তা, শক্তির ব্যবহার, শব্দদূষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব পরিবেশে এসব শর্ত পূরণ না হলে প্রযুক্তিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে ব্যবহার করা কঠিন হবে।

২০২৮ সালে উৎপাদনের পরিকল্পনা

মাস্ক জানিয়েছেন, নতুন রোডস্টারের উৎপাদন ২০২৮ সালে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উৎপাদন শুরুর নির্দিষ্ট সময়, গাড়ি সরবরাহের সূচি, চূড়ান্ত মূল্য এবং বিশেষ প্রযুক্তির বাস্তব কার্যক্ষমতা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। পরিকল্পিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শুরু হলেও গাড়িটির কোন সংস্করণে থ্রাস্টার প্রযুক্তি থাকবে এবং সেটি ক্রেতাদের জন্য কতটা ব্যবহারযোগ্য হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকবে। উৎপাদনের ঘোষণা আর বাজারে পরীক্ষিত, অনুমোদিত ও ব্যবহারযোগ্য গাড়ি সরবরাহ—দুটি আলাদা বিষয়।

টেসলার প্রদর্শনী উড়ন্ত গাড়ির ধারণাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। কিন্তু গাড়িটি দীর্ঘ সময় উড়তে পারে, আকাশপথে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সব নিরাপত্তাশর্ত পূরণ করেছে—এমন প্রমাণ এই বর্ণনায় নেই। অতএব, এখনই টেসলার নতুন রোডস্টারকে পূর্ণাঙ্গ উড়ন্ত গাড়ি বলা ঠিক হবে না। বরং এটিকে থ্রাস্টার প্রযুক্তির সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি প্রদর্শনী হিসেবে দেখা যায়।

সূত্র: বিবিসি

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

 

পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
পাঠ্যবইয়ে বাবুই, বাস্তবে নেই—তালগাছ কমে হারাচ্ছে বাংলার চিরচেনা দৃশ্য

‘বাবুই পাখিকে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থাকি কর শিল্পের বড়াই।’ কবি রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তি বাংলা পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীর কাছে পরিচিত। নিজের হাতে তৈরি বাসার সৌন্দর্য আর আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে বাবুই পাখির পরিচয়ও পেয়েছে বিশেষ মাত্রা। কিন্তু কবিতায় পরিচিত সেই পাখি ও তার নিপুণ বুননের বাসা এখন বাস্তবে অনেকের কাছেই অচেনা হয়ে উঠছে।

একসময় গ্রামবাংলার তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত বাবুই পাখির অসংখ্য বাসা। পাখির কিচিরমিচিরে মুখর থাকত গ্রামের পথঘাট। মৌলভীবাজারের বিভিন্ন গ্রাম ও হাওরাঞ্চলেও ছিল এমন দৃশ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কমেছে তালগাছ, সংকুচিত হয়েছে বাবুই পাখির আবাসস্থল। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকার এবং অপরিকল্পিত বসতি নির্মাণের মতো নানা কারণে প্রকৃতির এই পরিচিত দৃশ্য এখন ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছে। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রবীণ শিক্ষক ও পাখিপ্রেমীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, মৌলভীবাজারের অনেক এলাকায় একসময় প্রচুর তালগাছ থাকলেও এখন সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। কোথাও কোথাও তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেও সেখানে আর আগের মতো বাবুই পাখির বাসা দেখা যায় না।

তালগাছের পাতায় পাতায় ঝুলত শত বাসা

মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ২ নম্বর উত্তরভাগ ইউনিয়নের উত্তরভাগ গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক মো. মুজিবুর রহমানের স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল সেই সময়ের গ্রামবাংলা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় গ্রামের মেঠোপথের পাশে সারি সারি তালগাছ ছিল। গাছগুলোর পাতায় পাতায় বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা ঝুলত। পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত পুরো গ্রাম। মুজিবুর রহমান বলেন, শুধু তাঁর গ্রামেই নয়, আবহমান বাংলার বহু গ্রামেই এমন দৃশ্য দেখা যেত। কিন্তু এখন মৌলভীবাজারের গ্রাম-গঞ্জে তালগাছ খুব একটা চোখে পড়ে না। সেই সঙ্গে কমে গেছে বাবুই পাখির উপস্থিতিও।

তাঁর স্মৃতিচারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কীভাবে একটি পরিচিত প্রাকৃতিক দৃশ্য কয়েক দশকের ব্যবধানে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। যে পাখি ও বাসা একসময় গ্রামীণ পরিবেশের স্বাভাবিক অংশ ছিল, এখন তা দেখার জন্যও অনেক জায়গায় খোঁজ করতে হয়।

এক দশকেই বদলে গেছে গ্রামের চিত্র

শ্রীমঙ্গল উপজেলার ২ নম্বর ভুনবীর ইউনিয়নের সরকার বাজার এলাকার বাসিন্দা জনি দাসও দেখেছেন তালগাছ কমে যাওয়ার এমন পরিবর্তন। তাঁর মতে, প্রায় এক দশক আগেও তাঁদের এলাকায় যত তালগাছ ছিল, এখন তার চার ভাগের এক ভাগও নেই। জনি দাস জানান, ২০০১-২০০২ সালের দিকে শুধু তাঁদের গ্রামেই রাস্তার পাশে ও বিভিন্ন বাড়িতে অন্তত দুই শতাধিক তালগাছ ছিল। এসব গাছে বাবুই পাখির বাসাও দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে পুরো গ্রাম ঘুরেও একটি তালগাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাঁর।

বাবুই পাখির বাসার অবস্থা আরও করুণ বলে মনে করেন তিনি। একসময় যা ছিল গ্রামের পরিচিত দৃশ্য, এখন তা দেখা যেন জাদুঘরে বিরল কোনো নিদর্শন দেখার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়দের এমন অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, তালগাছ কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু গাছের সংখ্যা হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং পাখিদের বসবাসের সুযোগও।

এখনো রয়েছে বাবুইয়ের বাসা দেখার বিরল সুযোগ

তবে মৌলভীবাজারের সব জায়গা থেকেই বাবুই পাখির বাসা হারিয়ে যায়নি। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৩ নম্বর শ্রীমঙ্গল ইউনিয়নের রূপসপুর বা ফুলবাড়ি এলাকায় পাশাপাশি থাকা দুটি তালগাছে এখনো অসংখ্য বাবুই পাখির শৈল্পিক বাসা দেখা যায়। এলাকার এই দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন বিকেলে সেখানে ভিড় করেন অনেকে। তালগাছের পাতায় ঝুলে থাকা বাসাগুলো এখনো প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। চারপাশে তালগাছ ও বাবুইয়ের বাসা কমে যাওয়ায় এমন জায়গাগুলো স্থানীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্বও পেয়েছে।

ওই এলাকার বাসিন্দা হাজী মো. ফজলুর রহমান মনে করেন, নির্বিচারে গাছ কাটা, কীটনাশকের অবাধ ব্যবহার, পাখি শিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের কারণে তালগাছ কমে যাচ্ছে। এতে বাবুই পাখির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং পাখিটির টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষার বিষয়টি শুধু পাখি সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে গ্রামীণ পরিবেশের ভারসাম্যও জড়িত।

কুলাউড়ায় তালগাছ আছে, নেই বাবুইয়ের বাসা

কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর এলাকার সোলেমান হোসেনের স্মৃতিতেও রয়েছে ছোটবেলায় দেখা অসংখ্য তালগাছ ও বাবুই পাখির বাসার কথা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর এলাকার চিত্র বদলে গেছে। সোলেমান হোসেন জানান, বর্তমানে পুরো এলাকায় রাস্তার পাশে সরকারি জমিতে মাত্র একটি তালগাছ রয়েছে। আগে সেই গাছেও বাবুই পাখির বাসা দেখা যেত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে সেখানে আর কোনো বাসা চোখে পড়ছে না।

এই অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু তালগাছের অস্তিত্ব থাকলেই বাবুই পাখির উপস্থিতি নিশ্চিত হয় না। গাছের পাশাপাশি পাখির উপযোগী পরিবেশ, নিরাপত্তা ও খাদ্যের প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট এলাকায় বাবুই পাখি না থাকার সুনির্দিষ্ট কারণ জানতে আরও পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ৪ নম্বর সিন্দুরখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াছিন আরাফাত রবিনও তাঁর শৈশবের সঙ্গে বর্তমানের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। ছোটবেলায় তাঁদের এলাকায় অসংখ্য তালগাছ দেখেছেন তিনি। এসব গাছে বাসা বাঁধত বাবুই পাখি। এখন তালগাছ যেমন কম দেখা যায়, তেমনি চোখে পড়ে না পাখিটির শৈল্পিক বাসাও।

তিন প্রজাতির বাবুই নিয়ে উদ্বেগ

পাখিপ্রেমী খোকন সিং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি নিয়ে খোঁজখবর করেন এবং ফটোগ্রাফির মাধ্যমে পাখিদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় পাহাড়, টিলা ও হাওরসমৃদ্ধ মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় দাগি, বাংলা ও দেশি—এই তিন প্রজাতির বাবুই পাখির আবাস ছিল। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলা ও দাগি বাবুইয়ের দেখা প্রায় মেলেই না। তাঁর পর্যবেক্ষণে, কোনোরকমে টিকে আছে কিছু দেশি বাবুই পাখি।

খোকন সিংয়ের মতে, বাবুই পাখির বাসা তৈরির জন্য তালগাছ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পাখিটির আবাসস্থলও সংকটের মুখে পড়েছে। বাবুই পাখিকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ রোপণ করতে হবে বলে মনে করেন তিনি। তবে কোনো প্রজাতির বর্তমান সংখ্যা, বিস্তৃতি কিংবা বিলুপ্তির ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের জরিপ ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন। পাখিপ্রেমীদের পর্যবেক্ষণ স্থানীয় পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে পুরো জেলার প্রজাতিগত অবস্থা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

আবাসস্থল ধ্বংসে ঝুঁকিতে পাখি ও বন্যপ্রাণী

বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. কাজী নাজমুল হক বলেন, নানা কারণে গ্রামাঞ্চলে তালগাছ কাটা এবং অপরিকল্পিতভাবে বাড়িঘর নির্মাণের ফলে বাবুই পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। তিনি পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তালগাছ সংরক্ষণ এবং বাবুই পাখিকে বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। নাজমুল হকের সতর্কবার্তা হলো, প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে একসময় বাবুই পাখি বাস্তব জীবনের পরিচিত দৃশ্য থেকে হারিয়ে গিয়ে কেবল পাঠ্যপুস্তকের কবিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

তালগাছ রক্ষা ও নতুন করে রোপণ জরুরি

বাবুই পাখির বাসা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি গ্রামবাংলার পরিবেশ ও স্মৃতিরও অংশ। তালগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং পাখির বাসা বিরল হয়ে পড়ার যে চিত্র স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, তা আবাসস্থল সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তালগাছ সংরক্ষণ, উপযুক্ত জায়গায় নতুন চারা রোপণ, নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ, পাখি শিকার প্রতিরোধ এবং কীটনাশকের দায়িত্বশীল ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। পাশাপাশি বিদ্যমান বাবুইয়ের বাসা থাকা গাছগুলো রক্ষা করা এবং পাখির উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও প্রয়োজন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৭ পূর্বাহ্ণ
অফিসার্স ক্লাবের নির্মাণাধীন ভবনে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীর রমনায় অবস্থিত অফিসার্স ক্লাবের ভেতরে নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা পৌনে ১২টার দিকে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গা থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার বিস্তারিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্যের বাইরে নিশ্চিতভাবে কিছু জানা যায়নি।

মেয়েকে নিয়ে সকালে অফিসার্স ক্লাবে যান

অফিসার্স ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে মো. মোশাররফ হোসেন তাঁর ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাবে প্রবেশ করেন। পরে ক্লাবের সুইমিংপুলের সামনে মেয়েকে রেখে তিনি পাশের নির্মাণাধীন ভবনের ভেতরে যান। এরপর প্রায় এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলে ভবনটির নিচতলায় সিঁড়ির পাশের ফাঁকা অংশে তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন। মোশাররফ হোসেন অফিসার্স ক্লাবের সদস্য ছিলেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর বনানীর একটি বাড়িতে বসবাস করতেন।

তৃতীয় তলা থেকে পড়ে যাওয়ার কথা জানাল পুলিশ

ঘটনা সম্পর্কে রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, সকালে ছোট মেয়েকে নিয়ে অফিসার্স ক্লাবের সুইমিংপুলে গিয়েছিলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মোশাররফ হোসেন। তাঁর চোখে কম দেখার সমস্যা ছিল। পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নির্মাণাধীন ভবনটির তৃতীয় তলা থেকে তিনি নিচতলার ফাঁকা অংশে পড়ে যান। ঘটনাস্থলে মরদেহের সুরতহাল সম্পন্ন করেছে পুলিশ। তবে কীভাবে তিনি নিচে পড়ে যান, সে বিষয়ে পুলিশের বক্তব্যের বাইরে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিবারের সদস্যরা ময়নাতদন্ত করাতে চাননি। এ কারণে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কথা জানিয়েছেন রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মোশাররফ হোসেনের বড় মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তিনি দেশে ফেরার পর বাবার দাফন সম্পন্ন করা হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি