খুঁজুন
                               
, ,
           

অন্যের সন্তান গড়েন, নিজের সংসার চলে টানাটানিতে

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:০৯ পূর্বাহ্ণ
অন্যের সন্তান গড়েন, নিজের সংসার চলে টানাটানিতে

সকাল হলেই গ্রামের মেঠোপথ ধরে স্কুলের দিকে হাঁটেন শিক্ষক মো. রুহুল আমিন। হাতে বই-খাতা। সামনে তাঁর প্রতিদিনের পরিচিত শ্রেণিকক্ষ। সেখানে ঢুকেই শুরু হয় পড়ানো। শিক্ষার্থীদের কেউ বই খুলে বসে, কেউ খাতা বের করে। রুহুল আমিনও অন্য দিনের মতো বোর্ডে লিখতে থাকেন। ক্লাস শেষ হয়। শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফেরে। কিন্তু রুহুল আমিনের দিনের কাজ তখনো শেষ হয় না।

সংসার চালাতে তাঁকে বিকেলে প্রাইভেট পড়াতে হয়। কখনো যেতে হয় মাঠে। চাষাবাদ করতে হয়। কারণ যে চাকরিটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়, সেই চাকরি থেকে মাস শেষে নিয়মিত বেতন আসে না। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সোনাইডাঙ্গা বৈকণ্ঠপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই শিক্ষক ২০০২ সাল থেকে সেখানে চাকরি করছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছেন। কিন্তু এখনো প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়নি।

  • প্রায় ৪০ হাজার নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন কাটছে আর্থিক অনিশ্চয়তায়
  • সকালে শ্রেণিকক্ষ, বিকেলে টিউশনি কিংবা চাষাবাদ
  • শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়তে গড়তে নিজের পরিবারেই বাড়ছে অভাব

রুহুল আমিনের সংসারের গল্পটিও খুব সাধারণ—অথচ কষ্টের। স্কুল থেকে সামান্য যে টাকা পান, তা দিয়ে বাজার-সদাই, সন্তানের পড়াশোনা, পোশাক, চিকিৎসা—সব সামলানো সম্ভব নয়। তাই শিক্ষকতার পাশাপাশি তাঁকে অন্য কাজ করতে হয়। সন্তানের কোনো আবদার পূরণ করতে না পারার কষ্টটা হয়তো একজন বাবার কাছে সবচেয়ে বেশি। রুহুল আমিনের জীবনেও সেই কষ্ট আছে।

যশোর সদরের রূপদিয়ো বালিকা দাখিল মাদরাসার সুপার শরীফুল ইসলামের জীবনেও একই দৃশ্য। ২০০১ সালে মাদরাসায় যোগ দিয়েছিলেন। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকৃতি পেয়েছে। চাকরির বয়স এখন ২৬ বছর। এতটা সময় ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সামলানোর পরও সরকারি বেতন-ভাতার তালিকায় তাঁর নাম নেই। অবসরের সময় ঘনিয়ে এসেছে। অথচ যে চাকরিতে জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টা কাটালেন, সেখান থেকে নিয়মিত আর্থিক নিরাপত্তা পেলেন না। তাঁর প্রশ্নটা খুব সরল—আর কত দিন চাকরি করলে একজন শিক্ষক বেতন পাবেন? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু শরীফুল ইসলামের দরকার নয়। দেশের হাজারো নন-এমপিও শিক্ষক একই উত্তর খুঁজছেন।

শিক্ষক আছেন—শুধু বেতন নেই

দেশে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে তিন হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। তাঁদের কর্মদিবসও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের মতোই। সকালে স্কুলে যেতে হয়। ক্লাস নিতে হয়। পরীক্ষার খাতা দেখতে হয়। শিক্ষার্থীদের ফলাফল তৈরি করতে হয়। প্রতিষ্ঠান থেকে দায়িত্ব দিলে সভায় বসতে হয়, বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ করতে হয়। কাজের জায়গায় খুব একটা পার্থক্য নেই। পার্থক্য তৈরি হয় মাসের শেষে। কেউ বেতন নিয়ে বাড়ি ফেরেন। আর কেউ হিসাব করেন—আগামী মাসটা কীভাবে চলবে। এই বাস্তবতায় অনেক শিক্ষক বিকেলে টিউশনি করেন। কেউ কৃষিকাজে যুক্ত হন। কেউ দোকান চালান। অর্থাৎ শিক্ষকতার আয় দিয়ে সংসার না চলায় তাঁদের নিজেদের শ্রমের আরেকটি বাজার খুঁজতে হয়।

একই যোগ্যতা, ভিন্ন ভাগ্য

নন-এমপিও শিক্ষকদের বঞ্চনার পেছনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত ১৬ বছরে বিভিন্ন সময়ে নীতিমালার বাইরে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়েছে। সংসদ সদস্যদের ডিও লেটারের প্রভাবেও কিছু প্রতিষ্ঠান এমপিও পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে একই ধরনের দুটি প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যও ভিন্ন হয়েছে। একটিতে শিক্ষক মাস শেষে বেতন পান।

অন্যটিতে, একই দায়িত্ব পালন করা শিক্ষক বাড়ি ফেরেন খালি হাতে। কেন এমন হবে—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন এমপিও ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি সরকারের সময়ে প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বৈষম্যের কারণে এমপিও থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক দুই দশকের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করছেন।

যোগ্যতা প্রমাণের পরও শেষ হয়নি অপেক্ষা

গত বছরের ১৪ থেকে ২৫ জানুয়ারি এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে আবেদন পড়ে ৩ হাজার ৬১৫টি। যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা করা হয়। কাগজে-কলমে যোগ্যতা প্রমাণের পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর অপেক্ষা শেষ হয়নি। এখন সেই তালিকা আবার যাচাই হতে পারে। পাশাপাশি নতুন আবেদনও নেওয়া হবে। ফলে যাঁরা এত দিন ধরে একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের সামনে আবারও অপেক্ষার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। শিগগির নতুন আবেদন নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে। এবার সেই ঘোষণা বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনে, সেটিই দেখার বিষয়।

কলেজের বেতনে চলে না সংসার

শুধু স্কুল বা মাদরাসা নয়, বেসরকারি কলেজের অনার্স-মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকরাও দীর্ঘদিন ধরে একই সংকট বয়ে বেড়াচ্ছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে ১৯৯৩ সাল থেকে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু রয়েছে। কিন্তু এসব কোর্সে কর্মরত প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক এখনো এমপিও সুবিধার বাইরে।

একই কলেজের পাশের কক্ষে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ক্লাস নিচ্ছেন। তিনিও ক্লাস নিচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও একই। দায়িত্বও প্রায় একই। কিন্তু মাস শেষে একজনের হাতে নিয়মিত বেতন আসে, অন্যজন কলেজ থেকে পাওয়া অনিয়মিত সামান্য অর্থের ওপর নির্ভর করেন। কারও চাকরির বয়স ১৫ বছর। কারও ২০ বছর। কারও ক্ষেত্রে তিন দশকের কাছাকাছি। তবু বেতন কাঠামোয় তাঁদের স্থায়ী জায়গা হয়নি।

ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের গল্প

স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের গল্প আরও পুরোনো। ১৯৮৪ সালে যাত্রা শুরু করা এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষক এখনো নিয়মিত সরকারি সুবিধার বাইরে। একই সময়ের রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো সরকারি হয়েছে। কিন্তু স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসার বড় অংশের শিক্ষক সেই সুবিধা পাননি।

গত বছরের ৩ থেকে ১০ জুলাই এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন নেওয়া হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক বছর। কিন্তু এখনো কোনো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা এমপিওভুক্ত হয়নি। অর্থাৎ আবেদনপত্র জমা হয়েছে। ফাইল গেছে। অপেক্ষা হয়েছে। কিন্তু অপেক্ষার শেষ দেখা যায়নি।

এমপিও পেলেও স্বস্তি নেই

বেসরকারি শিক্ষকদের সংকট এমপিওভুক্তির পরও পুরোপুরি শেষ হয় না। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতায় তাঁরা সরকারি শিক্ষকদের তুলনায় পিছিয়ে। চিকিৎসা ভাতা মাত্র ৫০০ টাকা। উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। বাড়িভাড়াও দীর্ঘদিন ছিল খুবই কম। আগামী জুলাই থেকে বাড়িভাড়া মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করার কথা রয়েছে। ফলে একজন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হওয়ার পরও সংসারের বাজার, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসার খরচ সামলাতে হিমশিম খান।

৭০০ কোটি টাকার প্রশ্ন, ৪০ হাজার পরিবারের ভবিষ্যৎ

শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট দেশের ৩০ হাজার ৭৮৩টি স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির হিসাবে, জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ৯ হাজার ১০০ কোটি টাকা। বিপরীতে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সম্ভাব্য আয় হবে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি থাকবে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। সরকারের জন্য ৭০০ কোটি টাকার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ৪০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর জীবনে অনিশ্চয়তার মূল্যও কম নয়।

কারণ একজন শিক্ষক যখন সকালে ক্লাস নেন, দুপুরে বাড়ি ফেরেন, বিকেলে টিউশনি পড়ান কিংবা জমিতে কাজ করেন—তখন তিনি শুধু নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন না; একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলে দেন একটি ব্যবস্থার সামনে। যে মানুষটি প্রতিদিন অন্যের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ছেন, তাঁর নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ কেন অনিশ্চিত থাকবে?

যে শিক্ষক ২০ বছর ধরে শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর ২০ বছরের শ্রমের মূল্য কি শুধু ‘অপেক্ষা’ হতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত নন-এমপিও শিক্ষকদের সংকট শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যা হয়ে থাকবে না। এটি থেকে যাবে হাজারো পরিবারের রান্নাঘর, সন্তানের স্কুলব্যাগ, চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন আর মাসের শেষের খালি পকেটের গল্প হয়ে।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

চার্জে দিনে সাড়ে ৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪২ অপরাহ্ণ
চার্জে দিনে সাড়ে ৭ কোটি টাকার বিদ্যুৎ

রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্ট। বর্তমানে ঢাকায় আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, প্রতিটি অটোরিকশা চার্জে দৈনিক ৮ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ লাগে। সে হিসাবে সর্বনিম্ন হিসাবেও এসব যান চার্জ দিতে প্রতিদিন প্রায় ৯৬ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, যার মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

এই বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের বড় অংশ হচ্ছে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশনের বাইরে। রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এসবের অনেকগুলো গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা, সরু গলি ও টিনশেড গ্যারেজে। কোথাও আবাসিক মিটারের সংযোগে বাণিজ্যিকভাবে রিকশা চার্জ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে।

  • ঢাকায় ১০–১২ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা
  • ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন
  • আবাসিক মিটারে বাণিজ্য
  • অভিযানের পরও থামছে না অনিয়ম

রাজধানীর মুগদা, মান্ডা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজারের কয়েকটি গ্যারেজ ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। কয়েকটি গ্যারেজে বৈদ্যুতিক যান চার্জিংয়ের জন্য আলাদা মিটার থাকলেও তা ব্যবহার না করে আবাসিক সংযোগে রিকশা চার্জ দেওয়ার তথ্য মিলেছে। তেজগাঁওয়ে বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ঘটনাও ধরা পড়েছে।

অটোরিকশার এই অনিয়ন্ত্রিত চার্জিং শুধু বিদ্যুৎ চুরি ও রাজস্ব ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ায় স্থানীয় ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইনে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি এসব গ্যারেজকে ঘিরে মাদক কেনাবেচা, সেবন, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্বল্প দূরত্বে কম ভাড়ার জনপ্রিয় বাহনটি এখন নগরের বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করেছে।

১২ লাখ অটোরিকশা, নেই নির্ভরযোগ্য হিসাব
রাজধানীতে ঠিক কতটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে, তার হালনাগাদ ও নির্ভুল সরকারি পরিসংখ্যান নেই। বিআরটিএর হিসাব উদ্ধৃত করে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় চলছে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ। তবে কোন এলাকায় কতটি রিকশা চলছে, কতটি গ্যারেজে চার্জ হচ্ছে, কতটি নিবন্ধিত বা বৈধ—এসব তথ্য এক জায়গায় নেই।

ফলে যানবাহনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত রুট ঠিক করা কিংবা চার্জিং অবকাঠামোর প্রয়োজন নির্ধারণ—কোনোটিই নির্ভুল তথ্যের ভিত্তিতে করা যাচ্ছে না। ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতারা দাবি করছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর রাজধানীতে অটোরিকশার সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। তাঁদের হিসাবে, আগে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ রিকশা থাকলেও এখন তা ১০ থেকে ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদিন ৯৬ লাখ ইউনিটের হিসাব
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জে দৈনিক ৮ থেকে ১২ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ১২ লাখ রিকশার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ৮ ইউনিট ধরলেও প্রতিদিন প্রয়োজন প্রায় ৯৬ লাখ ইউনিট। এর মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এটি মোট সম্ভাব্য ব্যবহারের হিসাব; এর সবটাই যে অবৈধভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে বৈধ ও অবৈধ—দুই ধরনের চার্জিং মিলিয়ে এই বিপুল চাহিদা যে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।

জাতীয় সংসদে দেওয়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও অনুরূপ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে। অবৈধ ও অনানুষ্ঠানিকভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে সরকারের বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

বৈধ স্টেশন ৩,৩০০, অবৈধ প্রায় ৪৮ হাজার
চার্জিং ব্যবস্থার চিত্রে সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্য দেখা যায় অনুমোদিত ও অননুমোদিত স্টেশনের সংখ্যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, রাজধানীতে প্রায় ৪৮ হাজার অবৈধ চার্জিং স্টেশন চলছে। বিপরীতে সারা দেশে বৈধ চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্যারেজ ব্যবসার সঙ্গে চার্জিং ব্যবসা একীভূত হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্যারেজে রিকশা রাখার পাশাপাশি সেখানেই ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। ফলে আলাদা চার্জিং অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা এড়িয়ে আবাসিক বা অন্য ধরনের সংযোগ ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

মুগদা, মান্ডা ও তেজগাঁওয়ের কয়েকটি গ্যারেজে দেখা গেছে, বৈদ্যুতিক যান চার্জিংয়ের জন্য পৃথক মিটার থাকলেও মালিকেরা আবাসিক সংযোগে বেশি রিকশা চার্জ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এতে অনুমোদিত বাণিজ্যিক ব্যবহারের তুলনায় কম খরচে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।

মিটার আছে, ব্যবহার নেই
মান্ডা এলাকার এক গ্যারেজ মালিক জানান, বিদ্যুতের বিল বাড়ার আগে তাঁর গ্যারেজে ৩০ থেকে ৩৫টি রিকশা চার্জ হতো। তখন মাসে বিদ্যুৎ বিল আসত ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। পরে রিকশার সংখ্যা কমিয়ে প্রায় ২০টি করা হলেও মাসিক খরচ দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা। গ্যারেজে কোন মিটার কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি।

লালবাগের আরেক গ্যারেজ মালিকের ভাষ্য, আগে ১৬৫টি রিকশা চার্জে মাসে প্রায় ২ লাখ টাকা বিদ্যুৎ খরচ হতো। এখন রিকশা কমে ৭০টিতে দাঁড়ালেও বিল আসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা। গ্যারেজ মালিকদের দেওয়া এসব হিসাব বিচ্ছিন্ন। তবে এগুলো থেকে মিটারভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার ও প্রকৃত চার্জিংয়ের মধ্যে সমন্বিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।

কোথাও হুক, কোথাও আবাসিক লাইন
সম্প্রতি তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ চার্জিংয়ের ঘটনা পাওয়া গেছে। তেজগাঁওয়ে বিদ্যুতের মূল লাইন থেকে সরাসরি সংযোগ নিয়ে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। মোহাম্মদপুরের একটি আবাসিক এলাকায় টিনশেড গ্যারেজে প্রায় ৩০টি রিকশা আবাসিক সংযোগ ব্যবহার করে চার্জ দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।

রায়েরবাজার বালুরমাঠ এলাকায় সেপ্টেম্বর মাসে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশ, র‌্যাব ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা যৌথ অভিযান চালান। ছয়টি গ্যারেজের মধ্যে চারটিতে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়া যায় এবং সেগুলো বিচ্ছিন্ন করা হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর, রায়েরবাজার, ঢাকা উদ্যান, বসিলা, বেড়িবাঁধ, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, পল্লবী, উত্তরা, বাড্ডা, নতুনবাজার, আফতাবনগর, মুগদা, মান্ডা ও যাত্রাবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

গ্যারেজ ঘিরে বাড়ছে অপরাধের অভিযোগ

বিদ্যুৎ ব্যবহারের অনিয়মের পাশাপাশি গ্যারেজগুলোকে ঘিরে অপরাধের অভিযোগও রয়েছে। পুলিশ সূত্রের ভাষ্য, গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদক কেনাবেচা ও সেবনের ঘটনা নতুন নয়। চুরি-ছিনতাইয়ের সঙ্গে এসব স্থানের যোগসূত্রও পাওয়া যায়। ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গ্যারেজকেন্দ্রিক মাদক মামলার সংখ্যা বেশি। এসব এলাকায় ভ্রাম্যমাণ অপরাধীদের আনাগোনাও থাকে। কেউ অপরাধ করার পর গ্যারেজে অবস্থান নিতে পারে সহজে। গ্যারেজগুলোর অবস্থানও এ ঝুঁকি বাড়ায়। অনেক গ্যারেজ আবাসিক ভবনের নিচে, টিনশেড ঘরে, দোকানের পাশে কিংবা সরু গলির ভেতরে। সেখানে রিকশা রাখা, চার্জ দেওয়া ও মানুষের যাতায়াত—সবকিছু একই জায়গায় হওয়ায় নিয়মিত নজরদারি কঠিন।

অগ্নিঝুঁকিও কম নয়
একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার ফলে অগ্নিঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সরু গলি বা আবাসিক ভবনের ভেতরে অপর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক অবকাঠামোয় একাধিক ব্যাটারি চার্জ হলে শর্টসার্কিট ও অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা থাকে। এর সঙ্গে রয়েছে পুরোনো সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি সংরক্ষণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ঝুঁকি। ব্যবহৃত ব্যাটারি যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থাৎ একটি অনিয়ন্ত্রিত গ্যারেজে বিদ্যুৎ চুরি বা বিল ফাঁকির পাশাপাশি অগ্নি ও পরিবেশগত ঝুঁকিও জমা হচ্ছে।

অভিযান হচ্ছে, কিন্তু থামছে না
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েক মাসে গ্যারেজে অভিযান চালিয়ে শতাধিক অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নতুন করে যাতে এসব গ্যারেজে সংযোগ দেওয়া না হয়, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান জানান, কয়েক মাস ধরে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে গ্যারেজগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ সংযোগ, আবাসিক লাইনে বাণিজ্যিক ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ চুরির বিষয়গুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে অভিযান-পরবর্তী পরিস্থিতিই এখন বড় প্রশ্ন। কোনো একটি গ্যারেজের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর সেখানে আবার নতুন সংযোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত নজরদারির আওতায় না থাকলে অনিয়ম স্থায়ীভাবে বন্ধ করা কঠিন।

নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে গ্যারেজও
সরকার ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীকে আটটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা করছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জোনভিত্তিক আলাদা রঙ, ডিজিটাল নম্বরপ্লেট ও কিউআর কোড রাখার কথা রয়েছে। কিউআর কোডের মাধ্যমে মালিক ও চালকের তথ্য জানা যাবে। খসড়া নীতিতে নিবন্ধন, চালকের লাইসেন্স, নির্ধারিত রুট, অনুমোদিত নকশা, নিরাপদ যন্ত্রাংশ ও বৈধ চার্জিং স্টেশনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই উদ্যোগ কার্যকর হলে রিকশার প্রকৃত সংখ্যা ও চলাচলের এলাকা সম্পর্কে একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরি হতে পারে। কিন্তু চার্জিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে শুধু রিকশার নিবন্ধন দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি অনুমোদিত গ্যারেজে কতটি রিকশা চার্জ হবে, কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, কোন মিটারে সেই ব্যবহার রেকর্ড হচ্ছে এবং বিলের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এসব তথ্যও নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনা
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। স্বল্প দূরত্বে কম ভাড়ায় যাতায়াতের সুযোগের কারণে যাত্রীদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে। একই সঙ্গে এই খাতে যুক্ত রয়েছে বিপুলসংখ্যক চালক ও মালিকের জীবিকা। তাই হঠাৎ নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যাটি মূলত নিয়ন্ত্রণের। রিকশার সংখ্যা নির্ধারণ, নিবন্ধন, রুট ব্যবস্থাপনা, গ্যারেজের অনুমোদন, চার্জিং স্টেশনের লাইসেন্স এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব—সবকিছুকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।

কালের আলো/এমএসআই/এমকে

বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়ার সরাসরি ফ্লাইট ও অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:১৮ অপরাহ্ণ
বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়ার সরাসরি ফ্লাইট ও অন-অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে ভিসা ও ভ্রমণ প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আনিস মাত্তা। এ সময় দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

সাক্ষাতে দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি, শিক্ষা খাতে সংযোগ সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতে গ্যাস ও তেল সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময় করেন তারা। বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়া বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশে আরও বেশি ইন্দোনেশীয় কোম্পানির ব্যবসা ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা, বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অন-অ্যারাইভাল ভিসা পুনরায় চালু এবং দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, পর্যটন, শিক্ষা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন সুযোগ কাজে লাগিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশে ইন্দোনেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও আলোচনা হয়।

সাক্ষাতে পোশাক, পাট, কৃষিপণ্য ও পাম অয়েলের বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি হালাল পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করা হয়। একই সঙ্গে বহুমাত্রিক সহযোগিতা জোরদার এবং দুই দেশের অভিন্ন মুসলিম ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত প্রকাশ করে।

সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত মিস লিসতিওওয়াতী এবং ইন্দোনেশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. আবুল হাসান মৃধাসহ প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির অর্থায়নে নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৯ অপরাহ্ণ
কেএনএফের ইউনিফর্ম তৈরির অর্থায়নে নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থায়ন ও এ-সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে সংগঠনটির প্রধান নাথান বমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

সিআইডির অনুসন্ধানে কেএনএফের ৪০ হাজার সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ ইউনিফর্ম তৈরির ফ্যাব্রিক ও সেলাই বাবদ মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

বুধবার (৮ অক্টোবর) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ এসব তথ্য জানান।

মামলার আসামিরা হলেন কেএনএফের প্রধান নাথানা লনচেও ওরফে নাথান বম (৪৯), মংহলাসিন মারমা ওরফে মং (৩৮), নিয়াজ হায়দার (৩৯), মো. গোলাম আজম (৪৭), সাহেদুল ইসলাম (২৭), মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (৫৮), জামালুল ইসলাম (৪৫), মো. তৌহিদুল ইসলাম (৩৮) ও মো. মতিউর রহমান (৪৩)।

সিআইডি জানায়, ২০২৫ সালের ১৮ মে রাতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) একটি বিশেষ দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার মোজাফফরনগর আবাসিক এলাকায় অভিযান চালিয়ে কেএনএফের পোশাক তৈরির সঙ্গে জড়িত একজনকে আটক করে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হালিশহরের ছোটপুল এলাকার দুটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে আরও দুজনকে আটক করা হয়।

পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি গোডাউন ও একটি গার্মেন্টস কারখানায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে ২০ হাজার ৩০০ সেট চার রঙের ক্যামোফ্লেজ কেএনএফ ইউনিফর্ম উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে গোডাউন থেকে ১১ হাজার ২০০ সেট এবং কারখানা থেকে ৯ হাজার ১০০ সেট ইউনিফর্ম জব্দ করা হয়। প্রতিটি সেটে ছিল একটি শার্ট ও একটি প্যান্ট।

এ ঘটনায় বায়েজিদ বোস্তামী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। পরে ইউনিফর্ম তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে সিআইডি।

সিআইডির অনুসন্ধানে ব্যাংক হিসাব, চেক, নগদ অর্থ প্রদান, ক্রয়াদেশ, ব্যবসায়িক পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ফ্যাব্রিক তৈরি ও ইউনিফর্ম সেলাইয়ের জন্য মোট ১ কোটি ৬২ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া যায়।

সিআইডির দাবি, কেএনএফের প্রতিনিধি হিসেবে মংহলাসিন মারমা প্রথমে নিয়াজ হায়দার এবং পরে তার মাধ্যমে গোলাম আজমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তারা ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেএনএফের ইউনিফর্মের ক্যামোফ্লেজ প্রিন্টের ফ্যাব্রিক তৈরির ব্যবস্থা করেন।

সিআইডি জানায়, ফ্যাব্রিক তৈরির জন্য ওয়েল কম্পোজিট নিট লিমিটেডকে ৯০ লাখ ৫৯ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪০ হাজার সেট শার্ট-প্যান্ট সেলাইয়ের জন্য রিংভো অ্যাপারেলস, এনএন ফ্যাশন ও নূর ফ্যাশনকে মোট ৭২ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

সিআইডির ভাষ্য, অনুসন্ধানে পাওয়া নথি ও সাক্ষীদের বক্তব্য পর্যালোচনায় কেএনএফের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নাথান বমের নির্দেশনায় মংহলাসিন মারমাসহ অন্য আসামিরা পারস্পরিক যোগসাজশে সংগঠনটির জন্য বিপুল পরিমাণ ইউনিফর্ম তৈরির উদ্যোগ ও অর্থায়ন করেন—এমন অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া সন্ত্রাসী সংগঠনের কার্যক্রমে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এসব ইউনিফর্ম তৈরিতে অর্থের হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।

এ ঘটনায় ৭ অক্টোবর বায়েজিদ বোস্তামী থানায় মামলা নম্বর-১৩ দায়ের করা হয়। মামলায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।

সিআইডি জানিয়েছে, মামলাটির তদন্তে কেএনএফের কার্যক্রমে ব্যবহারের জন্য অর্থের উৎস ও প্রবাহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক লেনদেন এবং এ আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত অন্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি